• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ ১ রমজান ১৪৪২

করোনার প্রভাব ও খাদ্য নিরাপত্তা

ড. জাহাঙ্গীর আলম

| ঢাকা , সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২০

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর করোনাভাইরাস মহামারী বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে মহাসংকটে ফেলেছে। বিশ্বজুড়ে ২০৯টি দেশ ও অঞ্চল এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। বেশিরভাগ দেশ করোনা ঠেকাতে পুরো বা আংশিক লকডাউনে আছে। তাতে গৃহবন্দির জীবনযাপন করছে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ। এখনও লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে কোন কোন দেশে। নতুন করেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশে। তাতে স্থবির হয়ে পড়ছে মানুষের জীবন। তারা কর্মহীন হয়ে পড়ছে। তাতে মাঠে আর কল-কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাতে পঙ্গু হয়ে পড়ছে বিশ্বের অর্থনীতি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনার কারণে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১.৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই হতে পারে বড় মহামন্দা। এর প্রভাবে খাদ্যশস্যের উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। ফলে দারুণভাবে বিঘিœত হতে পারে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা অদূর ভবিষ্যতে গভীর খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করে ইতোমধ্যেই সদস্য দেশগুলোকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এর পরিস্থিতি ভালো নয়। প্রতিদিনই আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন মানুষ। তাতে অনেকেই বেশ আতঙ্কগ্রস্ত। পুরো কিংবা আংশিক লকডাউনে আছে অনেক পরিবার। তাদের যাতায়াত সীমিত। কল-কারখানা প্রায় বন্ধ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিরাজ করছে দারুণ এক স্থবিরতা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আশঙ্কা করছে, করোনাভাইরাসের অভিঘাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১.১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। তাছাড়া শেয়ারবাজারে ধস নামাসহ রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস, রপ্তানি আয় হ্রাস ও কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে। তদুপরি উপকরণ সরবরাহে অপ্রতুলতা ও পণ্যবাজার সংকুচিত হওয়ার ফলে কৃষির উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। তাতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই যে করোনা প্রভাব, এতে ব্যাপকভাবে খাদ্যাভাব দেখা দেবে বিশ্বব্যাপী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, সে রকম অবস্থা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমরা উৎপাদন বাড়িয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকলে অন্যদের সাহায্য করতে পারব। এটা মনে রেখে আমাদের সবার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেছেন, আমাদের মাটি উর্বর। তাতে ফলমূল, শাকসবজি, শস্য লাগান। কোথাও এতটুকু মাটি যেন অনাবাদি না থাকে। গত ৭ এপ্রিল এক ভিডিও কনফারেন্সে এই নির্দেশনা দেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। এর আগেও তিনি পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সে দিকে দৃষ্টি রেখে কোথাও এক ইঞ্চি জায়গাও অনাবাদি না রাখার আহ্বান জানান। করোনাভাইরাসের প্রকোপে সমগ্র বিশ্ব এখন টালমাটাল। মাঠের ফসল পরিচর্যা, কর্তন ও বাজারজাতকরণ খুবই সমস্যার সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক খাদ্যমূল্য ক্রমেই বাড়ছে। খাদ্য রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ ঘোষণা করছে অনেক দেশ। এরূপ বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমাদের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার আলোকে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান শর্ত খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা। সেদিক থেকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা ভালো। গত ৩টি ধান ফসলের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে। কৃষকের ঘরে এখনও প্রয়োজনীয় খাবার আছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সরকারের হাতে আছে সন্তোষজনক খাদ্য মজুত। গত মার্চ মাস নাগাদ সরকারিভাবে খাদ্য মজুতের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ টন। এর মধ্যে ছিল চাল ১৪ লাখ টন এবং গম ৩ লাখ টন। এখন মাঠে কর্তনের অপেক্ষায় আছে বোরো ধান। ফসলের বাহ্যিক চেহারা ভালো। আগাম পূর্বাভাস অনুসারে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রায় ২ কোটি টন চাল উৎপাদিত হবে সামনের বোরো মৌসুমে। তাছাড়া গমের উৎপাদন এবার ভালো হয়েছে। এ মৌসুমের উৎপাদন হতে পারে ১৩ থেকে ১৫ লাখ টন। ইতোমধ্যেই বোরো ধান চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। ২৬ টাকা কেজি দরে ধান সংগ্রহ করা হবে ৬ লাখ মেট্রিক টন, ৩৬ টাকা কেজি সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হবে ১০ লাখ মেট্রিক টন এবং ৩৫ টাকা কেজি আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১.৫ লাখ মেট্রিক টন। সেই সঙ্গে ৩৮ টাকা কেজি দরে সংগ্রহ করা হবে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন গম। সর্বমোট সোয়া ১৮ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে সরকার। তাতে একটি উঁচু পরিমাণে মজুত গড়ে তোলার সম্ভাবনা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তার দ্বিতীয় শর্ত হলো- প্রাপ্ত খাদ্যশস্যে। সবার অভিগম্যতা। এক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর ক্রেতাদের আয় ও ক্রয় ক্ষমতা বিবেচ্য। করোনাভাইরাসের অভিঘাতে অনেক মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছে। তাদের আয় কমেছে। তারা প্রয়োজনীয় খাদ্য ক্রয়ের সামর্থ্য হারিয়েছে। তবে সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে তাদের খাদ্য সরবরাহ করছে। ১০ টাকা কেজি দরে তাদের কাছে চাল বিক্রি করছে। তাতে দেশে প্রাপনীয় খাদ্যশস্যে তাদের অভিগম্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে খাদ্য নিরাপত্তার তৃতীয় শর্ত খাদ্যের পর্যাপ্ততা ও স্থায়িত্বশীলতার বিষয়ে যথেষ্ট সীমবাদ্ধতা আছে। চাল উৎপাদনে আমরা স্বয়ম্ভর হলেও গম ও ভুট্টার উৎপাদনে যথেষ্ট ঘাটতি আছে আমাদের। ২০১৮-১৯ সালে প্রায় ৬০ লাখ টন এবং চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ সালে (মার্চ পর্যন্ত) প্রায় ৫২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য আমরা আমদানি করেছি। সামনে করোনাভাইরাসের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা হবে অনেকটাই অনিশ্চিত। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যে কোন মৌসুমে স্থানীয় উৎপাদন বিঘ্নিত হতে পারে। তাতে খাদ্য নিরাপত্তা অনিশ্চিত হতে পারে।

করোনাভাইরাসের একটি নেতিবাচক প্রভাব হচ্ছে খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে ঘটেছে। ইতোমধ্যেই রপ্তানিযোগ্য থাই চালের দাম গত সাত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে আমরা তা প্রত্যক্ষ করছি। বাজারগুলোতে ক্রেতা কম। কিন্তু চালের দাম বেশি। ক্রমেই তা বাড়ছে। মিলাররা গত ১ মাসে প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে চালের। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৮-১২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়। নাজিরশাইল ও বিআর ২৮ চালে গত ১ মাসের ব্যবধানে কেজিতে ৫-৬ টাকা বেড়েছে। ফলে খেটে খাওয়া মানুষের চাল কিনতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমনিতেই অনেকে কর্মহীন তার ওপর বাড়তি দামে চাল কিনতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। দেশে এখন পর্যাপ্ত মজুত আছে চালের। সামনে বোরো ধান কাটা হবে। খাদ্যশস্যের এমন ভালো প্রাপ্যতার সময় করোনা দুর্যোগকালে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের অশুভ চক্রান্তে। এদের অন্যায্য মুনাফার রাশ টেনে ধরতে হবে।

অপরদিকে করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে। এবার চাষিরা প্রচুর সবজি উৎপাদান করেছেন। কিন্তু এখন বিক্রি করতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় ক্রেতার অভাবে খামারপ্রান্তে তারা উৎপাদন খরচের শিকিভাগও হাতে নিতে পারছেন না। পোলট্রি উপখাতে চাহিদা হ্রাসের কারণে ডিম ও ব্রয়লারের দাম অনেক কমে গেছে। মোট উৎপাদনের অর্ধেকও বাজারে বিক্রি করা যাচ্ছে না। ডিমের উৎপাদন খরচ প্রতিটি সাড়ে পাঁচ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ৪ টাকারও কম দামে। ব্রয়লারের প্রতি কেজি উৎপাদন খরচ ৯৫ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। মুরগির একদিনের বাচ্চা উৎপাদনে খরচ পড়ে ৩৫ টাকা। বিক্রি হচ্ছে না এক টাকাতেও। অনেকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলছে মুরগির বাচ্চা। এক মাস আগেও খামার প্রান্তে তরল দুধের দাম ছিল প্রতি লিটার ৫০ থেকে ৬০ টাকা। এখন তা নেমে এসেছে ২০-২৫ টাকায়। তারপরও ক্রেতা নেই। মিষ্টির দোকানগুলো বন্ধ থাকায় এবং দুগ্ধ বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজতকরণে নিয়োজিত শিল্পগুলো দুগ্ধ ক্রয় কমিয়ে দেয়ায় কৃষকরা উৎপাদিত তরল দুধের অর্ধেকও বিক্রি করতে পারছে না। দেশে তরল দুধের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ২৭ হাজার টন। বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২-১৩ হাজার টন। মৎস্য উপখাতেও দারুণ চাহিদা সংকট বিরাজমান। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য। পরিবহন সংকট ও বাজারজাতকরণের সমস্যাজনিত কারণে মৎস্য চাষিরা এখন দারুণ অসুবিধার সম্মুখীন। তদুপরী দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে হিমায়িত মৎস্য, চিংড়ি, কুচিয়া ও কাঁকড়ার রপ্তানি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাতে এখন লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার উপক্রম। তাছাড়া পশু-পাখি ও মৎস্য খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় আমদানিকৃত কাঁচামালের অভাবে তাদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে। সবকিছু মিলে বৃহত্তর কৃষি খাত এখন বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তাতে হুমকির মুখে পড়েছে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।

দেশের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সম্প্রতি পাঁচ প্যাকেজে পৌনে ৭৩ হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্যাকেজ-১-এর মাধ্যমে শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চলতি মূলধন দেয়া হবে। এর জন্য রাখা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা। প্যাকেজ-২-এ ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর চলতি মূলধন সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা। প্রথম ও দ্বিতীয় প্যাকেজের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। সুদের হার ৯ শতাংশ। প্রথম প্যাকেজে অর্ধেক সুদ বহন করবে সরকার, বাকি অর্ধেক দেবে ঋণ গ্রহীতা। দ্বিতীয় প্যাকেজে ৫ শতাংশ সুদ বহন করবে সরকার। বাকি ৪ শতাংশ সুদ গ্রহীতার। তৃতীয় প্যাকেজে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা যোগ করা হয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে। এতে সুদের হার ২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। চতুর্থ প্যাকেজে প্রাকজাহাজীকরণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি ঋণ নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন সুবিধা চালু করবে। এর সুদ হবে ৭ শতাংশ। তাছাড়া এর আগে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার আপৎকালীন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। এর সুদহার ২ শতাংশ। নতুন ৪টিসহ মোট ৫টি প্যাকেজে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এটা মোট দেশজ উৎপাদনের ২.৫২ শতাংশ। এই বড় পণোদনা প্যাকেজে আক্ষরিকভাবে কৃষি অনুপস্থিত। দ্বিতীয় প্যাকেজের অধীনে পোলট্রি, দুগ্ধ ও মৎস্য খামার, অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে। তবে তা নির্দিষ্ট করতে হবে। ফসল কৃষি খাত কার্যত এ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত নয়। গ্রামীণ অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প এবং অরপ্তানি খাতও এ প্যাকেজের আওতা-বহির্ভূত। যারা শিল্প বা খামার হিসেবে স্বীকৃত নয়, যাদের লাইসেন্স নেই অথচ তারা উৎপাদনে আছে, এমন উদ্যোক্তার অভাব নেই বাংলাদেশে। উদারণস্বরূপ ছোট পোলট্রি ও ডেইরি ফার্ম, বাঁশ-বেতের শিল্প, ওয়ার্কশপ, দোকান ইত্যাদির নাম বলা যায়। ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে এদের প্রণোদনার আওতায় আনা যাবে বলে মনে হয় না। ছোট কৃষক, ফলমূল ও সবজি চাষিরাও এ প্যাকেজের সুবিধাভোগী হবে না। এদের জন্য নগদ সহায়তা দিতে হবে। ঘোষণা করতে হবে আলাদা প্যাকেজ।

দেশে এখন অঘোষিত লকডাউন চলছে। জীবনের ভয়ে ঘরে বসে দিনযাপন করছে শহরের অনেক মানুষ। কিন্তু করোনাভাইরাসের আতঙ্ক উপেক্ষা করে এখনও মাঠে নামছেন গ্রামের কৃষক। তারা নিয়মিত ফসলের পরিচর্যা করছেন। তাছাড়া পোলট্রি ও মৎস্য খামারে তারা খাবার সরবরাহ করছেন, গাভীর দুধ দোহন করছেন, গরুতে ঘানি টানছেন। সামনে পাট ও আউশ ধান বোনার সময়। এর জন্য সংগ্রহ করতে হবে বীজ ও সার। নিশ্চিত করতে হবে টাকার জোগান। এরপর আসবে রোপা আমন, ভুট্টা ও সবজি আবাদের সময়। তাতেও লাগবে অনেক টাকা। অতি ক্ষুদ্র পোলট্রি ও দুগ্ধ খামারগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে লাগবে আরও অনেক টাকা। করোনাভাইরাসের প্রভাবে শ্রমিকদের মজুরি বাড়বে। বৃদ্ধি পাবে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ। অথচ বাজাজাতকরণের সমস্যাহেতু কৃষি ব্যবসায় লোকসান গুনতে হবে দেশের কৃষকদের। ফলে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবেন অনেক কৃষক। বিঘিœত হবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা।

সরকার ঘোষিত সাম্প্রতিক প্রণোদনা প্যাকেজ আকারে বেশ বড়। জিডিপির ২.৫২ শতাংশ। সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ ও মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে এ প্যাকেজের অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে। তাতে মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা খুবই প্রবল। এর অভিঘাত কৃষি খাতের জন্য ইতিবাচক নাও হতে পারে। আন্তঃখাত বাণিজ্যিক ভারসাম্য কৃষি খাতের প্রতিকূলে চলে যেতে পারে। এমতাবস্থায় কৃষি খাতের জন্য বিশেষ সহায়তা ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা ছাড়া দেশের ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদনে ধরে রাখা ও তাদের স্বার্থ রক্ষা করা খুবই কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে ফসল কৃষিখাত, পোলট্রি, ডেইরি এবং মৎস্য উপখাতের জন্য আলাদাভাবে সহায়তা প্রদানের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মধ্যে নগদ সহায়তা ঋণের সুদ মওকুফ, পুনঃতফসিলকরণের মাধ্যমে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বৃদ্ধি ও স্বল্প সুদে নতুন ঋণ প্রদানের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে। তাছাড়া আরও অধিক ভর্তুকি মূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও কৃষি পণ্যের রপ্তানি ক্ষেত্রে ভর্তুকি বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। সব মিলে বৃহত্তর কৃষি খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি আলাদা প্রণোদনা প্যাকেজ প্রণয়ন করা যুক্তিযুক্ত মনে করি।

[লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ]