• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪১

বাংলার পাট ও পাটশিল্প

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ এপ্রিল ২০১৯

পাটকে বলা হয় সোনালি আঁশ। আর এদেশে এক সময় পাটই ছিল প্রধান অর্থকরি ফসল। বাংলার মাটি পাট চাষের জন্য উপযোগী বলেই প্রচুর পাট উৎপাদন হতো। যার ফলে অতিতে বাংলায় প্রধান শিল্প ছিল ‘পাট শিল্প’। এশিয়া তথা বিশে^র অন্যতম পাটকল ছিল আদমজী জুটমিল। পাটের চাহিদা অতীতেও ছিল এখনও আছে। বিশ্বের প্রায় ৬০ দেশে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা আছে এবং রফতানি হয়। ইন্টারন্যাশনাল জুট স্টাডি গ্রুপের তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববাজারে শপিংব্যাগের বার্ষিক চাহিদা পাঁচ হাজার কোটি পিস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০১৯ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা আমাদের পাট শিল্পের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ জন্য পাটপণ্যের জন্য রিফাইন্যান্সিং ফান্ড বা গ্রিন ফান্ডের আওতায় ঋত সুবিধা প্রদান, প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবল বাড়াতে পারলে তা পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য সুবিধাজনক হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যে জানা যায়, গত অর্থবছরের আট মাসে কাঁচা পাট রফতানিতে আয় হয়েছে আট কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এ সময়ে পাট সুতা ও কুন্ডুলী রফতানিতে আয় হয়েছে ৩৪ কোটি ১২ লাখ ডলার। পাটের বস্তা ও ব্যাগ রফতানি হয়েছে ছয় কোটি ২৬ লাখ ডলারের এবং পাটজাত অন্যান্য পণ্য থেকে রফতানি আয় হয়েছে ছয় কোটি ৯৮ লাখ ডলার। ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশের জনগণ প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারের প্রতি সচেতন হওয়ায় সেখানে পাটপণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে মোট ২২টি পাটকল চালু রয়েছে এবং বেসরকারি খাতে প্রায় ২০০ পাটকল আছে। বাংলাদেশে পাটশিল্পের চলছে দুরবস্থা। পাটমন্ত্রী কয়েকদিন আগে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন যে, দেশে মোট ৩১৪টি পাটকলের মধ্যে এখনও ৬৩টি পাটকল বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ গেজেট অতিরিক্ত ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই মোতাবেক দেশে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৭টি। সম্প্রতি আরও ৬টি পাটকল পুনর্গ্রহণ করায় মোট জুটমিলের সংখ্যা হয়েছে ৩৩টি। যার মধ্যে ৭টি মিল বন্ধ রয়েছে। আবার বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৮১টি যার মধ্যে ৫৬টি পাটকল বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হয় বা হচ্ছে লোকসানের কারণে।

প্রশ্ন হচ্ছেÑ কেন লোকসান হয়? পাটজাত পণ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে যথেষ্ট চাহিদা আছে এবং ছিলও। আর দামও ভালো। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, অভ্যন্তরীণ শিল্পের যা চাহিদা তার চেয়ে বেশি পাট উৎপাদন হতো, এখনও হয়। তারপর পরও লোকসান কেন? ৮২টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে বর্তমানে ২৭টি মতো চালু আছে। শিল্প বন্ধ করেও লোকসান কমানো যাচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল বলছে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বিজেএমসির নিট লোকসান ছিল ১৫১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা যা গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৩০ এপ্রিল মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮৯ কোটি ৩১ লাখ টাকায়। কথায় বলে যে ‘লাভের গুড় পিপড়ায় খায়’। আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার অবস্থাও তাই। বাকিটা আর নাই বা বললাম। মূল কথা হচ্ছে যে, আমাদের দেশে পাটশিল্প লোকসানের দোহাই দিয়ে বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, যেসব শিল্প চালু আছে সেগুলো লাভজন অবস্থায় চলেও নতুন শিল্প গড়ে উঠার কথা। কারণ-পাটের উৎপাদন বেড়েই চলছে। কৃষক লোকসান দিয়ে হলেও পাটের উৎপাদন বাড়িয়েই চলছে। ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে পাট চাষ হয়েছিল ১২ লাখ ৬৬ হাজার একর জমিতে আর উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৫৩ হাজার টন। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৭ একর জমিতে আর উৎপাদন সাড়ে ৮৮ লাখ টনেরও বেশি। এখানে উল্লেখ্য-এক বিঘা জমিতে পাট চাষে ১৬-১৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বিঘাতে পাট হয় ১০-১২ মণ। প্রতি মণ পাট বিক্রি হয় এক হাজার থেকে ১৪শ’ টাকা পর্যন্ত। এ দামে পাট বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠে না। তারপরও কৃষক পাট করে যাচ্ছে। যদি সরকার পরিবেশ দূষণকারি পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়ে পাটজাত পণ্যের ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় তাহলে শিল্পও বাঁচে, বাঁচে কৃষকও।

বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতমানের দেশি ও তোষা পাট আমাদের দেশেই উৎপন্ন হয়ে থাকে। পাট তন্তু জাতীয় উদ্ভিদ। পাট গাছের ছাল থেকে পাটের আঁশ সংগ্রহ করা হয়। পাট আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের দেশে ২০০ বছরের ও আগের থেকে বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশে পাট অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। যদিও বর্তমানের রাষ্ট্র ও সমাজকর্তারা তা স্বীকার করতে চান না। পাট বিক্রির বাড়তি অর্থ দিয়েই এ ভূখন্ডে কৃষক তার সন্তানকে শ্লেট, পেন্সিলসহ শিক্ষা সামগ্রী কিনে দিতে শুরু করেন। নানাভাবে পাট ও পাটশিল্পকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে, যার ফলে আমাদের সমাজ বিকাশে পাটের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এক সময় প্রধান রফতানি পণ্য হিসেবে পাট খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হত। রফতানি আয়ের একটি ভালো অংশ এখনও পাট খাত থেকে এসে থাকে। আমাদের দেশের পাটের বাজারকে কেন্দ্র করে ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছিল আদমজী পাটকলের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে বাংলাদেশে ২৬টি সরকারি ও ৭৬টি বেসরকারি পাটকল রয়েছে। যদিও সবগুলিতে এখন উৎপাদন হয় না। আবার কলগুলো পুরনো হওয়ার কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন খরচ বেশি হয়। যার ফলে মিলগুলোতে লোকসান হয়ে থাকে। পাট ও পাটজাত দ্রব্যের উৎপাদন ও বিকাশের জন্য যে পরিমাণে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন আমাদের রাষ্ট্র তা করছে না। তুলার সঙ্গে পাটের আঁশ ব্যবহার করে চীনের মতো কাপড় উৎপাদন করতে পারলে একদিকে তুলার আমদানি হ্রাস পেত, অন্যদিকে পাটের ব্যবহারও বৃদ্ধি পেত। ফলে কৃষক ভালো দাম পেত এবং তুলা আমদানি কমে যাবার কারণে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো। স্বাধীনতার পর থেকে পাটের দাম উঠা-নামা করার মধ্য দিয়ে চলছে। তবে পাট চাষি তার লাভজনক দাম পাচ্ছেন না অনেক বছর ধরে। দেশের স্বার্থে পাট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পাট চাষিদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে বিবেচনায় নিতে হবে। চাষিদের স্বার্থকে উপেক্ষা করে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পাট চাষিদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার যে, উৎপাদন করতে যে সব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তার প্রতিকার করা। বিদেশে কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্যের রফতানি কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পাট চাষি ও পাট শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক, কর্মচারী ও ছোট ব্যবসায়ীরা। একটি কথা সমাজে বেশ ভালোভাবেই প্রচলিত আছে যে, যার দাম একবার বাড়ে, তার দাম আর কমে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে কৃষকের বেলায় এ কথাটি অর্ধসত্য। কেন না কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে আর কমে না। তবে কৃষি ফসলের দাম যে কোন সময়ে কমে যেতে পারে। পচনশীল খাদ্য দ্রব্যের বিষয়টা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু পাটের বেলায়...? প্রায় ৪ কোটি লোক পাট খাতের সঙ্গে জাড়িত। কৃষক-ক্ষেতমজুর সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। পাট বিপণন ও কাঁচা পাট ব্যবহার উপযোগী করে ‘পাট পণ্যে’ পরিণত করতে নানা স্তরে বহুলোকের প্রয়োজন হয়।

পাট ও পাটশিল্পের বিকাশের পথে বাঁধা রয়েছে অনেক। প্রথমত, সরকারের উদাসীনতা বা অবহেলা। গত কয়েকটি সরকার ব্যক্তি খাতকে প্রাধান্য দিলেও ব্যক্তি খাতের বৃহত্তর খাত হলো কৃষি। কিন্তু এদিকে নজর নেই। কারণ এখানে কমিশন কম। দ্বিতীয়ত, বিদেশি ষড়যন্ত্র। যে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপত্রের দ্বারা আদমজী পাটকল বন্ধ করা হয়েছিল, সেই বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একই সময়ে ভারতে নতুন পাটকল স্থাপিত হয়েছিল। লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি। অথচ আদমজী পাটকল বন্ধ করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যে টাকা খরচ করা হয়েছিল, তার থেকে অনেক কম টাকা দিয়ে পাটকলটি বিএমআরআই করালে লোকসান না হয়ে বরং লাভ হতো। পাট খাত সংস্কার কর্মসূচির নামে বিভিন্ন সময় বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে পাটচাষি ও পাটকল শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী এবং পরিবেশের পরিপন্থী কাজ করা হয়েছে। তৃতীয়ত, পাট ও পাট শিল্পের অন্তরায় হলো পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার। নাগরিক সচেতনতা এর জন্য দায়ী। দুঃখের বিষয় যে, পাটকল শ্রমিকদের বেতন-ভাতার জন্য রাস্তায় আন্দোলন করতে হয়।

[লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন]

  • গড়ে তুলুন ডিজিটাল স্কুল

    মোস্তাফা জব্বার

    newsimage

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিগত দশকের সবচেয়ে যুগান্তকারী স্লোগানটি হলো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। স্লোগান হিসেবে