• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৫, ১৮ শাবান ১৪৪০

বাঙালির গর্ব মহাকাশে জয় বাংলা

মোস্তাফা জব্বার

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

এক

বছরটি যখন শেষ হয়েছে, যখন শেখ হাসিনার সরকার দশক অতিক্রম করে ১৫ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে তখন ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়ে ১৮ সালটার প্রাপ্তির দিকে একটু ফিরে তাকানো যায়। একবারে তো সবগুলোর কথা বলা যাবে না তাই একটু একটু করে বিষয়গুলো তুলে ধরতে চাই। বস্তুত ১৮ সালের সব অর্জন এতো ব্যাপক যে তার প্রতিটির জন্য ভিন্ন ভিন্নভাবে আলোচনা হতে পারে। তবে কিছু কিছু বিষয় আছে যা কোন সময়ের নিরীখে আলোচিত নয়, বরং জাতীয় অর্জন হিসেবে গৌরবের। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১৮ সালের তেমন একটি মহান অর্জন। বরং এই অর্জন শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়ে নয়, জাতীয় গৌরব হিসেবেই এটি এই জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।

বাংলাদেশের একটি নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকতে পারে এ ভাবনার সূচনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়কালে। তিনি ১৯৭৫ সালের জুন মাসের ১৪ তারিখে বেতবুনিয়ায় উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র উদ্বোধনের সময় মহাকাশে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারই সুযোগ্যা কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের লক্ষ্যস্থির করেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের মে মাসে বিটিআরসির কমিশনার (এসএম)-কে আহ্বায়ক করে গঠিত ‘স্যাটেলাইট কমিটি’ কর্তৃক ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ নামকরণের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, জাতীয় আইসিটি পলিসি ২০০৯ অনুযায়ী ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি মহাকাশে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। ২০১৮ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ এবং সেটির সফল পরিচালনা করাটাই অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার। কাজটি সুসম্পন্ন করা ছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উপগ্রহ ভূ কেন্দ্রের নামাকরণ তারই দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে করতে পেরেছি। আরও স্বস্তির বিষয় যে আমরা সফলতার সঙ্গে কেবল উৎক্ষেপণের কাজটিই সম্পন্ন করিনি, এটি আমাদের স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন কোম্পানির আওতায় এসেছে, এটির চমৎকার ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং পুরো জাতির জন্য এটি গৌরবের সবচেয়ে বড় প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণের সর্বশেষ উদ্যোগের বাইরেও কিছু অতীত কথা আছে। আমার মনে আছে শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন ৯৭ সালে ‘কেমন করে বাংলাদেশ থেকে সফটওয়্যার রফতানি করা যায়’ তার উপায় উদ্ভাবন করার জন্য একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করেন। সে টাস্কফোর্সের প্রধান ছিলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। আমিও সেই টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলাম। টাস্কফোর্স মোট ৪৫টি সুপারিশ প্রদান করেছিল। কমিটির কাছে আমি বাংলাদেশের একটি নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকার সুপারিশ করতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু টাস্কফোর্স ‘সময় হয়নি’-এই বিবেচনায় প্রস্তাবটি সুপারিশ আকারে পেশ করেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বসে থাকেননি। তার সরকার বাংলাদেশের একটি স্যাটেলাইট পাবার প্রকল্প গ্রহণ করে। জাপান সরকার সে প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে সম্মতিও প্রদান করে। তৎকালীনমন্ত্রী নুরুদ্দীন খান আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় বিষয়টি সম্পর্কে জানান। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হবার প্রাথমিক কারণ ছিল যে জাপানি অর্থায়ন নিশ্চিত করা সময়সাপেক্ষ হয়ে যায়। অন্যদিকে ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকার সে প্রকল্পটি বাতিল করে। তারই ফলে স্যাটেলাইট নিয়ে আমাদের ভাবতে হয় ২০০৯ সালে। এরপর ১২ সালে ৮৬.৮১ কোটি টাকার একটি প্রস্তুতি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পটির ব্যয় ১৪৬.৪১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।

এ প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্দেশ্যে ‘স্যাটেলাইট কমিটি’ বিস্তারিত বিবরণসহ টেন্ডার দলিল প্রস্তুত করে। এ প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে ৩২টি পরামর্শক সংস্থা প্রস্তাব দাখিল করে। মূল্যায়নের পর বাছাইকৃত ৭টি সংস্থার কাছে দরপ্রস্তাব চাওয়া হয় এবং প্রাপ্ত দরপ্রস্তাব মূল্যায়ন করে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক অনুমোদনের পর ‘এসপিআই’ নামক মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত ২৯ মার্চ ২০১২ তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

অরবিটাল স্লট : স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য অরবিটাল স্লট একটি প্রধান ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে বাংলাদেশের ফাইলিংকৃত ৭৪ ডিগ্রি, ১৩৩ ডিগ্রি, ৬৯ ডিগ্রি এবং ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল স্লটসহ অন্যান্য অরবিটাল স্লট নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব ফাইলিংকৃত উপরোক্ত অরবিটাল স্লট গুলির কো-অর্ডিনেশন জটিলতা এবং তরঙ্গ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে বিকল্প অরবিটাল স্লট অনুসন্ধান করা হয়। এ অনুসন্ধান কালে ৪৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা হতে ১৩৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত আর্কের মধ্যে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রঘিমা অরবিটাল স্লট লিজ/ক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায় এবং সার্বিক দিক বিবেচনায়, প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসপিআই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের জন্য ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল স্লটটি উপযোগী হিসেবে সুপারিশ করে। অতঃপর ইন্টারস্পুটনিকের সঙ্গে প্রথমে একটি এমওইউ স্বাক্ষর হয় এবং পরে মোট ২৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে একটি ব্যবসা পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্প অনুমোদন : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ সংক্রান্ত কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য পরামর্শকের সহায়তায় প্রস্তুতকৃত ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ শীর্ষক প্রকল্পের ‘ডিপিপি’ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনে দীর্ঘ পর্যালোচনার পর গত ১৬/০৯/২০১৪ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘একনেক’ সভায় মোট ২৯৬৭.৯৫৭৭ কোটি টাকায় (জিওবি ১৩১৫.৫১৩৫ কোটি টাকা ও প্রকল্প সাহায্য ১৬৫২.৪৪৪২ কোটি টাকা) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের সংশোধিত মূল্য মোট ২৭৬৫.৬৬২৫ কোটি টাকা (জিওবি ১৪০৬.৯০৫৩ কোটি টাকা ও প্র:সা: ১৩৫৮.৭৫৭২ কোটি টাকা)। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ প্রকল্পের প্রধান অঙ্গসমূহ হলোÑ স্যাটেলাইট নির্মাণ, কক্ষপথে উৎক্ষেপণ, দুটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন ও ফ্যাসিলিটি নির্মাণ, স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি গঠন, প্রয়োজনীয় বীমা সংগ্রহ, অরবিটাল স্লট লিজ/ক্রয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা।

স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয় : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বৈদেশিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কারিগরি বিনির্দেশ ও দরপত্র প্রণয়ন করা হয়। প্রণীত টেন্ডার দলিলের ভিত্তিতে মার্চ ২০১৫ তে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবান করা হলে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা ও চীনের মোট ৪টি স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। মূল্যায়ন কমিটির বিচার বিশ্লেষণের পর ফ্রান্সের থ্যালাস এলেনিয়া কোম্পানি একমাত্র সফল দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয় প্রস্তাবটির অনুমোদন দেয়ার পর ১১ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীসহ সংসদীয় কমিটির মাননীয় সদস্যবৃন্দ, কূটনীতিক ও দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিতিতে থ্যালাস এর সঙ্গে মোট ১৯৫১, ৭৫, ৩৪, ৪৮২/- টাকা মূল্যে স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (সংশোধিত চুক্তি মূল্য কমে গিয়ে মোট ১৯০৮৭৫ কোটি টাকা)।

কাভারেজের আওতা : কারিগরি বিনির্দেশ ও চূড়ান্ত ডিজাইন অনুযায়ী ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ ১১৯.১ ডিগ্রি পূঃদ্রাঃ অরবিটাল লোকেশনে সফল তরঙ্গ সমন্বয় সাপেক্ষে সমগ্র বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং ‘স্তান’ ভুক্ত দেশসমূহের অংশ বিশেষ কাভারেজের আওতায় আসবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর কমিউনিকেশন মডিউল ও সার্ভিস মডিউল : ২০১৭ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর প্রধান দুটি মডিউল (কমিউনিকেশন মডিউল ও সার্ভিস মডিউল) তৈরি ও একীভূতকরণের কাজ এবং সোলার প্যানেল, এন্টেনা তৈরির কাজ শেষ হয়। প্রকল্পের বৈদেশিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এর দুজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে থ্যালাসের উক্ত ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটিতে বর্ণিত কার্যাদি সম্পন্ন হয়।

বস্তুত ২০১৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর নির্মাণকাজ চলতে থাকে। নির্মাণকাজ শেষে গত ১৭-২১ নভেম্বর ২০১৭ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর প্রি শিপমেন্ট সম্পন্ন করার আগে প্রায় ৬ মাস ধরে মোট ৪টি ধাপে থ্যালাস কর্তৃক সব ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।

(পরের সংখ্যায় সমাপ্য)

ঢাকা, সর্বশেষ আপডেট ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সম্পাদক, বিজয় কিবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক]