• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০, ৯ জিলহজ ১৪৪১, ৩১ জুলাই ২০২০

করোনা আতঙ্ক ও গুজব

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

| ঢাকা , সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০

সারা বিশ্ব লকডাউন হয়ে গেছে করোনা নামক ভাইরাস প্রতিরোধে। মরণব্যাধি করোনা দ্রুত অগ্রসরমান, তাই করোনাজনিত রোগের প্রভাবে মানবসমাজ হুমকির মুখে। সারা বিশ্বের ১৯৩টি দেশ করোনা ছোবলে নিপতিত। করোনা নামক ভাইরাসজনিত রোগটির কোন প্রতিষেধক নাই, তাই এর প্রতিরোধ করাটাই জরুরি। তবে অগ্রসারমান করোনার কবল থেকে মানুষের সচেতনতাই পারে মানুষকে এবং গোটা সমাজকে রক্ষা করতে। করোনার সম্পর্কিত বিষয়গুলো মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। আবার এই আতঙ্ককে পুঁজি করে গুজবও রটানো হচ্ছে। কোনটা গুজব কোনটা আতঙ্ক এই দুটি বিষয়ও পৃথকভাবে সঙ্গায়িত করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যেই সারা বিশ্বে ছয় লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৩০ হাজার। এই তথ্যটিও এক ধরনের আতঙ্ক ছড়ায়। আবার এই তথ্যকে অনেকে ভুল বলছে এবং বিশ্ব মিডিয়ার কারসাজি বলছে- এ রকম কথা গুজব রোধ করছে না করোনা বিস্তারে সহায়তা করছে- তা ভাবা প্রয়োজন।

রাজশাহীর নিউমার্কেটে এক আড্ডায় (সম্প্রতি দোকানপাট বন্ধ হওয়ার আগে) এক ব্যক্তি বলেছেন, বিশ্বে যে করোনা আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে বলে খবর আসছে তা সঠিক নয়। এটাও একটা কারসাজি। এ আড্ডা যেখানে হয় সেখানেও বহু লোক বসেন। তাছাড়া তিনি আরও বলেছেন, আমাদের শরীর ফরমালিনযুক্ত খাবার খেতে খেতে এমন হয়েছে যে, করোনার বাপও ঢুকতে পারবে না। সুতরাং কেউ ভয় পাবেন না। সম্প্রতি সরকার সব কিছু বন্ধ করার ঘোষণার সময় তিনি বললেন, সরকার এটা ঠিক করেনি।

উল্লেখিত কথাগুলো- গুজব, আতঙ্ক, না মানুষকে আশ্বস্ত করার কথা, না গোপনে করোনা ছড়ানো একটি প্রক্রিয়া, যিনি এই তথ্যগুলো প্রদান করেছেন তিনি নিজেকে অনেক প্রাজ্ঞ মানুষ হিসাবে দাবি করেন। বাংলাদেশব্যাপী এমন প্রাজ্ঞের সংখ্যা কিন্তু কম না। এই প্রাজ্ঞদের কথা বিশ্বাস করার মতো অনুসারীরও অভাব নেই। রাজশাহী মহানগরীর মহাসড়কগুলো ফাঁকা, সব বিপণিবিতান বন্ধ, হোটেলসহ কোন খাবার বা চায়ের দোকান পর্যন্ত খোলা নাই। তবে মহল্লা বা পাড়াগুলোতে বড় রাস্তাগুলোর অবস্থা ভিন্ন। বিপণিবিতান এবং অফিস আদালত বন্ধ থাকায় এ গলি গুপছি পাড়া-মহল্লায় চলছে ঈদের আমেজ। এ বাসায় ও বাসায় বেড়ানোসহ নানা পদের তরকারি রান্না চলছে, সেই সঙ্গে চলছে পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার বিনিময়। মানুষ যদি নিজ থেকে সচেতন না হয় তবে তাকে সচেতন করার কাজটি কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর রেকর্ড করা একটি ভিডিও সেই দেশের বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচার করা হচ্ছে। তার কথার মমার্থ হচ্ছে, করোনাকে ছোট করার দেখার বিষয় নয়, এটা মারাত্মক ব্যাপার, তাই হেলাফেলা করার সুযোগ নাই, সবাইকে হোম কোয়ারেন্টিনে খাকাটা জরুরি। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু আতঙ্ক ছড়াছেন না। তিনি সবাইকে সতর্ক করার জন্য যা করা দরকার তাই বলছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলছেন, দেশবাসীকে ২১ দিন যথাযথভাবে লকডাউন পালন করতে হবে নইলে দেশ ২১ বছর পিছিয়ে যাবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও দেশটিতে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন না।

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ হলো- ভারত, নেপাল, ভুটান এবং মায়ানমার। একমাত্র মায়নমার ছাড়া বাংলাদেশ থেকে বাকি তিন দেশের প্রতিদিনের সংবাদ শোনার ব্যবস্থা আছে। করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর প্রায় দেড়শ’ কোটির জনসংখ্যার দেশ ভারতকে সরকার লকডাউন করে দিয়েছে। নেপালে দুজন করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের মানুষ হোম করোয়েন্টিনে চলে গেছে। সুতরাং এগুলো গুজব বা আতংক ছড়ানোর উদাহরণ নয় এটা সচেতন করার জন্য প্রচার জরুরি। কারণ করোনা প্রতিরোধে গৃহে অবস্থান ব্যাতীত কোন প্রতিকার নেই। তাই সারা বিশ্বের ইতিবাচক বিষয়গুলো প্রচারের মাধ্যমে করোনার ধাবমান করাল থাবা থেকে দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। করোনা আক্রান্ত বা মৃত্যুর সংখ্যা প্রচার করাটা আতংক ছড়ানো না, সঠিক তথ্য পেলে মানুষ সজাগ হয়ে যাবে। বরং করোনা আক্রান্ত বা মৃত্যর খবর চেপে যাওয়াটাই হবে গুজব কারণ এর ফলে মানুষ অতি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে আর করোনার বিস্তার বাড়বে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত করোনা আক্রান্ত এবং ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়ে যে তথ্যগুলো প্রাচরিত হয়েছে তার ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ ঘটিয়েছেন প্রবাসীরা। তাই চীনসহ বিশ্বের দু-একটি দেশে যখন করোনার সংক্রমণ ঘটেছিল তখন দেশের গণমাধ্যম গুলি এবং সরকারের পক্ষ থেকে করোনার ভয়াবহতার চিত্রটা তুলো ধরার প্রয়োজন ছিল। আর করোনা যে আমাদের দেশের কোন ভাইরাস না এটা বিদেশি ভাইরাস এবং ছড়ানোর একমাত্র পথ হলো মানুষের মাধ্যমে এই বিষয়টি সম্পর্কে তখন থেকে দেশবাসীকে সচেতন করা হলে আজকের মতো কঠিন অবস্থা হতো না। এটা করা হলে প্রবাসীরা দেশে ফিরেছে যখন তখন স্থানীয়ভাবে মানুষ তার কাছ থেকে দূরে সরে যেত এবং প্রবাসী বাধ্য হয়ে নিজেই নিজেকে স্বেচ্ছায় কোরায়েন্টিনে নিয়ে যেতেন। আর এটা হলে এখন যে community transfusion নামক এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে তার প্রয়োজন হতো না। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে একটা প্রবাদ আছে, এখন হয়ত আমাদের মাথায় অনেক বুদ্ধি আসছে কি করলে করোনার বিস্তার রোধ করা যেত। চীনে সংক্রমণের সময় ভাবা উচিত ছিল করোনা বিষয়টি নিয়ে, আমরা যেহেতু সারা বিশ্বকে গ্লোবাল ভিলেজ বলি। চীনের করোনা সংক্রমণের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেকেই ধর্মের মোড়কে বির্তকের সৃষ্টি করেছিলেন, যেটা ছিল নিছক গুজব, ওই গুজব প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি সেই সময়। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম। ওই সময় অনেকেই বলে বেড়িয়েছেন, মুসলিমদের ওপর চীনাদের অত্যাচারের ফল হিসেবে চীনাদের ওপর গজব নাজিল হয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের কাছে করোনাটা মারাত্মক কোন বিষয় ছিল না। এ ধরনের ধর্মীয় গুজবে করোনার মতো মরণ ব্যাধি ভাইরাসটি বাংলাদেশে সম্প্রসারিত হয়েছে দ্রুত। কোনটি গুজব, কোনটি আতঙ্ক, এই বিষয়টি নির্ধারণ করা সচেতন প্রতিটি মানুষেরই দায়িত্ব। তাই কোন ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্টেটাস দিচ্ছে তাদের সতর্ক করে দেয়া উচিত। ভারতে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর ফেসবুকে দেখা যায় একজন বলেছেন, মোদি করোনায় আক্রান্ত (যদিও স্বল্পক্ষণ পরেই এই স্টেটাসটি খুঁজে পাওয়া যায়নি)। চীনে করোনার করাল থাবার সময় সারা দেশে করোনাভাইরাসটি নিয়ে চলে এক ধরনের হাসি তামাসা। এর ফলে এর ভয়াবহতার বিষয়টি জনগণের কাছে অনেকাংশে কমে যায়। তাই এখন রাস্তায় পুলিশ আর্মি নামিয়ে সামাজিক দূরত্ব এবং মাস্ক পড়ার বিষয়ে পথচারীকে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটাতে হচ্ছে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার এসিল্যান্ড রোমেন শর্মা তার নেয়া উদ্যোগটির কারণে দেশবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে গেছেন। তিনি খাবারের দোকান, যত্রতত্র আড্ডা বন্ধসহ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মাস্ক পরার বিষয়টিতে মানুষকে বাধ্য করিয়েছেন। তার এ ধরনের উদ্যোগটির ফলে Community transfusion বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রোমেন শর্মার মতো সারা দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করে মানুষকে গৃহান্তরীণ করতে পারলে করোনা বিস্তার রোধ করা সম্ভব। গত ২৬-৩-২০ তারিখে একটি চ্যানেলে জনপ্রতিনিধিরা (এমপি) কেন এই দুঃসময়ে জনগণের পাশে নেই, শীর্ষক একটি সংবাদ পরিবেশ করা হয়। যে সংবাদটি করোনা বিস্তার রোধে একটি অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কারণ একজন জনপ্রতিনিধি (এমপি) যখন রাস্তায় মানুষকে সচেতন করার জন্য হাটবেন তখন তার সঙ্গে কমপক্ষে ৮-১০ মানুষ থাকবে আর এই ৮-১০ জন মানুষ কি নিজেদের মাঝে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলতে পারবেন। করোনা বিস্তার রোধে সমাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করাটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই এই বিষয়টিকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নাই। স্টান্ডবাজি করে জনপ্রিয় হওয়ার সময় এখন না। কারণ ২৫-৩-২০ তারিখে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছয় মাসের জন্য শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পান। তার মুক্তির সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে জনসমাগম ঘটে তাতে সামাজিক দূরত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মানা সম্ভব হয়নি। এই অবস্থায় সংসদ সদস্যরা রাস্তায় নামলে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি নাজুক হয়ে পড়বে। তাই করোনা রোধে সবাইকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। জনপ্রিয়তার বিষয়টি এখানে মুখ্য না।

সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং ব্যক্তির একক গৃহান্তরীন থাকার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব।

[লেখক : কলামিস্ট]