• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৬ ফল্গুন ১৪২৬, ২৪ জমাদিউল সানি ১৪৪১

এদেশে চাকরির সঙ্গে শিক্ষার মিল নেই

সাধন সরকার

| ঢাকা , শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০

আমার এক বন্ধু বাংলা বিষয়ে ছয়-সাত বছর ধরে পড়াশোনা (অনার্স-মাস্টার্স) করে এখন চাকরি করছেন ব্যাংকে। আরেক বন্ধু ইতিহাসে পড়ে এখন মস্ত বড় পুলিশ অফিসার। অন্য এক বন্ধু পড়েছেন পদার্থ বিজ্ঞানে, চাকরি করছেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে। আরেক বন্ধু পড়েছেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশলে, চাকরি করছেন ‘বিএডিসি’তে। এ রকম শত শত উদাহরণ দেয়া যাবে! বাস্তবতা হলো, এদেশে চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষার মিল নেই! এখনকার শিক্ষিত তরুণেরা তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। একজন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে পাঁচ-ছয় বছর ধরে পড়াশোনা করে ভালো ফলাফল করার পরও নিজের পছন্দমতো চাকরি পাচ্ছেন না। চাকরির আশায় আবার আলাদাভাবে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে চাকরির পড়াশোনা করতে হচ্ছে। ভালো চাকরির আশায় অনেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে চাকরির পড়াশোনার জন্য আবার কোচিংয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন। বাস্তবতা হলো, এখন চাকরির বাজার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে সনাতনী পদ্ধতিকে আকড়ে ধরে পড়ে থাকলে এগিয়ে যাওয়া এখন আর সম্ভব নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমান বাস্তবতা ও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলায়নি শিক্ষাব্যবস্থা! নিজের পছন্দের বিষয়ে দীর্ঘসময় ধরে (পাঁচ-ছয় বছর) পড়ালেখা শেষ করার পর একজন চাকরিপ্রত্যাশী বেকার তরুণ যদি চাকরি না পায় তার মানসিক অবস্থা শুধু সেই বলতে পারবে!

একজন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে রাষ্ট্রকে অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। আর সেই পড়াশোনা তথা শিক্ষার সঙ্গে যদি চাকরির মিল না থাকে তাহলে সেই বিনিয়োগ যথাযথভাবে কাজে আসে না। নিজের পছন্দের বিষয় বা পছন্দ মতো চাকরি না পেয়ে অনেকে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। অনেকে আবার প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে না পেরে অপছন্দের চাকরি বরণ করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু যদি যে যার অনার্স-মাস্টার্সের বিষয় বা নিজের নির্দিষ্ট পড়ালেখার বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি পেত বা পর্যাপ্ত চাকরির ক্ষেত্র থাকত তাহলে সে নিজের অভিজ্ঞতা ও সেরাটা রাষ্ট্রকে দিতে পারত। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের কর্মী দরকার সে অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে না। ফলে গ্র্যাজুয়েটরাও তাদের চাহিদামতো চাকরি পাচ্ছেন না। চাকরির বাজারের সঙ্গে যদি শিক্ষার সমন্বয় হতো তাহলে তরুণদের যথোপযুক্ত কর্মসংস্থান যেমন নিশ্চিত হতো তেমনি সব ধরনের তরুণের মেধা কাজে লাগিয়ে দেশ এগিয়ে যেত। যদি একজন তরুণ পড়ালেখা শেষ করার পরপরই তার নিজের বিষয় সংশ্লিষ্ট (যে বিষয়ে পড়াশোনা) চাকরি পেত তাহলে তাকে আলাদাভাবে আর চাকরির পড়াশোনা করতে হতো না। দুঃখের বিষয় হলো, পড়াশোনা শেষ করার পর এদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে চাকরির পড়া পড়তে হয়। তা না হলে ভালো চাকরি পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই! চার-পাঁচ বছর ধরে চাকরির পড়া তথা প্রস্তুতি নেয়ার ফলে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের জীবনের সোনালি সময় নষ্ট হচ্ছে। তরুণরা যদি পড়াশোনা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চাকরি পেত তাহলে রাষ্ট্রকে তারা নিজের তারুণ্যদীপ্ত মেধা ও সময় দিয়ে আরও বেশি অবদান রাখতে পারত। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহে পড়ালেখা শেষ করে তরুণদের আলাদাভাবে চাকরির প্রস্তুতি নিতে এত বেশি (প্রায় তিন-পাঁচ বছর) সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয় না। আমাদের দেশে দেখা যায়, সাধারণ একটি পদের চাকরির পরীক্ষায় শত শত এমনকি হাজারেরও বেশি প্রার্থীর আবেদন জমা পড়ে। আবার দেখা যায়, কোনো কোনো পদে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যায় না! প্রশ্ন হলো, চাকরি পাওয়ার জন্য সব তরুণদের কেন একই বিষয় (চাকরির জন্য একই ধরনের প্রস্তুতির পড়া) পড়তে হবে। একই বিষয় পড়ে কী তরুণরা একই চাকরি করে ? একজন শিক্ষার্থীর একটি বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স করার ফলে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা হয়। বলা চলে একেক শিক্ষার্থী একেক বিষয়ে (নিজ নিজ বিষয়ে) দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। এমনটি নয় যে, চাকরির প্রস্তুতির পড়া একজন চাকরিপ্রত্যশীর চাকরি পাওয়ার পর তা খুব বেশি দিন মনে থাকে! বাস্তবতা হলো, চাকরির প্রস্তুতির পড়া চাকরি পাওয়ার পর তা আর মনেও থাকে না, আবার খুব বেশি কাজেও আসে না! তবে নিজের অনার্স-মাস্টার্সের বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সবারই কম-বেশি মনে থাকে ও কাজে লাগানো যায়। পড়ালেখা শেষে আলাদাভাবে চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার ফলে তরুণদের জীবনীশক্তি কিছুটা হলেও ক্ষয়ে যায়! আমাদের দেশে চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তর (চার ধরনের- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ) ও গ্রেড (২০ ধরনের) তৈরি করা হয়েছে। দরকার ছিল সব কাজ বা শ্রমকে সমান গুরুত্ব দেয়া বা চাকরির গ্রেড তথা স্তরের ব্যবধান খুব কম রাখা। কেননা অফিসের কোন কাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ আবার একজন বর্জ্য শ্রমিকের কাজটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সহজ কথায়, বর্তমান বাস্তবতায় কোন কাজ বা শ্রমকে খাটো করে দেখলে চলবে না। শিক্ষিত বর্জ্য শ্রমিক, শিক্ষিত বাস চালক, শিক্ষিত পিয়ন, শিক্ষিত কৃষক হলে ক্ষতি কী? বিদেশে কোন কাজকে ছোট মনে করা হয় না। দেখা যায়, আমাদের দেশে পড়ালেখা শেষ করার পর চাকরির সুযোগ থাকলেও বড় চাকরির আশায় অনেকে ছোট চাকরির পেছনে ছুটতে চায় না। ফলে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতি নিতে শিক্ষিত বেকার তরুণদের সময় ও অর্থ নষ্ট হয়। যদি চাকরির স্তর ও গ্রেডের ব্যবধান কম হতো তাহলে এমনটি কমে আসত।

চাকরির সঙ্গে শিক্ষার মিল না থাকার কারণে মেধাবী তরুণরাও সঠিক সময়ে চাকরি পাচ্ছেন না। দীর্ঘ সময়ব্যাপী বেকার থাকছেন। তথ্য মতে, দেশের শিক্ষিত তরুণদের এখন এক তৃতীয়াংশ বেকার। প্রশ্ন হলো, শিক্ষিত তরুণদের এক তৃতীয়াংশ যদি বেকার থাকে তাহলে সে শিক্ষাকে বা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কি মানসম্মত ও যুগোপযোগী বলা যায়? চাকরির সঙ্গে শিক্ষার মিল না থাকায় এদেশে দক্ষ কর্মীর ব্যাপক অভাব রয়েছে। বিদেশ থেকে উচ্চ বেতন দিয়ে বিদেশি কর্মীদেও দেশে আনতে হচ্ছে অথচ দেশে বেকাররা চাকরি পাচ্ছে না। গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষার মান নিয়ে এখন অনেক কথা হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় এদেশের শিক্ষার মান ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় হয়েছে। পরিমাণগত নয়, গুণগত শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাস্তবতা হলো এখন গ্র্যাজুয়েট আছে, কিন্তু বর্তমান বাজারের চাহিদা অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েট ও দক্ষ লোক নেই! তাই এখনই কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় করে গ্র্যাজুয়েট তৈরির পাশাপাশি এ ব্যাপারে গবেষণা করতে হবে। দেশে কোন কোন বিষয় বা ক্ষেত্রের চাহিদা রয়েছে এ ব্যাপারে গবেষণা করে সে অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে গ্র্যাজুয়েট তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। তারুণ্যের মেধা কাজে লাগাতে বিভিন্ন দেশের পদ্ধতি, পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। একজন গ্র্যাজুয়েট যাতে পড়ালেখা শেষ করার পরপরই নিজের বিষয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চাকরি পায় সে ব্যাপারে তরুণদের নিশ্চয়তা দিতে হবে, তা না হলে তারুণ্যের মেধা যেমন কাজে লাগানো যাবে না তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগের পুরোপুরি সুফলও আসবে না।

[লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)]

sadonsarker2005@gmail.com