• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ মহররম ১৪৪২, ১১ আশ্বিন ১৪২৭

জাতির পিতার স্বাস্থ্য ভাবনা এবং বর্তমান সরকার

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ

| ঢাকা , রোববার, ১৫ মার্চ ২০২০

বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিলো ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। অতীতে সেটা ছিলো গোপালগঞ্জ মহকুমা। সূদুর অতীতকাল থেকেই গোপালগঞ্জ জেলা মাছের জন্য বিখ্যাত ছিলো। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির আশপাশে প্রচুর বিল ছিলো। সেই সব বিলে পাওয়া যেতো প্রচুর মাছ; যার ফলে বঙ্গবন্ধুর খাওয়া-দাওয়া ছিলো যথেষ্ট পুষ্টিকর। এ কারণেই বোধ হয় বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলায় তেমন কোন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা হয়নি। তবে বঙ্গবন্ধু ১৪ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হন। বেরিবেরি রোগটা মূলত ভিটামিন বি ওয়ান ঘাটতিজনিত রোগ। বেরিবেরি তখন মহামারী আকারে ধারণ করেছিলো, কারণ তখন খাবারে ভিটামিন বি ওয়ান এর ঘাটতি ছিলো। তবে রোগীকে যদি আবার বি ওয়ান সমৃদ্ধ খাবার দেয়া হয় তবে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধু কিছু দিন এ রোগে ভোগার পর বি ওয়ান সমৃদ্ধ খাবারের মাধ্যমে রোগ থেকে মুক্তি পান।

বঙ্গবন্ধুর যখন বয়স ৩০ বা ৩৫ তখন তার চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ে। গ্লুকোমা হলে চোখের প্রেসার বেড়ে যায়।বঙ্গবন্ধুর গ্লুকোমা প্রাথমিকভাবেই ধরা পড়ে। বঙ্গবন্ধু কালো মোটা চশমা পরতেন। কাকতালীয়ভাবে বর্তমানে আমি যেখানে প্র্যাকটিস করি অপটিকস ম্যান বঙ্গবন্ধু এভিনিউ বঙ্গবন্ধুর সব চশমা ওখান থেকে নিতেন। বঙ্গবন্ধুর গ্লুকোমা চিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতা যান, পরে দেশে ফিরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. টি আহমেদের কাছে চিকিৎসা নেন।

চিকিৎসার জন্য কলকাতা যাওয়ার এ ঘটনা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য এক ধরনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। দেশের মানুষের জন্য কিভাবে চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত ও সহজলভ্য করা যায় এ ভাবনা জীবনের শেষপর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। স্বাধীনতার পর দেশ পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপ। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ। বাজেট কম, তারপর ও বঙ্গবন্ধু আরও নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

মেডিকেল আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার মাধ্যমে দেশের ডাক্তার সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা চালান। এফআরসিএস শেষ করা বহু ডাক্তার বিদেশ ছিলো তাদের দেশে ডেকে আনেন। তখন স্বদেশে তারা চিকিৎসাসেবা শুরু করেন। সদ্যস্বাধীন দেশে যা যা করণীয় বঙ্গবন্ধু তাই করলেন শিক্ষা, সেবা, পুষ্টি, প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেস কার্যক্রমের জন্য আরসিএসবি’র মাধ্যমে ব্যবস্থা করেন। তিনি ইপিআই প্রোগ্রাম চালু করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করতে ১৯৭৩ সালে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে বিশেষ দিক নির্দেশনা দেন এবং অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে এ খাতে কিছু বাস্তববাদী পরিবর্তন আনতে দেশের স্বাস্থ্য খাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৯৭২-১৯৭৫ সময়কালে বঙ্গবন্ধু তাদের দ্রুত সুস্থতার জন্য আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু গুরুতর আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য হাজার হাজার আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পূর্ব জার্মানি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) ভারত, চেকোসে্লাভাকিয়া এবং ফ্রান্সে প্রেরণ করেছিলেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের ওষুধের বিশাল সংকট ছিল এবং এটি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ও তাদের ওষুধ বিনামূলে দেয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা ছিল। এরপর বঙ্গবন্ধু দেশের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানির জন্য বাংলাদেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন (টিসিবি) নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর আসল চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ যথাযথভাবে বিতরণের জন্য, আমদানি করা ওষুধ তাৎকালীন মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের কাঁধে হস্তান্তর করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ওষুধ উৎপাদনে পরিবর্তন এনেছিলেন। সর্বাধিক ওষুধ তখন কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা দ্বারা উৎপাদন করা হতো, যা ব্যয়বহুল ছিল এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা মানুষের পক্ষে সাশ্রয়ী ছিল না।

ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলোকে বহুজাতিক সংস্থার সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি ইনস্টিটিউট এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কোর্স চালু করেন।

দেশের চিকিৎসকদের চাকরি প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করেন। সে সময় তিনি ১৩৮টা হেলথ কমপ্লেক্স করতে পেরেছিলেন নিপসমের ওখানে আইপিএইচ ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথ, ইন্সটিউট অব নিউট্রিশিয়ান স্থাপন করেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি, স্বাস্থ্য প্রত্যেক মানুষের দোরগোড়ায় যেন পৌঁছে দেয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করলেন।

বঙ্গবন্ধু দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পুষ্টিনীতি প্রণয়ন করেন। গবেষণার জন্য বিএমআরসি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করার পদক্ষেপ নিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল বিএমডিসি প্রতিষ্ঠিত করলেন। জনবল তৈরির জন্য নার্স ডাক্তার সেবা মিডওয়াইফার তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন।

কলেরা হাসপাতাল আইসিডিডিআর’বি প্রতিষ্ঠা করলেন; আইডিসিএইচ হাসপাতাল তৈরি করেন। সারা দেশে তখন মাত্র ৬৭টি হাসপাতাল ছিলো। তিনি ৩৭৫টি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তৈরি করেন; যার শয্যাসংখ্যা ছিলো প্রতিটিতে ৩১টি।

স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর সরকারই প্রথম এ দেশের পল্লী অঞ্চলের সাধারণ মেহনতী মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে, চিকিৎসাসেবাকে থানা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালু করেন, চিকিৎসকদের সরকারি চাকরিতে সম্মান ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করেছিলেন; যা দেশের চিকিৎসক সমাজ চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। মেডিকেল উচ্চশিক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধু শাহবাগ হোটেলকে আইপিজিএমআরে উন্নীত করেন। ১৯৭২ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জারি (বিসিপিএস) প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধুর ‘জনগণের চিকিৎসা’ দর্শন এবং চিকিৎসা ভাবনার পথ ধরেই জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখছে বর্তমান সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বল্পতম সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার সরকার ১৩৩৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং গ্রামের জনসাধারণ তার সুবিধা ভোগ করছেন। তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি-৪ ও ৫ এর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হ্রাস করায় জাতিসংঘ পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। সমগ্র চিকিৎসক সমাজ এবং গোটা জাতি এ অর্জনকে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সাফল্য হিসেবে গৌরববোধ করছে।

স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকদের বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকায় দ্রুততার সাথে শূন্যপদগুলো পূরণের জন্য অ্যাডহকসহ বিসিএসের মাধ্যমে প্রায় ১৫০০০ সহকারী সার্জন নিয়োগ প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে জনস্বাস্থ্যের পক্ষে এই পদক্ষেপ নজিরবিহীন ঘটনা। উক্ত চিকিৎসকগণ গ্রামগঞ্জে দায়িত্বরত আছেন। এছাড়া ১২০০০ নার্স নিয়োগ, নার্সদের ২য় শ্রেণীর মর্যাদা দান করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে ডিপিসি এবং এসএসবি’র মাধ্যমে মেডিকেল শিক্ষক ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের পদসমূহে প্রায় ১০ হাজার পদে পদোন্নয়ন দেয়া হয়েছে।

সব উপজেলায় সরকারি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সুযোগ সুষ্টি করা হয়েছে। সব জেলা ও উপজেলা হাসপাতালসমূহে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। টেলিমেডিসিন সেন্টার চালু করার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমান সরকার পূর্বের চেয়ে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধি করেছে তবে বিএমএ’র দাবি মূল বাজেটের ১০% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি। অবশ্য ১৩৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করে হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার পদ সৃষ্টি করে তাদের নিয়োগ প্রদান করে চিকিৎসাকে জনগণের দ্বারে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সব সময়ই অগ্রাধিকার দেন। ইতোমধ্যে দেশে চারটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম চলছে এবং একটি খুলনায় বাস্তবায়নাধীন।

নার্সিং শিক্ষা গ্র্যাজুয়েট কোর্সসহ সম্প্রসারিত হয়েছে। মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শিক্ষক চিকিৎসক নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ও ওষুধ নীতি হালনাগাদ করা হয়েছে। অটিজম ও স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যার চিকিৎসা ও সচেতনতামূলক কর্মকা- বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতাল ও মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এখন প্রয়োজন স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১০%-এ উন্নীত করা এবং মান নিয়ন্ত্রণকে আরও জোরদার করা। বঙ্গবন্ধুকন্যা চারবার দেশ পরিচালনার মধ্য দিয়ে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও মেডিকেল শিক্ষায় প্রভুত উন্নতি করেছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অবশ্যই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন কোনো কঠিন বিষয় হবে না।

[লেখক : চেয়ারম্যান, কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগ, সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]