• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৩ সফর ১৪৪২, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

টেলিভিশনে ভারতীয় চ্যানেলের অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে যত কচকচানি

কাজী মোহাম্মদ শীশ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

image

এই তো সেদিন টেলিভিশনে একটি টকশো শুনছিলাম আমার এক বাল্যকালের বন্ধুসহ। হঠাৎ-ই স্বল্প সময়ের জন্য বোধহয় ২৪ ঘণ্টার কিছু বেশি হবে ভারতীয় কয়েকটি বাংলা চ্যানেলের প্রচার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে দু-একটি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বাংলাদেশের অগণিত দর্শক দেখে থাকেন। অনুষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণ এবং তার সমাধান কি তা নিয়েই টকশো। আলোচনায় এসেছেন একটি টিভি চ্যানেলের একজন, তথ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একজন, ক্যাবল অপারেটরের একজন কর্তাব্যক্তি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রাইভেট টেলিভিশনে যেমনটা দেখা যায় টক শো এর সঞ্চালক উপস্থাপনার কাজকে গৌণ করে নিজেই একজন মুখ্য আলোচক হয়ে উঠছিলেন বারবার। বিশ্বের আর কোন নামকরা টিভিতে এমনটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে বাংলাদেশের সব প্রাইভেট টেলিভিশনে এমনটা করা হয় তা বলা ঠিক হবে না। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

আলোচনার শুরুতে বিজ্ঞ আলোচকগণ জানালেন, কোন চ্যানেলের প্রচার বন্ধ করা হয়নি। শুধু আইনকানুন ও নিয়মনীতি মানার কথা বলা হয়েছে। একজন বললেন, আইন হলো বিদেশি কোন চ্যানেল তাদের অনুষ্ঠান প্রচারকালে বাংলাদেশের কোন পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না। তাতে বাংলাদেশ কর আদায় থেকে বঞ্চিত হয়। টিভি চ্যানেলের প্রতিনিধি জানালেন, শুধু বাংলাদেশের পণ্যের নয় কোন পণ্যেরই বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না বিদেশি চ্যানেল। তাদের অনুষ্ঠানে সেটাই নাকি নিয়ম-আইন। যেহেতু এ বিষয়ে আমরা সাধারণেরা অজ্ঞ তাই শেষ অংশটা বুঝতে না পেরে অবাক হলাম। এরপর চলতে থাকল কত স্বল্প ব্যয়ে বিদেশি বিশেষ করে ভারতীয় এসব চ্যানেল তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করে আমাদের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি করছে। কার ক্ষতি করছে? এ প্রশ্নের উত্তরে তারা জানালেন ২৪টি প্রাইভেট চ্যানেলের (আরও ৫টি প্রচারের অপেক্ষায়) মালিকদের ক্ষতি। তারা কোটি কোটি টাকা খাটিয়েছেন এ ব্যবসায়। বিপুলসংখ্যক টেলিভিশন কর্মীর জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে একজন তো বলেই বসলেন, এমন নিয়ম ভাঙা হচ্ছে যে ভাবা যায় না। তার কথায় নিয়ম অনুসারে প্রদর্শনের ক্রমিক নং হবে বাংলাদেশের সরকারি টেলিভিশনগুলো (BTV, BTV National, BTV World ইত্যাদি) প্রথম দিকে তারপর প্রাইভেট টিভিগুলোর চালুর তারিখের ক্রম অনুসারে সিরিয়াল এবং তারপর বিদেশি চ্যানেল। তিনি আরও বললেন সরকারি টিভির ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হলেও প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। আমরা বুঝতে পারছি না কেন এ নিয়ম ক্যাবল অপরারেটররা ভঙ্গ করছেন। শৃঙ্খলা রক্ষায় এ নিয়ম খুবই সুন্দর। সেই সঙ্গে এই নিয়ম অনুসরণ করলে বিদেশি চ্যানেলের দর্শকদের সুবিধাই হবে। তার পছন্দমতো চ্যানেলের সিরিয়াল নাম্বার মনে রাখলে যে কোন স্থানে/ যে কোন টিভিতে রিমোট কন্ট্রোলের এক বা দুটি বোতাম টিপলেই তিনি তা পেয়ে যাবেন। বিষয়টি নিয়ে যখন চিন্তার অগভীরতা দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা নিয়ে শুধু আর্থিক লাভ-লোভের দিক বিবেচনা করে সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছিল, তখন প্রশ্ন এলো অনুষ্ঠানের মান নিয়ে। এখানে আবার বলির পাঠা করা হলো দর্শকদের। একজন বললেন এখানকার অনুষ্ঠান মানসম্পন্ন হলে নিশ্চয় দর্শকগণ ভারতীয় অনুষ্ঠান কম দেখবেন। তখন ক্যাবল অপারেটররাও পয়সা খরচ করেও সব চ্যানেল আনার উৎসহ হারাবে। আর যাই কোথা! একেবারে ঢালাওভাবে শুরু হলো, ভারতীয় এসব অনুষ্ঠান আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য মূল্যবোধ সব নষ্ট করে দিচ্ছে। বলা হলো, এমন কী ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও এসব অনুষ্ঠানের বিপক্ষে কথা বলা হচ্ছে। তারা ভুলে গেলেন পক্ষে-বিপক্ষে মত প্রকাশ সুস্থ সংস্কৃতি সৃষ্টির সহায়ক। সে যাক। প্রথম জন আবার বলার চেষ্টা করলেন, দর্শকদের মধ্যে ভারতীয় বেশকিছু বাংলা চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখার চাহিদা আছে তো। এবারের আক্রমণ অব্যর্থ নিশানায় মানুষের মধ্যে ইয়াবারও চাহিদা আছে তো? আপনি ইয়াবা সরবরাহ করতে থাকুন চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। আমার বন্ধুটি গম্ভীর মুখে বলল, টেলিভিশন বন্ধ করবি? নাকি চলে যাব।’ তার হাত চেপে ধরলাম। বললাম, ‘দেখি আর কত জ্ঞানগর্ভ মননশীল কথা শোনা যায়! একটু বোস ইয়াবার কথায় সমাজ সচেতন সঞ্চালক আর একধাপ এগিয়ে গেলেন। ওই অনুষ্ঠানগুলো যে সব বিদেশি চ্যানেলে দেখানো হয় সেগুলো বন্ধ করে দিলেই তো দর্শকরা তা আর দেখতে পারবে না। দেখতে না পারলে চাহিদাও থাকবে না। আহ কী সুন্দর সহজ সমাধান। তিনি ভুলে গেলেন এখন আকাশ কবিদের বিচরণ বা উড়োজাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে নেই। ইনফরমেশন টেকনলজি আকাশ সংস্কৃতিকে দর্শকদের দোরগোড়ায় নিয়ে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ তো আইটিতে বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে। ইউটিউবসহ আইটির আধুনিক সব কিছুর সঙ্গে আপনি পরিচিত থাকবেন আর কয়েকটি চ্যানেলের প্রদর্শন বন্ধ রেখে দর্শকদের অন্ধ করে রাখবেন তা কি সম্ভব? টক শোর শেষ পর্যায় সেদিনের মতো শেষ অস্ত্র ছুড়লেন একজন, আমরা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বজায় রাখতে ‘পিসটিভি’ বন্ধ করেনি? অনুষ্ঠানটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর মুখে চলে যাওয়ার জন্য বন্ধুটি উঠে দাঁড়ালো। সহজ-সরল সবসময় হাসি-খুশিতে থাকা মানুষটি কেন এমন সিরিয়াস হয়ে উঠলো বুঝতে পারলাম না। কাল সকালে আবার আসবে জানিয়ে সে বলল, আমি তো লিখতে পারি না। আমি কিছু বলব, তুই লিখবি।

পরদিন সে আগের রাতের টক শো নিয়ে কথা শুরু করল। তার বক্তব্য অনেকটা এ রকম। সব বয়সেই আমাদের ফল খেতে হয় স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য। সেই ফলে কেউ কেউ বিষও মেশায়। বিষমাখা ফল সরবরাহ বন্ধ করতে হয়। ‘পিস টিভি’ও ছিল তেমন এক বিষাক্ত ফল। তাই আমরা তা ত্যাগ করেছি। তারপর সে বলল মানের কথা। শুধু অর্থ উপার্জন কেমন করে অনুষ্ঠানের মান এনে দিতে পারে তা তার বোধগম্য নয়। টেলিভিশন দর্শকদের পছন্দের চাহিদার সঙ্গে ইয়াবা সেবনের চাহিদা তার কাছে শুধুু হাস্যকর নয় দুঃখজনক মনে হয়েছে। এলো টকশোর মানের কথায়। চাহিদার কথা আমরা তো দেখেছি কয়েক হাজার পর্ব ধরে চলছে বাংলাদেশের টেলিভিশনের এমন টক শো। সে টক শো গভীর রাতে অথবা অফিস সময়ে প্রচারিত হয়। আমাদের দেশের অগণিত দর্শক তা দেখছেন। টক শোর মাঝখানে কোন বিজ্ঞাপন না থাকায় এমন টক শো দর্শকরা গভীর মনযোগ দিয়ে শুনতে পারেন। আবার অন্য পরিবেশও রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক এসব টক শোতে একাধিক মতামতের পক্ষে-বিপক্ষের আলোচকরা আসেন। সঞ্চালকও কোন মতামতের পক্ষে থাকতে পারেন। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক টক শোতেই সঞ্চালক এমন অবস্থার সৃষ্টি করেন যে কোন দর্শকের কাছে তা মজার কারও কাছে আবার দৃষ্টিকটু লাগতে পারে। এ সব টক শোতে সঞ্চালকের মতামত কোন আলোচকের পক্ষে তা বোঝার জন্য বড় বেশি জ্ঞান ও বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। এখন ধরুন সঞ্চালকের মতামতের পক্ষে নয় এমন কথা কোন আলোচক বলছেন। হঠাৎ একটা বাক্যের মাঝখানে তিনি যখন এসেছেন, সঞ্চালক তাকে থামিয়ে বললেন আমাদের এখন একটা বিজ্ঞাপনের বিরতি নিতে হবে। আলোচক হয়তো বলছেন, আমি বাক্যটা শেষ করি। সঞ্চালক ভীষণ বিনয়ী। না; এখন আমাকে বিরতিতে যেতেই হবে। ফিরে এসে আপনাকে আবার বলতে দেব। বিরতির সময় দর্শক হয়তো রিমোর্ট ঘুরাতে ঘুরাতে তার পছন্দের অন্য কোন চ্যানেলে চলে গেছেন। অসম্পূর্ণ বাক্য তার আর শোনা হলো না। দর্শকদের এমন ধৈর্যচ্যুতির জন্য তো টেলিভিশনের কৃর্তপক্ষ দায়ী হতে পারে না। কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে বিজ্ঞাপন দেখার পর আবার টক শো শুনছিলেন তারা কি সম্পূর্ণ বাক্যটি শুনতে পেরেছেন? বিরতির পর পূর্বের বক্তাকেই সঞ্চালক বলতে দিলেন। তবে শুরু করলেন এভাবে বিরতির মধ্যে আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলাম বলে নতুন আর একটা বিষয়ের অবতারণা করে পূর্বের বক্তাকে সে সম্পর্কে কিছু বলতে বললেন। আগেই বলেছি তেমনটা সব চ্যানেলে হচ্ছে তা নয়। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের সব টেলিভিশনের সংবাদ অত্যন্ত আগ্রহভাবে দর্শকরা শোনেন ও দেখেন। আবার এক সময় টেলিভিশন ও রেডিওতে বাংলা ইংরাজি খিচুড়ি করে উপস্থাপন করা হতো। তখন এই দর্শকদের এগিয়ে আসতে হয়েছিল তা রোধ করতে। বাংলাদেশের টেলিভিশনের বর্তমানে বিদেশি বাংলা অনুষ্ঠান, দর্শকদের চাহিদার সঙ্গে ইয়াবা সেবনের নেশা নিয়ে বন্ধুটি অনেক কথাই বলল। বিস্তারিত না গিয়ে বন্ধুটির বলা কয়েকটি অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করব।

আমার বন্ধুটি চলচ্চিত্র নিয়ে বেশ পড়াশোনা করে। ছবি দেখে অজস্র। সে বলল, তোর মনে আছে, ‘সুলতান সোলাইমান’ নামে একটা সিরিয়াল টেলিভিশনের দেখানো হতো। আমি সেটা দেখতাম। হঠাৎই মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেল। প্রাথমিকভাবে জানা গেল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পুনরায় প্রদর্শন শুরুর দাবি উঠল। দেখানো, শুরু ও শেষ হলো আবার। জানি না দর্শকরা কেন ছবিটি দেখার আগ্রহ দেখিয়েছে। আমার কাছে ছবিটির ঐতিহাসিক পটভূমি, সিনেমার সেট, অভিনয়, বাংলায় ডাবিং, পরিচালনা অত্যন্ত উঁচুমানের মনে হয়েছে। ছবিটি নিয়ে ভিন্ন মত ও সমালোচনা থাকতেই পারে। তা বলে তা দেখানো বন্ধ করে দিতে হবে সে কেমন কথা? তবে দর্শকদের চাহিদার প্রেক্ষিতে ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে, বিদেশি চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন প্রচার করা আইনের লঙ্ঘন নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে বিদেশি মডেল দিয়ে বিজ্ঞাপন নির্মাণ, বিদেশ থেকে বিজ্ঞাপন তৈরি করে এনে তা এদেশে প্রচারÑ এগুলো সঠিক কাজ হচ্ছে কি নাÑ তা ক্ষতিয়ে দেখা হবে। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রসারের এসব নিয়মকানুন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। বিজ্ঞাপন নিয়ে নতুন নতুন আরও আইনকানুনের প্রয়োজন আছে কি না, বিশ্বের আর সব দেশে কী করা হয়, তা এ ব্যাপারে পারদর্শীরা বলতে পারবেন। আমরা আমজনতা এসবের কী বা বুঝব? আমরা নিশ্চয় চাই বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রসারে শৃঙ্খলা এনে আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হউক। কিন্তু তা বলে দর্শকদের চাহিদা ও বিদেশি চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠানকে ঢালাওভাবে অবমূল্যায়ন করে টক শোর কচকচানি নিয়ে নিশ্চুপ থাকব তা তো হতে পারে না। বন্ধুটি বেশ উত্তেজিত।

একটু দম নিয়ে বন্ধুটি আবার শুরু করল। ইদানীং আমি সোম থেকে শনিবার এই ছয় দিন রাত ৯টার মধ্যে বাড়ি ফিরি। বাসার সবাই এজন্য খুব খুশি। এই দিনগুলোতে একটি বিদেশি বাংলা চ্যানেলে সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনী নিয়ে করা ‘নেতাজি’ নামে একটি সিরিয়াল দেখাচ্ছে। বাসার সবাই আমরা একসঙ্গে বসে সিরিয়ালটি দেখি। দর্শকদের মধ্যে ৮/৯ বছর থেকে শুরু করে সত্তর বছর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের সদস্য আছে। তাদের জন্য একটাই অসুবিধা অনুষ্ঠানটি চলাকালে কথাবার্তা বলা নিষেধ।

তারপর বলল, নেতাজি সিরিয়ালটি আমার মনে কীভাবে দাগ কেটে বসে যাচ্ছেÑ তা তোকে শুনতে হবে। সিরিয়ালটিতে সুভাষ এখনও ১০/১১ বছরের বালক। সময়টা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক। ভারতজুড়ে ব্রিটিশ শাসন চলছে। বাংলা ভাষা, বাঙালিদের প্রতি ইংরেজদের অবজ্ঞা-ঘৃণা, স্বদেশি আন্দোলন গড়ে ওঠা, স্বদেশিদের প্রতি ইংরেজ শাসকদের বিদ্বেষ, অত্যাচার অধিকার আদায়ে স্বদেশিরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এসব ঘটনা দেখানো হচ্ছে। তারই মধ্যে হিন্দু-মুসলমান মিলনের ডাক দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধনের গানের মাধ্যমে। দেশের এমন অবস্থায় ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শুরু করে বেড়ে উঠছে সুভাষ চন্দ্র বসু। বাংলা-বাঙালি বা ভারতবাসীর প্রতি ইংরেজদের যে কোন অবজ্ঞা-অবিচার তাকে দুঃখ দেয়। সাধ্যমতো প্রতিবাদ করে ছোট্ট শিশুটি। ব্রিটিশ রাজ্যের একজন ইংরেজ কর্মকর্তার পুত্র নানা কূটকৌশল, মিথ্যার আশ্রয় নিয়েও অধ্যবসায়ী, দৃঢ়চেতা, প্রতিবাদী কিন্তু বিনয়ী সুভাষকে খেলাধুলা, পড়াশোনা, সাধারণ জ্ঞান-স্কুলের কোন প্রতিযোগিতায় পরাজিত করতে পারে না। সুভাষ চন্দ্র বসুর পরিবারকে প্রধান করে সিরিয়ালে এমন সব চরিত্র ও পরিবার ঘটনা আসতে শুরু করেছে যে দর্শক যেন ১১০/১১৫ বছর আগের সময়ে চলে গেছে। আমরা দেখতে পাই- কবি, নাট্যকার, গীতিকার দ্বিজেন্দ্রনাল রায়, সুভাস বসুদের বাসায় আসেন। সেই অল্প বয়সে তার লেখা, তার মুখে সুভাষ শুনে স্বদেশি গান, “বঙ্গ আমার! জননী আমার!/ধাত্রী আমার! আমার দেশ/ কেন গো মা তোর শুষ্ক নয়ন,? কেন গো মা তোর রুক্ষ কেশ!/ কেন গো মা তোর দুলায় আসন,/ কেন গো মার তোর মলিন বেশ!/ সপ্ত কোটি সন্তান যার/ডাকে উচ্ছে আমার দেশ/” স্বদেশি মেলায় সুভাষ দেখা পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সেখানে তিনি সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছেন। “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির, হলে জননী!/ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আখি না ফিরে!” আর একটি ঘটনা। স্বদেশিরা সব সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে বিদেশি, কাপড় বর্জন করার জন্য এক মাঠে মিলিত হন। ঘটনাক্রমে সেখানে সুভাষ উপস্থিত হয়। সেখানে রাখি বন্ধনে তার হাতেও রাখি পরিয়ে দেয়া হয়। সবার মিলিত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আর একটি গান শোনে সুভাষ, “এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, ‘জয় মা’ বলে ভাসা তরী ॥/ ওরে রে, ওরে মাঝি, কোথায় মাঝি, প্রাণপণে, ভাই, ডাক দে আজি-/ তোরা সবাই মিলে বৈঠা নেরে, খুলে ফেল সব দড়াদড়ি ॥” এসব গণজাগরণমূলক গান শিশু সুভাষকে প্রচন্ডভাবে উদ্দীপিত করে। বন্ধুটির কথা যেন শেষ হয় না। এক সময় সে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠল। জানিস এই সিরিয়ালে ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির নির্দেশ জানার পর ছোট্ট সুভাষের অভিনয় দেখে এবং সংলাপ শুনে আমি চোখের পানি রাখতে পারিনি। সে রাতে আমি খেতে পারিনি। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে বোমা মারতে গিয়ে অন্য ইংরেজের মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে ক্ষুদিরামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ খবর সুভাষ সংবাদপত্রে দেখেছে। তার বিচার হচ্ছে। ক্ষুদিরামের বয়স কম। সহজ-সরল সুভাষ ভাবে কারাগারে তো ক্ষুদিরামকে অনেক দিন থাকতে হবে। সুভাষকে একদিন না দেখতে পেলে তো তার মায়ের খুব কষ্ট হয়। ক্ষুদিরামের মায়ের নিশ্চয় খুব কষ্ট হচ্ছে। সে জানে না ক্ষুদিরামের মা নেই। অল্প বয়সে সে বাবা-মাকে হারিয়েছে। দিদি (জ্যেষ্ঠ বোন)

মায়ের স্নেহ-আদর দিয়ে তাকে লালন-পালন করেছে। বিচারে ক্ষুদিরামের ফাঁসির নির্দেশ সংবাদপত্রে দেখার পর কাগজটা বুকে নিয়ে সুভাষ স্বদেশিদের সহায়তাকারী আর একজন মহিয়সী নারী- তার অনু মাসির কাছে জানতে চাইল ফাঁসি কেমন শাস্তি। সে স্বচক্ষে দেখেছে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের গ্রেফতারের প্রতিবাদ করার জন্য এই কিংসফোর্ডের নির্দেশে একজন কিশোরকে কোর্টের সামনে উন্মুক্ত স্থানে পুলিশ কীভাবে লাঠিপেটা করেছিল। কী ভীষণ শাস্তি, সেটা। তাই সে অনু মাসিকে জিজ্ঞেস করল, লাঠি-পেটার চাইতেও কি কঠিন শাস্তি ফাঁসি। যখন শুনল ফাঁসি ক্ষুদিরামের জীবন কেড়ে নেবে তখন ছোট্ট সুভাষের অভিনয়সহ পুরো পরিবেশ এমন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল যে-সবই যে অভিনয় তা মনে হয়নি। মনে হয়েছে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্টে চলে গিয়েছি। ওইদিন ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকরি করা হয়। এভাবেই এই সিরিয়ালটিতে সুভাষ বসুর আত্ম-জাগরণ ঘটার পটভূমি তুলে ধরা হচ্ছে। ইতিহাসাশ্রিত এ সিয়ালটি দেখার নেশা আমাকে পেয়ে বসেছে। আরও কোন দর্শকের মধ্যে এ নেশা ছড়িয়ে পড়া দোষের কিছু বলে মনে হয় না।

বন্ধুটি চুপ করাতে আমি ভাবলাম তার কথা শেষ হয়েছে। কিন্তু না সে আবার শুরু করল, শতাব্দী পূর্ব ঘটনা নিয়ে করা এসব সিরিয়ালের মূল্য ও আকর্ষণ অবশ্যই আছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক দর্শকের চাহিদা হলো বর্তমান সময়ের জন্য উপভোগ্য, আনন্দদায়ক মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান দেখা।

ভারতীয় একটি বাংলা চ্যানেলে সপ্তাহে দু’দিন রাত ১০টা থেকে ১১-৩০ মিনিট পর্যন্ত গানের প্রতিযোগিতা পরিবেশন করা হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে এই অনুষ্ঠানটি পরিবেশিত হয়ে আসছে। যারা গান জানেন, গানের চর্চা করেন, সংগীত নিয়ে গবেষণা করেন তারা নিশ্চয় এই অনুষ্ঠানের মানও অন্যান্য দিক নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা করতে পারেন। আমরা যারা গান শুনতে অনুষ্ঠান দেখতে ভালোবাসি, তাদের কাছে এটি একটি নির্দোষ আনন্দদায়ক মনোরম অনুষ্ঠান। তবে আমাদের চোখেও এই অনুষ্ঠানের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে সংগীত প্রতিযোগিতার এ অনুষ্ঠান পরিবেশিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিযোগীরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকেন। প্রতিযোগী নয় এমন বাংলাদেশের সংগীত দল বা একক সংগীতশিল্পীর সংগীতও কখনও কখনও আমরা এই মঞ্চে পরিবেশন করতে দেখি। প্রতি বছরই এই অনুষ্ঠানে আসে নানা বৈচিত্র্য। অনুষ্ঠানে বাংলা-হিন্দি ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের ভাষার গানও পরিবেশিত হয়। তবে বাংলা সংগীতের সব ধরনের গান কম/বেশি প্রতিযোগীদের গাইতে হয়। রবীন্দ্র-নজরুল থেকে শুরু করে আধুনিক দেশাত্মবোধক, রাগপ্রধান আধ্যাত্মিক, রক, বাউল, লালন, কোন সংগীতই বাদ পড়ে না। এই অনুষ্ঠানে অনেক গানের ও বাদযন্ত্রের শিল্পী, গানের দলকে বিভিন্ন স্থান এমন কী প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চল থেকে তুলে এনে প্রতিষ্ঠা লাভে সহায়তা দেয়। আমরা দেখেছি বিগত কোন এক বছরে সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার ধলগ্রামে জন্মগ্রহণকারী বাউল শাহ আবদুল করিমকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এই অনুষ্ঠানে। আমাদের বহুবার শোনা গানগুলো এ অনুষ্ঠানে তার স্বকীয়তা বজায় রেখে নবনব রূপে উপস্থাপিত করা হয়। বিশাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে শ শ বাদ্যযন্ত্রীদের বাজনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান গাচ্ছেন প্রতিযোগীরা। কখনওবা বিরাট এক কোরাম গাওয়ার দলের সঙ্গে গলা মেলাতে হচ্ছে। ভাবলে অবাক লাগে অত্যন্ত বিজ্ঞ বিচারকও অকপটে স্বীকার করছেন, এ মঞ্চে এমনও বাদ্যযন্ত্র বাজানো হচ্ছে যার নাম তিনি জানেন না। যন্ত্রীকে আর একবার বাজিয়ে শোনানোর জন্য অনুরোধ করেন। এই অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতা হয় বটে- কিন্তু তারও চাইতে বেশিকিছু হয়। প্রতিযোগীরা পরস্পরের বন্ধু। একে-অন্যকে সাহায্য করতে সর্বদা আগ্রহী। প্রকৃতই তারা প্রতিযোগী-প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এই অনুষ্ঠানে বিচারকগণ শুধু ১ম, ২য়, ৩য়কে বাছাই করেন না। কেন একজন কম নাম্বার পেলেন, কোন ত্রুটিগুলো থেকে মুক্ত হলে তার গান ভালো হবে, কীভাবে চর্চা করতে হবে ইত্যাদি শিখিয়ে দেন। এক কথায় গানের মান ও উৎকর্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য বিচারক ও প্রতিযোগীদের প্রস্তুতকারীগণ এমনভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন যে উৎকর্ষতার মাত্রা, সূক্ষ্মমান ও বৈচিত্র্যের বিচারে অনুষ্ঠান শুরুর দিনের প্রতিযোগী এবং অনুষ্ঠান থেকে বিদায় নেয়ার দিনের প্রতিযোগী যেন দুই ব্যক্তি বা গায়ক হয়ে ওঠেন। বিদায়ী প্রতিযোগী নবরূপ নিয়ে অনেক উন্নতমানের গায়কে পরিণত হন। বন্ধুটি বলল, এই অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্যের একটা উদাহরণ দিয়ে আমি আমার উপসংহার টানব।

ফেব্রুয়ারি মাস। আমাদের ভাষা আন্দোলনের মাস। বাংলাদেশের একজন প্রতিযোগী মঞ্চে উঠলেন। তিনি গাইলেন আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙনো একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি। এই গানে মঞ্চসজ্জা, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ও গায়কের পরিবেশন এক নতুন মাত্রা ছিল। আমরা তো এই গানের প্রথম ছয় লাইন শুনে থাকি। প্রতিযোগী সম্পূর্ণ গানটি পরিবেশন করলেন। প্রথম অংশ গাওয়ার পর গায়ক ধরলেন, ‘জাগো নাগিনীরা জাগো, জাগো কালবোশেখীরা/শিশু হত্যার বিক্ষোভ আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,/দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবি/দিন বদলের ক্রান্তি লগনে তবু তোরা পার পারি?/” এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় গান যত এগোতে থাকে দর্শকের শরীরে তা যেমন কাঁটা দেয় তেমনি প্রতিবাদী হতে তাকে উদ্দীপিত করে। গান শেষে বিচারকগণ কিছুক্ষণ নীরব থেকে, কেউবা চোখের পানি মুছে তাদের অনুভূতির কথা জানালেন।

বিদেশি চ্যানেলে প্রচারিত এই অনুষ্ঠানটিও আমার মাঝে নেশা ধরায়। আলাপে জেনেছি, আমার মতো দর্শক আরও আছে। তাই আবারও বলছি, বিজ্ঞাপন প্রচারের আইন ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে প্রয়োগ করুন। কিন্তু অনুষ্ঠানের মানের বিষয়ে কোন মন্তব্য করার আগে একটু চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে। নিম্নমানের ক্ষতিকর কোন অনুষ্ঠান পরিবেশিত হলে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিন। মনে রাখা প্রয়োজন, ভালো মানের অনুষ্ঠান পরিবেশনা অর্থ উপার্জনের সহায়ক। কিন্তু অর্থ উপার্জন করতে পারলেই ভালো মানের অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

১৩.০৪.২০১৯