• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮ ১ রমজান ১৪৪২

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

ডা. এসএ মালেক

| ঢাকা , রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২০

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এখন বিশ লাখের উপরে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়াসহ এমন কোন মহাদেশ নেই যেখানে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রথমে চীনের উহান শহরে পরে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মান প্রভৃতি বড় বড় রাজধানী শহরে এ ভাইরাসের সংক্রমণে ইতোমধ্যে দেড় লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ((WHO) যথাসময়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে এ ভাইরাসের ব্যাপারে পূর্ব সতর্ক না করার কারণেই বর্তমান ভয়াবহ অবস্থা। এ কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে বাৎসরিক যে অনুদান দিত, তা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকেই বলেছেন, বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের চীনের প্রতি বিশেষ আনুকূল্যের অভিযোগ তুলেছেন। আসলে বাস্তবতা হচ্ছে, যথাসময়ে জাতিসংঘ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন বিশেষ গুরুত্ব দেননি। বরং করোনাভাইরাসকে চাইনিজ ভাইরাস বলে উপহাস করেছিলেন। এখন লাখো আমেরিকান আক্রান্ত ও প্রায় ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণে ট্রাম্পের ওপর যে চাপ এসেছে, তা মোকাবিলা করার প্রয়োজনেই ট্রাম্প তার ব্যর্থতার দায়িত্ব জাতিসংঘের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সাহায্য বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা বর্তমান পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এ কথা সত্য, জাতিসংঘকে সরবরাহকৃত অর্থের একটা বড় অংশ আমেরিকা দিয়ে থাকে। অন্যান্য দেশও সাহায্য করে থাকে, তবে আমেরিকার সাহায্যের পরিমাণ বেশি। বিশ্বের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদশালী রাষ্ট্র হওয়ার কারণে আমেরিকার ওপর জাতিসংঘ অনেকাংশে নির্ভরশীল। এর পূর্বে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে আমেরিকা নিজেদের প্রত্যাহার করল। আর এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টাকা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল। আমেরিকার মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক ধনী দেশের পক্ষে এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া অনেকেই অনুচিত বলে মনে করছেন। এরূপ একটা ভয়াবহ দুর্যোগ একটি বা কয়েকটি দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সংকটের প্রকৃতি এত কঠিন ও সুদূর বিস্তৃত বিশ্বের ছোট-বড় সব দেশকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এটা মোকাবিলা করতে হবে। এ বিশ্বযুদ্ধের মতো নয়; যে কয়েকটি দেশ জোটবদ্ধ হয়ে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হবেন। এটা এমন একটা সংকট যে তার কারণ নির্ধারণ ও প্রতিরোধ শক্তি সৃষ্টিতে অর্থাৎ ভ্যাকসিন তৈরিতে দেড় বছর বা বেশি সময় লেগে যেতে পারে। পৃথিবীর খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিকরা গবেষণা শুরু করেছেন এবং বিল গেটসের মতো ধনকুবেররা প্রয়োজনীয় সম্পদ বিলিয়ে দিচ্ছেন। হয়তো কয়েক মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন তৈরি হবে। ভ্যাকসিন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত মারাত্মক পরিস্থিতি বিশ্বে বিদ্যমান থাকবে। বাংলাদেশে এ ভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে, গত ৮ মার্চ থেকে বিদেশে কর্মরত প্রায় ৭ লাখ বাঙালি প্রবাসী ওইসব দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখে দ্রুত দেশে ফিরে এসেছেন। ৩ মাসে ফিরে এসেছেন প্রায় ৭ লাখ প্রবাসী। এদের অধিকাংশই করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না। মনে হয় সিম্পটম ফ্রি থাকায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এসব যাত্রীদের কড়াকড়ি ভাবে স্কিলিং করার প্রয়োজনবোধ করেনি। যারা সিম্পটম ফ্রি ছিলেন, তাদের অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করল। এদের ভেতর করোনা আক্রান্ত যে ছিলেন না, এরূপ নয়; বরং ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে গ্রামগঞ্জে গিয়ে কোয়ারেন্টিন না মেনে চলাফেরা করায় দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে। যারা ঢাকায় কোয়ারেন্টিনে ছিলেন তারা ১৪ দিন থেকে তারাও বাড়িতে চলে গেছেন। এরপরে যে বিশেষ ঘটনা ঘটেছে, তা হলো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকলকারখানা ছুটির ঘোষণা। আর ছুটি পেলে যা হয়, ঢাকা শহর ত্যাগ করে সবাই গ্রামে ফিরে গেছেন এবং ফেরত আসা প্রবাসি বাঙালিদের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন।

এদিকে চল্লিশ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিকদের কলকারখানা বন্ধের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না দেয়ায় চাকরি হারানোর ভয়ে প্রথমবার ছুটি শেষ হওয়ার পরেই অধিকাংশ কর্মজীবী শ্রমিকরা ঢাকায় ঢুকে পড়েছেন। যদিও যেদিন ছুটি শেষ হয়েছে সেইদিনই আবার গার্মেন্ট মালিক পক্ষ সরকারের নির্দেশ মতো কারখানার ছুটি বর্ধিত করেছেন। দেখা যাচ্ছে প্রথমে প্রবাসীদের গ্রামে ফিরে যাওয়া ও পরে স্কুল, কলেজের ছাত্র ও কারখানার শ্রমিকদের গ্রামে যাওয়া এবং পরে আবার তাদের ঢাকায় ফিরে আসা এসব কিছুর মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দারুণভাবে অবজ্ঞা হয়েছে। এ ব্যাপারে কে কতটুকু দায়ী তা নির্ধারণকল্পে তদন্ত করা যেতে পারে এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির বিধান করা যেতে পারে।

তবে একথা ঠিক, সামর্থ্য ও শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে সরকারের পক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা করা বোধহয় সম্ভব ছিল না। ক্ষেত্র বিশেষে হয়তো শিথিলতা প্রদর্শন করা হলেও কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে সব লোককে বিমানবন্দরে স্কিলিং করা এবং সব লোককে ঢাকা শহরে কোয়ারেন্টিনে রাখা বোধ হয় সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অভাব ছিল প্রযুক্তির, প্রশিক্ষিত জনবলের, অর্থের ও সঠিক পরামর্শ দেয়ার। সংশ্লিষ্ট অনেকেই সরকারকে সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথবা বিষয়টি যতটা গুরুত্ব সহকারে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। যথাযোগ্য তৎপরতার মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছে। দ্রুত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দক্ষ জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। কোয়ারেন্টিনে সামাজিক দূরত্ব এবং অন্যান্য বিধিমালা যাতে জনগণ কঠোরভাবে মেনে চলে, সেজন্য সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও মাঠে নামিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল প্রশাসন বিশেষ তৎপর রয়েছে। এদের সবার স্বাস্থ্য বীমার আওতায় এনে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ঘোষণা দেয়া হবে সরকারের পক্ষ থেকে। এর পূর্বে অর্থনীতি যাতে চরমভাবে বিপর্যস্ত না হয়, সেই জন্য আমদানি-রফতানি, পোশাকশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এবার যে বাম্পার বোরো ফলেছে তা যথাযথভাবে ঘরে তোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, এ জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। টেলিভিশনের পর্দা দেখলে মনে হয় বিশেষ কোন মহল এটা প্রচার করছে যে এই মহামারী দমনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। অভুক্ত মানুষকে সহায়তার জন্য যে তাৎক্ষণিক কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে বাস্তবায়ন করেছে, সে ব্যাপারে তাদের মন্তব্য উদ্দেশ্যমূলক বলে মনে হয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, কী করছে সরকার? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে ধরনের ত্রাণ চুরি হয়েছিল, বাস্তব অবস্থাও প্রায় সেইরূপ। আমাকে জবাবে বলতে হলো যে, হাজার হাজার ইউনিয়ন ও বড় বড় শহরে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। সেখানে নিম্ন পর্যায়ে তদারকির অভাবে কিছু কিছু দুর্নীতিবাজ দুর্নীতি শুধু করেছে, তাদের তো ধরা হয়েছে এবং শাস্তি প্রদান অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করার। অধ্যাপক সাহেবের কথায় মনে হলো যে, সরকার, সরকারি দল এবং তাদের সমর্থকরা সম্মিলিতভাবে ত্রাণসামগ্রী লুটপাট করছেন। আর একজন বামপন্থি সাংবাদিক যে অশালীন ভাষায় টেলিভিশনের পর্দায় সরকার বিশেষ করে মন্ত্রী ও সাংসদদের বিরেুদ্ধে বললেন, তা যে আক্রমণাত্মক ছিল, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি। এ দুটি উদাহরণের অর্থ এই নয় যে দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় দেশ চলছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান তো প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বেই শুরু করেছিলেন, এখনও তা অব্যাহত আছে। বহু রাঘববোয়াল ধরা পড়েছে। বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকারি দল বলে ছেড়ে দেয়া হয়নি। দুর্নীতি সব সময় ছিল, এখনও আছে। দুর্নীতিবাজরা সুযোগ পেলেই তা করে থাকে। সরকারি দল, বিরোধী দল, দল নিরপেক্ষ সবার ভেতর যদি দুর্নীতিবাজদের খোঁজ করেন, তা হলে দেখা যাবে, তাদের এখনও সংখ্যা বেশি। টেলিভিশনের পর্দায় এমন একজন এসে লম্বা লম্বা কথা বলেন, যিনি একসময় ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ করতেন, বঙ্গবন্ধুর অনুুসারী ছিলেন, সামরিক শাসক এরশাদকে সমর্থন করে শোনা যায় ঢাকা শহরে আটত্রিশটি প্লটের মালিক বনে গেছেন। আর একজন বামপন্থি বিপ্লবী সমাজতন্ত্রে যার বিশেষ আস্থা, তিনিও এরশাদকে সমর্থন করে আশুলিয়ায় বিঘার পর বিঘা খাস জমি দখল করেছেন। আর এখন নামকরা মুক্তিযোদ্ধা, যার বক্তব্য শোনার জন্য বঙ্গবন্ধু পার্লামেন্টে হাজির হতেন। তিনি এখন আল্লাহ-বিল্লাহ করে টুপি ও তসবিহ মাওলানা, যার সম্পদের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। কে এ দেশে দুর্নীতি করেননি। যারাই ক্ষমতায় গেছে, তাদের একাংশের লক্ষ্যই ছিল রাতারাতি ধনী হওয়া। ওদের কেউ কেউ একসময় ছিল বঙ্গবন্ধুর লোক, তারপর জিয়াউর রহমান, তারপর এরশাদ ও পরে খালেদা জিয়ার।

কেউ কেউ আহ্বান জানাচ্ছেন জাতীয় পর্যায়ে ত্রাণ পরিচালনা কমিটি গঠন করার। প্রস্তাবটা ভালো। গণতান্ত্রিক দেশে এটাই করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতাটা কি যেখানে একটি দল অপর দলকে নিশ্চিহ্ন করে ক্ষমতায় যেতে চায়। স্বাধীনতাবিরোধীরা এখনও তাদের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতি অব্যাহত রেখেছে। ধর্মীয় জঙ্গিবাদীরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে চলেছে। জাতীয় বৃহত্তম ইস্যুতে কখনও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। যাদের একমাত্র লক্ষ্য সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো এবং সুযোগ পেলেই ষড়যন্ত্র শুরু করে, তাদের ঐক্যের আহ্বানে ক্ষমতাসীনরা সাড়া দেবে কোন ভরসায়? সব জায়গায়ই অনৈক্য, প্রতিহিংসা, প্রতিরোধ। শুধু ত্রাণ বিতরণ নিয়ে জাতীয় ঐক্যের প্রস্তাব কার্যকর হতে পারে কি?

[ লেখক : কলামিস্ট ও রাজনীতিক ]

  • মাওলানা আনসারীর জানাজা

    জিয়াউদ্দীন আহমেদ

    মরণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সারাদেশে জনসমাগম নিষিদ্ধ সম্পর্কিত সরকারের নির্দেশ অমান্য করে