• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৫, ১৪ রমজান ১৪৪০

প্রিয় গ্রাম ভুলবাড়িয়া

রণেশ মৈত্র

| ঢাকা , শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

ভুলবাড়ীয়া আমার পৈতৃক গ্রাম। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছি ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সহধর্মিনী পূরাবী মৈত্রসহ। ফিরে আসার কথা ছিল ২০১৯ জানুয়ারিতে কিন্তু মেয়ে মালবিকা কুমকুমের গুরুতর অসুস্থতার কারণে উদ্বিগ্ন চিত্তে আগেই ফিরে আসতে হলো। মেয়েটি এখনও ২৪ ঘণ্টা শয্যাশায়ী তবে বাসায়। মাস তিনেক হলো বাসায় আনা হয়েছে। কিন্তু তার সংসারে আমাদের জমাতা গৌতম আর ১০/১২ বছরের শিশু কন্যা জয়িতা। আমার স্ত্রীকেই সংসারের সব দেখশুনা করতে হচ্ছিল।

এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লাম আমি। হার্টের। তৎক্ষণাৎ ভর্তি করা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। চিকিৎসাধীন থাকলাম প্রফেসর ড. সজল ব্যানার্জি ও তাঁর সহকারী সহযোগি অধ্যাপক ড. দীপক কৃষ্ণ অধিকারীর। থাকতে হলো সিসিইউতে (কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটে) প্রায় দু’সপ্তাহ। দিবারাত্র মনিটরিং, ওষুধপত্র সেবা শশ্রুষা চললো আন্তরিকতার সঙ্গে কি ডাক্তারদের কি নার্সদের। অতঃপর ছাড়া পেয়ে বাসায় আসলাম।

এতক্ষণ গেল নিতান্তই ব্যক্তিগত বা সাংসারিক প্যাচাল। তবে এর সঙ্গে শিরোনামটি অপ্রাসঙ্গিক কিছু নয় বরং খুবই প্রাসঙ্গিক কারণ এই সমস্যাগুলির জন্যেই বিলম্ব ঘটে যাচ্ছে গ্রামে ফিরতে। লেখালেখি যা করছি তাও ঢাকায় মেয়ের বাসায় বসে। শুরু করি নানা প্রতিকূলতার মধ্যে হাসপাতাল থেকেই।

সেই ১৯৪৭ সাল থেকে মা-ভাইদের নিয়ে বাস করেছি পাবনা শহরে। তখন আমি হাই স্কুলের ছাত্র পাবনায় প্রখ্যাত গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিশনের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। কিন্তু বছরের শুরুতে ভর্তি হতে পারিনি হয়েছি ফেব্রুয়ারি (আজকের এসএসসি) পাস বরে সংসারিক কারণে একটি বেসরকারি ওষুদ কারখানায় চাকরি নিতে হয় ১৯৫০ সালেই।

কিন্তু তখন তো পাবনা শহরে এসে গেছি সবাই মিলে। তার আগ পর্যন্ত ছিলাম তৎকালীন বর্ধিষ্ণু গ্রাম ভুলবাড়িয়াতে। গ্রামটির উত্তর দক্ষিণ দিক পূর্ব দিকে দিয়ে ইছামতি নদী প্রবাহিত ছিল। এখন স্তিমিত। নদীর পশ্চিম পাড়ের গ্রামটিই হলো ভুলবাড়িয়া। সাঁথিয়া থানার ভুলবাড়িয়ার ইউনিয়নের অন্তর্গত এই গ্রামটি নদী পারাপারের জন্য গ্রীষ্মকালে বাঁশের অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করা হতো। ওপারে হাটবাড়ীয়া নামক গ্রাম। পাশেই ছিল ভিন্ন গ্রাম। ঐ গ্রামের ঘোষদের বাড়ীর একটি ছেলে ছিল আমার সহপাঠী। সহপাঠী বন্ধুর অনুরোধে অনেকদিন থেকেই তাদের বাড়ীতে।

ভুলবাড়ীয়া একটি গ্রাম নয় শুধু ইউনিয়নও কিন্তু তখন ইউনিয়ন হেডকোয়ার্টার ভুলবাড়িয়ার চেয়াম্যান আবদুর রহমান মল্লিকের বাড়িতে। তেবাড়িয়া গ্রামে। ওনার বাড়ি ছিল তেবাড়িয়া গ্রামেই। গ্রামের বাড়িতেই ছিল দুটি অফিস সম্ভবত একই ঘরে। একটি হলো ইউনিয়ন পরিষদ অফিস অপরটি হলো পোষ্টঅফিস। তখন এই দুটি অফিসই ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পরিষদ এখনও গুরুত্বপূর্ণ তবে অনেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বারদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। অথচ ভোট তো তারা পান ভালো এবং সৎ মানুষ হিসেবেই। তবে চেয়ারম্যান আবদুর রহমান মল্লিককে একজন শতভাগ সৎ এবং অত্যন্ত ভদ্র মানুষ হিসেবে দেখেছি।

ইউনিয়ন পরিষদের হেড কোয়ার্টার অর্থাৎ ইউনিয়ন হেড কোয়ার্টারেই থাকা উচিত এমন মত অনেকেরই ছিল। কিন্তু তখন সরকার সম্ভত অফিস বাবদ টাকা পয়সা না দেওয়াতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাটি এমনই ছিল। আবদুর রহমান মল্লিকের মৃত্যুর পর কে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বূাচিত হয়েছিলেন তা কিছুতেই স্মরণে আনত্ েপারলাম না। তেমনি পোষ্ট অফিসটি তেবাড়িয়া থেকে অন্য কারও বাড়ীতে স্থানান্তর হয়েছে বেশ অনেক দিন হলো কিন্তু তাঁর নামটি বা গ্রামটির কথাও মনে পড়ছে না। বস্তুত তখন পোষ্ট মাষ্টারদের নাকি কোন বেতন ছিল না তবে চড়ংঃসধহ কিছু পেতেন। অর্থাৎ আয়ের ভিত্তিতে পোষ্ট অফিসের স্তর নির্ধারিত হতো। এভাবে তিন ধরণের পোষ্ট অফিস ছিল যার সর্বনি¤œ ছিল আমি যেটার কথা উল্লেখ করলাম সেইটি।

কিন্তু ভুলবাড়িয়াতে তখন ছিল মস্ত বড় একটা বাজার ইছামতি নদীর কুলঘেঁষা। নদীটি বছওে ৭/৮ মাস প্রবহমান থাকতো। ছোট একটা লঞ্চ চলতো বেড়া থেকে পাবনা পর্য্যন্ত থামতো প্যাসেঞ্জার উঠানো নামানোর জন্য। ভুলবাড়িয়া ঘাটেও এমন একটা ষ্টপেজ ছিল যেখান থেকে বছরে অন্তত: ২/১ বার বা বার মাসে পাবনা শহরে যেতাম। সে শহরও আজকের চাইতে বহুলাংশে ভিন্ন। আজকের মত তখন এত দালানকোঠা ছিল না বহুতল বিশিষ্ট দালানের তো প্রশ্নই ওঠে না। মূল যানবাহন ছিল টমটম। রিকসার প্রচলন তখনও সুরু হয় নি। তবে বাইসাইকেলের প্রচলন ছিল ব্যাপক তা থেকেই ধীরে ধীরে রিকশার প্রচলন হতে শুরু করে।

ইছামতি নদী দিয়ে কুধুমাত্র ছোট ছোট লঞ্চ বা ষ্টীমার চলতো তাই না। গহনার নৌকাও একটি বা দু’টি করে দৈনিক বেড়া থেকে পাবনা অবধি চলাচল করতো। ৪/৫ মাস যখন নদীর জল শুকিয়ে যেত তখন জাল দিয়ে নদী ঘিরে ‘কাঠা’ বসানো হতো অনেকগুলি। জেলেরা এই কাঠা বসাতেন চৈত্র বা বৈশাখ মাসে যখন নদী প্রায় শুকিয়ে আসতো তখন ঐ কাঠা সংকুচিত করে এনে মাছ ধরা হতো। বিশাল বিশাল নানা জাতীয় তরতাজা মাছ। রুই, কাতলা, বোয়াল, চিতল, খুঁটি সরপুটি, ভ্যাদা (নয়না), রায়েক প্রভৃতি। ওখান থেকেই বেপারীরা নগদ দামে মাছ কিনে নিয়ে পাবনার আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতো।

অপূর্ব সুস্বাদু ছিল সেই মাছগুলি। কিন্তু মাছের সেই স্বাদ কোথায় যে হারিয়ে গেল তা ভাবতে অবাক লাগে। বিদেশি মাছ ক্রস করাতে এমনটি ঘটে এ কথা অনেকেই বলেন। সেটি একটি কারণ হলেও একমাত্র কারণ বলে মনে হয় না। মাটিতে ছিটানো কেমিক্যাল সার নদীর জল শুকিয়ে, মাছকে মোটাতাজা করার কৃত্রিম চেষ্টা মাছকে বড় হতে না দিয়ে অত্যন্ত ছোট থাকতেই সেগুলি ধরে বাজারস্থ করা, ফরমালিন প্রয়োগ প্রভৃতি মিলেই সম্ভবত এমনটি হয়েছে। একমাত্র নদ-নদী-খাল জলাশয়গুলো অতীতের মত চওড়া এবং বড় নদীগুলির সঙ্গে ছোটগুলির উপযুক্ত সংযোগ ঘটাতে পারলে সম্ভবত আমরা সেই স্বাদ আবার অনেকটা ফিরে পাব। সঙ্গে কেমিক্যাল জমিতে দেয়া বন্ধ করা, মাছের ভাল খাদ্যেও ব্যবস্থা করা এবং ছোট অবস্থায় মাছ আদৌ না ধরা-এগুলিও করতে হবে।

ভুলবাড়িয়াতে বাজার বসতো রোজ বিকেলে শেষ হতো সন্ধ্যার অনেক পারে। মাছ, দুধ, মিষ্টান্ন ছাড়াও সকল ধরণের টাটকা তরকারি স্থায়ী কাপড়ের দোকান ও মুদিখানা দোকন প্রভৃতি ছিল যথেষ্ট। ওই বাজার তার বিশালত্ব নিয়ে আজ আর বেঁচে নেই যদিও বাজারটি ক্ষুদ্রাকারে রোজই বসে। বাজারের বিশাল এলাকা এখন বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়।

ভুলবাড়িয়াতে একটি সরকারি ফ্রি প্রাইমারি স্কুল ছিল। দোচালা টিনের ছাদের বিশাল লম্বা একটি কাঁচা ঘর। মেঝে মাটির। ওই বড় একটি রুমেই নানা স্থানে নানা ক্লাসের ছেলেমেয়েদের বইপত্র পাশে রেখে বেঞ্চে রেখে বসতে হতো। স্কুলটির প্রতিষ্ঠার সাল এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। তবে এটিই ছিল বৃটিশ সরকারের প্রথম প্রাইমারি স্কুল অভিভক্ত বাংলায়। আমার বাবা প্রয়াত রমেশ চন্দ্র মৈত্র আজীবন ওই স্কুলে সহকারী শিক্ষক পদে শিক্ষকতা করেছেন। আমিও চতুর্থ শ্রেণী পর্য্যন্ত ওখানেই পড়ি। তখন প্রাইমারী ছিল চতুর্থ শ্রেণী পর্য্যন্তই। অনেক পরে পঞ্চম শ্রেণী পর্য্যন্ত ইদানীং চেষ্টা চলছে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। প্রাইমারী পরীক্ষা ( জেএসসি) পাস করলে প্রাইমারি পাস ধরা হবে। স্কুলটির তদানীন্তন প্রধান শিক্ষক ছিলেন নায়েব আলী মন্ডল। আমি ছিলাম তার অন্যতম প্রিয় ছাত্র।

স্কুলটি এখন আর দোচালা টিনের ঘরে নেই। সরে এসেছে পূবে। উত্তর দুয়ারী দোতালা দালানে। সরকারিভাবে নির্মিত। কিন্তু আরও রুমের দরকার। পাশেই একটি হাই স্কুল। মুক্তিযুদ্ধের প্রয়াত আবদুল হালি (তদানীন্তন সাঁথিয়া থানা ন্যাপ সম্পাদক) আবদুল বাসেত, সদর আলীর সঙ্গে আমি যুক্ত হয়ে ভুলবাড়িয়া হাইস্কুলটি প্রতিষ্ঠা করি। ইতিহাসটি হারিয়ে যাওয়ার পথে। ম্যানেজিং কমিটি ভালো করবেন যদি প্রতিষ্ঠানতাদের স্মরণে স্কুল ও তার হল ও লাইব্রেরির নামকরণ করেন। স্কুলটি এখন বেসরকারি। তাই এ কাজ করতে চাইলে করা সহজেই সম্ভব। হালিম ব্যতীত বাকী তিন জন আজও জীবিত। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরে জেলা প্রশাসক এ ব্যাপারে ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে সহযোগিতা করে কাজটি সম্ভব করে তুলতে পারেন। তবে ম্যানেজিং কমিটিকে দলীয় রাজনৈতিক চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে আন্তরিকতা নিয়ে এগুতে হবে। মনে রাখতে হবে ইতিহাস ইতিহাসই।

ভুলবাড়িয়া হাইস্কুলের উত্তরে নির্মিত হয়েছে দ্বিতল বিশিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়। চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সেখানে সভা-সমিতি ও দাফতরিক কাজকর্ম পরিচালনা করে থাকেন। তবে তাদের যেমন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তেমনভাবে সেই দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে কোন কার্যকর জবাবদিহিতা নেইÑ নেই উপযুক্ত পরিমাণ ভাতাও। কিন্তু তারইফলে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে যতই দালানকোঠা বা আসবাবপত্র নির্মাণ করা হোক উপযুক্ত সেবা জনগণ ঠিকমতো পাবে না। কম্পিউটার দেয়া হলেও কম্পিউটার পরিচালনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক না দেয়ায় সেগুলি বহু ইউনিয়ন পরিষদে মরিচা পড়ে নষ্ট হচ্ছে তেমনি হাই স্কুলগুলোতেও কম্পিউটার দেওয়া হলেও তাতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক বা কর্মচারী না দেওয়ায় সেগুলিতেও প্রায় একই অবস্থা। দিনমান অব্যাহতাভাবে বিদ্যুত সরবরাহের অভাবের কথা নাই বা তুললাম। অবশ্য তার তুলনামূলক উন্নতি যথেষ্ট ঘটেছে।

প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, ইউপি অফিস ছাড়া বাদবাকি সবটাই বাজার। বিকেলে রোজ বসে বাজারটা মাছের আমদানি কমেছে মারাত্মকভাবে। স্থায়ী কাপড় চোপড়ের দোকানও নেই স্থায়ী মুদিখানা দোকানও। বাজারটা বড় করার উদ্যোগও কম।

ইছামতী নদীর তীরেই বাজার, প্রাইমারি ও হাইস্কুল এবং ইউপি অফিস। নদীর তীরে ছিল একটি কালীমন্দির। তার চিহ্নমাত্র নেই। বর্তমান প্রজন্ম জানেও না কালীমন্দিরটির কথা। মন্দিরটা থাকলেই বা কি হতো? পূজার আয়োজন করার মতো ধনী হিন্দু একঘরও নেই। যে কয়টি গরিব হিন্দু পরিবার আছে কোনক্রমে তারা বছরে দুটি অস্থায়ী মন্দিরে দুর্গোৎসবের আয়োজন করে থাকে। অর্থাৎ দেশত্যাগ করতে করতে হিন্দুদের সংখ্যা যেমন ভয়াবহভাবে কমেছে তেমনই তাদের ধর্মীয় উৎসব ও তেমন আর নেই।

বরাবরই ভুলবাড়ীয়া মুসলিমপ্রধান গ্রাম। ২০% এর কম ছিল হিন্দু জনসংখ্যা। কিন্তু শিক্ষা-দীক্ষায়, পোশাকে-আশাকে, সামাজিক মর্যাদা এবং সামাজিক নেতৃত্বও ছিল হিন্দুদের হাতে। অপরপক্ষে হিন্দুদের ব্যাপক দেশত্যাগের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা আজও পূরণ হতে না দেখে বিস্মিত হই। তখন হাই স্কুল ছিল না, তিন মাইল দূরে আতাইকুলা গিয়ে আমাদের হাইস্কুলে পড়তে হতো। এখন আতাইকুলাতে ডিগ্রি কলেজও হয়েছে। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু সম্ভবত শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন না হওয়াতে এলাকাজুড়ে ডাক্তার, ভালো শিক্ষক, খুব ভালো রেজাল্ট করা ছাত্রছাত্রী, ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি ওই এলাকা থেকে বের হচ্ছে না। সমাজেও সমাজকল্যাণকামী সক্রিয় নেতাকর্মীও সৃষ্টি হচ্ছে না। শূন্যতা যেন বেড়েই চলেছে।

আমাদের বাড়িটি ছিল বাজার থেকে উত্তর দিকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। ছোটবেলায় দেখেছি দুই একর জমির উপর আমাদের বাড়ি তার পূর্বে সবজির বাগান তার দক্ষিণ পাশে বিশাল দোলভূমি (তে-তলা), যার দুই পাশে দুটি বিশাল বটগাছ ও কদমফুলের গাছ। ওখানে বাৎসরিক রাসযাত্রা হতো। উত্তরে ছিল নানা জাতের সুস্বাদু ফলের বাগান। বাবার সুসজ্জিত বৈঠকখানা ঘরে ছিল চেয়ার টেবিল, আলমারী টানা পাখা ইত্যাদি। ফাঁকা পেলে ঐ ঘরে বসেই পড়াশুনা করতাম। বৈঠকখানার সামনে ছিল বিশাল মাঠ। সেখানে কীর্তন, কবিগানের আসর এবং নানা উৎসবের নানা আয়োজন ঘটত।

১৯৪৭ এ বাবার সঙ্গে সপরিবারে পাবনা শহরে এসে বসবাস শুরু ভাড়া বাড়ীতে। ১৯৫৪ সালের ৪ ফ্রেব্রুয়ারি বাবা মারা গেলেন। পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের তখন আমি সভাপতি যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ছাত্রকর্মী শিবিরের একটি নাম নিয়ে আমি সুজানগর থাকায় সঙ্গে সঙ্গে খবরও পাই নি বহুপরে একটি চিঠি পেলাম ‘জরুরিভিত্তিতে আপনাকে পাবনায় দরকার’। দ্রুততার সঙ্গে ফিরে এসে জানলাম, বাবা নেই, দাহও শেষ। দায়িত্ব পড়ল সংসারের জ্যেষ্ঠতম সন্তান হিসেবে। রাজনীতির কারণে সাংসারিক দায়িত্বও পালন তেমন একটা করতে পারিনি। জেল খাটতে হয়েছে প্রায় ১৫ বছর বিনাবিচারে। এখন সাংবাদিকতাই একমাত্র পেশা।

ভুলবাড়িয়া হাইস্কুলের সন্নিকটে একটি ব্রিজ বা সেতুর দরকার। বাজারটা বড় করার জন্য প্রয়োজন জমি অধিগ্রহণ করা প্রয়োজন। ইছামতী নদী সিএস খতিয়ান অনুযায়ী চওড়াও যথেষ্ট গভীর করে খনন করাও প্রয়োজন।

যুবকদের কর্মসংস্থান ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। গ্রামটিতে বেকারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। তার রেশ টেনে ধরতে হলে একটা টেক্সটাইল মিল স্থাপন করা প্রয়োজন। গ্রামটিকে তার পূর্ব মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এমন ভাবনা যদি ভাবি। বিকল্প চিন্তাভাবনাও করা প্রয়োজন। অবকাঠামোগত সামান্য উন্নয়ন হয়েছে। মাধপুর থেকে নদী তীর দিয়ে পাকা রাস্তা ভুলবাড়িয়ার স্কুলের পাশ দিয়ে চলে গেছে। এটাকে আরও চওড়া করতে হবে। গ্রামে বিদ্যুত সংযোগ কয়েক বছর আগেই স্থাপন করা হয়েছে। তার এলাকা সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

অপরদিকে ভুলবাড়িয়া হাইস্কুলের নামকরণ ছাড়াও আরও একটি কাজের প্রস্তাব রাখছি। স্কুলটিকে কলেজে উন্নীত করে ‘ভুলবাড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ করে দক্ষ শিক্ষকদের দিয়ে চালানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমেই গ্রামটি আমার ধীরে ধীরে ছোট শহরে উন্নীত হতে পারেÑ জনগণ পেতে পারে শহরের সুবিধাও।

[লেখক : সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত]