• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, ৭ রবিউল সানি ১৪৪০

দলিত ও বঞ্চিতদের স্বাস্থ্য সেবা উপেক্ষিত

বাবুল রবিদাস

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

১৫-১৯ নভেম্বর Peoples Health Movement (P.H.M) বা জনগণের স্বাস্থ্য আন্দোলন ঢাকার সাভারে হয়ে গেল। তারই আলোকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে নিম্নে আলোচনা করছি। প্রবাদে বলা আছে, স্বাস্থ্যই সব সুখের মূল ও স্বাস্থ্যই সম্পদ। অর্থাৎ Health is wealth. কিছু অর্জন করতে হলে সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া আবশ্যক। মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সুষম ও ভেজালমুক্ত খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষেরাই পরিশ্রম করে সমাজের চিত্র পাল্টে দিতে পারে। তাই বলা হয় ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি।’

দলিত শ্রমিকরা সব সময় সমাজের জন্য নোংড়া জীবাণুযুক্ত মল, মূত্র, ঝাড়ু দেয়া, ড্রেনের ময়লা আবর্জনা, মৃত ব্যক্তির লাশ উত্তোলন, মৃত গলিত ও অর্ধগলিত প্রাণীর দেহ অপসারণ করে ভাগাড়ে ফেলে পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। অজ্ঞতা ও অল্প শিক্ষিত হওয়ায় রোগজীবানু সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা মাথায় গজায় না। ফলে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কোনরূপ প্রতিরোধকমূলক সু-ব্যবস্থা না রেখেই যে কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন। এরূপ কাজে দীর্ঘদিন থাকার ফলে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন এবং পরিণতিতে অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হন। যেমন ৬ অক্টোবর দৈনিক সংবাদের খবরে জানা যায় যে রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের শতকরা ২০ ভাগ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এর বাইরে অ্যাজমায় শতকরা ২৩ ভাগ, ব্রেন স্ট্রোকে শতকরা ১০.৭৫ ভাগ, হৃদরোগে ১৮.৪৬ ভাগ মারা যাচ্ছে। আর স্বাভাবিক মৃত্যুর হার শতকরা ২৭.৭৬ ভাগ। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনায় এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ প্রসঙ্গে (ডিএনসিসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফা বলেন- পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা আমাদের শহর পরিষ্কারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের চিকিৎসার সেবাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়াব।’

স্বাস্থ্যকে ভালো রাখতে হলে মানসম্মত খাবার গ্রহণ করতে হয়। দলিত ও বঞ্চিত শ্রমিকরা তা থেকে অনেক দূরে। স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান তাদের বেশিভাগ মানুষেরই নেই। নিরাপদ পায়খানা চোখে পড়ে না, গাদাগাদি করে একত্রে বসবাস করতে দেখা যায়। দেশে অনিরাপদ পানি পান করছে সাড়ে সাত কোটি মানুষ। সুধীজন মনে করেন তাদের বেশিভাগ মানুষই দলিত। দেশে অপুষ্টিজনিত কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৬.১ শতাংশ শিশু খর্বকায়, এছাড়া ১৪.৩৩ শিশু কৃশকায় এবং ৩২.৪ শতাংশ শিশু কম ওজনে ভুগছে বলে জানা যায়। যদিও স্বাস্থ্য সেবা সহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবন যাত্রার বস্তুগত সাংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন, যাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অর্জন করা যায়। (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারনের মৌলিক উপকরণের ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ঘোষণার মাধ্যমে জণগণের স্বাস্থ্যের অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

কিন্তু এখনও দেশের অধিকাংশ জনগণ কি মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা অর্জন করতে পারছেন? দেশের স্বার্থ- সামাজিক উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সাংবিধানিকভাবে ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়টিকে মানুষের সার্বিক সক্ষমতার জন্য অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়া হয়েছিল। মানব উন্নয়ের সূচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকারের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে- দলিত, বঞ্চিত, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণ এখনও স্বাস্থ্যসেবা খাত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অপর এক তথ্যে জানা যায় যে, ১৯৭৮ সালে আলমা-আতা সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফসহ ১৩৪টি সদস্য দেশের মন্ত্রীরা ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য ঘোষণা পত্র গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাকে একটি উপায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যবশত সেই স্বপ্ন এখনও বাস্তবে পরিণত হয়নি। ফলে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্বের জনগণের স্বাস্থ্যর অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে এটা দেখা গেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। বর্তমানে আমরা একটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি। যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দেশের ভেতর এবং এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যগুলো অনবরত জনস্বাস্থ্যের প্রতি নতুন নতুন হুমকির সৃষ্টি করছে। এটি আবার বিশ্বায়নের নেতিবাচক শক্তিগুলো কর্তৃক আরও জটিল আকার ধারণ করছে। যা জনগণের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিশেষভাবে গরিবদের স্বাস্থ্য সম্পদের সমতাপূর্ণ অধিকার অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করছে।

স্বাস্থ্যসেবাকে মানব উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বৈষম্যহীন ভাবে জনগণের স্বাস্থ্য অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে আন্তর্জাতিক ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ফলে সরকারি স্বাস্থ্য পরিসেবা উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে।

তবে বিগত ৭ এপ্রিল দৈনিক সংবাদের মাধ্যমে জানা যায় যে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে চিকিৎসা খাতে সবচেয়ে বেশি খরচ করতে হয় বাংলাদেশে। এ খাতে যে খরচ হয় তার ৬৭ শতাংশই ব্যক্তির নিজ পকেট থেকে খরচ করতে হয়। বাকি ২৩ শতাংশ বহন করে সরকার। আরও এক তথ্যে উল্লেখ করা হয় যে- বাংলাদেশের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ বা সাড়ে ৫২ লাখ মানুষ প্রতিবছর নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে।

আন্তর্জাতিক মানদন্ডে বাংলাদেশের মাথাপিছু স্বাস্থ্য (সরকারি বা বেসরকারি ও ব্যক্তিগত) সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। যা মাত্র ২৭ ডলার। যেখানে ভারতে ৬১ ডলার এবং মালয়েশিয়ায় ৪১০ ডলার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের জন্য এ খাতে ব্যয় হওয়া আবশ্যক ৪০ ডলার, স্বাস্থ্য খাতে ন্যূনতম ব্যয়ের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের সরকারি ব্যয় বাংলাদেশে সবচেয়ে কম (২৩%)। যেখানে ভারতে ৩৩% এবং নেপালে ৪০%। অপরদিকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত পর্যায়ের ব্যয় বাংলাদেশে ৬৭% ভারত ৫৭% এবং নেপাল ৪৯.২%।

ধনী ও গরিব অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত তিন ভাগে বিভক্ত। যেমন সামর্থ্যবানরা বিদেশে চিকিৎসার জন্য গমন করেন, মধ্যবিত্তরা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের চিকিৎসা পছন্দ করেন। আর গরিবেরা তথা দলিত, বঞ্চিত শ্রমিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে বাংলাদেশের সরকারি হাসাপাতালে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে থাকেন। ১৬ কোটি জনসংখ্যা হলেও বাংলাদেশের জনসংখ্যা দিন দিন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ডাক্তার, নার্স, জনবলের, সংকট পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন কমপক্ষে ২৩ জন। সেখানে বাংলাদেশে আছে মাত্র ৫.৮ জন। যেখানে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত হবে ১.৩; বাংলাদেশে চিকিৎসক নার্সের আনুপাতিক হার ০.৬।

এছাড়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি জাতীয় বাজেটেও উপেক্ষিত। যেমন- বিগত ১৭ অক্টোবর দৈনিক সংবাদের খবর ছিল- মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের সাভার গ্রামের বিধবা আবিরণ বিবি (৫০) অর্থাভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। দলিত জনগণ অল্প বেতনে কাজ করায় তাদের কোন সঞ্চয়ী মনোভাব সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না। অল্প বেতনের কারণে আশ্চর্যের বিষয় হলো বাংলাদেশে ৫ কোটি ৭৯ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যাংক হিসাব নেই। তাই তাদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধি করে সঞ্চয় মনোভাব তৈরি করা আবশ্যক। এ সঞ্চয় হবে মৌলিক অধিকার রক্ষার বীমা। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চত করা এবং এ খাতে ব্যাক্তিগত ব্যয় শূন্যের কোঠায় কমিয়ে আনা। দলিত ও শ্রমিকরা যখনই কোন সরকারি, বে-সরকারি বা সংস্থার কাজে নিয়োজিত হবেন, সঙ্গে সঙ্গে মৌলিক অধিকার রক্ষা বিষয়ক বীমা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বীমা পদ্ধতি চালু করা আবশ্যক। দলিত জনগণ যেহেতু ঝুকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত, সেহেতু তাদের প্রতি আলাদাভাবে যতœ নেয়া আবশ্যক। অন্তত ৭ দিন পরপর তাদের স্বাস্থ্য চেকআপ করার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তাদের সমস্ত ওষুধপত্র বিনামূল্যে সরবরাহ করার বিধান চালু করা যেতে পারে। পরিচ্ছন্নতা কাজে নিয়োজিত থাকাকালে আধুনিক (Safty gear) নিরাপত্তা পোশাক এবং জীবাণুনাশক ওষুধপত্র আবশ্যকীয় ভাবে সরবরাহ করতে হবে। উন্নত বিশ্বে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার কারনে অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত কর্মীদের পারিশ্রমিকের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য তাদের বেতন অধিক। অথচ এদেশে দলিতরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকলেও তাদের মৌলিক অধিকার অর্জিত হয় না।

উপসংহারে এ কথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, দলিত শ্রেণী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সুষম খাদ্য না পাওয়ায় তারা অপুষ্টিতে ভুগে থাকেন, দেশের ৪ কোটি মানুষ এখনও পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পান না। এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তারা নিয়োজিত হতে বাধ্য হন। পরিণামে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। অর্থের অভাবে ভালো ও উন্নত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে তারা অকালেই ঝরে পড়েন মৃত্যুর কোলে। তাই বিশ্বব্যাপী গবেষণা করে গবেষকরা মতামত দিয়েছেন যে, ‘ধনীদের চেয়ে ১০ বছর আগে মরে গরিবেরা’।

[লেখক : সভাপতি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জয়পুরহাট জেলা শাখা]