• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলহজ ১৪৩৯

দেশের কথা দশের কথা

নির্বাচন সৌভাগ্য না হয়ে দুর্ভাগ্য হয় কেন

মো. মইনুল ইসলাম

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

দুটো মামলার কারণে বর্তমান দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত, যার ফলে দেশবাসীও শঙ্কিত। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামক দুটো মামলারই প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মামলা দুটো রুজু হয় ২০০৮ সালে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ৯ বছরের বেশি সময় ধরে মামলাগুলো চলছে। বিবেচনা করলে ৯ বছর কম সময় নয়। যেহেতু সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী এবং বড় একটি বিরোধী দলের নেত্রী বিচারের মুখ্য আসামি, তাই যথাযথ বিচারের মাধ্যমে এর দ্রুত পরিসমাপ্তি ঘটুক, এটাই দেশবাসীর কাম্য ছিল। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ মামলাটি ঘটনাবহুল এবং বড় রকমের আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে শেষ হয়েছে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটির রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে বেগম জিয়ার ৫ বছরের জেল বাকি ৫ আসামিকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। দুজন আসামি কারাগারে রয়েছে। তারেক রহমানসহ বাকি দুজন আসামি পলাতক রয়েছে। বেগম জিয়ার বয়স এবং সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে সাজার পরিমাণ কম করা হয়েছে।

প্রথমত, মামলাটি নিয়ে বিএনপির কিছু নেতারা কঠোর এবং উত্তেজনাকর বক্তব্য প্রদান করেছেন, যার রেশ এখনও চলছে। সরকারি দল ও এর বিপরীতে পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু আদালতের ভেতরে ও বাইরে বিএনপি নেতাদের কিছু বক্তব্য বেশ উত্তেজনাকর এবং আদালত অবমাননাকারী বলেও মানুষের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। ‘মোকাদ্দমাটি রাজনৈতিক,’ খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না এবং হতেও দেবে না’ প্রভৃতি ছিল বিএনপির কিছু উল্লেখযোগ্য বক্তব্য। এ ব্যাপারে আদালতের ওপর সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রভাব থাকার ইঙ্গিতও দেখা গেছে তাদের কথাবার্তায়। গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী কোন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল নেতাদের কাছ থেকে এটা মানুষ আশা করে না।

এতদিন আমাদের ধারণা ছিল, নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপির মূল দাবি সহায়ক সরকার। যার অন্য নাম নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন নিরপেক্ষ কথাটা তারা বলে না। কারণ তারাই এক সময় বলেছিল দেশে পাগল এবং শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। তারা একটি শুদ্ধ এবং সত্য নির্বাচন চায়। জনগণ বরাবরই সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে। তবে মাগুরার কালো নির্বাচন, ঢাকা-১ আসনে ফালুর নির্বাচন এবং ২০০৬ সালের নির্বাচনে তাদের ব্যাপক কারচুপির প্রচেষ্টা দেশবাসী ভালোভাবেই জানে এখন নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের শুদ্ধতা এবং সত্যতার ব্যাপারে এই উতলা হয়ে উঠার ব্যাপারটি মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতিটি বিষয়ে সাধারণ মানুষ শুদ্ধাচার এবং সত্যতা দেখতে চায়। কিন্তু তা খুব কমই পায়। এটা আমাদের একটি বড় ট্র্যাজেডি। আমাদের দলগুলো বিরোধী পক্ষ গেলে নির্বাচনের বেলায় ন্যায়, সত্য এবং সুষ্ঠুতার ব্যাপারে বেজায় উচ্চকণ্ঠ হয়ে উঠতে দেখা যায়। এটাও রহস্যজনক বটে। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচন করতে হবে জাতি এবং জনগণের স্বার্থে। যদি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় কোন দলের শীর্ষ নেতা-নেত্রী দোষী সাব্যস্ত হন এবং কারাদন্ড পান, তাহলে দল কেন নির্বাচনে যাবে না, সেটা আামাদের বোধগম্য নয়। ভারতে তামিল নাড়ুর জয়ললিতা এবং বিহারের লালু প্রসাদ যাদব আদালত কর্তৃক দ-প্রাপ্ত হয়ে জেলে গেছেন। তাই বলে তাদের দল নির্বাচনসহ সব রকমের রাজনৈতিক কর্মকা- থেকে বিরত থাকেনি। বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মকা-ে যা প্রাধান্য পাচ্ছে তা হলো তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে চলমান বিচারকার্য। তার বিরুদ্ধে মামলা চালানো যাবে না। তাকে ছাড়া দল নির্বাচনে যাবে না এবং নির্বাচন করতেও দেয়া হবে না। তাছাড়া গত কয়েক বছর যাবৎ তাদের রাজনীতি শুধু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। রাজনীতি ও সরকারের সাধারণ ছাত্রও জানেন, নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র উপাদান নয়। গণতন্ত্রের জন্য শ্রদ্ধা এবং সত্যিকার নির্বাচন অবশ্যই দরকার। কারণ তা একটি রাজনৈতিক দলকে বৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সমাসীন করে। জনগণের সম্মতি নিয়ে দেশ শাসনের অধিকার তারা পায়।

কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবে যা ঘটে তাতে ৫ বছরের জন্য একটি দলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণের শাসন তথা প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র তেমন একটা প্রতিষ্ঠিত হয় না। জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে আইনের শাসন ও সুশাসনের এমন অভাব পরিলক্ষিত হতো না। সরকারের বিভিন্ন অফিসে সাধারণ মানুষ এতটা হয়রানি এবং ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হতো না। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের সরকারগুলো শক্তিশালী হতো। এর অপর নাম ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন, যা গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। গণতন্ত্রের নামে উচ্চকণ্ঠ বিএনপি এবং অন্য দলগুলোকে এ সব ব্যাপারে কোন কথা বলতে শোনা যায় না। অনুমান করা কি অমূলক হবে যে তারা শুধু ক্ষমতা চায় এবং ঢাকার সরকারি মসনদটি দখল করাই তাদের আসল উদ্দেশ্য। এর জন্যই দরকার নির্বাচনী বৈতরণীটি পার হওয়া। কিন্তু সাধারণ মানুষ নির্বাচন চায়, কারণ তার ফলে দেশে আইন ও সুশাসন কায়েম হবে। ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে কিনতে হবে এবং জনগণ তাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এ টিমের জায়গায় বি টিম ক্ষমতায় গেলে জনগণের কি লাভ হবে, সেটাই মূল বিচার্য বিষয়।

এ টিম বা আওয়ামী লীগ দেশকে উন্নয়ন দিয়েছে। তাতে দেশের সব মানুষ সমানভাবে সুফল না পেলেও কমবেশি সবাই পেয়েছে। দেশে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। জাতীয় জীবনের নানাদিকে উন্নয়নের দৃষ্টিগ্রাহ্য ছোঁয়া লেগেছে, যা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো গরিব দেশে উন্নয়নের অর্থ হলো দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মানুষের মুক্তি। এর ফলে এ বিশ্বাসও সৃষ্টি হয়েছে যে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও তার দল উন্নয়নের ব্যাপারে আন্তরিক। তাছাড়া গণতন্ত্রের ব্যাপারেও তারা আন্তরিক হবেন সেটাও দেশবাসী চায়। তবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে এবং কথাবার্তা বলে এটাও প্রতীয়মান হয় যে মানুষ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সন্তুষ্ট নয়। সরকারি দল ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোর বেশ কিছু নেতাকর্মীর অন্যায়-অবৈধ কার্যকলাপে মানুষ বেশ বিরক্ত। পাবলিক পরীক্ষা হোক কিংবা চাকরির পরীক্ষার হোক তা সুষ্ঠু হবে কি-না তাতে মানুষের সন্দেহ থাকে। এ রকম অসংখ্য ক্ষেত্রে মানুষ অন্যায়-অবিচারের প্রাদুর্ভাব দেখতে পায় বলে অভিযোগ আছে। মোট কথা দেশে আইনের শাসন ও সুশাসনের অভাবটি মানুষের কাছে বেজায় প্রকট। মৌলিক গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাও সত্যিকার গণতন্ত্রের দাবিদার একটি সরকারের অবশ্য কর্তব্য। আর এ বিষয়টিতে বর্তমান সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

দুর্নীতি, অন্যায়-অত্যাচার, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রভৃতি বিষয়ে বিরোধী দল অধিকতর সোচ্চার হবে এবং নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন করবে, এটাই মানুষের কাম্য। গণতন্ত্রের জন্য বিরোধী দল তাই অত্যাবশ্যকীয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও বিরোধী দল আছে। তারা ক্ষমতায় না থাকলেও সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের নীতি ও কার্যকলাপের সমালোচনা করে এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে সরকার পরিচালনাকে সুষ্ঠু এবং সমৃদ্ধ করে। তারা সারাক্ষণ সরকার ও সরকারি দলের সঙ্গে বাকযুদ্ধ এবং সাংঘর্ষিক রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকে না। জনগণের বিচারের প্রতি বিএনপির বিশ্বাস রাখা দরকার। তাছাড়া একদিকে গণতন্ত্রের কথা বলবেন, অন্যদিকে লাগাতার হরতাল-অবরোধ এবং পেট্রোলবোমা মেরে নিরীহ-নির্দোষ সাধারণ মানুষকে হত্যা করবেন, এটা মানুষ গ্রহণ করবে না।

তাছাড়া বড় দলগুলোর ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। দেশটি দেশের মানুষের, বিশেষ করে কোন দলের নয়। দুই দলের রাজনীতি দেখলে মনে হয়, দেশটি যেন একটি জমিদারি, জন-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্র নয়। এই জমিদারিটির শরিক দুই দল। বিরোধী দলটি অনেক দিন যাবৎ তাদের ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না। এবার তাদের লড়াই সেই শরিকানার ন্যায্য হিস্যা ফেরত পাওয়া। তার জন্য যদি তারা নির্বাচন চায় সেটা দলের স্বার্থে হবে; জনগণের স্বার্থে হবে না। তাদের নির্বাচন দাবি যতটা জনগণের শাসন তথা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, সে ব্যাপারে জনমনে সন্দেহ আছে। সরকার ও বিরোধী দলকে মনে রাখতে হবে, দেশটি দেশের মানুষের। ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ দেশের মানুষ নীরবে সব দেখে। দীর্ঘ সময় অন্যায়-অবিচার সহ্য করে। কিন্তু এক সময় প্রতিবাদ এবং প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠে। নির্বাচন মানুষ অবশ্যই চায়। কিন্তু তা শুধু কোন একজন ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাসীন করার জন্য নয়। তারা চায় নির্বাচিত দল দেশে গণতন্ত্র তথা আইনের শাসন ও সুশাসন কায়েম করবে। সরকার শাসক হবে না, জনগণের সেবক হবে। অর্থাৎ মানুষ চায় দেশে গণতন্ত্রের ধারাটি অব্যাহত থাকুক এবং সেটা সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হোক। মূল কথা, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের জয় হোক।

কিন্তু সেটা হচ্ছে বলে মনে হয় না। ইতোমধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারির রায় সম্পর্কে বেগম জিয়া খানিকটা আঁচ করতে পেরেছিল বলে মনে হয়। তাই দলের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিসমূহ এবং ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সভা করেছেন। সম্ভাব্য সাজার কথা মাথায় রেখে তার অবর্তমানে দল কিভাবে পরিচালিত হবে সে ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। এবার শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনের কথা বলায় মানুষ খুশি হয়েছে। ২০১৫ সালের জ্বালাও-পোড়াও এবং পেট্রোলবোমার আতঙ্কে মানুষ এখনও ভীত-সন্ত্রস্ত। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে কয়েকটি বড় শর্ত আরোপ করায় জনমনে এ বিষয়ে সন্দেহ এখনও কাটছে না। নির্বাচনের মতো গণতন্ত্রের একটি মৌলিক বিষয়ে দুটি বড় দলের মধ্যে ঐকমত্য হলো না এবং ব্যবস্থাটি সুদৃঢ় এবং বিতর্কহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো না, এটা জাতির জন্য একটি বড় দুর্ভাগ্যের কারণ। অথচ এটা হওয়া উচিত ছিল সৌভাগ্যের বিষয়।

[লেখক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]