• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জিলকদ ১৪৪১

অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

মোহাম্মদ সায়েদুল হক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

image

আজ ৩০ জুন। এই দিনটি নকলা- নালিতাবাড়ীর মানুষের কাছে অন্যরকম এক দিন। কারণ ১৯৪২ সালের এ দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন নকলা- নালিতাবাড়ীর মানুষের আশা আকাংখা, ভালোবাসার প্রতীক অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরী। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নকলা-নালিতাবাড়ীর মানুষ তাদের সব স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব তুলে দেয় অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাতে। তিল তিল করে বিগত ৩০ বছরে নকলা-নালিতাবাড়ীর মানুষের সব স্বপ্ন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী পূর্ণ করেছেন মমতাময়ী মায়ের মতো। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর যারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আজ তারাও নকলা-নালিতাবাড়ীর যুগান্তকারী উন্নয়নের কথা অস্বীকার করার সাহস পায় না। ৩০ বছর আগে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী যখন প্রথম এমপি নির্বাচিত হন তখন ঢাকা-নালিতাবাড়ী সরাসরি কোন বাস চলাচল ছিল না। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী কথা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে নালিতাবাড়ী থেকে সারা দেশে বাস চলাচলের উপযোগী পিচ ঢালা পথ তিনি নির্মাণ করবেন। তিনি তা করেছেন। তিনি বলেছিলেন নালিতাবাড়ীর প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ঢাকায় বাস যাতায়াতের রাস্তা তিনি করবেন। তিনি তার কথা রেখেছেন। ১৯৯১ সালে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী যখন প্রথম এমপি নির্বাচিত হন তখন নকলা এবং নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর ছাড়া কোথাও বিদ্যুৎ ছিল না। আজ নকলা-নালিতাবাড়ীর ২১টি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম শতভাগ বিদ্যুতায়িত। চাকরিসূত্রে সারা দেশ আমাকে ভ্রমণ করতে হয়। যখন দেখি ‘মধুটিলা ইকোপার্ক’ সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত তখন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর কথা মনে পড়ে; কারণ এ পর্যটন কেন্দ্রের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন এবং তিনি তা বাস্তবায়ন করেছেন। যখন কোন ব্যবসায়ী জানতে চায় নাকুগাঁও স্থল বন্দরের কথা তখনও অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর কথাই মনে পড়ে, কারণ এ স্থলবন্দরের স্বপ্ন যে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী প্রথম দেখেছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় নকলা-নালিতাবাড়ীর কৃষকদের মাঝে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর, সেচের জন্য প্রয়োজনীয় খাল খনন, রাবার ড্যাম স্থাপন, স্লুইচ গেইট নির্মাণ, পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ বিতরণ, ভর্তুকি প্রদান ও কৃষি উপকরণ বিতরণের ফলে দুটি উপজেলা আজ খাদ্য শস্য এবং সবজি ফসল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নকলা-নালিতাবাড়ীর কৃষকরা এখন ক্ষেতের পাশে পিকআপ দাঁড় করিয়ে ঢাকায় বিক্রির জন্য ফসল লোড করে। ফসল বিক্রি নিয়ে রবি খরিপ কোন মৌসুমেই দুশ্চিন্তা করতে হয় না। অথচ বিএনপি শাসনামলে ১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে ভরা বোরো মৌসুমে দেশব্যাপী সার, তেল ও কীটনাশকের চরম সংকট সৃষ্টি হয়। সারা দেশের কৃষক যখন তাদের ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্থ তখন সরকার সার নিতে আসা কৃষকের বুকে গুলি চালায়। সারের জন্য সারা দেশের ১৮ জন কৃষক জীবন দেয়। আহত হয় হাজার হাজার কৃষক। তখন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতি বছর ১৫ মার্চ ‘কৃষক হত্যা দিবস’ পালন করে আসছে। নকলা- নালিতাবাড়ীর মানুষের এখনও মনে আছে, তখন এলাকার কৃষকদের সান্ত¡না দিতে গিয়ে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন ‘আপনারা এ মৌসুমে ধৈর্যধারণ করুন, আগামী বছর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসবে তখন এ দেশে এক কেজি সারের অভাব হবে না, ইনশাল্লাহ্।’ তার কথা সত্য হলো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করল। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী পেলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। নালিতাবাড়ী-নকলার মানুষের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের কৃষকের প্রাণে নতুন জোয়ার বইয়ে দিলেন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মতো অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাত্র দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার জন্য ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কাছ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রহণ করেন ‘সেরেস পদক-১৯৯৯’। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে শুধু নকলা-নালিতাবাড়ী নয় সারা দেশের কৃষিতে ঘটলো কাক্সিক্ষত বিপ্লব। আবার ২০০৮ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আমরা ফিরে পেলাম বিপ্লব কন্যাকে। এবার অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে কৃষির সবকয়টি সাবসেক্টর যেমন মৌসুমি ফল ফুল শাকসবজি থেকে শুরু করে তৈল বীজ, অর্থকরী ফসল, সর্বোপরি দানাদার শস্য উৎপাদনে অর্জন করল অকল্পনীয় সাফল্য। বাংলাদেশ প্রথম নাম লেখালো চাল রপ্তানিকারক দেশের তালিকায়। এটা সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা এবং আমাদের অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর নিরলস পরিশ্রম, শতভাগ সততা, শ্রম, বিচক্ষণতা, উদারতা এবং মানবিকতার জন্য। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাতেই দেশে সর্বপ্রথম প্রণীত হয় ‘জাতীয় কৃষি নীতি, ১৯৯৯’। অতঃপর ‘জাতীয় কৃষি নীতি, ১৯৯৯’ পরিমার্জন ও সংশোধন করে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত দিয়েই আসে সময়োপযোগী ‘জাতীয় কৃষি নীতি, ২০১৩’। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাতেই প্রণীত হয়, ‘বীজ বিধি, ১৯৯৮’, ‘জাতীয় বীজ নীতি, ১৯৯৯’, ‘সার (নিয়ন্ত্রণ) আদেশ, ১৯৯৯’, ‘বালাইনাশক (সংশোধনী)আইন, ২০০৯’, ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা, ২০০৯’, ‘সার (ব্যবস্থাপনা) (সংশোধন) আইন, ২০০৯’, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সহিঞ্চু আগাম ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাত ও প্রযুক্তিবিষয়ক নীতিমালা, ২০১০’, ‘উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন, ২০১১’, ‘জাতীয় শস্য ও বন জীবপ্রযুক্তি নীতি-নির্দেশিকা, ২০১২’, ‘উদ্ভিদ জাত ও কৃষক অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৩’, ‘জাতীয় জৈব কৃষি নীতি, ২০১৬’, ‘কৃষি ফার্ম শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা, ২০১৭ (পরিপত্র), ‘সমন্বিত ক্ষুদ্র সেচ নীতিমালা, ২০১৭’, ‘বীজ আইন, ২০১৮’, ‘কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১৮’, ‘উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বিধিমালা, ২০১৮’, ‘বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮’, জাতীয় কৃষি নীতি, ২০১৮’। এখন করোনার ছোবলে মানুষের জীবনের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র পৃথিবীর কৃষি ল-ভ-। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের কৃষি সেক্টর ঠিক এগিয়ে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি এর ভিত্তি রচিত হয়েছে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাতে।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায় অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীকে পাকিস্তানি হায়েনারা বিনা বিচারে জেলে আটকে রেখেছে বছরের পর বছর। আমি যতবার অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর লেখা ‘দেয়াল দিয়ে ঘেরা’ বইটি পড়ি ততবার অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে নতুন করে জানার সুযোগ পাই। বইয়ের ২২তম অধ্যায়ে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী লিখেছেন, ‘পুরো এক বছর তিন মাস বিনা বিচারে আটক থাকার পর অবশেষে ৩১ আগস্ট নেত্রকোনার মামলার রায় বেরুলো। দু’বছর জেল ও এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস জেল। ... কিছু মামুলী কথাবার্তার পর উনি (বুদ্ধি বিভাগের একজন কর্মচারী/পাকিস্তানি ইনটেলিজেন্স) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, আপনি জামিনে যেতে রাজি আছেন? প্রশ্নের গূঢ় অর্থ বুঝেও আমি ভাবলেশহীন মুখে জিজ্ঞেস করলাম- কোন জামিনের কথা বলছেন? তিনি বললেন- কেন, আপনার মামলার। আমি বললাম- কাল যে মামলার রায় বেরুচ্ছে আজ তার জামিন করিয়ে কি লাভ। আর জামিনের পরও যখন জেল থেকে বেরুচ্ছি না, তখন কি দরকার ওসব ঝঞ্ঝাটের। ভদ্রলোক এবার বললেন, ধরুন, ৩২ ধারারও জামিন হলো। আমি বললাম- ওই ধারার জামিন তো শুনেছি সুপ্রিম কোর্টও দিতে পারে না। উনি এরপর আরেকটু খুলে বললেন- আপনি এসব কাজে জড়াবেন না, এই শর্তে আপনার কোন আত্মীয় যদি জামিন নেন তাহলে আপনি রাজি আছেন তো? আর দেখুন, কি দরকার এ সবের মধ্যে থেকে। আপনারা যা চাইছেন (বাংলাদেশের স্বাধীনতা) সে তো কোনদিনই এ দেশে হবে না। কেন অনর্থক নিজের জীবনটাকে নষ্ট করবেন। ... কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, আপনি যদি প্রথমেই আপনার উদ্দেশ্যটা সরাসরি খুলে বলতেন তাহলে অনেক আগেই আলাপটা শেষ করা যেত এবং আপনার সময় বাঁচতো। কি মনে করে ওরা (পাকিস্তানিরা)! রায় - তারিখের আগের দিন এলে বেশি দিনের সাজার ভয়ে বন্ড দেব?’ না; অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী কাউকে কোনদিন ভয় পাননি; কোন অন্যায় বা লোভের কাছে তিনি নত হননি; তার প্রমাণ আমরা রাজ পথে পেয়েছি, তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ২০০৭-০৮ সালে সেনা সমর্থিত সরকারের সময়। যে মানুষটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবনের সব আকাক্সক্ষা বিসর্জন দিয়েছেন; পরিশ্রম আর সততা দিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করছেন; কোন প্রলোভন যাকে আজও স্পর্শ করতে পারেনি; সেই অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীকে রাজনীতি, সমাজসেবা বা মুক্তিযুদ্ধের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি। করোনামুক্ত বাংলাদেশে আমরা নকলা-নালিতাবাড়ীবাসী অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর ৮০তম জন্মদিবস জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে উদ্যাপন করব ইনশাল্লাহ।

[লেখক : কৃষিবিদ, টিভি নাট্যকার মোবাইল] Sayedulbau@gmail.com