• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫, ১৩ সফর ১৪৪০

আসন্ন বাজেট ও কৃষি খাত

ড. জাহাঙ্গীর আলম

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৭ মে ২০১৮

সামনে বাজেট আসছে। ইতোমধ্যেই একটি ভালো অর্থনীতির পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৭.৬৫ শতাংশ। গত বাজেটে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৭.৪ শতাংশ। তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবারের অর্জিত প্রবৃদ্ধির হার। দেশে কোন রাজনৈতিক সহিংসতা না থাকায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ভালোভাবে এগিয়ে যাওয়ায়Ñ এ উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন অনেকটা নিশ্চিত। এবার শিল্পের প্রবৃদ্ধির হবে ১৩.১৮ শতাংশ, সেবা খাতে ৬.৩৩ শতাংশ এবং কৃষিতে ৩.০৩ শতাংশ। তাছাড়া উল্লেখযোগ্য হারে রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে, রফতানি বেড়েছে, বিনিয়োগ বেড়েছে, কিন্তু ভোগ-চাহিদা অনেকটাই স্থবির। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নী সংস্থা আইএমএফের মতে এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হবে ৭.১ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে ৬.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির। তবে বিশ্বব্যাংক ধারণা করছে ৬.৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের। এ সব পূর্বাভাসে কিছুটা ফারাক থাকলেও বাংলাদেশ যে খুবই উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে এ অর্থ বছর শেষ করতে যাচ্ছে- তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবার সারা বিশ্বে সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে গেছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। বিনিয়োগ বেড়েছে, উৎপাদন বেড়েছে, বেড়েছে বাণিজ্য ও ভোগ। ধারণা করা হচ্ছে, উন্নত দেশগুলো গড়ে ২.২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৪.৫ শতাংশ। বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধি হবে এবার ৩.১ শতাংশ।

এ রকম একটি সন্তোষজনক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত হতে যাচ্ছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নতুন বাজেট। ইতোমধ্যেই বলা হয়েছে যে, এবারের বাজেটের আকার হবে ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এটি হবে এক বিশাল বাজেট। গত বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এবারের আসন্ন বাজেট হবে তার চেয়ে ৫৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ জনপ্রতি প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। এটি তেমন বড় অংকের অর্থ নয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর চেয়ে আরও বেশি বরাদ্দ ও বিনিয়োগ দরকার। তবে গত বাজেটের চেয়ে এবারের সম্ভাব্য বাজেটের আকারে ফারাক অনেক বেশি মনে হয়। আগামী অর্থবছরের নির্বাচনকে সামনে রেখে জনতুষ্টির বাজেট প্রণয়ন করতে হলে এটুকু বেশি বরাদ্দের হয়তো প্রয়োজন হবে। তবে দিন শেষে বাজেটের আকার বেশ কাটছাঁট হয়। প্রকৃত আয় প্রাক্কলনের কাছে যায় না। তবু জাতীয় বাজেটে একটা বড় আয়-ব্যয়ের টার্গেট সামনে রাখা দোষের কিছু নয়। এ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয় বাজেটের আকার বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে তা ৩.৬২ গুণ বেড়েছে। এ সময় জাতীয় আয় প্রায় ২.৫ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৫২ মার্কিন ডলারে। আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছি। তবু অর্থনীতিতে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে আমাদের। বিনিয়োগ এখনও জিডিপির ৩১ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটি ন্যূনপক্ষে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এবার আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছর শেষে তা দাঁড়াবে প্রা ১৫ বিলিয় ডলার। কিন্তু তা হবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের প্রায় সমান। অর্থাৎ গত দুবছর ধরে রেমিট্যান্স হ্রাসের মাত্র ক্ষতিপূরণ করতে সক্ষম হবে এবারের উচ্চ প্রবৃদ্ধি। রফতানি ক্ষেত্রে এবার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে প্রায় ৬ শতাংশ। কিন্তু আমদানির প্রবৃদ্ধির হার ২৬ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের প্রতিকূল বাণিজ্য পরিস্থিতির মুখোমুখি। ওদিকে ডলারের দাম ক্রমেই বাড়ছে। ইতোমধ্যেই প্রতি ডলারের মূল্য ৮৫ টাকায় উপনীত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। এবার মূল্যস্ফীতির হার হতে পারে পৌনে ছয় শতাংশ। আইএমএফের প্রাক্কলন হলো ৫.৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি। গত বাজেটে ২০১৭-১৮ সালের জন্য মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হচ্ছে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব। আগামী দিনগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে বেকারত্ব হ্রাস করা সম্ভব না হলে বর্তমান প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন তেমন অর্থবহ মনে হবে না। এর জন্য উৎপাদনশীল কৃষি ও শিল্প খাতে, বিশেষ করে শিক্ষা ও ভৌত সবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রিক উন্নয়নের একটি বড় সমস্যা হলো আয় বৈষম্য। ২০১০ সালে জিনি সূচকে দেশের আয় বৈষম্য ছিল ০.৪৬। ২০১৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ০.৪৮। সম্প্রতি গরিব লক্ষ্যগোষ্ঠী কেন্দ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর বিস্তার সত্ত্বেও অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস তেমন সম্ভব হয়নি। দারিদ্র্য বিমোচনে শতকরা হারে বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে সত্য, কিন্তু দারিদ্রপীড়িত মোট জনসংখ্যার বিচারে তেমন কোন হেরফের নেই। ২০০৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। ২০১৭ সালে তা নেমে এসেছে ২২.৩ শতাংশে। অতি দরিদ্র মানুষের শতকরা হার নেমে এসেছে ১২ শতাংশে। কিন্তু এখনও মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা রয়ে গেছে প্রায় ৪ কোটি। অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। এদের বেশিরভাগ মানুষ দৈনিক ২ হাজার ১২২ কিলো ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করতে পারছে না। জীবনের মৌলিক প্রায়োজনগুলো মেটাতে এরা সক্ষম নয়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে গুণগত ও পরিমাণগত বরাদ্ধ বৃদ্ধি ছাড়া এদের নিত্যদিনের কষ্ট লাঘব করার কোন উপায় নেই।

স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধির হার বছরে গড়ে ৩ শতাংশ। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, এদেশে এখনও প্রায় এক চতুর্থাংশ মানুষ এক ধরনের অভুক্ত। এরা অপুষ্টির শিকার। খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি এবং তাতে সবার অভিগম্যতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই ক্ষুধার্তের সংখ্যা হ্রাস সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। সাধারণ হিসাবে বাংলাদেশের বর্তমানে যে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয় তাতে সরবরাহ সংকট থাকার কথা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেত্ত অহরহই এ সংকট আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। তার মোকাবিলা করার জন্য আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে খাদ্য আমদানির ওপর। ২০১৪-১৫ সালে আমাদের খাদ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৫৩ লাখ ৩১ হাজার টন, ২০১৬-১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ লাখ ২৩ হাজার টনে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে তা ৮৪ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। এর জন্য গচ্ছা দিতে হয় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তার পরও চালের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালের শেষার্ধে উচ্চ খাদ্যমূল্য দুর্বিষহ করে তুলেছে সাধারণ মানুষের জীবন। এক সমীক্ষায় জানা যায়, প্রায় ৫ লাখ মানুষ তাতে দারিদ্র্য বেষ্টনীর নিচে নেমে এসেছে। তারা বঞ্চিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় খাদ্য অধিকার থেকে। তাই সবার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খাদ্যের উৎপাদন ব্যাপক ভিত্তিতে বাড়ানো ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। এর জন্য কৃষি খাতে যথাযথ পরিমাণে বাজেট বরাদ্দ ও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি একটি প্রধান উৎপাদনশীল খাত। বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন ২০০৮ অনুসারে কৃষির উৎপাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্যের হার ০.৫ শতাংশ হ্রাস পায়। অর্থনীতির অন্যান্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচনে দ্বিগুণ কার্যকর। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কৃষির উৎপাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্যের হার ০.৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। তবে কৃষিবহির্ভূত খাতে উৎপাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দারিদ্র্য হ্রাস পায় ০.২ শতাংশ হারে। অর্থাৎ কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধির তুলনায় দ্বিগুণ হারে দারিদ্র্য কমায়। কারণ কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে খাদ্য ও পুষ্টির সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যে স্থিতিশীলতা আসে। ফলে খাদ্যভোগ বেড়ে যায় সাধারণ মানুষের। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৩ শতাংশ হারে। এ সময় দেশে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে বছরে গড়ে ১.৪ শতাংশ হারে। তাতেও বলা যায় যে, কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃষি খাত তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। যে হারে মোট বাজেট বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষি বাজেটের প্রবৃদ্ধি সে হারে হচ্ছে না। ২০০৯-১০ সাল থেকে ২০১৭-১৮ সাল নাগাদ মোট বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬২.১৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে, সার্বিক কৃষি খাতের বরাদ্দ বেড়েছে ১৩৫.৫৬ শতাংশ। সেই সঙ্গে মোট বাজেটে কৃষি খাতের শরিকানাও হ্রাস পেয়েছে। যেমন ২০১০-১১ সালে মোট বাজেটে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা ছিল ১০.৪৭ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালে তা ৮.৩৩ শতাংশে কমে আসে। সম্প্রতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষক পানি সেচ পাচ্ছে আগের চড়া দামে জ্বালানি কিনেই। ফলে সারা বিশ্বে কৃষির উৎপাদন খরচ কমে গেলেও বাংলাদেশে তা কমেনি, কৃষি শ্রমিকের মজুরি ও জমির ভাড়া বৃদ্ধির কারণে তা আরও বেড়েছে। তাতে ভাটা পড়েছে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধিতে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫৫ শতাংশ। ২০১৮-১৮ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়েছে ৩.০৬ শতাংশে। তাতে ধারণা করা যায় যে, বাজেটে হিস্যা হ্রাসের সঙ্গে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে।

কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ধারণ উৎসাহিত করার জন্য প্রদান করা হয় উপকরণ ভর্তুকি। স্বাধীনতার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫০ শতাংশেরও বেশি। এরপর অর্থনৈতিক সংস্কারের কারণে দ্রুত প্রত্যাহার করা হয় কৃষি ভর্তুকি। বর্তমান মহাজোট সরকার কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়েছে। তবে তা যথেষ্ট নয়। মোট বাজেট বৃদ্ধির তুলনায় তা আনুপাতিক হারে হ্রাস পাচ্ছে বছরের পর বছর। ২০১২-১৩ সালে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা হ্রাস পায় ৯ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ২০১২-১৩ সালে কৃষি ভর্তুকির হিস্যা ছিল মোট বাজেটের ৬.৩৪ শতাংশ। ২০১৭-১৮

সালে তা ২.২৫ শতাংশে হ্রাস পায়। এটা দেশের কৃষি ও কৃষকের ক্ষতি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ সব মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এর জন্য কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে প্রায় দ্বিগুণ। প্রতি বছর গড়ে উৎপাদন বাড়িয়ে যেতে হবে গড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে। ষাট পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষির উৎপাদন ৪.৫ শতাংশ হারে বাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ লক্ষ্যমাত্রা নামিয়ে দেয়া হয় সর্বোচ্চ ৩.৫ শতাংশে। গত ৩ বছর ধরে এ লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি খাতে মূল বরাদ্দ ও ভর্তুকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো না হলে ভবিষ্যতেও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ফলে আমাদের নির্ভরশীল থাকতে হবে কৃষিপণ্য আমদানির ওপর। সম্প্রতি কৃষিপণ্যের আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০১-০২ অর্থবছরে আমাদের কৃষিপণ্য আমদানি ব্যয় ছিল ৬৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে তা ৪,৪৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে তা আরও বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের আমদানি বিকল্প নীতি গ্রহণ করে কৃষির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে হবে। এ পরিস্থিতিতে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় একটি গুণগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন। এটি এখন বেশ দীর্ঘ। এর বিষয়স্তু সম্প্রসারিত। এটি প্রয়োজনীয় তথ্যসম্ভার, সারণি ও চিত্র দ্বারা সমৃদ্ধ। একটি মূল প্রতিপাদ্যের উপর ভিত্তি করে রচিত হচ্ছে বাজেট বক্তৃতা। দুই বছর আগে (২০১৬-১৭) বাজেট বক্তৃতার মূল বিষয় ছিল ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ : উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ রচনা’। গতবার (২০১৬-১৭) তা পরিবর্তন করে বক্তৃতার শিরোনাম করা হয় ‘প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রা’। চলতি (২০১৭-১৮) অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের’। আসন্ন বাজেটে (২০১৮-১৯) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ২ নম্বর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বক্তৃতার মূল বিষয় ‘টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা’ নির্ধারণ করে জাতিকে টেকসই কৃষি উন্নয়নের প্রতি আগ্রহী ও আস্থাবান করে তোলার জন্য অনুরোধ করছি।

[লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ। উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিডি)]

E-mail: alamj52@gmail.com