• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

চাঁদ তুমি ফিরে যাও

ফারুক ওয়াহিদ

| ঢাকা , শনিবার, ২৩ মে ২০২০

‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও, রুপালি আঁচল রাখবে কোথায় বলো! মুক্তিতে হাসি ফুটবে যেদিন, সেদিন এসো খুশির চাঁদ’- হ্যাঁ, একাত্তরে শাওয়ালের অশ্রুসিক্ত বেদনার্ত ঈদের নীল বাঁকা চাঁদকে এভাবেই ফিরে যেতে বলেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী কণ্ঠযোদ্ধা রূপা ফরহাদ। চাঁদ রাতে এবং ঈদুল ফিতরের দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সারাদিন ধরে বেজে উঠেছিল অত্যন্ত আবেগময় অশ্রুসিক্ত এ গানটি। বিপরীতে সব কিছু স্বাভাবিক দেখাতে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা থেকেও পাল্টাপাল্টি বারে বারে প্রচারিত হচ্ছিল কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি।

সেই অগ্রহায়ণে হেমন্তের ঈদুল ফিতরের কান্নার দিনটি ছিল ১৯৭১-এর ২০ নভেম্বর শনিবার- পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচার আর নিপীড়নে বিপর্যস্ত সারা বাংলা। স্বাধীনতার জন্যে পাকিস্তানিদের সঙ্গে লড়াই করছে বীর বাঙালি- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস, আল মুজাহিদ বাহিনী বাঙালির ওপর চালিয়ে যাচ্ছিল নির্মম নির্যাতন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বর্ষপঞ্জির স্বাভাবিক নিয়মে বাঙালির জীবনে একটি অনাকাক্সিক্ষত অপ্রত্যাশিত ঈদ চলে এসেছিল- যে ঈদের চাঁদ ছিল বেদনার্ত নীল রংয়ের- এরকম বেদনার্ত ঈদের চাঁদ বাংলার মানুষ আগে কখনও দেখেনি।

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের বেদনার্ত ঈদের স্মৃতিচারণ করে স্বাধীন বাংলাদেশে আজ ২০২০ সালে আবার কেন অশ্রুঝরা বেদনার্ত নীল রংয়ের ঈদের চাঁদ ফিরে এলো? আবার কেন অশ্রুঝরা ঈদ এলো? যদিও ১৯৭১ সাল আর ২০২০ সালের প্রেক্ষাপট দুটি ভিন্ন- তারপরও একাত্তরের মতো অশ্রুসিক্ত নয়নে আবার কেন বলতে হচ্ছে- ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’!

২০২০-এ এসে বিশ্ববাসী তথা সারা বাংলা করোনাভাইরাস সংক্রমণে বিপর্যস্ত- দেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শাওয়ালের আবারও বেদনার্ত ঈদের নীল বাঁকা চাঁদ রাতে বা ঈদের দিন কি মিডিয়ায় তথা বেতার-টিভিতে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি বাজানো হবে? বেদনার্ত ঈদেও খুশির ঈদের গান বাজিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেক কি একবারও কাঁপবে না? তাহলে কি আমরা ধরে নেব একাত্তরের ঈদের মতো ‘রেডিও পাকিস্তান ঢাকা’ থেকে খুশির ঈদের চাঁদের গান এখনও বাজছে?

একাত্তরের মতো ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত বেদনার্ত ঈদের সেই গানটি কি এবার অর্থাৎ ২০২০-এর চাঁদ রাতে ও ঈদের দিন বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস মিডিয়াতে বাজানো যায় না?- ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও, রুপালি আঁচল রাখবে কোথায় বলো! মুক্তিতে হাসি ফুটবে যেদিন, সেদিন এসো খুশির চাঁদ’।

গতবারও (২০১৯) হাজার কোটি টাকার খুশির ঈদ উৎসবে মেতে উঠেছিল বাংলাদেশ- এতে আমি অত্যন্ত আনন্দে আপ্লুত এই ভেবে যে, আজ যদি দেশ স্বাধীন না হতো তাহলে কি এটা সম্ভব হতো? তবে আরও আনন্দিত হতাম যদি আমরা এ ঈদের আনন্দ ষোলো কোটি লোক সবাই ভাগ করে নিতাম। স্বাধীনতার সুফল বা ঈদের আনন্দ কেউ একচেটিয়া ভোগ করুক বা লুফে নিক এটাতো হতে পারে না- এর জন্যতো আমরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করিনি। ভবিষ্যতে ‘মুক্তিতে হাসি ফুটবে যেদিন, সেদিন এসো খুশির চাঁদ’ সেইদিন যেন আমরা ঈদের আনন্দ এই দুঃখিনী বাংলায় সবাই ভাগ করে নিতে পারি- সেদিনের অপেক্ষায় এখনও বেঁচে আছি। তাই একাত্তরের বেদনার্ত ঈদের মতো ২০২০ সালে এসে আবারও বলব- ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও, মুক্তিতে হাসি ফুটবে যেদিন, সেদিন এসো খুশির চাঁদ।’

[ লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ]