• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জিলকদ ১৪৪১

একজন মাকছুদুল আলম ও আমাদের ঘুণে ধরা সমাজ

মো. ইব্রাহীম

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। নারায়ণগঞ্জের মানুষ এমনকি মিডিয়ার কাছেও যিনি ‘করোনা বীর’ নামে পরিচিত। তার মতো গভীর হৃদয়ের মানুষকে এতটুকুতে সীমাবদ্ধ করাটা বড়ই কৃপণতা হয়ে যায়। তবে মানুষ তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছে তার প্রাপ্যটুকু। করোনায় যখন পুরো পৃথিবী ভয়ার্ত, বাবা-মা, ভাইবোন, প্রিয়জন, বন্ধু ও ভালোবাসার মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে তখন খন্দকার খোরশেদ ও তার টিম মানবতার দেয়াল হয়ে হাজির প্রতিটি কবরস্থান-শ্মশানে। নিজ কাঁধে তুলে নিচ্ছেন নাম-পরিচয়নহীন হতভাগ্য করোনার মৃত ব্যক্তির লাশ। গত ২২ জুন পর্যন্ত ৮৭টি করোনায় মৃত ব্যক্তির ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে দাফন ও সৎকার সম্পন্ন করেছে টিম খোরশেদ।

গত ৩১ মে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে খবর বের হয় ‘৬২ করোনার মৃতদেহ সৎকারকারী খন্দকার খোরশেদ নিজেই করোনায় আক্রান্ত’। এমনকি একই সময়ে স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত হন। এমন নিউজ দেখে লোকটির প্রতি অনেক মায়া হলো। তার চেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়লাম করোনায় এখন থেকে যারা মারা যাবে সেই হতভাগ্য লাশগুলোর কি হবে। তার মধ্যে যেহেতু পরিবারও আক্রান্ত, আর মনে হয় তিনি এ কাজে নিজেকে জড়াবেন না। এদিকে শুরু থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানো নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করে। অবশ্য এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে করোনায় মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে ভাইরাস ছড়ায় না। কিন্তু ১৯ জুন শুক্রবার রাত ২টা ৩৯ মিনিটে মাকছুদুল আলম খোরশেদ নিজের ফেসবুকে ছবিসহ পোস্ট দেন। ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ গ্রহণ করার জন্য টিম খোরশেদ হাজির। আমার তখন এত আনন্দ লাগল যা বলে বোঝাতে পারব না। আমার বাসা থেকে সিরাজুল মেডিকেল পায়ে হেঁটে মাত্র ৩ মিনিটের পথ। এই বীরকে দেখার খুব ইচ্ছা করছিল। কিন্তু অনেক রাত দেখে যাওয়া হয়নি। বর্তমানে করোনা রোগীদের প্লাজমা সংগ্রহও করে দিচ্ছেন তিনি। কেউ ফোন করলেই হাজির হয় টিম খোরশেদ। এ পর্যন্ত ২৭ জনকে প্লাজমা সংগ্রহ করে দিয়েছে টিম খোরশেদ। এ জন্য অনেক রোগীর আত্মীয়স্বজন তাকে ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করেন। মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ একজন জনপ্রতিনিধি। হ্যাঁ, তিনি একজন সত্যিকার জনপ্রতিনিধি, যিনি তার এলাকার জনগণের লাশ কাঁধে নিয়ে কবরস্থানে যান, শ্মশানে যান।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনাভাইরাস আমাদের ফেরেশতা যেমন দেখিয়েছেন, তেমনি দেখিয়েছেন শয়তানও। মানুষরূপী শয়তান। করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির দাফন করায় ফেনীর এক ইমামকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকে ‘করোনা উপসর্গে মৃত ব্যক্তির দাফন করায় ইমাম চাকরিচ্যুত!’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। গত ১৭ জুন ফেনীতে মাওলানা জিয়াউল হক করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। মসজিদ কমিটির অনুমতি না নিয়ে দাফন কাজে অংশগ্রহণ করায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। আবার লক্ষ্মীপুরে হিরামনির ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা পুরো দেশবাসীকে হতবাক করে দেয়। ক্যানসারে মারা যাওয়া বাবার লাশ আনতে ঢাকায় মা গেলে নবম শ্রেণীর ছাত্রী হিরামনিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে নরপিশাচরা। করোনা সন্দেহে ১৪ এপ্রিল মাকে গাজীপুরের জঙ্গলে ফেলে যায় সন্তানেরা, যা নিয়ে পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর মধ্যে আবার ৬ জুন শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ায় এক মাকে তার সন্তানেরা ঢাকা মেডিকেলের গেটে ফেলে যায়। তিন দিন ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পড়ে থাকেন তিনি। অথচ করোনা মহামারীর মধ্যে যখন পরিবারের বয়স্ক সদস্যটির আরও বেশি খেয়াল রাখা দরকার তখনই মাকে রাস্তায় ফেলে গেলেন সন্তানরা। করোনার ভয়ে ঘরে স্বামীর লাশ রেখে পালাল স্ত্রী-সন্তান এমন শিরোনামও হচ্ছে মিডিয়াতে।

বাংলাদেশে করোনার শুরুতে মৃত ব্যক্তিদের লাশ খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে দাফনের জন্য সরকার ঠিক করে। সেখানেও মানুষ বাধা দেয় করোনা ছড়াবে এই ভয়ে। তেজগাঁওয়ে আকিজ গ্রুপের জায়গায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় কাউন্সিলর দলবল নিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। এমনকি হাসপাতাল নির্মাণসামগ্রীও ভাঙচুর করে বাইরে ফেলে দেয়া হয়। অবশ্য পরে বাধা কেটে গেলেও ওই হাসপাতালটি আর হয়নি। করোনা মহামারীর শুরুতে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের দাম ইতিহাসের রেকর্ড করে। তার মধ্যে যে যার মতো করে খাদ্যদ্রব্য মজুত করতে শুরু করে। সরকার থেকে বারবার বলা হলেও যে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য আছে। কেউ খাদ্য মজুত করবেন না। তারপরও মানুষ স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের বাঁচার চিন্তা করা শুরু করে। অথচ প্রতিটি মানুষ যদি শুধু নিজে বাঁচার জন্য ঘরে থাকত ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলত তাহলে আরও আগে করোনা দমন করা সম্ভব হতো অনেকখানি।

করোনাকালে অনেকে নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনলেও কিছু চাল চোর, তেল চোর, টাকা চোর ঠিকই আছে। এসব খারাপ মানুষের অভাব নেই সমাজে। এরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে। তাই তো আজ আমাদের সমাজে ঘুণে ধরেছে। তবে খন্দকার খোরশেদরা থাকেন মানুষের হৃদয়ে। তবে সমাজে আলোর মশাল জ্বালানোর জন্য খন্দকার খোরশেদদের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

[লেখক : গণমাধ্যমকর্মী]

ibrahim242599@gmail.com