• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬, ৩০ রজব সানি ১৪৪১

রাজনীতির পথে প্রান্তে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সেই ‘লাল ঘোড়া দাবড়ানোর’ কোন বিকল্প নেই

ফকীর আবদুর রাজ্জাক

| ঢাকা , শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

দেশের উন্নয়ন বেশ দ্রুতই এগিয়ে চলেছে। এ পর্যন্ত যতগুলো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে, তার কাজও ভালোভাবেই এগোচ্ছে। আশা করা যায় অনেক কাজই এ বছরের মধ্যেই সমাপ্ত হবে। দেশের এমন অগ্রগতি একটি মহল বাঁকা চোখে দেখবেÑ এটাই স্বাভাবিক। জাতি উন্নয়নের ধারা লক্ষ্য করছে এবং আশা করে আছে গৃহীত প্রকল্পগুলোর কাজ এ বছরেই শেষ হবে। তারপরও মানুষের মনে কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। আশঙ্কাও আছে। বিশেষ করে সরকারি অফিসগুলোতে ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি বেড়েই চলেছে। দৈনিক সংবাদ যা দেশের প্রাচীনতম সংবাদপত্র তাতেই এ ব্যাপারে একটা খবর প্রকাশ করা হয়েছে। প্রত্রিকায় প্রকাশ না পেলেও যাদের বিভিন্ন কাজে অফিস কাচারি যেতে হয় তারা খুব ভালো করেই জানেন ঘুষ, দুর্নীতি এবং হয়রানির বিষয়সমূহ। সরকার জাতীয় উন্নয়ন যতই করুক না কেন যদি রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি-ঘুষের লাগাম টেনে ধরে তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে না পারে তাহলে কোন উন্নয়নই দেশ-বিদেশের ওয়াকিবহাল মহল ওই উন্নয়নকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখবে না। আমরা জানি ঘুষ-দুর্নীতি আমরা পেয়েছি উত্তরাধিকার হিসেবে। ব্রিটিশ শাসনামল ও পাকিস্তানের সময় তা বন্যার মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাই স্বাধীন বাংলাদেশে সংক্রামিত হয়েছে। তার ওপর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৪/১৫ বছর সরাসরি সামরিক স্বৈরশাসকদের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন থাকার দরুন দুর্নীতি আরও ব্যাপক হয়েছে। দুর্নীতি সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা সম্ভব না তবে তাকে যে কোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এটাই ভালো শাসক ও তার প্রশাসনের কাছে জনগণের দাবি। কিন্তু অবস্থা দেখে যা মনে হচ্ছে তাতে দুর্নীতি এখন সমাজে রন্দ্রে রন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। উক্ত দৈনিকের খবর অনুযায়ী মাত্র ছয় বছর ৩১ লাখের বেশি দুর্নীতির অভিযোগ দুদক বা সরকারি অফিসগুলোতে জমা পড়েছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের কোন অভিযোগ দায়ের করে ন্যায়বিচার লাভের আশায় ঘুষ দিতে হয়। কয়েকদিন আগে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। পত্রপত্রিকায়ই সে খবর ছাপা হয়েছে। তাছাড়া এমন অনেক বড় বড় অভিযোগ দেশের সাধারণ মানুষের চোখেও পড়ে না, জানতেও পারে না। অথচ সরকার সবই জানে। এক কথায় দুর্নীতি এখন সর্বব্যাপী। সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। নিশ্চয়ই সরকার বা কোন সরকারণ এই চরম সত্যি কথাটা স্বীকার করবে না।

কিছুদিন আগে এক দূর আত্মীয় দেখা করতে এসেছিল। সরকারি চাকরি থেকে সবে অবসর নিয়েছে। এখনও সে দুটি সরকারি অফিসের সঙ্গে যুক্ত। একটি বাংলাদেশ পাসপোর্ট অফিস, আরেকটি তার পুরোনো অফিস এজি বা অ্যাকউন্টেন্ট জেনারেলের অফিস। সে অ্যাকাউন্টস বিষয়ে দক্ষ। বড় দুঃখে বলল- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সামগ্রিক উন্নতির জন্য দিনরাত কাজ করছেন সততার সঙ্গে। অফিসের কথা বলব না। যে দুটি সরকারি অফিসের সঙ্গে কনসালটেন্সি করছি সেখানকার দুর্নীতির কথা বললে ভালো মানুষ পাগল হয়ে যাবে। নিজের চোখে, নিজের হাত দিয়ে যে সব দুর্র্নীতির চিত্র দেখি তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। তাই তার কথা- শেখ হাসিনা আন্তরিকতা নিয়ে যত উন্নতিই দেশের জন্য করুন না কেন ঘুণ পোকার মতো দুর্নীতিবাজরা সব খেয়ে যাচ্ছে। এতদিন যত উন্নতি দেশের হতে পারত শুধু দুর্নীতিবাজদের জন্যই তা পিছিয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু সঠিকভাবেই দারিদ্র্যতার মূল কারণ বুঝতে পেরেই ’৭৪ সালে ‘লাল ঘোড়া দাবড়ানোর’ হুমকি দিয়েছিলেন। বস্তুত প্রায় ৫০ বছরে দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে পরিমাণ অগ্রগতি হওয়া উচিত ছিল শুধু দুর্নীতির কারণে তা হয়নি। এটা বিষবাষ্পসম ক্ষয় রোগের ন্যায় একটা সম্ভাবনাময় সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের প্রায় ৪৫ বছর পরে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে, যা বহু আগেই হতে পারত। পারেনি শুধু সেনা স্বৈরশাসন ও তাদের সমর্থিত শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে। অথচ ’৯৬-এত মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক শক্তি ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেই খাদ্যে দেশকে স্বয়ংসম্পর্ণ করে নজির স্থাপন করেছিল। আবার যখন বিএনপি এবং সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেছিল তখন দেশ আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা হারিয়ে ফেলে ঘাটতির দেশে রূপান্তরিত হয়। তারপর থেকে আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে দেশকে খাদ্যে, বিদ্যুতে অন্যান্য ক্ষেত্রের উন্নয়নে নজির স্থাপন করে দেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদার তালিকায় উন্নীত হয়েছে। যা ২০ বছর আগেই হতে পারত। ক্ষমতার লোভ ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে তা সম্ভব হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সেই লাল ঘোড়া দাবড়ানোর ঘোষণা আর বাস্তবায়িত হয়নি। সপরিবারে তাকে হত্যা করার পর ২১ বছর ধরে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কব্জা করে রেখেছিল তারা দুর্নীতিতে স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল দেশকে। আজ বঙ্গবন্ধুর কন্যা বা তার রক্তের উত্তরসূরি ক্ষমতায় থেকে তিন মেয়াদে দেশের ব্যাপক উন্নতি করেছেন এমন উন্নয়নের পথে বিস্ময়করভাবে এগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনও পারেননি দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে। তার বিশ্বাস ছিল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়িয়ে দিলে দুর্নীতি কমে আসবে। কিন্তু আজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে দুর্নীতি, ঘুষ তো কমেইনি বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তা আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে এমনকি মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নোরাও ঘুষের মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব ভাগ-বাটোয়ারা করছেন। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে সর্বব্যাপী রাজনৈতিক অঙ্গনেও যে পরিমাণ দুর্নীতি, ঘুষ চলছে, ‘তার তুলনায় ব্যতিক্রমের তুলনা করা যায় না। কারণ তারা দেখতে পারছে নেতা হতে পারলেই দুর্নীতি করা যায় বাধাহীনভাবে। প্রশাসন জেনেও কিছু করতে পারবে না, কারণ তারাও ওই একই চর্চায় মগ্ন। শেখ হাসিনা সারা জীবন ক্ষমতায় থাকবেন না, কেউ থাকে না। তাছাড়া তার বয়সও হয়েছে। তাই একান্ত প্রার্থনা, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে যে সব দুর্নীতি হচ্ছে তার লাগাম টেনে ধরার একটা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে জাতির সামনে উদাহরণ রেখে যাওয়া। বিষবৃক্ষের মতো প্রশাসনও সমাজের সর্বত্র দুর্নীতি যেভাবে সংক্রামিত হয়েছে তাতে প্রমাণিত সুশাসনের ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ নেই। পূর্বেই বলেছি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করা এ মুহূর্তে সম্ভব হবে না, তবে সরকার যদি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে সাহসী পদক্ষেপ নেয় তাহলে অবশ্যই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব।

সম্প্রতি রবার্ট মুগাবে মারা গেছেন ৯৫ বছর বয়সে। জিম্বাবুয়ের তথা আফ্রিকারও অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। জিম্বাবুয়ের জাতির জনক মর্যাদায়ও তিনি অভিসিক্ত ছিলেন। ৩৭ বছর প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে শেষের দিকে এসে তিনি চরম স্বৈরশাসক ও দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিগণিত হয়। জনগণ তাকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে। শাসন, ক্ষমতা সবকিছু হারিয়ে এক অনিশ্চিত নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এবং জনগণের কাছ থেকে পরিচিতি পেয়েছেন চরম দুর্নীতিবাজ হিসেবে। দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন দারিদ্র্যের চরম সীমায়। অথচ একদা রবার্ট মুগাবে ছিলেন জাতির ত্রাণকর্তা এবং আফ্রিকার দুস্থ-দুঃখী মানুষের আশাজাগানিয়া নেতা। তাই দেশের যত অর্থ সামাজিক উন্নয়নই ঘটুক, যদি রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও সমাজ থেকে দুর্নীতি, অব্যবস্থা দূর করা না যায় তাহলে সম্ভাবনাময় একটা দেশও ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে চিহ্নিত হতে পারে। সে কারণে সময় থাকতেই শেখ হাসিনার সরকারকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সেই ঘোষণা অনুযায়ী ‘লাল ঘোড়া দাবড়ানোর’ মতো সাহসী ও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তাহলেই তার নাম ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধু সে সময় পাননি।

আগেই উল্লেখ করেছি, সরকারি অফিসগুলোতে ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানির ৩১ লাখ অভিযোগ দুদকেই জমা পড়েছে। ঘুষ এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দুদকে দেয়া অভিযোগের দ্রুত বিচার পেতে হলেও ঘুষ দিতে হবে। এ ব্যাপারে একটা ঘটনার কথা মনে হলো- আমার এক বন্ধু মারা গেছে, বলেছিল এক ছেলে নাকি তার কাছে চাকরির সুপারিশের জন্য এসে বলেছিল, এজি অফিসে চাকরির দরখাস্ত করায় ইন্টারভিউয়ের ডাক পেয়েছে। এবার যদি আপনি একটু চেষ্টা করেন তাহলে চাকরিটা হতে পারে। বেতন না দিলেও রাজি। দরকার শুধু চাকরির। ঘটনাটি বন্ধুর কাছ থেকে শুনে হাসতে হাসতে মরেছি। আর ভেবেছি- আমাদের সরকারি অফিসগুলোর কি চেহারা। বস্তুত দীর্ঘকাল ধরে এটাই সত্য যে, সরকারি সব অফিস বিশেষ করে এজি, দুদক এবং পুলিশের চাকরিতে বেতন না দিলেও চাকরি প্রার্থীর অভাব পড়বে না। আশা করি দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা এবং পর পর তিন মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে আওয়ামী লীগ ঘুষ, দুর্নীতির বিষয়টা খুব ভালোভাবেই জানে। ঘুষ, দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশের একজন সাধারণ মানুষও জানে টাকা না দিলে চাকরি হবে না। টাকার পরিমাণ ৫, ১০, ২০ লাখ টাকা চাকরির গুরুত্ব অনুযায়ী সম্প্রতি পরিচিত এক ব্যক্তি বললেন-পুলিশের এএসআই পদে একটা চাকরির জন্য বিশ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। দেশের চাকরি-বাকরির অবস্থা এটাই। এটা কোন সভ্য প্রশাসন ও সমাজের চিত্র হতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রীই জাতির একমাত্র ভরসা। তিনি যদি অবিলম্বে সাহসী কঠোর পদক্ষেপ না নেন তাহলে সরকার ও তার নামের পাশেও ‘সততা, স্বচ্ছতা’ লেখা হবে না/জাতীয় উন্নয়ন যতই হোক না কেন। মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাতির মোহাম্মদ ২০ বছরের বেশি ক্ষমতায় থেকে নিজের দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার পর রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছিলেন। ৪/৫ বছর পর তার নিজের বিশ্বস্ত লোককে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে অবসর থেকে ৯২ বছর বয়সে আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। শুধু দুর্নীতির কারণে। তার সেই বিশ্বস্ত লোক ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে মালয়েশিয়াকে আবার মর্যাদার সোপানে নিয়ে এসেছেন। এবার নাকি তিনি আবার অবসরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। ইতোমধ্যে তৈীি করেছেন সৎ, যোগ্য উত্তরসূরি।

বস্তুত সততা, স্বচ্ছতার কোন বিকল্প হয় না। রাষ্ট্র কতখানি উন্নত হচ্ছে তা নির্ভর করে ওই সততার ওপর। তাই দুর্নীতি, ঘুষের বিরুদ্ধে আপসহীন হতে হবে সরকার ও সরকারপ্রধানকে। ‘বালিশ কেলেঙ্কারির’ খবর দেশের সীমানার মধ্যে সীমাব্ধ নেই। সব ক্ষেত্রে যেসব অপরাধ হচ্ছে তার ক্ষমা করার কোন সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধুর ‘লাল ঘোড়া দাবড়াতেই’ হবে। বিকল্প নেই।

[লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট]