• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৯ রবিউস সানি ১৪৪১

ঋণখেলাপিদের সুবিধা বনাম ব্যাংক খাতে সুশাসন

ফরহাদ আহমদ

| ঢাকা , সোমবার, ০৮ এপ্রিল ২০১৯

বর্তমান অর্থমন্ত্রী পদে আ হ ম মুস্তফা কামালের অন্তর্ভুক্তিতে আমি ধরেই নিয়েছিলাম ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে আরও সুবিধা বাড়বে। গত ২৫ মার্চ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী যা বললেন তাতে আমার ধারণা সত্য প্রমাণিত হলো। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, মোট খেলাপি ঋণের মাত্র ২% ডাউন পেমেন্ট (এককালীন জমা) দিয়ে একজন ঋণখেলাপি নিয়মিত গ্রাহক হয়ে যাবেন। তিনি অবশিষ্ট ঋণ শোধ করবেন ১২ বছরের মধ্যে। বর্তমান সুদ হার যাই থাকুক না কেন- এক্ষেত্রে নেয়া হবে মাত্র ৭%। বাংলাদেশ ব্যাংক খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে পরিপত্র জারি করে- মে দিবস (১ মে) থেকে এ নিয়ম কার্যকর করবে।

বাংলাদেশে ঋণখেলাপিদের পোয়াবারো চলে আসছে ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা ও জাতীয় ৪ নেতা হত্যার মাধ্যমে যে অপশক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কব্জা করে- তাদের আমল থেকে; যা কোন সরকারের আমলেই কমেনি বরং ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।

এর পূর্বে ২০১৫ সালে ঋণখেলাপিদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালার সুযোগ নিয়ে ১১টি শিল্প গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার মাধ্যমে আরও বড় অংকের ঋণ সুবিধা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এ সুবিধা গ্রহণের পরে ২টি শিল্পগ্রুপ ছাড়া অন্যরা টাকা পরিশোধ করেনি।

গত ২৬ মার্চ জাতীয় একটি পত্রিকার তথ্যমতে, ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের সকল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। অবলোপন ঋণের পরিমাণ এ সময়ে হয়েছে ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।

ঋণখেলাপি শিল্পপতিদের নতুন করে এ বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি বিআইবিএমের মহাপরিচালক প্রফেসর মইনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন- ‘ঋণখেলাপিদের অন্যান্য সুবিধা দেয়ার জন্য এসব খামখেয়ালিপনা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ী হওয়ায় ঋণখেলাপিদের জন্য এসব সুবিধা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। মনে হচ্ছে, সময়টা ঋণখেলাপিদের। নতুন সিদ্ধান্ত খেলাপি ঋণ আদায়ে কোন প্রভাব ফেলবে না।’ তিনি ঋণখেলাপিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন- উচ্চ আদালতে যেন ঋণখেলাপিরা বেশি সুবিধা না পায়- তার উদ্যোগ নিতে হবে। তা হলেই তারা ঋণ ফেরত দেবে।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভালো ঋণখেলাপিরা এ সুযোগ পাবেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ঋণখেলাপি আবার ভালো হয় কী করে? ভালো চোর ভালো ডাকাত যেমন হয় না- তেমনি ঋণখেলাপিও ভালো হয় না।’ তিনি বলেন, ঋণ পুনঃতফসিল ১ম, ২য় ও ৩য়বার করা যায়। এরপর আরও সুযোগ সৃষ্টি করা ভালো উদাহরণ নয়।

অর্থমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর থেকে অনেক ঋণগ্রহীতা আর টাকা শোধ করছেন না বলে জানিয়েছেন কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা। তারা আরও জানিয়েছেন, প্রদত্ত বিনিয়োগের তহবিল খরচ ছিল ১০% উপরে। এখন ৭% হারে পরিশোধ করা হলে ব্যাংকের লোকসানের পাল্লা ভারি হবে। ব্যাংকের সুশাসন ব্যাহত হবে।

এসব বিবেচনা করলে বলা যায়- অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত সার্বিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বড় বড় গ্রুপগুলো চলে ব্যাংকের টাকায়। ব্যাংকের টাকা জনগণের। জনগণের টাকায় ব্যবসা করে ব্যবসায়ীরা একটির পর একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু ব্যাংকের কিস্তি যথাসময়ে পরিশোধ করছেন না। তৃতীয়বার পুনঃতফসিলী করার পরেও যারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করেননি- তাদের আবার সুবিধা দিলে ব্যাংকিং খাতে কোন দিন শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে আরও ভাবা দরকার বলে মনে করি। দেশের অর্থনীতির ও ব্যাংকিং সেক্টরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে একটি গোলটেবিল ডেকে তাদের মতামতের আলোকে অগ্রসর হলে- অর্থনীতির জন্য মঙ্গল হবে বলে মনে করি।

[লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও (অব.) ব্যাংক নির্বাহী]