• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৭ চৈত্র ১৪২৫, ১৩ রজব ১৪৪০

বহুজাতিক ও বড় কর দাতাদের মধ্যেই রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বেশি

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম

| ঢাকা , শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

বড় করদাতা ও কোম্পানিগুলোর মাঝে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা বেশি। মোবাইল কোম্পানিগুলো থেকে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি, দেশিয় কিছু কিছু কোম্পানি ছাড়াও বড় ব্যক্তি করদাতারাও কর ফাঁকি দিয়ে থাকেন। পত্রিকার খবর অনুযায়ী ১৮ বছরে সরকারকে বড় অংকের কর ফাঁকি দিয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর রবি অ্যাক্সিয়াটা লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার কর ও অন্যান্য প্রদেয় ফাঁকি দিয়েছে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত চালানো এক অডিটে এ তথ্য বেরিয়ে আসে। মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেডের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ উঠে প্রায় ৯২৫ কোটি টাকার। ২০১৬ সালে দুই অপারেটর রবি ও এয়ারটেল একীভূত হওয়ার পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল ফোন সেবাদানকারী কোম্পানিতে পরিণত হয় রবি আজিয়াটা লিমিটেড। এমন অনেক বড় কোম্পানির বিরূদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আছে বাংলাদেশে কর্মরত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নজিরবিহীন রাজস্ব কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজস্ব অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তালিকায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদানকারী হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু তদন্তে এসব কোম্পানির রাজস্ব অনিয়মের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এনবিআর বিব্রত। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ফাঁকি দেয়া অর্থ আদায় করা যাচ্ছে না। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সার্বিক রাজস্ব আদায়ে। সন্দেহ করা হচ্ছে, রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত বিপুল অর্থের বেশির ভাগই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তদন্ত অনুযায়ী, অনিয়মের শীর্ষে আছে গ্রামীণফোন এবং ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেড (বিএটিবি)। অভিযুক্ত ১৪ বহুজাতিক কোম্পানিই মূল্য সংযোজন কর বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (ভ্যাট এলটিইউ) নিয়ন্ত্রণে। একাধিক তদন্ত এবং নিরীক্ষায় দেখা গেছে, বিএটিবি, গ্রামীণফোনসহ অধিকাংশ নামিদামি বহুজাতিক কোম্পানিই দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত এমন খবর উঠে আসে।

আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়েই রাজস্ব অনিয়ম বেশি উদঘাটিত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের আইনি জটিলতায় এ বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় আইনি জটিলতায় বকেয়া আদায় বিলম্বিত হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বহুমুখী প্রতারণা, জালিয়াতি, উৎপাদন ও বিক্রি কম দেখানো, কাগজপত্রে মিথ্যা তথ্য এবং ঘোষণা প্রদান, অবৈধ রেয়াত নেয়াসহ নানা কায়দায় রাজস্ব ফাঁকি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, সেরা ও সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদানকারী হিসেবে সম্মান পাচ্ছে তুলনামূলক অখ্যাত এবং কম রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যা বিব্রতকর। আইনে রাজস্ব অনিয়মে জড়িত হলে এবং এজন্য সরকারের পাওনা পরিশোধ না করার দুর্নাম থাকলে রাষ্ট্রীয় এ সম্মাননা পাওয়ার সুযোগ নেই। বহুজাতিক কোম্পানিগুরো উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব প্রদানে বিলম্ব করছে। এলটিইউ কর্তৃপক্ষের দাবি, এখন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকি ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও তা আদায় করা যাচ্ছে না। এ জন্য লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিএটিবির বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম মামলায় ২ হাজার ৪২১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে উচ্চ এবং মধ্যম মূল্যস্তরের সিগারেটকে নিু মূল্যস্তরের অসত্য ঘোষণা প্রদান এবং ঘোষণার অতিরিক্ত উপকরণ থেকে পণ্য তৈরি করে সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে রিপ্লেসমেন্ট সিমকার্ড ইস্যুর নামে গ্রাহকের কাছে নতুন সিমকার্ড বিক্রয়ের মাধ্যমে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা, গ্রাহক সংখ্যা কম দেখিয়ে সিম বিক্রয়ের তথ্য গোপন করে ৭৩০ কোটি ২৮ লাখ টাকা, সরবরাহকৃত সিমকার্ডের ওপর প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট হিসেবে ৪৫২ কোটি ৫৩ লাখ টাকার রাজস্বসহ এ পর্যন্ত ১৮টি অনিয়মের মামলায় ফাঁকির পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। ভ্যাট কর্তৃপক্ষের দাবি, দুটি বহুজাতিক কোম্পানির এসব অনিয়ম উদঘাটিত ও প্রমাণিত। কিন্তু বাস্তব অনিয়ম আরও অনেক বেশি বলে সন্দেহ করা হয়। মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক ৬১৮ কোটি টাকা, রবি ১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। অন্য বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ২২ কোটি টাকা, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট (বাংলাদেশ) লিমিটেড ১২২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, বাটা শো কোং বাংলাদেশ ৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, হোলসিম বিডি লিমিটেড ২০ কোটি ৩২ লাখ টাকা, নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড ১০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, সানোফি এভেন্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ৩৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা, এইচএসবিসি ৯ কোটি টাকা এবং নিউজিল্যান্ড মিল্ক প্রো. (বাংলাদেশ) লি. ৫৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে এনবিআর সূত্র জানা যায়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো রাজস্ব ফাঁকি দেয় না- এমন ধারণা ছিল প্রতিষ্ঠিত। রাজস্ব অনিয়মের সব দায় এতদিন ছিল দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। কিন্তু সেই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে নজিরবিহীন রাজস্ব জালিয়াতি আর অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে এসব নামিদামি কোম্পানি। এ বিষয়ে ভ্যাট এলটিইউর কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, অডিট হলেই বহুজাতিকের অনিয়ম ধরা পড়ছে। আগে এসব কোম্পানির ওপর তেমন নজরদারি ছিল না। কিন্তু এখন প্রতি বছরই যেভাবে রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটিত হচ্ছে তাতে আশঙ্কা অতীতে এসব কোম্পানি এর অনেকগুণ ফাঁকি দিয়েছে, যা অজানা। নামিদামি এসব কোম্পানিকে অনেকবার সতর্ক করা হয়েছে। ভ্যাট আইনে পাওনা অর্থ আদায়ে দাবিনামা জারি, অর্থদন্ডসহ বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও ফাঁকি থামছে না। প্রতি বছরই নতুন নতুন কায়দায় এসব বহুজাতিকের রাজস্ব অনিয়ম বেড়ে চলেছে বলে দাবি ভ্যাট কর্তৃপক্ষের। ধারণা করা হয়, রাজস্ব ফাঁকির এ বিপুল অংকের অর্থ বিদেশে মূল বিনিয়োগকারীদের কাছে পাচার করা হয়েছে। যদিও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তা স্বীকার করছে না। তাদের দাবি, এসব অভিযোগ বিতর্কিত। যদিও ভ্যাট কর্তৃপক্ষ সরকারের বকেয়া আদায়ে কোম্পানিগুলোকে একাধিকবার দাবিনামা জারি করেছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফাঁকি দেয়া অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এ দাবিনামা অগ্রাহ্য করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে, যা এখন বিচারাধীন।

ইউনিলিভার বাংলাদেশসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান করে দুই কোটি ৮৩ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির অনিয়ম পায় শুল্ক মূল্যায়ন ও অডিট (সিভিএ) বিভাগ। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- সোলাইমান প্রিন্টিং, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, রিধিকা ট্রেডিং, অপশন প্লাস, এসআর ট্রেডিং ও এলজে এন্টারপ্রাইজ। মোট ১৮টি আমদানি চালানে রাজস্ব ফাঁকির এই অনিয়ম পাওয়া যায়। এসব কোম্পানি এনবিআর নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্য থেকে কম মূল্যে এবং জালিয়াতি করে সিপিসি পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা এই রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। এর অধিকাংশ চালান চীন থেকে আমদানি করা। অন্যদিকে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এজন্য সুবিধা নেয়া ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের আয় ও রিটার্ন খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। এনবিআর প্রণোদনার আওতায় অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ, ঢাকার বাইরে বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে কর অবকাশ সুবিধা দিচ্ছে সরকার। ব্যক্তিশ্রেণীর ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারসহ বেশকিছু খাতে বিনিয়োগে কর অবকাশ ও রেয়াতের সুযোগ রয়েছে। অনেক করদাতাই এসব সুবিধার অপব্যবহার করছেন বলে এনবিআরের কাছে অভিযোগ রয়েছে। কোম্পানিগুলো কর অবকাশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে অন্য প্রতিষ্ঠানের অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। একই মালিকানার অধীন কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে আয় বেশি দেখানো হলেও করযোগ্য প্রতিষ্ঠানের আয় কম দেখানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে কর ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা শেয়ারবাজার, ডিবেঞ্চারসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ দেখিয়ে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। এসবের সত্যতা যাচাই করতেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেশি আগেই যে ধনী নাগরিকেরা তুলনামূলক কম কর দেয় তাদের একটি তালিকা তৈরি করছে এনবিআর। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আরও রাজস্ব যোগ করতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়। বাংলাদেশে কাজ করা বিদেশিদের কর ফাঁকি ধরতে নতুন করে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। এরই মধ্যে এমন ৩০টি প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশির সঠিক সংখ্যা সরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই। অধিকাংশ বিদেশি বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট ভিসা ব্যবহার করেন। এরপর বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। অনেকে বিভিন্ন কোম্পানির ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে আসেন। বিশেষ করে এনজিও, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, গার্মেন্টস, মার্চেন্ডাইজিং, পরামর্শকসহ বিভিন্ন পদে যোগ দিয়ে উচ্চ বেতন নেন। তাদের বেতনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গোপন রাখে। তার থেকে কোনো আয়কর আসে না। এদিকে বাংলাদেশে ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা ও ছোট ছোট অবৈধ কোম্পানি ও ব্যান্ডের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। রাজস্ব ফাঁকি দেয়া ধোঁয়াবিহীন তামাক কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিবন্ধনহীন ধোঁয়াবিহীন তামাক কোম্পানিগুলোকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তালিকাভুক্ত করা জরুরি।

[লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন]

  • প্রিয় গ্রাম ভুলবাড়িয়া

    রণেশ মৈত্র

    ভুলবাড়ীয়া আমার পৈতৃক গ্রাম। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছি ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সহধর্মিনী