• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১

ছাত্র রাজনীতির সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে হবে

সংবাদ :
  • সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০১৯

ছাত্র রাজনীতিকে বলা হয় নেতৃত্ব তৈরির বাতিঘর। কিন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেশের বিশিষ্টজনরা ছাত্র রাজনীতি বন্ধ কিংবা গঠনমূলক পরিবর্তন করার বিষয়ে অনেক যুক্তিসঙ্গত পরামর্শ দিয়ে আসছেন। বর্তমানে বেশ কিছু আলোচিত নেতিবাচক ঘটনার প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষ শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যার পর সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশের সকল মানুষ আবরার হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবির পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের জোরালো আওয়াজ তুলেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দেশে চলমান বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং সর্বোপরি ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আওয়াজ তুলতে ছাত্র রাজনীতির কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে এবং আছে অনেক ঐতিহাসিক অর্জন। সেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ও সমন্বয় ঘটিয়ে গণআন্দোলনের মাধ্যমে তারা ইতিহাস সৃষ্টি করে। আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতির যেসব অর্জন আছে, তা বিশ্বের আর কোন দেশে নেই। বহির্বিশ্বের দিকে যদি তাকিয়ে দেখি, তাহলেও আমরা ছাত্রসমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখতে পাব। ১৯৪৮ সালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিপ্লবের মূলশক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। ‘জার’ আমলে রাশিয়ায় ছাত্ররাই বিভিন্ন বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা ঘটায়। এমনকি ১৯৫৫ সালে আর্জেন্টিনায়, ১৯৫৮ সালে ভেনিজুয়েলায়, ১৯৬০ সালে কোরিয়ায় ছাত্রসমাজ পালন করে ঐতিহাসিক ভূমিকা। ১৯৬৪ সালে ভিয়েতনাম ও বলিভিয়ার ক্ষেত্রেও জাতীয় সংকটে ছাত্রসমাজের অবদান ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হবে।

খুব হতাশা ও দুঃখ নিয়ে বলতে হয়, ছাত্র রাজনীতি তার গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। ছাত্রসমাজ অতীত ইতিহাস ভুলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। এক সময় ছাত্র রাজনীতি করা ছিল অতি গৌরবের। যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল, সমাজে তাদের আলাদা কদর ছিল। দেশের মানুষ জানতো, এই ছাত্র সমাজ নিজেদের স্বার্থ বলিদান দিয়ে দেশ ও দশের স্বার্থে রাজনীতি করে। বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। আমাদের ছাত্রসমাজের অধিকাংশই ছাত্র রাজনীতি বিমুখ। ছাত্র রাজনীতি যেন তাদের কাছে একটা জঞ্জাল ও আতঙ্কের নাম। ছাত্রনেতাদের ছাত্র ও শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ ভয় পায়। যারা ছাত্র রাজনীতি করে, তাদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্নভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে অনেকটাই জোরপূর্বক ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা হয়। আর যারা স্বেচ্ছায় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে, তাদের অধিকাংশই নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে নেতৃত্বে যাওয়া এবং কিছু ফায়দা হাসিল করা। যারা ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে। আমার দেখি, যখনই যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের ছাত্র সংগঠন সারা দেশজুড়ে বেপরোয়া হয়ে উঠে। তারা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা, খুন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে যায়। নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে দেশজুড়ে একটা অরাজকতা সৃষ্টি করে। তাদের কর্মকাণ্ডে মূল রাজনৈতিক দল পর্যন্ত বিব্রতজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে ছাত্র রাজনীতির সংজ্ঞা হচ্ছে, ‘ছাত্রদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা তোলা, এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করানো এবং সেই এজেন্ডার পক্ষে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করার জন্য পরিচালিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ছাত্র রাজনীতি বলা যায়।’ আর বর্তমান ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সংজ্ঞাটা হবে এমন, ‘জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় কোন রাজনৈতিক দলের ছাত্র শাখা হিসেবে ছাত্রদের মাঝে সেই দলের সমর্থন তৈরি করা, নেতৃত্ব তৈরি করা এবং সেই দলের স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করাকে ছাত্র রাজনীতি বলা যায়।’

বুয়েট হচ্ছে বাংলাদেশের একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। সেখানে দেশের সকল মেধাবী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। তারা আমাদের দেশের মহামূল্যবান সম্পদ। তারা দেশকে সমৃদ্ধ করতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের সমাজে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের বিশেষ নজরে দেখা হয়। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সমাজের মানুষ আলাদাভাবে সম্মান ও সমীহ করে। আমাদের সমাজের মানুষের ধারণা, তাদের সম্ভব লেখাপড়া করা ছাড়া অন্য কোন কিছুতে সময় ব্যয় করার মতো বিন্দু পরিমাণ সময় নেই। তারা সারাদিন লেখাপড়া ও বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সেই বুয়েটের শিক্ষার্থীরাও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে। তাদের কেউ কেউ লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি মেধা ব্যয় করে। তাই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই বুয়েটে বিভিন্ন সময় মারামারি ও অস্ত্রের ঝনঝনানির আওয়াজ উঠে। আর এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন মতপ্রকাশের কারণে পিটিয়ে মেধাবী ছাত্র আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। যারা আবরারকে হত্যা করেছে, তারাও কিন্তু বুয়েটের ছাত্র, তারাও মেধাবী। তবে এরা বিবেক বিবর্জিত মনুষ্যত্বহীন মেধাবী ছাত্র। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে এমন একটি ঘৃণ্য ঘটনার জন্ম দিল। হীন রাজনৈতিক চর্চায় এখানে শুধু আমরা আবরারকে হারাইনি, হারাচ্ছি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীদের। যারা লেখাপড়াকে প্রাধান্য না দিয়ে রাজনীতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সচেতন। অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই দিনরাত কাজ করে। নিজ মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কাউকে কোন কিছু বলতে দেয়া যাবে না। নিজের মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বললেই ডাইরেক্ট অ্যাকশন। এই দৃশ্য শুধুমাত্র বুয়েটে নয়, সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই অবস্থা। এই দোষে শুধু ছাত্রলীগ দোষী নয়, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রদল একই কাজ করেছে। এই দুটি ছাত্র সংগঠনের চরিত্র অনেকাংশেই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

আমাদের দেশের অনেক বর্ষীয়ান সাবেক ছাত্রনেতাদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা সময়ের দাবি। ছাত্র রাজনীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ থাকবে এবং প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হতে হবে। তাহলেই সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি ফিরে আসবে এবং সারা দেশ থেকেই অসংখ্য যোগ্যতা সম্পন্ন ছাত্রনেতা বের হবে। যারা শিক্ষাজীবন শেষ করে পরবর্তী সময়ে দেশের মূল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই, ছাত্র রাজনীতি বলতে গেলে সম্পূর্ণরূপে লেজুড়ভিত্তিক। মূল রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই এদের মূল কাজ। লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলো নিজ মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের পক্ষে রাজপথ সরগরম করে রাখা একপাল লাঠিয়াল বাহিনী। ছাত্র রাজনীতি হবে ছাত্রদের নিয়ে এবং সেটা হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক। তাহলে কেন অধিকাংশ অছাত্রদের নিয়ে মহানগর, জেলা, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি? কেন এসব কমিটি? এই কমিটিগুলোর কাজ কী? এই কমিটিগুলো সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ রক্ষায় কী ভূমিকা পালন করে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর সবারই জানা আছে। ছাত্র সংগঠনের নামে দেশের তরুণ ছাত্রসমাজকে ব্যবহার করে সারা দেশে মূল রাজনৈতিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার করতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে এত সব কমিটি করা হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব ছাত্র সংগঠনের কমিটির নেতৃত্বে আসতে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এটাকে বলা হয় ইনভেস্টমেন্ট এবং নেতৃত্বে আসলে ইনভেস্টমেন্টের শতগুণ অর্থ বিভিন্নভাবে তুলে নেয়া নাকি সম্ভব হয়। সে জন্যই দেখা যায়, অধিকাংশ ছাত্রনেতা অল্প দিনের ব্যবধানে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়।

দলের স্বার্থকে ঊর্ধ্বে রেখে দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মূল রাজনৈতিক দলগুলোর এখন ছাত্র রাজনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে। ছাত্র রাজনীতি যেভাবে কলুষিত হয়েছে, সেটা অত্যন্ত ভয়াবহ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সব রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে সব দল মিলে আলোচনা করে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতিতে একটি গঠনমূলক পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা চাই না প্রতিহিংসামূলক ছাত্র রাজনীতি। আমরা দেখতে চাই ছাত্রসমাজের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি। যারা ছাত্রদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দেশ ও দশের স্বার্থে গঠনমূলক রাজনীতি করবে। আমরা আর চাই না- রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে যেন আর কোন মেধাবী আবরারের প্রাণ দিতে হয়। আমরা আবরার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করি। তবে আফসোস করে বলতে হয়, অপরাধীরাও যে বখে যাওয়া মেধাবী সন্তান। তাই প্রতিহিংসার রাজনীতির বিষবাষ্পে যে ছাত্রসমাজ বখে গেছে, তাদের উদ্দেশে এটাই প্রত্যাশা- ‘আবার তোরা মানুষ হ’।

[লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট]

  • মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে ‘গণহত্যা অস্বীকার আইন’ চাই

    ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘটানো গণহত্যাকাণ্ডের দিনটি জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাধীনতার প্রায় ৪৬ বছর পর গত ১৮ মার্চ ১০ম জাতীয় সংসদের সমাপনী দিনে এ স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন ‘গণহত্যা অস্বীকার