• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৯, ৬ মাঘ ১৪২৫, ১২ জমাউল আওয়াল ১৪৪০

রাজনীতির পথে প্রান্তে

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি, সুশাসন ও বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ

ফকীর আবদুর রাজ্জাক

| ঢাকা , শনিবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৯

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ

নতুন সরকারের যাত্রা শুরু। আওয়ামী লীগই টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অনেকে বলছেন ‘পুরনো বোতলে নতুন মদ’। আমরা সেভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই না। বরং আমরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত এ সরকারের মাধ্যমে নতুন কিছু দেখতে চাই। দেশবাসীরও তেমনি প্রত্যাশা। শুধু গৃহীত বড় বড় বা মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়ন করাই নয় ব্যতিক্রমধর্মী নতুন কিছু করতে হবে। যাতে দেশের মানুষ প্রকৃত পক্ষে উপকৃত হয় এবং নতুন আশায় বুক বাঁধে। কি হতে পারে সেই নতুন পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ? ইতোমধ্যে দেশের শিক্ষিত বুদ্ধিদীপ্ত বেশকিছু মানুষ তাদের প্রত্যাশার কথা বলেছেন। সংবাদপত্রে তা প্রকাশও পেয়েছে। আপাতত নতুন কিছু এ মুহূর্তে ভাবছি না- তবে সরকারি দল এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছে। অনেকে মনে করছেন এটা কথার কথা। কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন ক্ষমতাকে কেউ ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার হাতিয়ার মনে করবেন না। অর্থাৎ শুধু জনস্বার্থেই যেন ক্ষমতার ব্যবহার করা হয়। বস্তুত এটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, গত এক দশকে আমরা বহুবার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সরকারকে আহ্বান জানালেও দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর তেমন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এবার তৃতীয় মেয়াদের নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা-তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ছোট-বড় দুর্নীতির যে জাল বিস্তৃত হয়েছে তা মূলোৎপাটন করার জোরালো পদক্ষেপ নেয়াই হবে এ সরকারের নতুন এক বড় ও সাহসী উদ্যোগ। বিশেষ করে দলীয় নেতাদের এক বড় অংশ যেভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে তা উচ্ছেদ করাই হবে প্রথম কাজ। এবার ইশতেহারে যখন বলা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তখন দেশবাসী আশাবাদী হয়েছে। কারণ এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার যখন জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে এবং কার্যক্ষেত্রে তার প্রমাণ পাওয়া যায়; তখন দেশবাসী দারুণভাবে খুশি হয়ে তাকে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলÑ যার সুফল জাতি দেখতে পেয়েছে এবারের নির্বাচনের ফলাফলে। তখনই আমরা আশা করছি প্রধানমন্ত্রী একইভাবে দুর্নীতির ব্যাপারেও তার কঠোর মনোভাব প্রকাশ করবেন। তিনি এখনও করেননি। তবে এবার নির্বাচনের প্রাক্কাল্যে তিনি ও তার দল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা করে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন। নতুন সরকারের যাত্রাকালে জাতি ওই নীতির সঠিক বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

আমরা এ কলামে বহুবার লিখেছি- একটি দেশের উন্নয়নের গতি স্থবির হয়ে যায় দুর্নীতির কারণে। আমাদের দেশেও দুর্নীতি যদি ২০ বছর আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যেত তাহলে আজকের এই উন্নয়নশীল দেশে অনেক আগেই উন্নীত হতে পারতাম। পৃথিবীর বহু দেশেই তার উদাহরণ রয়েছে। আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে মালয়েশিয়ার উদাহরণ। মাহাতির মোহাম্মদ শুধু তার গড়ে তোলা দেশে দুর্নীতির পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে অবসরে যাওয়ার পরও সরকারে ফিরে এসেছেন এবং পুনরায় দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরতে শুরু করেছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী তিন মেয়াদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন শেষে চতুর্থবার একই দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি খুব ভালো করে জানেন দেশে-প্রশাসনে দুর্নীতি রয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনামল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা দুর্নীতি পেয়েছি। রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার শিকড়। কোন শাসক ইচ্ছা করলেই তা নির্মূল করতে পারবে না। তবে কোন দেশপ্রেমিক ও সৎমানসিকতার শাসক আপসহীনভাবে সাহসের সঙ্গে যদি পদক্ষেপ নেয় তাহলে দুর্নীতির প্লাবন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। দেশবাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কছ থেকে এই নিয়ন্ত্রণই আশা করে। ইউনিয়ন, থানা-জেলা পর্যায়ে যে কোন ধরনেরও চাকরি সরকার কর্তৃক দেয় সুযোগ-সুবিধা পেতে হলে জনগণকে ঘুষের টাকা গুণতে হবে। ব্যতিক্রমী ঘটনা নাই বললেই চলে। গত পাঁচ-সাঁত বছরে এই ছোট আকারের দুর্নীতি সীমা ছাড়িয়ে গেছে। স্থানীয় পর্যায়ে যে কোন সরকারি-বেসরকারি, স্কুল-কলেজে চাকরি পেতে হলে ৫-১০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এটা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বড় বড় দুর্নীতির বিষয় আলোচনা নাই-বা করলাম। বড় বড় দুর্নীতির খবর প্রধানমন্ত্রীও তার সরকারের মন্ত্রীরা জানেন। এ সব ছোট-বড় দুর্নীতিই মহীরূহ আকারে ক্রমাগত আঘাত করে চলেছে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে। স্বাধীনতার পর পৃথিবীর বহু দেশ থেকে ২০ বছরের মধ্যে দেশের সামগ্রিক উন্নতি যতখানি করতে পেরেছে আমরা ৪৭ বছরেও তা পারিনি। আমরা সহজে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। দুর্নীতির পাগলা ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরে রাখতে না পারলে মধ্যম আয়ের যেটুকু উন্নতি সম্ভব হয়েছে তাও ধরে রাখা যাবে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন দুর্নীতির ভয়াবহতা। যে কারণে এক পর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘লাল ঘোড়া দাবড়ানো হবে’। স্বাধীনতাত্তোর সেই ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশেও এক শ্রেণীর মানুষ আখের গোছানোর কাজে মত্ত হয়ে উঠেছিল।

শেখ হাসিনা পুরনো ও নতুন রক্তের মিশ্রণে যে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তাদের কাছ থেকে যেমন জনগণ যোগ্যতা প্রত্যাশা করে তেমনি করে সততার। সাহসী ও সৎ মানসিকতা নিয়ে তারা সবাই শেখ হাসিনার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সার্বিক প্রচেষ্টা চালাবেন। দুর্নীতি যে কোন সমাজে ক্ষয়রোগের মতো বাসা বাঁধে। সারা দেহে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগে তা নিরাময় করতে হয়। শেখ হাসিনা বিশ্বরেকর্ডে স্থান করে নিতে চলেছেন চারবার প্রধামন্ত্রী অর্থাৎ সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে। মার্গারেট থেচার, এঞ্জেলা ম্যারকেল, আফ্রিকার একটি দেশের সরকারপ্রধান, ভারতেরও ইন্দিরাগান্ধী, শ্রীলঙ্কার কুমারাতুঙ্গার পর চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ শেষ করতে পারলেই তিনি সবাইকে পেছনে ফেলে নারী-প্রধানমন্ত্রী ও সরকারপ্রধান হিসেবে সর্বাধিক সময়ের রেকর্ড গড়বেন। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পূর্ণ সাফল্য আসবেÑ তিনি যদি দেশ থেকে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে উদাহরণ রেখে যেতে পারেন। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও তার সেই ঐতিহাসিক সাফল্য কামনা করি।

সুশাসন

নতুন সরকার তাদের যাত্রা শুরু করেছে। গঠিত হয়েছে নতুন মন্ত্রিসভা। এ মন্ত্রিপরিষদে পুরনোদের চাইতে নতুনদের সংখ্যাই বেশি। অনেকে প্রথমবার এমপি হয়েই মন্ত্রী হয়েছেন। নতুন-পুরনোদের এ পদযাত্রা শুনতে যেমন ভালো লাগে তেমনি তারুণ্যের প্রতি নতুন প্রজন্মের আশা-প্রত্যাশাও বেশি থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের প্রশাসনের আমলাতন্ত্রের ওপর যোগ্যতা ও প্রভাব রেখে সবাইকে মন্ত্রণালয় চালাতে হবে। যদি প্রশাসনে আমলাতন্ত্রের প্রভাব বেড়ে যায় তাহলে গণতান্ত্রিক সরকারের ওপরও আমলাতন্ত্রের প্রাধান্য বেড়ে যায়। তখনই তা হয় আমলাতান্ত্রিক শাসন যা ঐতিহাসিকভাবে গণবিরোধী স্বৈরতন্ত্র। তাই একজন রাজনৈতিক দল পরিচালনা ও সুনেতৃত্বের অধিকারী নেতা সর্বদা যোগ্য মন্ত্রী হবেনÑ এমন নিশ্চয়তা নেই। তা কারণে মন্ত্রিত্বে তিনিই যোগ্যÑ যার ধীশক্তি, দূরদর্শিতা লেখাপড়া- জানাশোনা এবং অধঃস্তন আমলা ও প্রশাসনকে নিজের যোগ্যতা দিয়ে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারবেন।

‘নতুন গঠিত মন্ত্রিসভার সবাই কি তেমন যোগ্যতার অধিকারী? তবু আমরা আশাবাদী থাকতে চাই। বিশেষ করে দেশের সচেতন মানুষের একটি প্রধান দাবি হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সুফল করার একটা প্রধান শর্ত সুশাসন নিশ্চিত করা। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশে সুশাসনের অভাব রয়েছে। প্রশাসন, আইনের শাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রশাসনিক ক্ষেত্র যথার্থ সুশাসনের মানদন্ডে উন্নীত হয়নি। এমনকি বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও আধুনিকায়ন বা ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমান নতুন সরকারকে এই সুশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক কাজ করতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটা প্রধান বিষয় হলো নির্বাচন। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা এখনও নির্ভরশীল সিভিল প্রশাসনের ওপর। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মী বাহিনীর অপ্রতুলতা থাকায় তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। প্রতিবেশী ভারতে নির্বাচন কমিশনের যেমন নিজস্ব কর্মী বল রয়েছে তেমনি সিভিল প্রশাসনও নিরপেক্ষ ও আস্থাভাজন। ভারতের বিশাল জনতা দীর্ঘদিনের চর্চার মাধ্যমে সেটা মেনেও নিয়েছে। যে কারণে যে কোন নির্বাচনে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হলে ৭/১০ দিন পরে ভোটের ফলাফল প্রকাশ করা হলে জনগণ সে ফলাফলে অবিশ্বাস বা আস্থা হারায় না। অথচ আমাদের দেশে ভোটকেন্দ্র থেকে ফল ঘোষণার পরও অনেক ক্ষেত্রেই অনাস্থা দেখা দেয়। এই বিশাল পার্থক্য আমাদের গণতন্ত্র ও নির্বাচনে রয়ে গেছে। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সর্বক্ষেত্রে যদি সুশাসন অর্থাৎ সুব্যবস্থাপনা বা আইনের শাসন নিশ্চিত করা না যায় তাহলে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দুর্বলতা থেকেই যাবে। যার খেসারত দিতে হবে জনগণকে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য এই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। দেশের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, আইন মোতাবেক ও সততার মানদন্ডে পরিচালিত হয় তেমন সুশাসনও এসব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য

দেশ ক্রমাগত অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে এ অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। সরকারপ্রধান ও তার মন্ত্রী-নেতারাও ইদানীং অহরহ বলছেনÑ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হবে, যা হবে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। দেশ আজ মাধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। যদি উন্নয়নের ধারা এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে তাহলে ২০৪১ সালের আগেই দক্ষিণ এশিয়ায় আরও একটি দেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে- যার নাম বাংলাদেশ। সাধারণ দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে এটা আনন্দের বিষয়। জনগণ এ স্বপ্ন এখন দেখতেই পারে। কিন্তু সেটা কি স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হবে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তান আমলের গোটা জীবন লড়াই করেছিলেন শোষণ, স্বৈরশাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে তিনি রাজনীতির অস্ত্র ধরেছিলেন বৈষম্যহীন, সাম্প্রদায়িকতাহীন ও শোষণহীন দেশ গড়ার লক্ষ্যে। তাই বাংলাদেশ রক্তাক্ত পথে স্বাধীন হবার পরেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশ হবেÑ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজবাদী এই চারটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথম সংবিধানেই তিনি তার স্বপ্নের বাংলাদেশের কাঠামো ঐ চারটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করে রচনা করেন (যার অনিবার্য রূপ পায় ’৭৫-এ দ্বৈতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর সেই বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। তিনি পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করে দেশের দুঃখী, কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি বৈষম্যমুক্ত সমাজবাদী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন কিশোর বয়স থেকেই। জীবনের শেষ সময়ে সেই রাজনৈতিক দর্শনই তিনি জাতির সামনে উপস্থাপন করে দেশি-বিদেশি শত্রুর হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন। তার রেখে যাওয়ার সেই বাংলাদেশে আজ ২২ পরিবার নয় ২২ হাজার পরিবারের জন্ম হয়েছে। যাদের কারণে সমাজ হয়ে উঠেছে বৈষম্যময়। এখানে ধনী আরও ধনী হবার অবাদ সুযোগ পেয়েছে এবং দরিদ্ররা নাভিশ্বাস ফেলছে। এমন অবস্থাকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন বলা যায় না। তিনি চেয়েছিলেন ধনীরা যেন আরো ধনী হবার অবারিত সুযোগ না পায় তেমনি গরিবরা যেন আরও গরিব না হয়। বঙ্গবন্দুর সেই স্বপ্নসাধ আজ কোথায়?

সম্প্রতি এক জরিপ রিপোর্টের প্রতিবেদন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তাতে বলা হয়েছে এবারের সংসদে যারা নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নপূরণ করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন তাদের মধ্যে নাকি তিন’শয়ের মধ্যে ২৪৪ জনই কোটিপতি। জাতির পিতার সেই কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের আশীর্বাদ ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে যে আওয়ামী লীগ গড়ে তোলা হয়েছিল তাদেরই ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে, সেই দলের নেতাদের জীবনেই এসেছে আজ এই বিশাল ভাগ্য পরিবর্তন। দলের এই নেতৃত্ব সঙ্গে নিয়ে বিপুল জনম্যান্ডেট পাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেও সম্ভব হবে না বঙ্গবন্ধুর সেই সমাজবাদী, শোষণহীন, শোষিতের গণতন্ত্রের রাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া। এখন পৃথিবীব্যাপী প্লাবন চলছে পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারা। আমরা তার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছি। অথচ পুঁজিবাদী উন্নয়নের নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিক আমরা বহুযুগ ধরেই দেখে এসেছি। এ অর্থ ব্যবস্থার নেতিবাচক দিকই বেশি। নাদুশ-নুদুশ শরীর গঠন হয় ঠিকই কিন্তু তাতে থাকে না প্রাণশক্তি, প্রকৃত শক্তি, প্রকৃত দেশপ্রেম। তবু আমরা জানি, দেশ, দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়ন, জীবনাচরণ সবই দ্রুত সেই উন্নতির দিকেই ধাবমান। সবার মতো আমাদেরও বিশ্বাস ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হবে। তাতেও কি দেশে গরিব মানুষ বেকার ও অভুক্ত-অর্ধভুক্ত মানুষের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? মার্কিন মুল্লুক, ইউরোপের দেশগুলো বা জাপান, থেকে কি তা নিশ্চিহ্ন হয়েছে? পুঁজিবাদী উন্নয়ন ব্যবস্থা তা পারেনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সুযোগ্যে উত্তরাধিকারী জনপ্রিয়তার শীর্ষে উন্নীত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে একটি পদক্ষেপ সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করতে পারি তা হলোÑ সমাজবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব না হলেও সীমাহীন বৈষম্য কমিয়ে আনার ব্যাপারে তিনি একটা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই পারেন। ধনীরা সীমা ছাড়িয়ে ধনসম্পদের মালিক হতে পারবেন না এবং গরিবদেরও জীবনমান আরও নিচে নেমে যাবে না। একটা ভারসাম্য থাকবে। এমন একটা সীমানা তৈরি হতেই পারে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদেও দাবি উঠেছে বড়লোকদের ওপর ৭০ ভাগ ট্যাক্স আরোপ করার। সরকার ট্যাক্স আরোপের মাধ্যমেও লাগাম টেনে ধরতে পারে। সমাজে একটা স্থায়ী ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক নীতি করা হলেও বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাছাকাছি যাওয়া যায়। না হলে দেশ যতই উন্নত হোক সবই কিন্তু হবে জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশের পরিপন্থী।

[লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট]