• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬, ৭ শাবান ১৪৪১

আসাম : কামরূপ কামাখ্যা-২

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

| ঢাকা , রোববার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আসামে নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য যেসব শর্ত দেয়া হয়েছিল তা পূরণ করে গরিব, নিঃস্ব, নিরক্ষর লোকদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করা ছিল কঠিন। নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকায় যাদের নাম নেই তারা আদালতে আপিল করতে পারবেন বলে এখন সান্ত্বনা দেয়া হচ্ছে; কিন্তু সবার পক্ষে প্রয়োজনীয় দলিলপত্রাদি দাখিল করে আদালতকে কনভিন্স করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশেও শহরে ভাসমান বা গ্রামের গরিব, নিরক্ষর বহু লোকের এখনো কোন জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, সংগ্রহ করার কোন তাগিদও তারা অনুভব করেন না; আবার যারা সংগ্রহ করেছেন তারা হয়তো তা নিরাপদে সংরক্ষণ করেন না। কারণ একদিকে এসব কাগজপত্র তাদের জীবনে খুব অপরিহার্য বলে বিবেচিত নয়, অন্যদিকে ভাসমান লোকদের যেখানে নিজের থাকার জায়গা নেই সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের হেফাজত করা কঠিন। এমনি ঘটনা আসামের লোকদের বেলায়ও ঘটেছে। শতাব্দীব্যাপী বসবাসকারী বাঙালি বাসিন্দারা কল্পনাও করেনি যে, তাদের নিজেদের জন্মভূমিতে থাকার জন্য প্রমাণপত্র লাগবে। আসামে প্রতি বছর বন্যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকে, এ অবস্থায় দলিলপত্র রক্ষা করে নাগরিকত্ব প্রমাণে আইনি লড়াইয়ে জেতা কঠিন।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হতে ১৬৭৬৩৩ জনকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে। এখন আসামে ১০০টি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, সাম্প্রতিককালের তালিকা বহির্ভূতদের জন্য আরও ৯০০টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য আইনজ্ঞ ছাড়াও প্রশাসনিক লোকদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে এসব ট্রাইব্যুনালে; এতে তালিকা বহির্ভূত লোকেরা ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠেছেন। বিজিপি আমলে স্থাপিত এসব আদালতের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের বিস্তর অভিযোগ রয়েছ। তালিকা বহির্ভূত লোকদের সবচেয়ে বড় ভয়, তারা যে ভারতের নাগরিক তা প্রমাণের সমস্ত দায় বর্তাবে তাদের ওপর। গরির, নিঃস্ব তালিকা বহির্ভূত লোকদের আইনি সহায়তা দেয়া হবে মর্মে বিজিপি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, বিরোধী কংগ্রেসও এদের সার্বিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিমকার্টে গিয়ে দীর্ঘ, জটিল এবং ব্যয়বহুল আপিল প্রক্রিয়ার সুবিধা নেয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশের মতো ভারতের আদালতগুলোও মামলার চাপে পর্যুদস্ত। বাঙালিদের এমন উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দেয়ার এই রাজনীতির কারণে অনেকে ইতোমধ্যে আত্মহত্যা করেছে, অনেকের বিয়ে ভেঙে গেছে। বাঙালি জাতির প্রতি এরূপ ঘৃণা আর বিদ্বেষকে আশ্রয় করে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হয়েছে অপ্রতিহত গতিতে।

তালিকা থেকে বাদ পড়া তাদের ভোটার বেশি হওয়াতে বিজিপির দলভুক্ত উগ্র জাতীয়তাবাদীরা নাখোশ। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ জেলাগুলোর তালিকা পুনরায় যাচাই, বাছাই করার আর্জি পেশ করে সুপ্রিমকোর্ট থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তারা হাল ছাড়বে বলে মনে হয় না। কারণ সুপ্রিমকোর্টের কাজ শেষ, তালিকা এখন বিজিপি সরকারের প্রশাসনের হাতে- নয়ছয় করার সুযোগ থাকলে প্রশাসনিক ক্ষমতায় তারা তা করে নেবে। অন্যদিকে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পর কতজন তালিকা বহির্ভূত থাকবে এখন তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। শুধু বিজিপি নয়, এ তালিকা অসমিয়াদেরও পছন্দ হচ্ছে না। তালিকাটি সুপ্রিমকোর্টের তত্ত্বাবধানে তৈরি হলেও ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য করা হচ্ছে। তালিকা পর্যালোচনায় পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, মা-বাবা তালিকাভুক্ত হলেও তাদের সন্তানদের নাম তালিকায় নেই, স্বামী বৈধ হলেও স্ত্রী অবৈধ, নাতি বৈধ হলেও দাদা বিদেশি। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমদের পরিবারের লোকজন এবং আসামের একজন বিধায়কও নাকি তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। যে সেনা ভারতের জন্য জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কার্গিল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তার নাম নেই তালিকায়, ভারতের চন্দ্রযান ২-এর অন্যতম উপদেষ্টা ড. জিতেন্দ্রনাথ গোস্বামীর নাম নেই চূড়ান্ত তালিকায়। এ লোকগুলোকে এখন অপমানজনকভাবে নাগরিকত্বের জন্য আদালতের দোরগোড়ায় বছরব্যাপী ধর্ণা দিতে হবে। নাগরিকপঞ্জি তৈরির সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলার বিরুদ্ধে এই মর্মে এফআইআর দায়ের হয়েছে যে, তিনি বৈধ ভারতীয় নাগরিকদের বিদেশি করে ছেড়েছেন। বিজেপি নেতাদের অনেকে এখন বলে বেড়াচ্ছেন, এনআরসি তাদের আমলে নয়, কংগ্রেস সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল এবং জনগণের এই হেনস্থার জন্য কংগ্রেস সরকারণ দায়ী। নিরর্থক ও ব্যয়বহুল এমন একটি কর্মসূচির জন্য আবার কেউ কেউ সুপ্রিমকোর্টের কঠোর নির্দেশাবলীকেও দায়ী করছেন। খারাপ কাজের দায় কেউ নিতে চায় না।

বহ্মপুত্র উপত্যকা, বরাক উপত্যকা এবং দুটি পার্বত্য জেলা নিয়ে বর্তমান আসাম। এই আসামে সবাই বহিরাগত; অসমিয়ারাও এসেছে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, তবে তারা এসেছে সবার আগে। পরবর্তীতে যারা এসেছে তাদের সঙ্গে অসমিয়াদের কোন বিরোধ প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল না। রাজনীতির কুটিলতায় আপন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে যেদিন থেকে মানুষ মানবতাকে বিসর্জন দিলো সেইদিন থেকেই সহঅবস্থানের নীতি পরিত্যজ্য হলো। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টির এমনতর হীন কর্মকান্ডে রাজনৈতিক দলের প্ররোচনায় জনসমর্থন সৃষ্টি হয় বিধায় বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সহঅবস্থান অসম্ভব হয়ে উঠে। ধর্মীয় এই অনুভূতি আবার শিক্ষিত লোকদের মধ্যে বেশি। ধোঁকাবাজ রাজনীতিবিদদের ধর্মান্ধরা যতদিন সমর্থন দেবে ততদিন এমন সমস্যা পৃথিবীব্যাপী নতুন নতুন আঙ্গিকে উদ্ভব হতে থাকবে। অনেক শিক্ষিত মানুষও এখন হিন্দু জাতি, মুসলমান জাতি, খ্রিস্টান জাতি ইত্যাদি অভিধায় পরিচয় দিয়ে খুশি হয়।

বিদ্যমান ব্যবস্থা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে অবৈধ বলে চিহ্নিতদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে রাখা হতে পারে; কনসেনট্রেশন ক্যাম্প জেলখানা না হলেও মোহাম্মদপুরে আমাদের জেনেভা ক্যাম্পের মতো গাঁদাগাঁদি করে অমানবিক পরিবেশে আবদ্ধ জায়গায় বসবাস করতে হবে। বর্তমানে আসামে ছয়টি ডিটেনশন ক্যাম্প রয়েছে, ৩০০০ লোকের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আরেকটি ক্যাম্প নির্মাণাধীন, কারাগার আছে ২৪টি; সবগুলোর ধারণ ক্ষমতা ১২ হাজার। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি বন্দী জেলখানা ও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে রয়েছে। এ অবস্থায় তালিকা বহির্ভূত অর্ধেক লোকও আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলে তাদের আবদ্ধ করার ব্যবস্থাদি আসাম সরকারের থাকবে না। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তিন বছর অতিবাহিত হলে মুচলেকা নিয়ে শর্তসাপেক্ষে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশানুযায়ী ছেড়ে দিতে হয়। তবে ছেড়ে দিলেও তারা ভারতের নাগরিক নয়। তখন এরা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে; রাষ্ট্রহীনদের ক্ষেত্রে ভারতের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি নেই। তাই ভারত সরকারকে এই অবৈধ বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত লোকদের নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে। বিজিপি সরকার পশ্চিমবঙ্গেও নাগরিকপঞ্জি করার হুমকি দিলেও এইসব লোকদের ভারত ত্যাগে বাধ্য করা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। আমার ধারণা, অবৈধ হলেও এরা ভারতেই থাকবে, নাগরিকত্ব না দিলেও কাজ করে জীবনধারণের জন্য ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করবে, কয়েক বছর পরপর রিনিউ করবে। এদের নিয়েও হয়তো নানা দল নানাভাবে নানা ফন্দি-ফিকির আঁটতে থাকবে। ভোটে জেতার জন্য যাদের একবার অবৈধ করেছে তাদের আবার ভোট এলে বৈধ করার আশ্বাস দেবে।

এই ত্রুটিপূর্ণ তালিকার জন্য তালিকা বহির্ভূত ব্যক্তিরা সামাজিক পরিমন্ডলের হেয়প্রতিপন্ন হবেন, তারা জীবিকা নির্বাহের সংগ্রামে বিপন্ন হয়ে পড়বেন। তবে ভোটে জেতার জন্য বিজিপি ও অসমিয় নেতারা যে অশুভ রাজনীতির শুরু করেছিলেন তার যৌক্তিক ইতি টানার জন্য তাদেরই আবার গলদঘর্ম হতে হবে। ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতাদের অনেকে এখনি বলতে শুরু করে দিয়েছেন, এনআরসি কারিগরি এবং ধারণাগত উভয় দিক থেকেই একটা ত্রুটিপূর্ণ কর্মসূচি ছিল। ভাওতাবাজি রাজনীতিও মাঝে মাঝে বিপদে পড়ে। এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর গেরুয়া শিবিরও আজ নিজের ভ্রান্ত রাজনীতির জালে নিজেরা কিছুটা হলেও আটকে গেছে। ‘আসাম শুধু অসমিয়ার’- এমনতর কলুষিত অহংবোধে পৃথিবীর মানবজাতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন আক্রান্ত। যে মানুষগুলো এক সময় আধুনিক সমরাস্ত্রে বলীয়ান হয়ে পৃথিবী চষে অন্যের ভূমি দখল করেছে তারাই আবার দখল করা ভূমিতে অন্যের প্রবেশাধিকারে বিধিনিষেধ আরোপ করছে। কিন্তু পৃথিবী যখন সৃষ্টি হয় তখন তো লোকই ছিল না। এখনো পৃথিবীর দুর্ভেদ্য অঞ্চলে লোকজনের বসতি নেই। ’জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রয়োগ করে দখল করা জায়গা নিয়ে মানুষে মানুষে মারামারি, হানাহানি অনন্তকাল চলতে থাকবে। সাতশ’ কোটি লোক বেড়ে যখন চৌদ্দশ’ হবে তখন হয়তো একই দেশে এক মহল্লার লোককে অন্য মহল্লায় গিয়ে জমি কিনতে দেয়া হবে না, বসতি স্থাপনে বাধা দেয়া হবে। পৃথিবী আমার দেশ, মানব আমার জাতি- সাম্যবাদের এই স্লোগান এখন অচল।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]