• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭, ১৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

গ্রাম-গ্রামান্তরে

চলতে ফিরতে দেখি, দেখে না প্রশাসন

রুকুনউদ্দৌলাহ

| ঢাকা , বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০

মহাসড়কের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসেছিলেন ফজলুল হক। বয়সের তুলনায় দেহটি ভারি। দেখলে যে কারও মনে হবে তিনি নানা রোগে ভুগছেন। আসলে ভুগছেনও। ফজলুল হকের নিজের জমি নেই। বাস করেন রেলওয়ের জমিতে। ওই জমিটুকু যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামে। তবে রেলওয়ের জমিতে তার ওই বাড়িটির অবস্থান সবাই বলেন লাউজানীতে। ফজলু নিজেও তাই বলেন। যশোর-বেনাপোল রেলপথ ও যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক যেন হাত ধরাধরি করে চলেছে। একের থেকে অন্যের দূরত্ব বেশি না। এ দুই যোগাযোগ মাধ্যমের মাঝখানে তিনি বাস করেন।

তাকে বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখে জানতে চেয়েছিলাম তার কোন সমস্যা আছে কি? দোকানটা বন্ধ করে বসে থাকার কারণটা কি।

আমার প্রশ্নে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল ফজলুল হকের। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। বললেন, সারা দুনিয়ায় করোনা এসেছে। এতে মানুষ মারা যাচ্ছে। কোন দেশের সরকার এ রোগটাকে কিছুতেই সামাল দিতে পারছে না। তবে আমি ও আমার পরিবার করোনায় মরব না। আমরা মরব না খেয়ে।

তার সমস্যার কথা বিস্তারিত জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেন, আমার সংসারে এখন ৪ জন লোক। এক মেয়ে ও জামাই মাঝে মধ্যে আসে তাদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। সবার মুখে একমুঠো ভাত তুলে দিতে আমার একমাত্র ভরসা এই চায়ের দোকানটা। কিন্তু তা আর খুলতে পারছিনে। সরকারি লোকজন এসে বলে গিয়েছিল চায়ের দোকান খোলা যাবে না। আমি সে কথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দোকানটি বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু একদিন হঠাৎ করে তারা আবার এসে আমার চা তৈরি করার সাজ-সরঞ্জাম বিনা কারণে ভেঙেচুরে দিয়ে যায়। আমি ওই সময় দোকানে ছিলাম না। ওই সময় দোকানটা চালুও ছিল না।

তিনি বলেন, আমি কোন দিন গোপনে দোকান খুলিনি। আমার সংসারে প্রতিদিন চাল, তেল, নুন, তরি-তরকারি মিলিয়ে খরচ হয় ৩০০ টাকা। আমার নানা রোগের কারণে প্রতিদিন ৭৫ টাকার ওষুধ খেতে হয়। দোকানটা চালিয়ে কিছু আয় হতো। হাইওয়ের পাশে একটি ঘর আছে। সেটি ভাড়া দিয়ে পাই মাসে ৫০০ টাকা। এই আয় ছাড়া আর কোন আয় নেই। সব মিলিয়ে মাসে আয় হয় ৭ হাজার টাকা। হিসাব করে দেখেছি প্রতি মাসে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়। ঘাটতি পূরণের জন্য আমার স্ত্রী গ্রামে গ্রামে কাপড় ফেরি করে বেচে বেড়ায়। কিন্তু এতে যা দু-এক পয়সা আয় হয় তাতে সংকট কাটে না। কিন্তু অগত্যা খেয়ে না খেয়ে সংকট মোকাবিলা করতে হয়।

তিনি বলেন, সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব ছুটি দেয়া হয়েছে। কিন্তু কর্মকর্তারা নিয়মিত বেতন পেয়ে যাচ্ছেন। তারা নাকি প্রণোদনাও পান। কিন্তু আমার দোকানটা বন্ধ করে আমি কি পেলাম?

ফজলুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম তিনি সরকারি সাহায্য পেয়েছেন কিনা। তিনি বললেন, এ যাবৎকালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১০ কেজি চাল ছাড়া আর কিছুই পাইনি।

ফজলুল হকের মতো অগণিত অসহায় মানুষের প্রতিচ্ছবি প্রতিনিয়ত চলতে ফিরতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু দেখে না শুধু প্রশাসন। অথচ এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে প্রশাসনের।

ফজলুর মতো আর এক অসহায় নারী ঝরনা বেগম ফল বিক্রি করেন। মৌসুমি সব ফল অর্থাৎ যখন যে ফল ওঠে সেই ফল তিনি বিক্রি করেন। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। সংসারে আর কেউ নেই বলে ১৫ বছরের মেয়ে তাকে কাজে সহযোগিতা করে।

তিনি বলেন, যশোর শহরে বাসা ভাড়া করে থাকি। ভাড়া বাবদ মাসে দিতে হয় ৩ হাজার টাকা। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকায় ৩ মাস ভাড়া দিতে পারিনি।

এ কথা বলতে বলতে কপালে দুশ্চিন্তার বলি রেখা ভেসে উঠল। বললেন, একে আয় রোজগার নেই। লকডাউনের সময় দু’এক পয়সা যা সঞ্চয় ছিল তা ভেঙে খাওয়া হয়ে গেছে। এখন হাতে ব্যবসার পুঁজিও নেই। তারপর দিনে দিনে ঘর ভাড়ার দেনা বেড়ে যাচ্ছে। এই টাকা কিভাবে পরিশোধ করব। এ চিন্তা করতে করতে ঘুম-খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।

জীবনের গল্প বলতে বলতে ঝরনা বেগম বললেন, বেঁচে থাকতে হলে ব্যবসাটা করতেই হবে। তাই মাসখানেক আগে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা হাওলাত নিয়ে ব্যবসাটা শুরু করেছি। এভাবে ৫ হাজার টাকার আম কিনে বিক্রি করতে পারলে ৮০০ টাকার মতো লাভ থাকে। কিন্তু করোনার কারণে বেচাকেনা এত কম যে, ৫ হাজার টাকার আম এনে বিক্রি করতে বেশ সময় লেগে যায়। এতে জীবন খাতার হিসাব সব গড়বড় হয়ে যায়। ঝরনা বেগম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কত দিন এভাবে চলবে আল্লাহই মালুম।

জীবনের এমন অবস্থা কিন্তু শুধু ঝরনা ও ফজলুর নয়। দেশের ব্যাপক সংখ্যক মানুষ আজ এ অবস্থার শিকার।

ধনীদের ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ আছে, হতদরিদ্রদের ত্রাণ দেয়ার জন্য আছে সরকার, কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য আছে শুধু হাহাকার। কে কি ভাববে এ লজ্জায় তারা মুখ খুলে কিছু বলতে পারছে না। হাত পাতার তো প্রশ্নই ওঠে না।

সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অফিস ছুটি ঘোষণা করায় সংশ্লিষ্টদের বসে বসে বেতন নেয়ার বিষয়টি তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। এ কর্মহীন মানুষগুলোকে কর্মমুখী করার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা নতুন করে দেখা দেয়াটা অসম্ভব কিছু নয়।

করোনার বিষয়কে কেন্দ্র করে সরকারিভাবে প্রণীত নিয়ম-নীতিতে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। আর তা জনসাধারণের কষ্টের কারণ হলেও প্রশাসনের চোখে পড়ছে না অথবা অবহেলা ও উদাসীনতায় দেখছে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন গণপরিবহন বন্ধ থাকার পর শর্ত সাপেক্ষে খুলে দেয়া হলো। এর পেছনে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ ছিল। শর্ত হলো গণপরিবহনে আগের মতো গাদাগাদি অবস্থায় যাত্রী ওঠানো যাবে না। এজন্য মালিকদের আর্থিক ক্ষতি পোষাতে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হলো। এতে জনসাধারণ আশঙ্কা করেছিলেন এ বর্ধিত ভাড়া আগের জায়গায় আর ফিরবে না। শুধু তাই নয়, কিছু দিন পর এ শর্ত ভঙ্গ করে স্বাস্থ্যবিধির প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অধিক যাত্রীও তুলবে এবং বর্ধিত ভাড়াও আদায় করবে। কাঙালের কথা বাসি হলে ফলে। তাই হলো। অল্প দিন না যেতেই জনসাধারণের সেই আশঙ্কা বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশাসন এ বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে নাকে খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে সুখ নিদ্রায় ঘুম যাচ্ছে। একে আয় নেই, তারপর বাড়তি একটা খরচ চাপিয়ে দিয়ে জনসাধারণকে পিষে ফেলার কল পাতা হয়েছে।

বাসে এক সিটে একাধিক যাত্রী বসানো নিষেধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ বর্ধিত ভাড়া ঠিক নেয়া হচ্ছে এবং এক সিটে একাধিক যাত্রী বসানোতো হচ্ছেই তার ওপর দাঁড় করানো যাত্রী তুলে বাসের ভেতরকার অবস্থা আগের সেই গাদাগাদি পরিস্থিতি করে তুলছে। এ বিষয়ে কোনো যাত্রী আপত্তি করলে তাকে নাজেহাল করা হচ্ছে। সব চেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আনলে তারা নিয়মের নামে যা দেখাচ্ছে তাতে প্রকারন্তরে পরিবহন মালিকদের পক্ষে যাচ্ছে এবং জনসাধারণের পকেট কাটার স্থায়ী ব্যবস্থা হচ্ছে। বিষয়টি পুলিশের জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে তারা কোন ব্যবস্থা না নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে জানানোর পরামর্শ দিচ্ছে। সেখানে যোগাযোগ করা হলে লিখিতভাবে আবেদন করতে বলা হচ্ছে।

পরিস্থিতি যা তাতে স্বাস্থ্যবিধি ভঙ্গ ও বাড়তি ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে যে কিছুই হবে না তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিয়মের নামে দায় এড়ানোর এ কৌশল নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। একতরফাভাবে বাড়তি ভাড়ার বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এখন অনিয়ম প্রতিরোধে আবেদন করতে হবে কেন? ভাড়া বাড়ানোর সময় কি জনসাধারণ ভাড়া বাড়ানোর আবেদন করেছিল? স্বাস্থ্য বিভাগ মাস্ক পরার ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এজন্য কি কারও কাছ থেকে কি আবেদন নিয়েছে নাকি কারও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রজ্ঞাপনটি জারি করেছে? একটি নিয়ম লঙ্ঘন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। এটাই নিয়ম। দায়িত্ব পালন না করে বাঙালিকে নিয়ম শেখাতে বসেছে। আর এদিকে প্রবর্তিত নিয়মে জনগণের পকেট উজাড় হচ্ছে। অতএব যারা কাজটি করেছে তাদেরকেই তা প্রতিহত করতে হবে। গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন ও বাড়তি ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে গণরোষ কিন্তু সৃষ্টি হচ্ছে। করোনা ঠেকানোর নামে কর্মচারীদের ছুটি দেয়া হলো। তারা বাড়িতে বসে আরামসে বেতন তুলছে আর ফুর্তি মেরে খাচ্ছে। চা, সবজি, মুদি দোকান প্রভৃতি সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের দোকান খুললে ভেঙে দেয়া হচ্ছে বা জরিমানা করা হচ্ছে। কর্মচারীরা ছুটিও পান আবার বেতন-প্রণোদনাও পান, কিন্তু এসব ব্যবসায়ীরা কি করে বাঁচবেন তা কেউ ভাবেনি ভাবছে না আর ভাববেও না। আমরা জনস্বার্থের বিপক্ষে নই। কর্মচারীর সংখ্যা হাতেগোনা। কিন্তু সাধরণ মানুষের সংখ্যা অসীম। বৃহত্তর এ মানুষের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। জনগণ একবার ফুঁসলে অবস্থা ভালো থাকবে না।

মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যাটাই দেশে বেশি। মূলত তাদের ত্যাগ, তাদের শ্রমে দেশের কল্যাণ হয়। এ গরিষ্ঠ মানুষের সমস্যা ও কষ্টের কথা সরকারিভাবে খোঁজ নিয়ে তাদের বাঁচাতে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য প্রশাসনের দায়িত্বহীনতাকে যথাযথ জবাবদিহিতার ভেতর আনতে হবে।