• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৩ মে ২০২০, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ রমজান ১৪৪১

চা শিল্পাঞ্চলে ‘ফাগুয়া’ উৎসব

ইসমাইল মাহমুদ

| ঢাকা , বুধবার, ১১ মার্চ ২০২০

হোলি বা দোল হলো এক সামাজিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কেউ এ অনুষ্ঠানকে হোলি, কেউ দোল আবার কেউবা দোলযাত্রা বলে থাকেন। যে যে নামেই অভিহিত করুক না কেন এটি যেন বাঙালির এক সার্বজনিন উৎসব। বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে কৃষ্ণলীলার একটি প্রধান উৎসব দোলযাত্রা। মূলত সূর্য বা বিষ্ণুলীলার প্রতীক এ উৎসব। তবে ইতিহাসবিদদের মতে রাধা-কৃষ্ণের দোলনায় দোলা বা দোলায় গমন করা থেকেই ‘দোল’ শব্দটির উৎপত্তি। এ উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রীতির উৎসব, প্রেমের উৎসব। চা শিল্পাঞ্চলে এ অনুষ্ঠানটি ‘ফাগুয়া’ উৎসব হিসেবে পরিগণিত। চা শ্রমিকরা তাদের ভাষায় এ উৎসবকে ‘ফাগুয়া’ বলে থাকে।

প্রতি বছর বসন্তে দোল পূর্ণিমার মধ্যরাতে চা শিল্পাঞ্চলে কর্মরত দুই লক্ষাধিক চা শ্রমিক আলো জ্বালিয়ে দোল পূর্ণিমাকে আড়ম্বরে বরণ করে থাকেন। পূর্ণিমার দিনে চা শ্রমিকরা কাদা গায়ে মাখামাখি করে বিচিত্র খেলায় মেতে ওঠেন। পূর্ণিমার পরের দিন হতে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ আবির বা রঙ নিয়ে শুরু হয় রঙ খেলা উৎসব। চা শ্রমিকরা দলে-দলে আবির ও বৈচিত্র্যময় রঙ হাতে বা বোতলে ভরে গায়ে ছোড়া-ছুড়ি করে। প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত চা শিল্পাঞ্চলে চলে তাদের ফাগুয়া উৎসব।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক আদিবাসী ফোরামের সভাপতি পরিমল সিং বাড়াইক জানান, বাংলাদেশের চা-বাগানের শতকরা ৯৮ ভাগ শ্রমিক সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ (উৎসব)’। অর্থাৎ সারা বছরের প্রতি মাসেই একটা না একটা উৎসব লেগেই থাকে। এর কোন ব্যতিক্রম হয় না চা-বাগানগুলোতেও। চা-শ্রমিকরা ছোট-বড় সব পূজা পালন করেন যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে। শারদীয় দুর্গোৎসব হিন্দুদের বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি প্রধান উৎসব। শারদীয় দুর্গোৎসবের পরে আসে কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, জন্মাষ্টমী, ব্রহ্ম তারকযজ্ঞ ও নামযজ্ঞ। চা-শ্রমিকেরাও এই পূজাগুলো অতি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে থাকে। তবে চা-বাগানে তিন-চার দিনব্যাপী রঙে রঙে রাঙিয়ে রঙ খেলা বা ফাগুয়া অর্থাৎ হলি উৎসব পালন করা হয় চা শিল্পাঞ্চলের প্রতিটি চা-বাগানে। এ উৎসবটি চা শ্রমিকদের মন রাঙিয়ে দেয়। বাংলা ফাল্গুন মাস থেকে চা-বাগানে চলে এসেছে ফাগু বা ফাগুয়া উৎসব। ফাল্গুন পূর্ণিমায় হিন্দুধর্মীয় চা-শ্রমিকেরা তিন-চার দিনের রঙ মাখামাখি, রঙ ছোড়াছুড়ি করে। ফাগু বা ফাগুয়া উৎসবের সময় পুরো চা-বাগান এলাকা নানা রঙে রঙিন হয়ে যায়। চিরসবুজ চা-বাগানে লাল, নীল, হলুদ, কালো, সবুজ নানা রঙের ছড়াছড়ি। এ সময় চা-বাগান এলাকায় পরিচিতজন অন্য ধর্মের হলেও তার গায়ে সামান্য হলেও রঙ মাখতে হবে। চা-শ্রমিকেরা এখন ফাগুয়া পালন এমনভাবে করছে যে এটাকে চা-শ্রমিকদের প্রধান উৎসব বলা চলে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরি বলেন, ‘চা শিল্পাঞ্চলে দোলের দিন সকালে পরিবারিক গৃহদেবতার ফুলদোল দিয়ে শুরু হয় দোল উৎসব। এরপর নানা রঙের আবির দিয়ে পরিবারের সদস্যদের রাঙানোর খেলায় মেতে ওঠেন চা শ্রমিকরা। বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চলে চলতি বছরের ১৩ মার্চ বিশাল আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে এবারের ফাগুয়া উৎসব। এর আগে ৯ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে এ উৎসবের আয়োজনমালা। উৎসবের প্রথম দিনটি আবিরের দিন হিসেবে পরিচিত। এ দিনে চা শ্রমিকরা শুকনো রঙ দিয়ে একে অপরকে রাঙিয়ে দেয়। পরের দিন বাগানে বাগানে শুরু হয় রাধা-কৃষ্ণের কীর্তন। পুরো বাগানের চা শ্রমিক নারী-পুরুষ কীর্তনে যোগ দেন। পরের দিনও অনুষ্ঠিত হয় রঙ খেলা। চা শিল্পাঞ্চলের সব চা বাগানের চা শ্রমিকরা রঙ খেলার উৎসবে মেতে উঠার আনন্দ-উল্লাসে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। তাদের কাছে এ এক অপূর্ব আনন্দচ্ছোয়া। চা শ্রমিক মেয়েরা রাধার সাজে পোশাক অলঙ্কার পরিধান করেন এবং ছেলেরা কৃষ্ণের সাজে সজ্জিত হয়ে আনন্দ-উৎসবে যোগদান করে। প্রতিটি চা বাগানে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল করে দলের প্রত্যেক সদস্য ছোট দুটি করে লাঠি নিয়ে লাঠি নৃত্যে অংশ নেয়। দলের মধ্যে যে কৃষ্ণ হিসেবে সাজে তার হাতে থাকে বাঁশি। বাগানের শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে তারা লাঠি নৃত্য করে থাকে। চা শ্রমিকদের অতি প্রিয় নৃত্য লাঠিখেলা একমাত্র ফাগুয়া উৎসবেই হয়ে থাকে। চা শ্রমিকরা লাঠি খেলার সময় উড়িষ্যা, বাংলা ও হিন্দী গান গেয়ে মাদল, বাঁশি ও লাঠির শব্দের তালে তালে মুখরিত করে তোলে এ দেশের চা শ্রমিক পল্লীগুলো। এ এক অপরূপ দৃশ্য। চা শিল্পাঞ্চলের চা শ্রমিকরা এ উৎসবকে তাদের সবচেয়ে আনন্দঘন উৎসব হিসেবে পালন করে। এ উৎসব চলাকালে চা শ্রমিক পল্লীতে প্রাণের উচ্ছ্বাস, প্রেমের উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন চা শ্রমিকরা। ফাগুয়া উৎসব চলাকালে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক চা শ্রমিকদের প্রাণের উৎসব, প্রেমের উৎসব দেখতে চা বাগান এলাকায় ভিড় করেন। এ সময় রঙের হোলি খেলায় রঙিন হয়ে ওঠে সবাই। চা শিল্পাঞ্চলে ফাগুয়া উৎসব চলাকালে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একাকার হয়ে ওঠেন সবাই।

ফাগুয়া উৎসব সম্পর্কে জানা যায়, ‘হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রে আছে, রাক্ষস অসুর হিরণ্যকশিপুর কথা। এই রাক্ষস এমনই প্রতাপশালী ছিল যে সে ধর্ম-কর্ম কিছুই পালন করত না। সে ভগবান নারায়ণকে বিশ্বাস করত না। কিন্তু তারই ছেলে প্রহ্লাদ ছিল ভগবান নারায়ণের ভক্ত। রাক্ষস তা জেনে ছেলের ওপর এতই ক্ষুব্ধ ছিল যে তাকে শাস্তিস্বরূপ একটি পর্বতের ওপর থেকে নিচে ফেলে দেয়। কিন্তু ভগবান নারায়ণ তাকে এ সময় বিপদ থেকে রক্ষা করেন। দ্বিতীয়বার রাক্ষস ছেলে প্রহ্লাদকে একটি স্বর্পকুণ্ডে ফেলে দেয়। কিন্তু এখানেও ভগবান নারায়ণ তাকে রক্ষা করেন। রাক্ষসের বোন ধুন্ডি রাক্ষসী ছিল। সে ছিল আগুনের বরপ্রাপ্ত। রাক্ষস এবার ছেলে প্রহ্লাদকে প্রাণে মেরে ফেলার জন্য বোন ধুন্ডি রাক্ষসীর কোলে তুলে দেয়। ধুন্ডি রাক্ষসী ভাইপোকে কোলে নিয়ে আগুন দিয়ে পোড়ানোর চেষ্টা করে। প্রহ্লাদ ধুন্ডি রাক্ষসীর কোলে বসেই নারায়ণের নাম জপ করতে থাকলে এখানেও নারায়ণ প্রহ্লাদকে রক্ষা করেন আর ধুন্ডি রাক্ষসীকে পুড়িয়ে মারেন। এভাবে ভগবান নারায়ণের দয়ায় বারবার রাক্ষসের হাত থেকে প্রহ্লাদ বেঁচে যায়। ধ্বংস হয় রাক্ষসের। এটাকে একটি বড় বিজয় হিসেবে প্রতি বছর ফাল্গুন পূর্ণিমায় হিন্দুধর্মীয় লোকজন আনন্দ উৎসব পালন করে। উৎসব পালন করা হয় রঙে রঙে নিজেদের রাঙিয়ে দিয়ে।’

লেখক : কলামিস্ট

ismail.press2019@gmail.com