• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১, ৬ মাঘ ১৪২৭, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শফিউদ্দিন সরকার

একটা আন্দোলনের নাম

এম আর খায়রুল উমাম

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১

image

সংবাদটি শোনার পর থেকে প্রচণ্ড মানসিক অস্বস্তির মধ্যে সময় পার হচ্ছে। কোনো স্বস্তি নেই। বিশাল এক ধসের শব্দ যেন বাজছে চারিদিকে। হারানোর আতঙ্ক। শরীরের গভীর থেকে গভীরে শুধুই যেন শুনতে পারছি পতনের ধ্বনি। মনের মণিকোঠায় কম্পন তুলছে যন্ত্রণাবোধ। যেন মহাবিপন্ন হতে চলেছে অবহেলিত এক গোষ্ঠীর অস্তিত্ব। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালের ইনটেনসেভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন ছিলেন সত্য ও সুন্দরের স্বপ্ন দেখানো মানুষটা। অবহেলিত একটি গোষ্ঠীকে গৌরবের বুকে, মর্যাদার বুকে, চেতনার বুকে প্রতিষ্ঠার মহানায়ক। শেষপর্যন্ত বিশ্বব্যাপী করোনার শতবিচ্ছিন্নতার বাধাকে অতিক্রম করা সম্ভব হলো না। অবহেলিত গোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক শফিউদ্দিন সরকার নামক নক্ষত্রের পতন ঘটলো। ২৫ অক্টোবর ২০২০ সকালে হলো মহাপ্রস্থান। ১৯৮০ সালের ৩১ অক্টোবর পাবনা জেলা থেকে যে নক্ষত্রের যাত্রা শুরু তার যবনিকাপাত ঘটলো।

শফিউদ্দিন সরকার অন্ধকারাচ্ছন্ন এক গোষ্ঠীকে আলোর পথে নিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তা সত্য। তবে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবেও তিনি স্মরণীয়। সত্য ও সুন্দরের স্বপ্ন দেখা, ব্যক্তিগত জীবনে তার চর্চায় দ্ব্যর্থহীনই শুধু ছিলেন না; তিনি অসামান্য প্রতিভায় তা অন্যদের মাঝে চর্চার বাস্তব উদ্যোগেও ছিলেন অনন্য। প্রাথমিক পর্যায়ে তার উদ্যোগগুলো প্রতিকূলতার মধ্যে পড়লেও শেষ বিচারে চেতনায় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন চোখ বন্ধ করে বাংলাদেশকে দেখা না গেলে দেশপ্রেম জাগ্রত হতে পারে না। তাই তিনি রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহকর্মীদের বাংলাদেশের ম্যাপ আঁকা শিখতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। মুজিবনগর কমপ্লেক্সে বাংলাদেশের একটা ম্যাপ মাটিতে করা আছে। ২০ বছর আগের কথা, তখনও তা পূর্ণতা পায়নি। শুধু বাহিরের সীমানা টানা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সাথে যখনই মুজিবনগরে গিয়েছি শফিউদ্দিন সরকারের ভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সবাইকে নিয়ে নিজ জেলা খোঁজার চেষ্টা করেছি ম্যাপে। শতকরা পাঁচভাগ মানুষকেও দেখিনি নিজ জেলা চিহ্নিত করে সঠিক জায়গায় দাঁড়াতে। হয়তো চোখ বন্ধ করে দেশটা দেখা যায় না বলেই আজ হাটহাজারীতে বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু সেতু সিরাজগঞ্জে গিয়ে উঠেছে, ঢাকা-আরিচা সড়ক ধামরাই ঘুরে গিয়েছে, চাঁদপুর পলিটেকনিক কসবায় করতে হয়েছে, রাউজানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে- আরো কত কী? দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজ নিজ জেলাকেই বাংলাদেশ বিবেচনায় এসব কাজ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন।

মানুষের রুচি, বুদ্ধি ও মনকে একটা বিশেষ সাংস্কৃতিক স্তরে নেয়া হলে মানুষ সমস্বার্থে সহযোগী হয়ে শান্তিতে সহাবস্থানে সমর্থ হয়। প্রগতিকামী মানুষ হিসেবে শফিউদ্দিন সরকার সহযাত্রীদের মধ্যে বহুজনের কল্যাণের মধ্যেই নিজের কল্যাণ নিহিত- এ মূল্যবোধ সৃষ্টি ও লালনের জন্য কাজ করে গেছেন। শুধু তাই নয়, বহুজনের কল্যাণের জন্য দাবিনামা তৈরি করে কার্যক্রম পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন সহযোদ্ধাদের। গোষ্ঠীস্বার্থের বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের আন্দোলন করেছেন। কর্মচারীদের জন্য অমর্যাদাকর শ্রেণীপ্রথার বিনাশ চেয়েছেন। উৎপাদন ও নির্মাণের জন্য নীতিমালা চেয়েছেন। সহযাত্রীদের নিয়ে অসামান্য সাহসিকতায় দেশব্যাপী ব্যক্তি ও সংস্থার ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যের তীব্রতা নিয়ে কারো কারো মনে ভিন্নতা থাকলেও যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে দেখা গেছে সবাইকে। নিষ্ঠার সাথে প্রাণবন্ত দায়িত্বশীল বক্তব্যে ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতে বাধাহীন ছিলেন তিনি। সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে তিনি জাতীয় পত্রিকায় দেশের মানুষের কল্যাণ বিবেচনায় গভীর নলকূপের মারাত্মক কুফল সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বনের আবেদন রেখেছিলেন। ‘প্রযুক্তি-চিন্তাহীন রাজনীতি শোষণের হাতিয়ার’- এ সাহসী উচ্চারণ রেখে দেশব্যাপী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে মতবিনিময় করে রাজনীতিতে প্রযুক্তির সম্পৃক্ততা আনায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। এখানে তিনি দেশবাসীকে দেখিয়েছিলেন- স্বাধীন দেশে এক টাকার কাজ চৌদ্দ আনায় না করে এক টাকার কাজ ১০ টাকায় করা হচ্ছে। দেখিয়েছিলেন কীভাবে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোতে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা চলছে এবং একের পর এক প্রকল্প নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যর্থ হচ্ছে, পাচ্ছে না জীবনকাল। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় রাজনীতিতে কতটা প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে, তা বলতে পারবো না; তবে আজও দেশে এক টাকার কাজ ১০ টাকায় করার কার্যক্রম চলমান তা সাধারণ জনগণ দেখতে পায়। কোন প্রকল্পই নির্ধারিত সময় ও বরাদ্দে শেষ হয় না। দেশপ্রেমের নামে চলমান লাগাতার জালিয়াতি, দেশপ্রেমের কথা বলে নিজ প্রেমে দেশকে নিজ সম্পত্তির মতো অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা চলছেই।

১৯৯০ সালে সরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে ব্রতী হলে তিনি একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বিবেচনার জন্য পেশ করেন; যা দেশের রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, শিক্ষাবিদ সাংবাদিকসহ অনেকের কাছে সমাদৃত হলেও সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সীমিত সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার বিবেচ্য হয়নি, বিবেচনায় আসেনি ‘আমাদের দেশের ৯৯ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত বা সামাজিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত’ হওয়ার বিষয়টি- যেসব প্রতিষ্ঠানকে একটা নির্বাহী আদেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। অবস্থা ছিল এমন- যে নীতি-কৌশলের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় নেই, বিপুল অংকের টাকার ব্যবসা নেই, তা কীভাবে গ্রহণীয় হতে পারে? অথচ এই নীতি-কৌশলে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন হলে আজ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার চেহারা অন্যরকম হতে পারতো। সব শিশুর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সহজতর হতো, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যেতো, ঝরে পড়ার হারকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। পরিবার পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যেত। পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তিতে সহায়ক হতো।

পরিবেশ উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক পানি। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সেই পানি অবশ্যই ভূপৃষ্ঠের পানি। সেজন্যই বারংবার জলাশয় রক্ষার তাগিদ অনুভব করেছেন তিনি। বলেছেন- ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কুফলের কথা, দেশের নদী দেখতে দিনের পর দিন মাইলের পর মাইল হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন। পানি ব্যবস্থাপনার নামে ব্রক্ষপুত্র নদের পাড়ে বাঁধ দিতে গিয়ে ৮টা নদীর মুখ বন্ধ করে দেওয়া, বড়াল নদীতে ধারণক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশের স্লুইস গেট নির্মাণ করে নদীর জীবন বিপন্ন করে তোলা, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদে চলন বিল ধ্বংস করা, তিস্তা প্রকল্পের স্থান নির্বাচন যথাযথ না হওয়ার কারণে লক্ষমাত্রা অজর্নে ব্যর্থতা, দেশের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত এমন বহু বিষয়ের পাশাপাশি সস্তা ও সুলভ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য নৌপথ ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন মানুষের সামনে। পরিকল্পনাকে বহুমুখী করে সীমিত সম্পদের সফল ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কোনো অবস্থার আশু সমাধান হিসেবে নয়, ন্যূনতম ৫০ বছরের আগাম চিন্তা করে পরিকল্পনা প্রণয়নসহ বহু বিষয় দেশ ও জাতির কল্যাণ বিবেচনা করে দেশবাসীর সামনে নিয়ে এসেছেন।

শফিউদ্দিন সরকার গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন। নিজ অধ্যবসায়ে কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। জ্ঞান আহরণের জন্য পাঠতৃষ্ণায় জীবনকে করে তুলেছেন অনন্য। শুধু নিজের পাঠতৃষ্ণা নয়, কর্মতৃষ্ণাও সৃষ্টি করেছেন সহযোগীদের মধ্যে। নিজেকে সমাজচিন্তা আর মুক্তবুদ্ধির চর্চায় পুরোপুরিভাবে নিমগ্ন রেখে স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও প্রলোভনমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের ধারক হিসেবে সারাদেশে অনুগামী সৃষ্টি করেছেন। যারা পরিবেশ, নদী, পানি, উৎপাদন ও নির্মাণ, উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, সমাজ প্রভৃতি নিয়ে দেশে-বিদেশে ভূমিকা রেখে চলেছে। ব্যক্তিত্বপ্রবণ, প্রাণবন্ত, নিষ্ঠাবান শফিউদ্দিন সরকার দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির নীতি-কৌশল নির্ধারণী পর্যায়ে সমাদৃত না হলেও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং তাদের সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের সদস্যদের মধ্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অসীম শ্রদ্ধা।

শফিউদ্দিন সরকার প্রথমত সহযাত্রীদের মনোদৈহিক উন্নতিতে এবং তারপর রাষ্ট্রের উন্নতির বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। এজন্য সংগঠনে যে প্রগতিশীল নেতৃত্ব অপরিহার্যভাবে প্রয়োজন, তা সৃষ্টিতে কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সদস্যরা নিষ্ক্রিয় হলে, সদস্যদের মধ্যে চাহিদা না থাকলে, জনকল্যাণের নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় না। কারণ সদস্যদেরই নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হয়। সদস্যরা যখন যেমন নেতৃত্বের যোগ্য হয়, তখন সেই রকম নেতৃত্বই তৈরি করে। নেতৃত্বের মধ্যে জনচরিত্রের প্রকাশ ঘটে এবং নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে জনচরিত্র তৈরি হয়। তাইতো সদস্যদের চিন্তায় ও কর্মে উৎকর্ষ ও সৌন্দর্য আনার পূর্ণপ্রয়াসী ছিলেন শফিউদ্দিন সরকার। সম্মিলিত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনের পরিবেশকে সংস্কারের মাধ্যমে উন্নত, সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার চিন্তা ও চেষ্টার শফিউদ্দিন সরকার একজন আদর্শ রূপকার। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের কাছে মাটি ও মানুষের গুরুত্ব কমে গেছে। তারপরও শফিউদ্দিন সরকার সাধারণ জীবনযাপনের মধ্যে উন্নত চিন্তার ধারক হিসেবে অনুগামীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণীতে- ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে’; নিরন্তর শ্রদ্ধা।

[লেখক : সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)]