• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৩ সফর ১৪৪২, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

নুসরাতের হত্যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেবে না?

নাসিমা হক

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

image

নুসরাত জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করে গেছে। নুসরাত এক জ্বলন্ত প্রতিবাদের নাম। সাহসের নাম। সাহসী মেয়ে নুসরাত বলেছিল, যতদিন জীবন আছে আমি প্রতিবাদ করে যাব, আমি হার মানব না। নুসরাত হার মানেনি। মৃত্যুশয্যায় শুয়েও সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে।

আমরা ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির কথা বলছি। সোনাগাজীর মাদ্রাসার শিক্ষক নরপিশাচ সিরাজ উদ্দৌলা তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছে। তাকে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করেছে। তাকে অপমান করেছে। নুসরাত এর প্রতিকার চেয়ে সোনাগাজী থানায় গিয়েছিল মামলা করতে। থানার ওসি তার মামলা নিতে চায়নি। ওসি বলেছে, নুসরাত মিথ্যা কথা বলেছে। নুসরাত নাটক করছে।

এতে প্রমাণিত হয় ওই থানার ওসি মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লাকে বাঁচাতে চাচ্ছিল।

পরে ২৭ মার্চ নুসরাতের মা মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ অপরাধী সিরাজ উদ্দৌল্লা এতই শক্তিশালী যে তার অনুগত একটি মহল তাকে বাঁচাতে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করে। ধর্ষক অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন সেও এক অভিনব ঘটনা। বাংলাদেশে তাও আমরা ঘটতে দেখলাম।

এখানেই ঘটনার শেষ নয়। মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লার অনুগত দুর্বৃত্তরা মামলা তুলে নেয়ার জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে থাকে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে নুসরাত। কিন্তু তাকে পরীক্ষা দিতে যেতে হবে তার বড় ভাই তাকে সঙ্গে করে প্রথম দিন পরীক্ষার হলে বসিয়ে দিয়ে আসে। ফেরার সময় সঙ্গে করে ফিরিয়ে নিয়ে আসে বাড়িতে। কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হলো না। দ্বিতীয় পরীক্ষার দিন ভাইকে পরীক্ষা কেন্দ্রের গেট দিয়ে ঢুকতেই দেয়া হলো না।

নুসরাতকে পরীক্ষা দিতেও দেয়া হলো না। পরীক্ষার আগেই তাকে মিথ্যা কথা বলে, বন্ধুর বিপদের কথা বলে, ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো ছাদে।

ছাদে তাকে মামলা প্রত্যাহার করতে বলা হলো। নুসরাত অস্বীকৃতি জানানোয় বোরকা পরা, হাতমোজা পরা, নেকাবে মুখ ঢাকা চার দুর্বৃত্ত ওড়না দিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদ্রাসার ছাদে এ নৃশংস ঘটনা ঘটে।

সারা গায়ে আগুন নিয়ে নুসরাত ছাদ থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা নিরাপদে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

নুসরাতকে সোনাগাজী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা সংকটজনক বলে তাকে ফেনী থেকে এনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তার শরীরের ৮০ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। সারা শরীর ব্যান্ডেজে মোড়া, দেহে দুঃসহ কষ্ট। তবু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নুসরাত বলেছে, ‘আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলব, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলব, সারা দুনিয়ার কাছে বলব, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করব।’

৭ এপ্রিল চিকিৎসকদের কাছে দেয়া শেষ জবানবন্দিতে নুসরাত বলেছে, নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরা চারজন তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই চারজন একজনের নাম শম্পা।

এর আগে ফেনী থেকে মাইক্রোবাসে ঢাকা আসার পথে ভাইয়ের কাছে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লার অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ দেন। ভাই তা রেকর্ড করে রাখেন। এসব ভিডিও এখন ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে।

শুধু তাই নয়, সোনাগাজীর এ মাদ্রাসাছাত্রী বন্ধুদের কাছে চিঠিতেও অনেক কথা লিখে গেছে। নুসরাত লিখেছেন, আমি লড়ব শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে, সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করব না। মরে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া। আমি মরব না। আমি বাঁচব। আমি তাকে শাস্তি দেব, যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেব যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নেবে।’

১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় নুসরাতের মৃত্যু হয়েছে। নুসরাত তার কথা রেখেছে। সে শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়েছে। এই অষ্টাদশী সাহসী মেয়েটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। অন্যায়ের প্রতিকার চেয়েছে সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে। চেয়েছে, অপরাধীর শাস্তি হোক। তাকে দেখে অন্যরা শিখুক। অপরাধ করতে ভয় পাক। শাস্তির উদ্দেশ্যইতো তাই। সেই জন্যই তো আমরা বলি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

নুসরাতের হত্যাকারীর কি শাস্তি হবে না? এই মৃত্যু, এই নৃশংস নির্মম হত্যা কি আমাদের বিবেককে জাগ্রত করবে না? নুসরাত কিন্তু একা নয়। অতি সম্প্রতি বেশ কয়েকজন কিশোরী, শিশুসহ নানা বয়সের নারী দুর্বৃত্তের হাতে নিগ্রহ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ বা হত্যার শিকার হয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বহু নুসরাত নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। কিন্তু আমরা নির্বিকার।

মেয়েরা ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। ঘরের ভেতরে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায়, পথে-ঘাটে, বাসে, কর্মস্থলে নারীরা যৌণ হয়রানি, নিগ্রহ, নির্যাতন, হত্যার শিকার হচ্ছে। বাসের ভেতরে ধর্ষণ করে তারপর ঘাড় মটকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মেয়েরা বিচার পাচ্ছে না। এর আগে সোহাগী জাহান তনু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সারাজুড়ে আন্দোলন হয়েছে। তবু আজ পর্যন্ত তনু হত্যার বিচার হয়নি।

আরও অনেক অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা বিচার না হতে দেখেছি। যেমন- সাগর-রুনি হত্যা, ত্বকী হত্যা ইত্যাদি। এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। এ বিচারহীনতার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। নুসরাত প্রতিবাদ করে গেছে। এখন আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে।

সোনাগাজী থানার ওসি প্রথমে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। নুসরাতের মৃত্যুর পর মানুষের প্রতিবাদের পর ওই ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ওই থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু শুধু প্রত্যাহারই যথেষ্ট নয়। তার অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এমন শাস্তি হওয়া উচিত যেন ভবিষ্যতে আর কোন পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধীদের বাঁচাতে ও সাহায্য করতে সাহস না পায়।

মাদ্রাসার পরিচালক কমিটির যে সদস্যরা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লাকে এ যাবত রক্ষা করেছে, স্থানীয় যে প্রভাবশালী রাজনীতিকরা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছিল তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

অবশেষে একে একে প্রায় সব অপরাধী ধরা পড়েছে। যে সিরাজ উদ্দৌল্লাকে বাঁচাতে মানববন্ধনে আয়োজন করেছিল সেই নূরুদ্দিনসহ অন্যরা ধরে পড়েছে। যে নূরুদ্দিন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে স্বীকার করেছে যে, সে ও অন্যরা কিভাবে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

পিবিআই জানিয়েছে, সিরাজ উদ্দৌল্লা কারাগারে বসেই নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল নূরুদ্দিনকে।

এখন আমরা চাই, নরপিশাচ সিরাজউদ্দৌল্লার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার এবং কঠোরতম শাস্তি। মৃত্যুদন্ড ছাড়া আর কোনও শাস্তিই তার জন্য যথেষ্ট নয়।

শুধু নুসরাত হত্যাকান্ডের নয়, সব নারী ও শিশু নির্যাতন ধর্ষণ ও হত্যার বিচারই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হতে হবে।

অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তাহলেই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করতে অপরাধীরা ভয় পাবে।

নুসরাতের হত্যাকান্ডে প্রমাণ হয়েছে এ দেশ, এ সমাজ নারীর জন্য নিরাপদ নয়।

নুসরাত জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করেছে। এখন দায়িত্ব আমাদের। সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের নারীর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হবে। আরেকটি মেয়েরও যেন এমন নিগ্রহ, এমন মৃত্যু ঘটতে না পারে।

এ মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লা শুধু নুসরাত নয়, আরও বহু ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করেছে। বহু বছর ধরে সে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছে। আরও বহু মাদ্রাসা ছাত্রছাত্রীদের ওপর এ ধরনের নিগ্রহের খবর প্রকাশ পাচ্ছে। মাদ্রাসাগুলোর অভ্যন্তরে কী ঘটছে সে সম্পর্কে অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।

হাইকোর্টের রায় অনুসরণ করেন মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানিবিরোধী কমিটি এখনই গঠিত হওয়া দরকার।

প্রয়োজন অবিলম্বে যৌন হয়রানি বিরোধী আইন প্রণয়ন। তাহলেই নারী নিগ্রহ বন্ধের পথে তৈরি হবে।

নুসরাতের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দিক।