• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪১

পাহাড় ধসে মৃত্যুর দায়

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

| ঢাকা , শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯

image

পাহাড় ধসে মৃত্যু কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না। বর্ষাকাল এলেই চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার ও বান্দরবনের মতো পাহাড় এলাকায় মৃত্যু-বিভীষিকা নেমে আসে। প্রবল বর্ষণে প্রায়ই ঘটে পাহাড় ধসের মতো ঘটনা। আর পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে ঢালে বসবাসকারী মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটে। গেল ১৩ জুলাই কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের বমুরকূল এলাকায় পাহাড় ধসে স্বামী-স্ত্রী দুজনের মৃত্যু ঘটে। বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়লে এই দুর্ঘটনা ঘটে। অপরদিকে পরের দিন বান্দরবনের লামার মধু ঝিড়িতে পাহাড়ের নরম মাটি বৃষ্টির তোড়ে ধসে এক নারী মারা যান। ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগরীর আকবর শাহ থানার পূর্ব ফিরোজ শাহ কলোনিতে পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিনজন ও বায়েজিদ এলাকায় দেয়াল ধসে একজনের মৃত্যু হয়। একই বছরের ২১ মে বান্দরবনের নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের মনজয় পাড়ায় পাহাড় কাটার সময় মাটি ধসে ৩ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। ২০১৭ সালে প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গুনিয়া, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবন ও সিলেটের মৌলভীবাজারে দফায় দফায় পাহাড় ধসে পড়ে শতাধিক মানুষ মারা যান। ২০১৫ সালে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রামুতে নারী ও শিশুসহ ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৭ সালের ভারি বর্ষণে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের হাট হাজারি, পাহাড়তলি, বায়জিদ বোস্তামী, খুলসী এলাকায় পাহাড়ের মাটি চাপায় একশ’র অধিক মানুষ নিহত হন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরী এবং এর পার্শ¦বর্তী এলাকায় পাহাড় ধসে ২০০৮ সালে ১৪ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১২ সালে ২৮ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করে। গত চার দশকে পাহাড় ধসে ৬ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পাহাড় ধসের আশঙ্কায় প্রতি বার পুলিশ দিয়ে মাংকিং করে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও কিছু সংখ্যক পাহাড়বাসী জোর করে পাহাড়ে থেকে যান। পাহাড় ধসের ফলে মানুষের মৃত্যু ছাড়াও জীববৈচিত্র্য হয় হুমকির সম্মুখীন, বন্যপ্রাণী হারায় আবাসস্থল।

চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পার্বত্য এলাকায় এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহল প্রতিনিয়ত পাহাড় কেটে চলেছে সব আইন-কানুন উপেক্ষা করে। কাটা পাহাড়ের গায়ে গড়ে তোলা হচ্ছে হাজার হাজার কাঁচা, নড়বড়ে বাড়িঘর। ইতিপূর্বে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের আবাসিক হোটেল-মোটেল জোনসংলগ্ন কলাতলী সৈকতপাড়ায় সরকারি পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। শহরের লাইটহাউস পাহাড়, আদর্শ গ্রাম, পাহাড়তলী, জাদিরাম পাহাড় এবং হিলটপ সার্কিট হাউস পাহাড় কেটেও তোলা হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এবং ষোলশহর এলাকার ১৫০ একর পাহাড়ের জমি কেটে নির্মিত হয়েছে আধুনিক ভবন। বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শহরের প্রায় সাতশ’ একরের ছোট-বড় ১২টি পাহাড়ে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি অবৈধ বাড়িঘর রয়েছে এবং সেখানে কমপক্ষে আড়াই লাখ মানুষ বাস করছে। শহরের শান্তিনগর পাহাড় এলাকায় ৫শ’ একর জমি কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ঘরবাড়ি। নাসিরাবাদ এলাকা থেকে সীতাকু-ু পর্যন্ত ৭-৮ কিলোমিটার এলাকা পাহাড়শূন্য হয়ে পড়েছে। সীতাকু-ে পাহাড় কেটে প্রায় ৯০০ একর জমিতে বস্তি ও বাড়িঘর তৈরি করা হয়েছে। ২০১৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি শহরের ৩২ স্পটে পাহাড়ের ঢালে প্রায় অর্ধ লাখের মতো মানুষ অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। গত ২০ বছরে চট্টগ্রামে ২ হাজার একরেরও অধিক ভূমির পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতীক পাহাড় আজ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

পাহাড় কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য হচ্ছে হুমকির সম্মুখীন, বন্যপ্রাণী হারাচ্ছে আবাসস্থল। প্রকৃতি হয়ে পড়ছে ভারসাম্যহীন। ইতিপূর্বে বান্দরবানে সেনা রিজিয়নের পাশেই নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়েছে। কখনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাহাড় ও টিলা লিজ দেয়া হয়েছে। বিগত কয়েক যুগ ধরে পাহাড় কাটার পাশাপাশি পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজিকে নির্বিচারে ধ্বংস করে সমতল ভূমিতে মুনফালোভী সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে আবাসিক প্লট ও অভিজাত ফ্লাট। নিম্নআয়ের হতদরিদ্র, ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর জন্য পাহাড়ের গায়ে গড়ে তুলছে বস্তি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার পরিবারকে টাকার বিনিময়ে সেখানে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা গাছপালা উজাড়ের ফলে পাহাড়ের অবশিষ্ট মাটি আগলা হয়ে যায়। বৃষ্টি হলে পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্রবেগে নেমে আসা ঢল আগলা মাটি ধুয়ে নিয়ে নিচে নামার ফলে পাহাড় হয়ে পড়ে দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ। পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধস ছাড়াও মাটির অনুজীব বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে হারাতে থাকে প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত পাহাড়ের মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয়ের। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বনজ সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। পাহাড় এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণের নিয়ন্ত্রণ পূর্ত মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যাস্ত। এদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা সুযোগ করে দিয়েছে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা গাছপালা উজাড় করে দালানকোঠা, বস্তি নির্মাণের ক্ষেত্র। পাহাড় কাটা, পাহাড় কেটে অবৈধ বাড়িঘর নির্মাণ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধি ১৯৯৫ এর ১৫ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর জন্য রয়েছে শাস্তির বিধান। কিন্তু পাহাড়খেকোরা বরাবার রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। নেয়া হয়নি তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তাই পাহাড় কাটা, বসতি স্থাপনও থেমে থাকেনি। পাহাড় ধসে মৃত্যু যেন হয়ে গেছে এক স্বাভাবিক ঘটনা।

বর্ষকালে মাইিকিং করে পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়। কখনও পাহাড় ধস শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়েও নেয়া হয়। কিন্তু তাদের জন্য স্থায়ী কোন আবাসস্থল না থাকায় কিছুদিন যেতে না যেতেই মানুষগুলো আবার সেখানে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। কখনও তাদের বস্তি থেকে অমানবিকভাবে উচ্ছেদও করা হয়। তারপরও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বন্ধ হয় না। বর্ষাকালে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা বস্তি উচ্ছেদ পাহাড় ধসে মৃত্যুরোধের কোন স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসের সম্ভাবনা দেখা দিলে পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হতে পারে মৃত্যু কমিয়ে আনার একটি সাময়িক ব্যবস্থা। তাই পাহাড়ের গায়ে অবৈধ বস্তি নির্মাণ করে অর্থ উপার্জন করা এবং পাহাড়ে বাসকারী আশ্রয়হীন মানুষকে মৃত্যুঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া বন্ধ করতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রভাবশালী মহলের পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে নিতে হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। পাহাড় ধসে মৃত্যু রোধ করতে হলে পাহাড় কাটা বন্ধের পাশাপাশি ন্যাড়া পাহাড়ে গাছপালা লাগিয়ে সবুজ আচ্ছাদনে ছেয়ে দিতে হবে। পাহাড়ের ওপরে এবং নিচে বসতি স্থাপন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনকে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। পাহাড় অঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। প্রাকৃতিক নিয়মে গড়ে ওঠা পাহাড় এমনিতে ধসে পড়ে না। পাহাড়কে অপরিকল্পিত, বেপরোয়াভাবে প্রতিনিয়ত কেটে ফেলে দুর্বল করে দেয়া হয়। যার ফলে বৃষ্টি হলেই তা ধসে পড়ে। শুধু নান্দনিকতা রক্ষার জন্য নয়, প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় বাংলাদেশের অবশিষ্ট সামান্য কটি পাহাড় এলাকা। এগুলো বিলুপ্ত হলে গোটা জাতিকে দিতে হবে খেসারত। তাই পাহাড়বিনাশী অপরিণামদর্শী তৎপরতা বন্ধ করা ছাড়া পাহাড় ধসে মৃত্যু রোধ অসম্ভব।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক]