• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৫ জুন ২০১৮, ১ আষাঢ় জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ২৯ রমজান ১৪৩৯

আমজনতার অর্থনীতি

ঈদ উৎসবের আর্থ-সামাজিক তাৎপর্য

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন ২০১৮

অপরের কল্যাণ সাধনই সকল সমাজ দর্শনের মূল ভিত্তি। ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’- এই মহান ব্রত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সকলের জন্য সুখময় জীবন যাপন নিশ্চিত হয়। ব্যষ্টি থেকে সমষ্টি। ব্যক্তি কল্যাণের ওপরই রচিত হয় সমষ্টিগত কল্যাণের সৌধ। পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন, একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ এবং অপরের আনন্দ বেদনায় পরস্পরকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক সংহতি ও শার্ন্তি প্রতিষ্ঠা লাভ হয়। সামাজিক সংহতি ও শার্ন্তি প্রতিষ্ঠান জন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ যা অভিন্ন সত্তা হিসেবে কাজ করে। এই মূল্যবোধ সহসা কিংবা আরোপিত নির্দেশের বলে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান ও ব্যবহারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা স্থিতি আকারে প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ লাভ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম এক বিরাট গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে থাকে। ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েই মানুষের জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে। ধর্মীয় অনুশাসনমালা মানুষের আচার আচরণ প্রবৃত্তি প্রবণতার উপর একটা গঠনমূলক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশ করে। মূলত ধর্মীয় বিধি বিধান মানুষের আত্মিক উন্নতি লাভের পথ নির্দেশ করে আর এই আত্মগত উন্নতির ওপর ভিত্তি করে সমষ্টিগত তথা সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়ে থাকে।

ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ধর্মের মূল আদর্শগুলো প্রতিফলিত হয়ে থাকে। অপরের কল্যাণে নিবেদিত হতে উৎসাহিত করাই ধর্মীয় উৎসবগুলোর মূল লক্ষ্য। মানুষ মাত্রই সামাজিক জীব। সে নিজে একা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে জীবন যাপন করতে পারে না। কোন না কোন কারণে তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তাকে বহির্মুখী করে তোলে। অন্যের সঙ্গে নানা লেন-দেনে তাকে সম্পৃক্ত হতে হয়। এর ফলে সকলের সঙ্গে তার একটা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলাকে লক্ষ্য করে গঠনমূলক শিক্ষা ধর্মীয় উৎসবগুলোতে বাস্তবায়িত হয়। উৎসব এবং অনুষ্ঠান মাত্রই একটি সম্মিলন। সমাজের সকল স্তরের মানুষ বিশেষ উপলক্ষে একত্র হয়। ব্যক্তি হয় সমষ্টির অংশ। এর ফলে ভাবের আদান প্রদান হয়। সুখ দুঃখের কথোপকথন হয়। আনন্দ বেদনা ভাগাভাগির একটা তাগিদ অনুভূত হয়। এমন ধরনের সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যক্তির সুখ দুঃখ, সমস্যা সকলের সুখ দুঃখ সমস্যায় রূপান্তরিত হয়ে থাকে। একের দুঃখ অন্যের সুখের সঙ্গে, একের বেদনা অন্যের আনন্দের সঙ্গে, একের অভাব অন্যের প্রাচুর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সমাধানের পথ খুঁজে পায়।

ধর্মীয় উৎসবগুলো সাধারণত বছরের বিশেষ সময়ে উপলক্ষে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে সকলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ আসে বছরের জমে থাকা দঃখ বেদনা মনোমালিন্য দূর করার একটা উপলক্ষ তাতে মিলে। ধর্মীয় উৎসবগুলো প্রায়শই কৃচ্ছ্রতা সাধন, আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রেক্ষাপটে আনন্দের হেতু হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। আত্ম কল্যাণ লাভের জন্য কঠোর ত্যাগ ও পরিশ্রমের পর আনন্দের সোপান হিসাবে এই উৎসবের আয়োজন। সে উৎসবে থাকে পরিতৃপ্তির আমেজ। আত্মোৎসর্গের পরিতৃপ্তিতেই অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা জাগে। সে জন্য ধর্মীয় উৎসবগুলোতে দান খয়রাত করা অর্থাৎ বিত্তবান সমর্থরা বিত্তহীন অসমর্থদের সাহায্য করে, আনন্দে সকলে সমভাবে অংশ গ্রহণ করে। অন্যের অতৃপ্তিকে নিজের অতৃপ্তি বলে মনে করে সবাই। খোদার সন্তুষ্টির জন্য বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আহার্য দ্রব্য, সম্পদ-সামগ্রী এমনকি জীবজন্তু উৎসর্গ করা হয়ে থাকে এসব উৎসবগুলোতে। কিন্তু এগুলোর কোন কিছুই তার দরবারে সরাসরি পৌঁছায় না। বান্দার তরফ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ইচ্ছাটিই তার কাছে মুখ্য হিসাবে গৃহীত হয়ে থাকে। এই ধূলি ধরায় উৎসর্গীকৃত সব কিছুই করা হয় সকলের মাঝেই। যা কিছু উৎসর্গ করা হয় তা সবই আহার্য কিংবা মানুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী যা অন্যের ক্ষুধা ও অভাব মিটিয়ে থাকে। সুতরাং দেখা যায় ধর্মীয় উৎসবের সকল কিছুই সামাজিকতার আদর্শ প্রতিফলনের মধ্যেই সার্থকতা লাভ করে থাকে।

সাম্য ও সামাজিক সংহতির ধর্ম ইসলামের ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আশুরা, শব-ই-বরাত, শবে কদর বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। এসব উৎসবের মূল তাৎপর্য হলো আত্মশুদ্ধি ও আত্মোৎসর্গের কঠোর ত্যাগ সাধনার প্রেক্ষাপটে আনন্দঘন সম্মিলন। গরীব দুঃখীদের মধ্যে দান খয়রাত করা, ভেদাভেদ ভুলে সকলের সাথে এ সম্মিলনে শরিক হওয়া, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি করার মাধ্যমে সামাজিকতার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে থাকে। মোবারক মাস রমজানের পর আসে ঈদুল ফিতর। সুদীর্ঘ একমাস কঠোর কৃচ্ছ্রতা সাধনের পর আসে আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর। ‘ঈদ’ শব্দের ব্যবহারিক অর্থ খুশি। আভিধানিক অর্থ ‘ফিরে আসা’। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যে বিশেষ নিয়ম কানুন পালিত হয় তা থেকে ‘স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসা’ হয় ঈদুল ফিতরের দিনে। ঈদের এই আনন্দ উৎসবে শরিক হওয়ার সামর্থ্য সকলের সমানভাবে থাকে না। সে জন্য ইসলামে সমাজের ধনী ও বিত্তবান সদস্যদের ওপর দরিদ্র ও বিত্তহীনদের মধ্যে জাকাত ও ফিতরা প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে ‘বিত্তবানদের সম্পদের ওপর বিত্তহীনদের হক আছে।’ ৫১ সংখ্যক সুরা আর যারিয়াত, আয়াত ১৯) কোরআনের এই অমোঘ নির্দেশ ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে জাকাত ও সদকা প্রদানের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে থাকে। বিধান রয়েছে, ঈদের নামাজ আদায়ের আগেই জাকাত ও ফিতরা প্রদান করতে হবে। এটা ঈদুল ফিতরের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য। উন্মুক্ত ময়দানে ধনী দরিদ্র উঁচু নিচু সাদা কালোর সকল ভেদাভেদ ভুলে ঈদের জামাতে সামিল হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মিলনে পাড়া-পড়শী থেকে শুরু করে সকল পরিচিত অপরিচিতের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। নামাজ শেষে কোলাকুলির মাধ্যমে সবাই সকল ভেদাভেদ ও মনো-মালিন্য ভুলতে চেষ্টা করে। ঈদের দিনে সকলে সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরিধান করে। পুরাতন বিবাদ বিসংবাদ দুঃখ কষ্ট থেকে নতুনতর জীবনবোধ ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রতীকী প্রকাশ ঘটে থাকে এর মধ্যে। একে অন্যের বাসায় পালাক্রমে দাওয়াত খাওয়া যাতায়াতের মাধ্যমে সামাজিক সখ্যতার ভিত্তি আরো দৃঢ় হয়।

ঈদুল ফিতরের ন্যায় ঈদুল আজহা উদযাপনের মধ্যেও রয়েছে বিশেষ সামাজিক তাৎপর্য। হযরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ. ) কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার মহান স্মৃতিকে স্মরণ করে পালিত হয় ঈদুল আজহা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানীর মাধ্যমে আত্মোৎসর্গের পরিচয় দেয়া হয়। এই পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানব চরিত্র বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ। হজ পালন ঈদুল আজহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ্ব অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সকল দেশের মুসলমানগণ সমবেত হন এক মহা সম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলের অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরীফে একই পোশাকে, একই ভাষায় একই রীতি রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয় তার চাইতে বড় ধরনের কোন সাম্য-মৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথায়ও অনুষ্ঠিত হয় না। হজ পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রং ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বাচনীয় সখ্যতা সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হতে পারে।

শবে বরাত ও শবে কদরে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে নিজের অপরাধ মার্জনা ও আল্লাহর রহমত কামনার জন্য বিশেষ ইবাদত করা হয়। এসব মহান রাতে আত্মশুদ্ধির যে প্রচেষ্টা তা তো প্রকারান্তরে সকলের জন্য কল্যাণ বহন করে আনে। এই দুই মহান রজনীতে গরিব দুঃখীদের মধ্যে হালুয়া রুটি বিতরণ করা একটা বিশেষ কর্তব্য বলে বিবেচনা করা হয়। এই দুই রজনীর সামাজিক তাৎপর্য এখানেই।

পৃথিবীর তাবৎ ধর্ম ও সমাজে স্ব স্ব সংস্কৃতি ও অবকাঠামো অবয়বে উদযাপিত ঊৎসবাদিতে মানবিক মূল্যবোধের সৃজনশীল প্রেরণার, সখ্যতা সৌহার্দ্য প্রকাশের অভিষেক ঘটে থাকে। নানান উপায় উপলক্ষে সম্প্রীতি বোধের বিকাশলাভ ঘটে থাকে, অ-বনিবনার পরিবর্তে বন্ধন, মতপার্থকের অবসানে সমঝোতার পরিবেশ সৃজিত হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপুজা, দেওয়ালীসহ নানান পূজা পার্বণাদিতে আত্মশুদ্ধির আনন্দের, অপয়া অশুর সত্তার সংহার, সংবেদনশীলতার শুভ উদ্বোধন ঘটে থাকে। খ্রিস্টীয় বড় দিনের উৎসব বছরের সকল বিভ্রান্তি বিবাদ বিসংবাদ ভুলে অনাবিল আনন্দ আচার অনুষ্ঠানে নিবেদিত হওয়ার সুযোগ সমুপস্থিত করে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সৎ চিন্তা সৎ ধ্যান ও অহিংস অভেদ বুদ্ধি বিবেচনার বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের পরিপালনীয় নির্বান অনুষ্ঠানাদিতে। সকল আয়োজন আপ্যায়নের মর্মবাণীই হলো সৃষ্টিকর্তার ইবাদৎ তার সৃষ্টির সেবা ও সমন্তষ্টি বিধানের মাধ্যমে। সংহার নয় সেবাই পরম ধর্ম। সকল অশান্তি কলহ বিবাদে। শান্তির সম্ভাবনা শুধু সহযোগিতা সমঝোতাতেই।

[লেখক : সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান]