• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮, ১ আষাঢ় জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৯ রমজান ১৪৩৯

একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস

আবদুল লতিফ সিকদার

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ মার্চ ২০১৮

image

বঙ্গবন্ধুর হস্তলিখিত ও স্বাক্ষরিত অমর বাণী

পূর্বকথা

একাত্তরের ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের সময় ”ট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে অ্যাসিস্ট্যান্ট কালেক্টরের পদে কর্মরত ছিলাম। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব আয়ের (মোট রাজস্বের আশি শতাংশেরও বেশি) শুল্ককর আহরণের দুটি কেন্দ্র করাচি ও চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থিত কাস্টম হাউসের অন্যতম ”ট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। সেই সুবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত অসহযোগ কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ খাজনা ট্যাক্স আদায় সম্পর্কিত ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচি সর্বাত্মক নিষ্ঠার সাথে পালন করার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতার কথা এখনও মনে পড়ে।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ অধ্যায় রচিত হয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাস্তব অবয়বে রূপলাভ করার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেছি এ সময়কে আমি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বলে গণ্য করি। একই সাথে এটা একটা দুঃসময়ের কালও ছিল। ইংরেজ কথাসাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের ভাষায় বলতে পারি ‘‘It was the best of times, it was the worst of times”| “Best of times” এই অর্থে যে বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন পৃথিবীর বুকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রত্যক্ষ করার আনন্দ। আর “worst of times” এই অর্থে যে লাখো শহীদের রক্তস্রোত এবং অগণিত গণমানুষের অশ্রুধারার বিনিময়ে এই অর্জন। একদিকে নিজস্ব স্বদেশ ভূমির অভ্যুদয় হতে দেখার আনন্দ উত্তেজনা, অন্যদিকে পদে পদে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকার দুঃসহ যন্ত্রণা।

সত্তরের সাধারণ নির্বাচনী গণরায়ে বঙ্গবন্ধু ছয় দফার পক্ষে ম্যান্ডেট লাভ করে। দেশের এই অঞ্চলের স্বাধিকার সংবলিত সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একাত্তরের ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল। দেশবাসী তাদের হতবাক করে দিয়ে পয়লা মার্চ দুপুর একটায় অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রচারিত ঘোষণা দ্বারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সেই অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সাথে সাথে সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষ অগ্নিগর্ভ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। সে সময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে কমনওয়েলথ একাদশ ও পাকিস্তান ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড একাদশের মধ্যে অনুষ্ঠিত খেলাকে প- করে তাবুতে অগ্নিসংযোগ করে হাজারো দর্শক বাইরে বেরিয়ে আসে। ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণা মানি না মানি না’ স্লোগানে মুখরিত লাখো জনতার বিক্ষুব্ধ মিছিলে সামিল হয়ে মতিঝিলের যেখানে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় খসড়া শাসনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা চলছিল সেই হোটেল পূর্বাণীর সামনে সমবেত হয়। সভা থেকে বেরিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু সংসদ অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণাকে নিন্দা জানিয়ে এর প্রতিবাদে পরদিন থেকে ৬ মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মহাসমাবেশে পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার কথা বললেন। পাঁচ দিনের কঠোর হরতাল কর্মসূচি পালন শেষে এলো ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক গণমানুষের মহাসমাবেশ। মঞ্চে দাঁড়িয়ে একক বক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বভাব সুলভ বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলো উনিশ মিনিটের সেই অলিখিত অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভাষণে। যে ভাষণ আজ পৃথিবীর আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করা (speeches that inspired history)৪১টি শ্রেষ্ঠ ভাষণের অন্যতম ভাষণ এবং আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল। এই ভাষণের নির্দেশমূলক অংশে বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হয় ততদিন খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হলো, কেউ দেবে না।’ পরদিন ৮ মার্চ আওয়ামী লীগ যে ১০টি নির্দেশ জারি করে তার প্রথমটিই এই খাজনা ট্যাক্স আদায় বন্ধ রাখা সম্পর্কিত।

শুল্ককর আদায়ের নতুন ব্যবস্থা

৮ মার্চ সকাল থেকেই কাস্টম হাউসে গিয়ে জানলাম আমদানিকারক ও তাদের এজেন্টরা শুল্ককর পরিশোধ না করে পণ্য খালাস দেয়ার দাবি শুরু করছেন। এ দাবির সমর্থনে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শেষ দিকে নির্দেশমূলক অংশের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। এ দাবির প্রেক্ষিতে কালেক্টর সাহেব সিনিয়র অফিসারদের নিয়ে এক বৈঠকে বসলেন। সে সময়ে কাস্টম হাউসের প্রধান নির্বাহী কালেক্টর অব কাস্টমস জনাব ওয়ালিউল ইসলাম একজন সজ্জন, অমায়িক ও কঠোর প্রকৃতির এবং দ্বিতীয় নির্বাহী ডেপুটি কালেক্টর এম. এ. কাইউম সাহেব সততা ও সাহসে অতুলনীয় হলেও, উভয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক ক্ষেত্রেই দোদুল্যমানতা ও দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। বৈঠকে অনেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমত এ দাবি মেনে নিয়ে শুল্ককর আদায়ের পরিবর্তে শুধু দাবিনামা জারিপূর্বক মুচলেকার ভিত্তিতে পণ্য খালাস দেয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। জামায়াতপন্থি একজন সহকারী কালেক্টরসহ অখন্ড পাকিস্তানের ঘোর সমর্থক পাকিপন্থী কয়েকজন এ দাবি ও নির্দেশ অমান্য করে শুল্ককর আগের মতো আদায়ের পক্ষে অটল থাকতে বললেন। আমি দু’পক্ষের মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললাম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যখন দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তখন এই নির্দেশের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করা সত্ত্বেও মনে হয় খাজনা ট্যাক্স বলতে কোনক্রমেই আমদানি শুল্ক ও বিক্রয় কর বোঝানো হয়নি, জমির খাজনা ও স্থানীয় কর বোঝানো হয়েছে। কাজেই আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ককর আদায় করা আমাদের আইনগত দায়িত্ব হবে। তবে যেহেতু ভাষণের অন্য একটি নির্দেশে পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে কোন অর্থ চালান নিষেধ করা হয়েছে সেই কারণে রাজস্ব কিভাবে আদায় ও জমা করা হবে সেই ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ দুইজন এমএনএর (জাতীয় পরিষদ সদস্য) মাধ্যমে আমি নীতি নির্ধারকদের মতামত জানতে পারবো বলে বৈঠকে জানালাম। এদের মধ্যে একজন ষাটের দশকে বরিশাল বিএম কলেজে অধ্যায়নকালে একজন উদীয়মান ছাত্রলীগ নেতা। আমার তত্ত্বাবধানে পরিচলিত বিএম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের বরিশাল শহরে অবস্থিত বাড়িতে Aswini Kumar Students Home নামক সকল ধর্মের ছাত্রদের কসমোপলিটন ছাত্রাবাসে আমার একজন প্রিয় আবাসিক ছাত্র। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ২৭ বছর বয়সী কনিষ্ঠতম সদস্য ভোলার তোফায়েল আহমেদ। আর অন্যজন মঠবাড়িয়া স্কুলে আমার সহপাঠী অন্তরঙ্গ সুহৃদ রাজনীতি সচেতন, দশম শ্রেণীতে থাকার সময় যাকে ১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বের হওয়া ছাত্রদের মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ঢাকা হলের একজন firebrand ছাত্রলীগ নেতা, ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে স্বৈরশাসক আইউব খানের পোষ্য গভর্নর মোনায়েম খানের আগমন প্রতিহত করে কনভোকেশন পন্ড করে দেয়ার অভিযোগে যার এমএ ডিগ্রি বাতিল করা হয়েছিল বরগুনার আসমত আলী সিকদার, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩১ বছর বয়সী তরুণতম সদস্য। এই বাস্তবসম্মত প্রস্তাব সমর্থিত হলে সেদিন বিকেলের মধ্যেই আমি আসমত আলির সাথে তার ঢাকার মনিপুরিপাড়ার বাসায় টেলিফোনে যোগাযোগ করে কাস্টম হাউসে বিদ্যমান সংকটময় অচলাবস্থা অনতিবিলম্বে নিরসনের প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে সক্ষম হলাম। তোফায়েল আহমেদকে পাওয়া গেল না। যাই হোক, আসমতের পরামর্শ ছিল চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বয়কারী এমএনএ জনাব এম আর সিদ্দিকীর সাথে দেখা করে বিষয়টি তার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কিংবা তাজউদ্দীন আহমদের সাথে আলোচনা করে অনুমোদন করে নেয়াই সঠিক হবে। কারণ, এসব বিষয়ে ইতিমধ্যেই তারা ১০টি নির্দেশনামা জারি করেছেন, যার প্রথমটিই হচ্ছে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ রাখার নির্দেশ। “No taxation without representation “ অর্থাৎ কোন প্রতিনিধিত্ব ব্যতীত কোন কর নয় রাষ্ট্রনীতির আলোকে পাকিস্তান সরকারে বাংলাদেশের কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এখানে তারা কর আরোপ ও আহরণের বৈধ কর্তৃত্ব হারিয়েছে। এই পরামর্শ মোতাবেক কালেক্টর ওয়ালিউল ইসলাম সাহেব ডেপুটি কালেক্টর কাইউম সাহেব এবং আমাকে জনাব এম আর সিদ্দিকী সাহেবের সাথে আলোচনা করার দায়িত্ব দিলেন। ৯ মার্চ সকালেই আমরা এম আর সিদ্দিকী সাহেবের বাটালী হিলসের বাসায় হাজির হয়ে দেখলাম সেখানে অনেক দর্শনার্থী জরুরি নির্দেশের জন্য উপস্থিত। এমনকি আর্মি ও ন্যাভির দুইজন কর্মকর্তা এসেছেন তাদের খাদ্যবাহী ট্রাক চলাচলের ক্ষেত্রে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর আমাদের ডাক পড়লো। আমাদের বক্তব্য শুনে তিনি বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে সাথে সাথেই জনাব তাজউদ্দীন আহমদের সাথে টেলিফোনে কথা বললেন। জনাব তাজউদ্দীন আমদানি শুল্ককর বিষয়ে আমাদের অভিমত অনুমোদন করে বললেন আদায়কৃত শুল্ককর পাকিস্তানে প্রেরণ করা যাবে না। তাহলে এই রাজস্বের ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হবে সে ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বললেন। সিদ্দিকী সাহেব পরদিন অর্থাৎ ১০ তারিখ এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবসহ দেখা করতে বললেন। কাস্টম হাউসে আবার বৈঠক বসলো। আদায়কৃত রাজস্ব ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এর কাস্টম হাউসে অবস্থিত ট্রেজারি শাখায় জমা না হলে এ অর্থ কোথায় রাখা যায় তার কোন উপায় খুঁজে পাওয়া গেল না। এমন পরিস্থিতিতে আমি একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলাম। আমি জানতাম যে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং কর্পোরেশন নামক দুটি বাঙালি মালিকানাধীন ব্যাংক রয়েছে, যাদের হেড অফিস ঢাকায় অবস্থিত। কালেক্টর সাহেবের নামে (ব্যক্তিগত নামে নয়, পদের নামে) এই দুটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমোদন করা হলে সেই অ্যাকাউন্টের যে কোন একটিতে এই আদায়কৃত শুল্ককর জমা করার পর পণ্য খালাসের আদেশ দেয়া যাবে। ১০ মার্চ জনাব এম আর সিদ্দিকী সাহেবের সাথে দেখা করে এই প্রস্তাব পেশ করা হলে তিনি আমাদের অপেক্ষা করতে বললেন। প্রস্তাবটির সাথে তিনি একমত হলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ সাহেবের অনুমোদন আদায় করে আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বললেন। আমরা কিছু একটা লিখিত আকারে চাইলে তিনি জানালেন যে তাজউদ্দীন সাহেব দু’একদিনের মধ্যে অন্যান্য বিষয়ে নির্দেশের সঙ্গে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ গণবিজ্ঞপ্তি আকারে জারি করবেন বলে আমাদের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ১১ মার্চ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এই নতুন পদ্ধতিতে রাজস্ব আদায় ও জমাদান শুরু হয়ে গেল। ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে ৩৫টি নির্দেশ জারি করে বাংলাদেশের সমগ্র প্রশাসনভার গ্রহণ করেন তার মধ্যে ৫ নং নি¤œরূপ নির্দেশটি ইতোমধ্যে কাস্টম হাউসে গৃহীত পদক্ষেপকে অনুমোদন করে প্রদত্ত হয়েছে :

‘আমদানিকৃত সকল মাল দ্রুত খালাস করতে হবে। শুল্ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখাসমূহ কাজ করে যাবেন এবং ধার্যকৃত শুল্ক সম্পূর্ণরূপে পরিশোধের পর মাল খালাসের অনুমতি দেবেন। এ কাজ সমাধানের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংকিং কর্পোরেশন লিমিটেড ও ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডে বিশেষ অ্যাকাউন্ট খোলা হবে। কাস্টমস কালেক্টরগণ এই বিশেষ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করবেন। আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে যে সব নির্দেশ ইস্যু করবেন কাস্টমস কালেক্টরগণ তদানুযায়ী অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করবেন। যে শুল্ক আদায় হবে তা কোন মতেই কেন্দ্রীয় সরকারের নামে জমা হবে না।’

অনুরূপভাবে সেন্ট্রাল এক্সাইজ, বিক্রয় কর ও আয়কর সংক্রান্ত বিষয় ৩১ নং নির্দেশে উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে যে কেন্দ্রীয় সরকারের পরোক্ষ কর, যেমন, আবগারী শুল্ক, বিক্রয় কর, এখন থেকে কেন্দ্রীয় খাতে জমা করা যাবে না অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে হস্তান্তর করা যাবে না। এসব আদায়কৃত কর ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক অথবা ইস্টার্ন ব্যাংকিং কর্পোরেশনে ‘বিশেষ অ্যাকাউন্ট’ খুলে জমা রাখতে হবে এবং ব্যাংক দুটিও তাদের প্রতি প্রদত্ত নির্দেশ অনুযায়ী এগুলো গ্রহণ করবে। সকল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানকে এ নির্দেশ ও বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রতি যে নির্দেশ দেয়া হবে, তা মানতে হবে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সকল প্রত্যক্ষ কর, যেমন আয়কর, আদায় পরবর্তী নির্দেশ জারি হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ৩১ নং নির্দেশে আরো বলা হয় কোন খাজনা কর ভূমি রাজস্ব আদায় বন্ধ থাকবে, লবন কর ও তামাক কর আদায় করা যাবে না এবং তাঁতীরা আবগারী শুল্ক প্রদান ব্যতিরেকেই সুতা কিনবেন। এছাড়া প্রাদেশিক সরকারের প্রমোদ করসহ অন্যান্য কর আদায় করে বাংলাদেশ সরকারের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে। চট্টগ্রামে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তানের দুটি সেন্ট্রাল এক্সাইজ কালেক্টরেট এ সব নির্দেশ অনুসারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল কিনা জানতে পারিনি। তবে মনে হয় করে নি। কারণ, চট্টগ্রামে অবস্থিত অন্য কোন প্রত্যক্ষ কর বা পরোক্ষ কর অফিসকে মার্চ-পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে নিগৃহীত হতে হয়নি যেমনটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে হতে হয়েছিল।

২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ দিবসে’ কাস্টম হাউসে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি ‘পাকিস্তান দিবসের’ পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ দিবস’ হিসেবে পালন করার ঘোষণা করা হলো। এ ঘোষণার অনেক আগেই ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নাম ‘বাংলাদেশ’ হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন। সে বছর ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত তার মাজার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, আর পূর্ব পাকিস্তান নয়, আর পূর্ব বাংলা নয়। শেরে বাংলা ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের পক্ষ থেকে আমি ঘোষণা করছি, আজ থেকে বাঙালি জাতির এই আবাসভূমির নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। আর তখন থেকে ‘বাংলাদেশ’ নামটি আমাদের হয়ে গেল। বাংলাদেশ দিবসে দেশের সর্বত্র বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল সবুজের পতাকা উত্তোলিত হলো। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া দেশের কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উড়লো না। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে কাস্টম হাউসে ডিউটিরত ডিউটি অফিসার ডি কে বড়–য়া আমাকে ফোন করে জানালো যে একদল ছাত্রশ্রমিক মিছিল করে এসে কাস্টম হাউসের ছাদে ফ্লাগস্ট্যান্ডে বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন করতে চায়। কালেক্টর সাহেব কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে তাকে আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলেছেন। আমি বললাম, বাধা দিয়ে লাভ নেই। সারাদেশে দিবসটি যেহেতু ‘বাংলাদেশ দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে তখন তারা বাংলাদেশের পতাকা তুলতে চাইলে তুলতে দাও। এরপর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে বাংলাদেশের পতাকাই উড়েছে। বাংলাদেশের সকল বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় সেদিন ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হলো। বাসায় দৈনিক সংবাদ এবং অফিসে Pakistan Observer পত্রিকা দুটি রাখতাম। সংবাদসহ এই ইংরেজি পত্রিকাটিতেও সেদিন বাংলায় লিখিত ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামের ক্রোড়পত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল। ক্রোড়পত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত নিম্নরূপ হস্তলিখিত অমর বাণীটি লিপিবদ্ধ ছিল:

২৪ তারিখ যথারীতি কাস্টম হাউসে এসে বাংলাদেশের পতাকা দেখে মনে হল পাকিস্তানের এই অঞ্চলে বাংলাদেশ নামে একটি দেশ উদয় দিগন্তের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। কাস্টম হাউসে আদায়কৃত রাজস্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না হয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকে জমা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ৩৫টি নির্দেশ অনুসারে সমগ্র দেশের প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে, অথচ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ১৬ মার্চ থেকে ঢাকায় অবস্থান করছেন বাংলাদেশের একজন অতিথি হিসেবে। দেশের সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। প্রশ্ন হলো এই পতাকার গুরুভার শেষ পর্যন্ত আমরা বহন করতে পারবো তো? মনে মনে প্রার্থনা করলাম ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’ তিন সপ্তাহের অধিককালব্যাপী অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের তীব্রতায় পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসনযন্ত্র অকার্যকর ও অচল হয়ে গেলে দেশের শাসনভার বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে এলো। সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আদেশ নির্দেশ জারি ও তা বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে একটি সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা চালু হয়ে গেল। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া কার্যত (de facto) চূড়ান্ত কাঠামো ধারণ করেছে। এখন সঠিক সময়ে এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য একটি আইনগত (de jure) ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

(আগামীকাল সমাপ্য)