• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮ মহররম ১৪৪২, ০৯ আশ্বিন ১৪২৭

করোনা : জীবন জীবনের জন্য

মোস্তাফা জব্বার

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

করোনাকালে আমরা যেভাবে অমানবিক কার্যকলাপের অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখে আসছি তেমনি দেখতে পাচ্ছি মানুষের জন্য মানুষের অসাধারণ মানবিক কাজ করার দৃষ্টান্ত। এমনকি অমানবিক কাজের বিপরীতে মানবতার জয় হচ্ছে। এসব কাজ দেখে অবশেষে মনে হচ্ছে যে কিছু খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলেও দিনের শেষে মনুষ্যত্ত্বই জয়ী হচ্ছে। ২৬ মে ২০ এর দৈনিক ডেইলি স্টারের অনলাইন বাংলা সংস্করণের একটি খবর হৃদয় স্পর্শ করার মতো। শুধু তা-ই নয় মানুষের পাশে পুলিশ বাহিনীর থাকার এই নজিরটি জাতি কোনকালেই ভুলবে না। এ খবরটি একদিকে চরম অমানবিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে অন্যদিকে পরম মনুষ্যত্বেরও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

‘করোনা মৃত সন্দেহে তিস্তা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া পোশাক শ্রমিক মৌসুমী আক্তারের জানাজায় কেউ আসেননি। এমনকি পরিবারের সদস্যরাও না। কিন্তু পুলিশ এসেছিল। তিস্তা নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার, থানায় নিয়ে আসা, জানাজা সবকিছুই করেছে পুলিশ। আসেনি স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ বা জনপ্রতিনিধি। (২৫ মে ২০২০) সোমবার ঈদের দিন বিকেলে লালমনিরহাটের আদিতমারী থানা চত্বরে পুলিশের অংশগ্রহণে জানাজা শেষে মৌসুমী আক্তারকে দাফন করা হয়।

আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, ঈদের আগের দিন রোববার রাতে স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বৃষ্টিতে ভিজে উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের গোবর্ধান এলাকায় তিস্তা নদী থেকে পোশাক শ্রমিক মৌসুমী আক্তারের মরদেহ অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করে। পরে তার পরিচয় খুঁজে বের করা হয়।

দাফন কাজেও পুলিশ ছাড়া কেউ আসেননি জানিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আদিতমারী ও পাটগ্রাম থানা পুলিশ মেয়ের বাবা ও পরিবারের সদস্যদের মরদেহ নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু মেয়েটির বাবা তা না করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে তাদের অনাগ্রহ প্রকাশ করে। তাই আমরাই থানা চত্বরে জানাজা সম্পন্ন করি। জানাজা শেষে মেয়ের বাবা আসলে তার কাছে মরদেহ বুঝিয়ে দিয়ে আদিতমারী ও পাটগ্রাম থানা পুলিশ যৌথভাবে দাফন কাজ সম্পন্ন করে।’

মৃত পোশাক শ্রমিক মৌসুমী আক্তার (২৩) জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামের গোলাম মোস্তফার মেয়ে এবং একই উপজেলার বাউড়া ইউনিয়নের সরকারেরহাট এলাকার মিজানুর রহমানের স্ত্রী। স্বামীর নিগ্রহের শিকার মৌসুমী গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।

পুলিশ ও মৃতের পরিবার জানায়, জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা ও মাথা ব্যথায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে মৌসুমী ২১ মে একটি ট্রাকে চড়ে গাজীপুর থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে তার মৃত্যু হলে ট্রাকচালক মরদেহটি রংপুরের তাজহাট এলাকায় রাস্তার ওপর ফেলে দেন। পরদিন ২২ মে সকালে তাজহাট থানা পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠান। তাজহাট থানা পুলিশ পরে ঠিকানা জানতে পেরে পাটগ্রাম থানা পুলিশের মাধ্যমে পরিবারকে খবর দেয়। মেয়েটির বাবা গোলাম মোস্তফা রংপুর মেডিকেলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন। কিন্তু বাড়িতে না নিয়ে লাশবাহী গাড়ি চালককে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে আঞ্জুমান মফিদুলে মরদেহটি দাফনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু গাড়িচালক এ কাজটি না করে ২২ মে রাতে মরদেহ ফেলে দেয় তিস্তা নদীতে। ২৪ মে রাতে মরদেহটি তিস্তা নদীর ভাটিতে আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধান এলাকায় নদী তীরে আটকে যায়।

মৃত মৌসুমী আক্তারের বাবা গোলাম মোস্তফা জানান, করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ায় তিনি মেয়ের মরদেহ গ্রামে নিয়ে দাফন করতে চাননি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রতিবেশীদের জানালে তারাও এর অনুমতি দেয়নি। তিনি বলেন, ‘লাশবাহী গাড়িচালক অপরিচিত। তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। ভাবিনি তিনি আমার মেয়েকে দাফন না করে তিস্তা নদীতে ভাসিয়ে দিবেন। পুলিশ আমার ভুল ভেঙে দিয়েছে। তাই স্থানীয়দের হুমকি উপেক্ষা করে মেয়ের মরদেহ নিয়ে যাই এবং পুলিশের সহযোগিতায় গ্রামেই দাফন করি।’

লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আবিদা সুলতানা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঈদের দিনেও পুলিশকে মরদেহটি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। বৃষ্টিতে ভিজে মরদেহটি উদ্ধার, জানাজা ও দাফন সবকিছুই পুলিশকে করতে হয়েছে। আদিতমারী থানা পুলিশ পালন করেছে মানবিক ভূমিকা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মেয়ের বাবা ও পরিবারকে আশ্বস্ত করেছি সব ধরনের আইনি সহযোগিতা দেয়ার। গ্রামে কেউ যেন তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে না পারে সেজন্য পুলিশ স্থানীয়দের সচেতন ও সতর্ক করেছে।’ পুলিশের এ অসাধারণ কাজটির জন্য পুরো জাতির পক্ষ থেকে তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়। একই সঙ্গে এটিও উপলব্ধি করা যায় যে করোনা মানবিক সম্পর্কগুলোকে কতোটা অমানবিক করে তুলেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ লাশবাহী গাড়িচালকরা মানবতার ন্যূনতম বর্ণটাও ভুলে গিয়ে একটি লাশকে পানিতে ফেলে দিয়ে যেতে পারে।

আসুন এবার মুদ্রার উল্টো পিঠটার কথাও আমরা বিবেচনায় নিই। করোনার প্রাদুর্ভাব হবার পর সরকার জনগণের পাশে থাকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ প্রণোদনা, ত্রাণ বিতরণ ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা প্রদান করার ক্ষেত্রে সরকারের এ উদ্যোগ অবশ্যই সর্ব মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। যেখানে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে উন্নত বিশ্ব করোনা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ বলতে গেলে শূন্য অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। সরকারের প্রচেষ্টার বাইরেও অনেক সাধারণ মানুষ হতদরিদ্র-দরিদ্র, নিম্নবিত্ত-দিনমজুরসহ সব মানুষের পাশেই যার যার সাধ্যমতো এগিয়ে আসছেন। একজন আশি ঊর্ধ্ব মহিলা তার হজের টাকা গরিব মানুষকে দিয়ে দিলেন। অনেক বেসরকারি সংস্থা ও সামাজিক সংগঠন নিজেরা নিজেদের সামর্থ্য থেকে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে বাসায় বাসায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। অনেকে স্থানীয়ভাবে হতদরিদ্র-দরিদ্র-দিনমজুর বা দুস্থদের পাশে রয়েছেন। এরই মাঝে নতুন ধরনের মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে শুরু করেছে। বহু মানুষ নিজেরা তাদের গ্রাম, পাড়া, মহল্লা বা এলাকাকে সুরক্ষিত করে রাখছে। এসব এলাকায় কেউ ঢুকতে পারে না-বেরোতেও পারে না। দেশের বাণিজ্য সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, যুব সংস্থা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইতাদির স্বেচ্ছাসেবা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। কেউ কেউ ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের ব্যবস্থাও করেছেন। এলাকা জীবাণুমুক্ত করা থেকে শুরু করে মাস্ক-সুরক্ষাসামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। মানুষ আবার প্রমাণ করছে-মানুষ মানুষের জন্যই।

প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রীর অভাব থাকায় বাংলাদেশের ডাক্তার ও নার্সদের মাঝে করোনায় সেবা দেবার বিষয়ে সংশয় ছিল হয়তো। কিন্তু যখনই ন্যূনতম সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা হয়েছে তখন অন্তত সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের ও পরিবারের ঝুঁকি নিয়েও রোগীদের পাশে থাকার এ মহতী প্রচেষ্টাকে একটি অসাধারণ মানবিক উদ্যোগ বলে মনে করা যায়। নারী পুরুষ-যুবা-বয়ষ্ক নির্বিশেষে বাংলাদেশের ডাক্তার ও নার্সদের এ অবদান জাতি অবশ্যই স্মরণ রাখবে। এটি অবশ্য শুধু বাংলাদেশে নয়, যে চীনে করোনার সূচনা সেখান থেকে সারা দুনিয়ার ডাক্তার ও নার্সরা এ মহাবিপদে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এদের অনেকে জীবন দিয়েছেন এবং তারা প্রতি মুহূর্তে বিপদের মাঝেই থাকছেন। তাদের একে অপরের মানবিক সম্পর্ক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ডাক্তারি বা নার্স শিক্ষা গ্রহণের সময় তারা ও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এখন এ রকম মহামারির সময়ে সেটি পূরণ করে তারা সেরা মানুষের পরিচয় দিচ্ছেন। যেসব ডাক্তার ও নার্স এখনও এই পথে পা দেননি তারাও আশা করি তাদের প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করে মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। এটি বস্তুত শুধু একটি চাকরি নয়। এটি বস্তুত মানবতার পাশে থাকা ও বিপন্ন মানুষের সেবা করা। সব পেশায় থেকে এই অসাধারণ কাজ করা সম্ভব হয় না।

ডাক্তারদের মতোই বিপদ মাথায় নিয়ে ব্যাংক, ডাক বিভাগ, ইন্টারনেট কর্মী, টেলিকম কর্মী, বিদ্যুৎ বিভাগ, টেলিফোন সেবা দানকারী, ই-কমার্স, ওষুধসহ জরুরি পণ্য সরবরাহ ও বিতরণ অব্যাহত রাখার কাজে নিয়োজিত ইত্যাদি বিভিন্ন খাতের কর্মীরা জরুরি অবস্থায় জনগণকে জীবন বাজি রেখে সেবা দিচ্ছে। আমি একটি খবর শুনে বিস্মিত হয়েছি যে আমার ডাক বিভাগের মহিলা ড্রাইভাররা (এমনকি গর্ভবতী অবস্থাতেও) গাড়ি চালিয়ে বিনামূল্যে জেলায় জেলায় চিকিৎসা ও সুরক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা ডাকঘর খুলে সাধারণ মানুষকে ডাক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনের টাকা দিয়েছেন। তারাই আবার ফসলের খেত থেকে শাকসবজি-ফলমূল বিনামূল্যে বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে। টেলিফোনের বা ইন্টারনেটের লাইনম্যানরা ভয়কে জয় করে তাদের সেবা অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থাতে নিরলস কাজ করছেন কৃষিকর্মীরা। বিশেষ করে ধানকাটার সময়ে তারা জীবন বিপন্ন করেও খেতের ধান কেটে দিয়েছেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মীরা বিনাশ্রমে কৃষকের খেতের ধান কেটে দিয়ে মানবতার নতুন নজির স্থাপন করেছে। কোন কোন মাঠে কৃষকের বাদাম তোলার কাছে তরুণদের বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে দেখলাম। সেখানে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রলীগের মেয়েদেরকেও অংশ নিতে দেখা গেল। এই সময়ে দিনে রাতে শ্রম দিয়ে ধান কাটায় যারা নিযুক্ত ছিলেন তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। অত্যন্ত চমৎকারভাবে আমাদের আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করছে। বিপন্ন মানুষের কাছে তারাই হয়ে উঠেছে আশ্রয়স্থল।

সরকার পুরো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বীমা ছাড়াও জরুরি কাজে নিয়োজিতদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণাও দিয়েছে।

যদি আমরা সামগ্রিক অবস্থার ব্যাখ্যা করি তবে এ কথা বলতেই হবে যে বিশ্বজুড়ে বিরাজিত এই মহাদুর্যোগ থেকে অবশ্যই আমরা পরিত্রাণ পাব। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সেই বাণীটা আমাদের স্মরণ রাখা দরকার। তিনি বলেছেন যে, বাঙালি বীরের জাতি এবং এবারও আমরা বিজয়ী হবো। আমাদের সবার বিশ্বাসও তা-ই।

ঢাকা, ২৭ জুন ২০২০

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-বিজয় ডিজিটাল শিক্ষার প্রণেতা]

mustafajabbar@gmail.com