• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২ ফাল্গুন ১৪২৭ ১২ রজব ১৪৪২

কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২০

নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জে শেখ জাহিদ নামে এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। একই রকম একটি ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে মুন্সীগঞ্জে।

সেই কবে ১৯১৭ সালের ২৮ জানুয়ারি বরিশালে সংঘটিত এক কিশোর হত্যাকাণ্ড সংবাদ শিরোনাম দেখে যার পর নেই বিস্মিত আর বিচলিত হয়েছিলাম। ঘটনাটি ঘটেছিল বরিশাল জেলা স্কুলসংলগ্ন পরেশ সাগর মাঠে। ওখানেই দিন-দুপুরে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ১৫ বছর বয়সের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান হৃদয় গাজীকে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটায় নিহতের সমবয়সী একদল কিশোর সন্ত্রাসী। নেপথ্যে রয়েছে ইভটিজিং নিয়ে বিরোধের জের! সেই পঞ্চাশের দশকে ওই জেলা স্কুল মাঠে কতই না ফুটবল খেলেছি। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে খোশগল্পে কাটিয়েছি অনেকটা মধুর সময়। তখন কাউকে হত্যা করা তো দূরে থাক, সামান্য আঘাত করার মতো মানসিকতা কারও ছিল না। অথচ আজ কিশোর অপরাধ যেন একটি সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বয়সে কিশোরদের বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ঠিক সেই বয়সে ছুরি, চাকু হাতে কিশোররা একের পর এক অপরাধমূলক কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে। শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে উঠতি বয়সের কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। গত ১০ বছরে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া আলোচিত হত্যাকাণ্ড বেশিরভাগই কিশোর অপরাধীদের দ্বারা সংঘঠিত হয়েছে।

সম্প্রতি শুরু হয়েছে কিশোর গ্যাং কালচার। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে-বন্দরে উঠতি বয়সের ছেলেরা একত্রিত হয়ে চালিয়ে যাচ্ছে নানা ধরনের অসামাজিক তৎপরতা। ঘটছে হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ। এমনকি বর্তমানের করোনাভাইরাস সংক্রমণের লকডাউনের সংকটসময়ের মধ্যেও ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে কিশোরদের দ্বারা পরিচালিত অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। ১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। কখনো পাড়া, মহল্লায় স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব কিশোর গ্যাং। আধিপত্য বিস্তার, মাদক সেবন ও বিপণনের স্বার্থে ওদের গ্রুপে গ্রুপে মারামারি খুনাখুনি লেগেই আছে। কখনো ওরা সংঘবদ্ধ হয়ে চালাচ্ছে ধর্ষণ। এদের গডফাদারের নেতৃত্বে এরা বড় ধরনের চুরি, ডাকাতি, মাদক পাচারের মতো কাজে যুক্ত হচ্ছে। অস্ত্র বহনসহ নানা অপরাধমূলক কাজে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের কিশোরদের লিপ্ত থাকার সাহস পাচ্ছে। এর পেছনে কখনো কাজ করে এক শ্রেণীর শক্তিশালী সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র। এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণও রয়েছে ওদের। সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যরা দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে নিম্নবিত্ত, ছিন্নমূল পরিবারের কিশোরদের অথের্র প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে টানছে। সাহসী ও বুদ্ধিমান কিশোরদের চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ছোট খাঁ অপরাধের বাইরেও মাদক বিক্রি, অস্ত্র ও বোমা বহনের মতো মারাত্মক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কাজের জন্য ওদের দেয়া হয় লোভনীয় অঙ্কের অর্থ। অর্থের প্রলোভনে পড়ে ধীরে ধীরে কিশোররা এক সময় অপরাধ জগতের স্থায়ী সদস্য হয়ে যায়। কিশোর অপরাধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গোটা সমাজব্যবস্থায়।

অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিশোরদের একটি বিরাট অংশ নিম্নবিত্তের। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ছোটবড় শহরে দরিদ্র পরিবারের লাখ লাখ কিশোর বড় হয় অযত্ন, অবহেলার মধ্য দিয়ে। ওরা রেলস্টেশনে, লঞ্চ-টার্মিনালে, অফিসের বারান্দায়, এমনকি ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে জীবন কাটায়। নদীভাঙন ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম শিকার দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিবারের শিশু-কিশোরদের নিজস্ব কোন ঠিকানাও নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে ওরা হয় বঞ্চিত। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ লাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে থেকে যায়। লাখ লাখ শিশু হয় অপুষ্টির শিকার হয়। সামাজিক নিরাপত্তার লেশমাত্র নেই বিত্তহীন পথশিশুদের জীবনে। শিশুকাল থেকে মা-বাবার স্নেহ-মমতা বঞ্চিত হয়ে ওরা পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রতিকূল পরিবেশে অবহেলা, বঞ্চনা এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে এক সময় অপরাধ জগতের অন্ধকারের দিকে পা বাড়ায়। কখনো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে হয়ে ওঠে বেপরোয়া। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত শিশু-কিশোররাই প্রথমে অপরাধ জগতের নবীন সদস্য হয়ে কালক্রমে শীর্ষস্থানে চলে যায়। উচ্চবিত্তের পরিবারের কিশোরদেরও বর্তমানে ভয়ঙ্কর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।

অর্থাভাব যেমন একটি কিশোরকে অপরাধ জগতে ঠেলে দিচ্ছে তেমনি অর্থের প্রাচুর্যও কখনো অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাবা-মায়ের অসতর্কতার কারণে এসব কিশোররা অসৎ সঙ্গে মেশার সুযোগ করে নিচ্ছে। সেবন করছে দামি সিগারেট, গাঁজা এমনকি ইয়াবা। নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার নামে তারা নানা ধরনের অসামাজিক কাজে জড়িয়ে রয়েছে। নেশার ঘোরে ঘটিয়ে চলছে নানা অপরাধ, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ। মা-বাবা, নিকটাত্মীয়কে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রবাহের এ যুগে অশ্লীল ভিডিও, ফেসবুক, ইন্টারনেটের অপব্যবহার তাদের বিপথগামী করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে মাদক ও অস্ত্র বহনের মতো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত কিশোররা কালক্রমে হয়ে পড়ে মাদকসেবী। পারিবারিক, সামাজিক অনুশাসনের অভাবে বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওরা অঢেল অর্থ ব্যয় করে নেশার পেছনে। পরে শত চেষ্টায়ও এ থেকে আর তাদের ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।

পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ শিথিল হয়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, অস্থিরতা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আজকাল মা-বাবা, অভিভাবক ঘরের শিশুর-কিশোরদের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল রাখেন না। নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে নি¤œমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তের পরিবারের প্রায় সবাই জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে এত ব্যস্ত থাকেন যে ঘরে তাদের সন্তানের দেখভালের যথেষ্ট সময় পান না। উচ্চবিত্তের পরিবারের সন্তানরা নামিদামি স্কুলে পড়ার বাইরের সময়টা কেমন করে কাটায়, কার সঙ্গে মেলামেশা করে সে খবর ওদেও মা-বাবা রাখেন না। স্কুল শিক্ষক, প্রাইভেট টিউটরের কাছেও তাদের তেমন মানবিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই। মোবাইল ফোন আর কম্পিউটার ব্যবহারে ব্যস্ত কিশোর সময় কাটায় এক পরিবার বিচ্ছিন্ন জগতে। তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রভাবে পরিবর্তিত বর্তমান সমাজে কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া শরীর চর্চা, খেলাধুলার কোন সময় বা সুযোগ নেই আজকের শিশু-কিশোরদের। সামাজিক-সাংস্কৃতির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ারও সুযোগ নেই ওদের। কিশোরের মনোজগতের বিকাশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে ওরা ধাবিত হচ্ছে এক নিরুদ্দেশ যাত্রায়।

আজকের কিশোর দিনে দিনে বেড়ে পরিণত মানুষ হয়ে ওঠে। অনুকূল পরিবেশ পেলে ধীরে ধীরে তাদের মনে চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটাতে পারে। বিদ্যা-বুদ্ধি-মননে, প্রগতিশীলতায় সমৃদ্ধি লাভ করে। দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা অর্জনেও সক্ষম হয়। সমাজ গঠনে রাখতে পারে সক্রিয় ভূমিকা। শিশু-কিশোরদেও তাই দেহমনের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক পরিচর্যা, অফুরন্ত আলোকময় পরিবেশ। দেশের অধিকারবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, বস্ত্র এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যাবে না। ওদের সামাজিক নিরাপত্তা ও বাঁচার ন্যূনতম অধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু উপযুক্ত শিক্ষা নিয়ে যোগ্যতা অনুসারে কাজ করার সুযোগ পেলে কখনই ওরা অপরাধে জড়াবে না। বোঝা হবে না সমাজের। এ জন্য সর্বস্তরের শিশুর জন্য সুশিক্ষা দানের ব্যবস্থা নিতে হবে। নিম্নবিত্তের শিশুদের জন্য স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রাম-গ্রামান্তরে প্রতিটি নিম্নবিত্তের শিশু-কিশোরের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিদান নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদন সুবিধা দিতে হবে। ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের করতে হবে পুনর্বাসন। সর্বস্তরের সন্তানদের প্রতি মা-বাবার যত্নশীল হতে হবে। অপরাধ চক্রে জড়িয়ে যাওয়া কিশোরদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। ওদের শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে উন্নত চিন্তা-চেতনা নিয়ে বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণসহ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বল বা শাস্তি প্রয়োগ কোনভাবেই কিশোর অপরাধ দমনের স্থায়ী পথ নয়। সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলেই কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কিশোরদের অপরাধজগৎ থেকে বের করে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজসচেতন মানুষকে নিতে হবে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক]

  • নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ

    মোস্তাফা জব্বার

    গত ১ মে শুক্রবার ২০২০ রাত ৮টায় বাংললাদেশ কম্পিউটার সমিতি ‘নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ’