• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

গ্রাম-গ্রমান্তরে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খ—গ সাংবাদিকদের ঘাড়ে পড়বে না!

সংবাদ :
  • রুকুনউদ্দৌলাহ্

| ঢাকা , বুধবার, ২০ মে ২০২০

কী ভয়ংকর আসামি শফিকুল ইসলাম কাজল! তাই তাকে হাতকড়া পরিয়ে বেনাপোল থেকে যশোর নিতে হয়। সীমান্ত এলাকা থেকে ধরা হয়েছে। কিন্তু তার কাছ থেকে কোন চোরাচালনকৃত পণ্য উদ্ধার হয়নি। তাহলে তিনি তো আর চোরাচালানী নন। সম্ভবত সীমান্ত থেকে আটককৃত সাংবাদিক কাজল গুরুতর কোন অপরাধ করেননি বলেই আদালত তাকে ওই মামলায় জামিন মঞ্জুর করেন। তার বিরুদ্ধ আর একটি মামলা আছে। সেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা। পত্রিকায় প্রকাশিত লেখনীর কারণে যদি কেউ আহত হন তিনি আইনের আশ্রয় নিতে পারেন, এতে আমাদের বলার কিছু নেই। যারা মামলা করেছেন তারা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন। তারাই কিন্তু মঞ্চে, ময়দানে, ক্লাসরুমে গণতন্ত্রের একটি মহান বাণী উচ্চারণ করেন, তাহলো সংবাদপত্র চতুর্থ রাষ্ট্র, জাতির দর্পণ।

এ দর্পণটি যাদের অক্লান্ত শ্রমে প্রতিদিন আলোকিত হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয় তারাই সাংবাদিক। মামলার বাদী সমাজের ওই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের ব্যক্তিত্বরা প্রথম চোটেই মামলায় না গিয়ে পত্রিকায় তাদের প্রতিবাদ জানাতে পারতেন। এতে তাদের মনের কথা ও ব্যথা সবই প্রকাশ হতো সংশ্লিষ্ট পত্রিকাটিতে। তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত খবর পাঠ করে পাঠকদের মধ্যে তাদের সম্পর্কে যে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল তার অপনোদন হতো। লেখকের সম্পর্কেও ধারণা পাল্টে যেত পাঠকদের। পত্রিকাটি কিন্তু তাদের প্রতিবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য। যদি না প্রকাশ করে তাহলে আইনতো ছিলই। কেউতো আর আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

শফিকুল ইসলাম কাজল মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্ত চেতনার সাংবাদিক। তার পত্রিকাটিও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের নয়। যারা মামলা করেছেন তাদের পরিচয় পরিচিতিতে তারা গণতন্ত্রের মশালবাহী ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের অনুসারী। তাদের শিক্ষা দেয়ার ধৃষ্টতা আমাদের নেই। তবে, এতটুকু বলতে দ্বিধা নেই, তারা সহনশীল হতে পারতেন। মিডিয়ায় প্রকাশিত কোন লেখা কারও বিরুদ্ধে গেলে তিনি চোটপাট দেখিয়ে প্রমাণ করতে চান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্দোষ। আর মামলা করে সমাজকে বোঝাতে চান তিনি ক্লিন ইমেজের মানুষ।

আলোচিত ফটোসাংবাদিক ও দৈনিক পক্ষকালের সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজলকে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় যশোরে দেখা গেছে। তিনি ১০ মার্চ ঢাকা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন। ৫৩ দিন পর যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এলাকার সাদীপুর মাঠ থেকে গভীর রাতে উদ্ধার করা হয়। অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের অভিযোগে ও ৫৪ ধারায় আটক দেখিয়ে ৩ মে বিকেলে তাকে যশোরের আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে যশোরের শার্শা আমলী আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বেনাপোল পোর্ট থানা বলেছে, ২ মে রাতে বেনাপোল সীমান্তের সাদিপুরের একটি মাঠের মধ্য থেকে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে উদ্ধার করে যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের রঘুনাথপুর বিজিবি ক্যাম্পের টহল দল। অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা দিয়ে তাকে গভীর রাতে বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করে বিজিবি।

বিজিবি সূত্র জানায়, রাতে বিজিবির টহল দলের সদস্যরা তাকে সাদিপুর সীমান্তের একটি মাঠের মধ্য থেকে উদ্ধার করেন। অবৈধভাবে ভারত থেকে আসার সময় তাকে আটক দেখানো হয়। পরে তাকে বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়।

বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশের ভাষ্য, রাত সাড়ে ৩টার দিকে ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পারাপারের অভিযোগে বিজিবি একটি মামলা দিয়ে বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করে। সেখানে পোর্ট থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে বিজিবির করা অবৈধ পারাপারের মামলায় তাকে যশোরে পাঠানো হয়। দুপুরে তাকে পোর্ট থানা পুলিশ হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে যশোরে নিয়ে আসে।

বেনাপোল থেকে এনে তাকে যশোর ডিএসবি অফিসে নেয়া হয়। সেখানেও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পরপরই তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের মামলা ছাড়াও ঢাকায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

বেলা ৩টার দিকে যশোর ডিএসবি কার্যালয় থেকে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয় ফটোসাংবাদিক ও পক্ষকালের সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজলকে। এ সময় তিনি মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন। আদালত প্রাঙ্গণে তার ছেলে মনোরম পলক তাকে জড়িয়ে ধরেন। তখন কাজলের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। শফিকুল ইসলাম কাজল তার ছেলেকে বলেন, ‘ভয় পাসনে, আমি কোন অন্যায় করিনি। সত্যের জয় হবেই।’

আদালত সূত্র জানায়, সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের অভিযোগে ১১(সি) ধারায় আটক দেখিয়ে যশোরের শার্শা আমলী আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাকে ৫৪ ধারায়ও আটক দেখানো হয়েছে।

যশোরের আমলী আদালতের (শার্শা) বিচারক সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে বিজিবির দায়ের করা অবৈধ অনুপ্রবেশ মামলায় জামিন দেন। তবে, থানার ৫৪ ধারায় দায়ের করা অপর একটি মামলায় তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার ওয়েস্টিন হোটেলকেন্দ্রিক কারবারে জড়িতদের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তাতে আসামির তালিকায় শফিকুল ইসলাম কাজলের নামও রয়েছে। মাগুরা-১ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর গত ৯ মার্চ শেরেবাংলা নগর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ওই মামলাটি করেন।

সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল গত ১০ মার্চ সন্ধ্যায় পক্ষকাল অফিস থেকে বের হন। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে, পরদিন ১১ মার্চ চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার স্ত্রী জুলিয়া ফেরদৌসী নয়ন। পরে ১৮ মার্চ রাতে কাজলকে অপহরণ করা হয়েছে অভিযোগ এনে চকবাজার থানায় মামলা করেন তার ছেলে মনোরম পলক। এসব হলো সাংবাদিক কাজলকে আটকের পূর্বাপর ঘটনা।

শফিকুল ইসলাম কাজলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। এই আইনটি প্রণীত হওয়ার পর সাংবাদিকরা তাদের বলেছিলেন এতে সাংবাদিকরা লেখার স্বাধীনতা হারাবেন। সাংবাদিকতা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। আইনটি রহিত করার দাবিতে তারা আন্দোলন-সংগ্রামও করেন। কিন্তু সে কথা সরকার কানে তোলেনি। শুধু মিষ্টি কথায় সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করা হয়েছে এ আইনের খ—গ সাংবাদিকদের ঘাড়ে পড়বে না। এতে সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু খ—গ ঠিকই সাংবাদিকদের ঘাড়েই পড়ছে। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল সাম্প্রতিক সময়ের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। সাংবাদিক কাজলকে বেনাপোল থেকে উদ্ধারের পর তার সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা কোন চোর-ছেঁচড়ের সঙ্গেও বোধ হয় করা হয় না। একজন প্রবীণ সাংবাদিকের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের নামে যেভাবে টানাহেঁচড়া করা হয়েছে তা না করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পারত। তারপরও তো তিনি সিনিয়র নাগরিক। রাষ্ট্র যখন বয়সী নাগরিকদের সম্মান দিতে সিনিয়রিটির স্বীকৃতি দিয়েছে তখন কী সম্মান পেলেন সাংবাদিক কাজল। তার সঙ্গে আচরণে মনে হয়েছে তিনি দেশের একজন কুখ্যাত অপরাধী। অপরাধী হলেও কিন্তু আদালত কর্তৃক দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে অপরাধী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। শফিকুল আসলাম কাজল যে নিরপরাধী তা তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে যা বলেছিলেন তাতে আঁচ করা যায়। তিনি তার ছেলেকে বলেছিলেন, ‘ভয় পাসনে, আমি কোনো অন্যায় করিনি। সত্যের জয় হবেই।’

আজ ত্রাণের চাল বেশুমার চুরি হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে সংবাদ পরিবেশন করে মামলার আসামি হয়েছেন সাংবাদিক। কোন সরকারি অফিসের বিরুদ্ধে অনিয়মের ঘটনা ঘটলে তার সত্যতা নিশ্চিতের জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নিতে গেলে তিনি নানা নিয়মের বেড়াজাল টাঙিয়ে দিয়ে তথ্য তো দেন না। আরও শুনিয়ে দেন, এ বিষয়ে খবর প্রকাশিত হলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করবেন।

শুধু তাই নয়, যখন ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় তখনই সার্কুলার আসে কারও সম্মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। এটা নিঃসন্দেহে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বলেই বলা হয়। ‘গ্রাম বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, তা হলো : তাড়াবো না তোর উঠোন চষবো’। ডিজিটাল আইন আর সাংবাদিকদের নিয়ে যা চলছে তা অনেকটা সে রকমই। দেশের জন্যে দশের জন্যে খবর লিখে অহেতুক কে চায় ঝঞ্ঝাটে জড়াতে। মিডিয়া জগতে যদি এ ধারণা একবার গেঁথে যায় তাহলে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কবর রচিত হবে। সত্য চাপা পড়বে অতল গভীরে। আর এতে দুর্নীতিবাজরা বাধাহীন ফাঁকা মাঠ পেয়ে দুর্নীতির লাঙলে দেশটা চষে ফেলবে।