• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ মহররম ১৪৪২, ১১ আশ্বিন ১৪২৭

প্রসঙ্গ : সংস্কৃতির মূলধারা ও সমাজ-ব্যক্তি জীবন

জয়নাল আবেদীন

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯

জমিতে যদি চাষ, নিড়ানী ও ফসলের পরিচর্যা না করা হয়- তাহলে সে জমি কৃষকের কোন কাজে আসে না। দু’এক বছরের মধ্যে তা পতিত জমিতে পরিণত হয়। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনেও আবাদি জমির মতো পরিচর্যা, চাষবাসের ভূমিকা রাখে সংস্কৃতি। এ বিষয়ে গত ২০ মে ২০১৯ দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয় ‘সংস্কৃতির মূলধারা সংকুচিত হচ্ছে, সমাজ ও ব্যক্তির জন্য সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ সংকট’ এর বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক। সময়ের উপযোগী এ সম্পাদকীয়র জন্য সংবাদ কর্তৃপক্ষকে আমি ধন্যবাদ জানাই।

গত ১৯ ও ২০ জুন আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দু’রাত কাটাই। আমার ছাত্রজীবনের পুরোটাই কেটেছে গ্রামে। বিএ পাস করে ঢাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএ পড়ার জন্য ভর্তি হয়েও প্রথম শ্রেণীর চাকরি পাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক লেখপড়ার ইতি ঘটে। প্রথম শ্রেণী থেকে বিএ পর্যন্ত গ্রামের শিক্ষাজীবনে আমি যে সংস্কৃতির ধারা ও সমাজ জীবন দেখেছিÑ গ্রামে এখন তা নেই। আমার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন কেটেছে পাকিস্তান আমলের শেষ দশকে। উভয় শিক্ষাজীবনে যে মানের শিক্ষক আমরা পেয়েছি সে মানের শিক্ষক এখন নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সঙ্গে আউটডোর গেম ছিল আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। বর্ষাকালে স্বাধীনতা দিবসে নৌকাবাইচ, সাঁতার প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম।

প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মান সার্বিকভাবে এত উন্নত ছিল যে, তা এ আমলে কল্পনাও করা যায় না।

দু’রাত বাড়িতে অবস্থানকালে সকালে ঘুম ভাঙলে ১৯-২০টি মসজিদ থেকে মাইকে প্রচারিত ফজরের আজানের শব্দে। কবি কায়কোবাদের ‘আজান’ কবিতার যে সুর তা বর্তমানের আজানে নেই। আছে শব্দজট, যা মনে কোন আকুতি সৃষ্টি করতে পারে না। আজানের মিনিট ২০ পরে শুরু হয় মাইকে কোমলমতি শিশুদের আরবি শিক্ষার জন্য মসজিদে আসার আহ্বান। এই হলো বর্তমানের বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের ভোরবেলার চিত্র।

পাকিস্তান আমলে আমার গ্রামে মাত্র একটি টিনের ঘরের মসজিদ ছিল। এখন সেই গ্রামে ১৫টি উন্নতমানের পাকা মসজিদ। প্রতিটিতে উচ্চশব্দের মাইক্রোফোন। শুক্রবারে একটু দেরিতে গেলে মসজিদে জায়গা পাওয়া যায় না।

আগে টিনের ঘরের মসিজদে অল্পসংখ্যক মানুষ জুমার নামাজ পড়তেন। এখন বালক, যুবক, বৃদ্ধ সবাই যান। এক কথায় নামাজ পড়ার লোক বেড়েছে। অপরদিকে স্কুলে স্কুলে সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলাসহ চিত্তবিনোদনের কর্মকান্ড নেই বললেই চলে। ২০ জুন ভোরে আমি বাড়ি থেকে হাঁটতে বাহির হয়ে কামারখোলা সেতু পার হয়ে মাশুরগাঁও, উত্তর পাইকসা, হোগলাগাঁও, বাসাইলভোগ ও বেজগাঁ গ্রাম অতিক্রম করি। গ্রামের আগের হালট এখন উঁচু করে ইট বিছানো হয়েছে। ইটের রাস্তা সর্বত্র এবরোখেবড়ো। এর কারণ দলীয় কর্মীর মাধ্যমে কাজ করার ফলে ৫০% কাজে দেয়া হয়েছে ফাঁকি। গ্রামে যেসব পুকুর, ডোবা-নালা ও খাল ছিল তা ১০০% কচুরিপানা ভরা। একমাত্র বাসাইলভোগে আবদুল মান্নান মীর সাহেবের বাড়ির পুকুরটি ছিল ব্যতিক্রম।

ভোরবেলা প্রায় ১ ঘণ্টা হাঁটাকালে কোন বাড়ি থেকে ছেলেমেয়েদের পড়ার শব্দ আমার কানে আসেনি। সন্ধ্যার পরেও আমি গ্রামের বিভিন্ন পাড়া দিয়ে হাঁটিÑ তখনও কোন বাড়িতে ছাত্রছাত্রীদের পড়ার শব্দ পাইনি। গ্রামে খালের উপর নির্মিত সেতুতে স্কুল পড়ুয়া ছেলেদের সন্ধ্যার পরে দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখা যায়। প্রায় প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট মোবাইল ফোন; যা নিয়ে তারা সময় কাটায়।

গ্রামের প্রতিটি প্রাইমারি স্কুলের মাঠে আগে নিয়মিত খেলাধুলা হতো। উত্তর পাইকসার খেলার মাঠ দেখলাম খড়ের পালা ও আগাছায় পূর্ণ। খেলাধুলা হয় নাÑ তার প্রমাণ পেলাম।

আমি নিজে যে প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি সে স্কুলের নিজস্ব মাঠ ছিল। এ মাঠে বড় ও ছোটরা নিয়মিত পৃথক সময়ে ফুটবল খেলতো। এখন সে মাঠ বারো মাসই পানিতে পুকুর হয়ে থাকে। এর কারণ হলো মাঠের চারিদিকের জমি উঁচু করে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মিত হয়েছে। ফলে স্কুলের মাঠ পুকুরে পরিণত হয়েছে। স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান এবারে নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন। আশা করি হয়তো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠটি ছেলেমেয়েদের খেলা উপযোগী করে উঁচু করে দেবেন।

১৯৬৫-১৯৭০ সাল ছিল আমার মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন। বাড়ি থেকে এক মাইল দূরে ষোলঘর অক্ষয় কুমার শশী কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কমতি ছিল না। রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, বার্ষিক নাটক নিয়মিত হতো। আমরা এতে অংশ নিতাম। আমাদের সময়ের জিমন্যাশিয়াম এখন আর নেই। ব্রিটিশ আমলে ডা. এমএন নন্দী ছিলেন দীর্ঘদিন এ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি। তখন বিদ্যালয়ের পুকুরে সুইমিং পুলও ছিল। খেলাধুলা ও পরীক্ষায় ফলাফলে বিদ্যালয়ের রেকর্ড ছিল উচ্চমানের। এখন সে বিদ্যালয় সব দিক দিয়েই অধপতনের নিম্নপর্যায়ে অবস্থান করছে। এর প্রধান কারণ বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয় যাদের নিয়ে তারা শিক্ষা-সংস্কৃতির গুরুত্ব সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ এবং এ বিষয়ে চিন্তাও করে না।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বিক্রমপুরসহ দেশের সর্বত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যে সংস্কৃতি চর্চা হতো- তা ছিল উন্নতমানের। ফলে সে সময়ের জনমনে স্থান করে নিত দেশপ্রেম। মানুষ মানুষের জন্য এ চেতনা সে আমলের শিক্ষার্থীরা লালন করতো বলেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শ্রীনগর ও লৌহজং থানা থেকে একজনও রাজাকার বাহিনীতে যায়নি। ছাত্র যুবকদের বেশিরভাগই যোগ দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে।

বর্তমানে যেভাবে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা সংস্কৃতির চর্চা বাড়ছে- তা ১৯৭১ সালে বিরাজমান থাকলে রাজাকারের সংখ্যাই হতো মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে বেশি।

তাই আমি মনে করি, দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে নিতে হলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত লেখাপড়ার সাথে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সমান গতিতে চালিয়ে নিতে হবে। তা না হলে আমরা চিন্তা-চেতনায় আরও পিছিয়ে যাব। একই সঙ্গে রাজনীতিতেও ধর্মীয় উন্মাদনাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া বন্ধ করতে হবে। রাজনীতি চলবে দলের কর্মসূচি দিয়ে, সেখানে ধর্মীয় চেতনার কোন প্রভাব থাকবে না। এ বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

[লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও ব্যাংক নির্বাহী (অব.)]