• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৯ আশ্বিন ১৪২৬, ২৪ মহররম ১৪৪১

গ্রাম-গ্রামান্তরে

ধানের দরপতনের সেই দুঃখের সারি

রুকুনউদ্দৌলাহ্

| ঢাকা , বুধবার, ২২ মে ২০১৯

‘করব না আর ধানের চাষ, দেখি তোরা কি খাস’ ধানের দরপতনে এবার এ স্লোগানে মানববন্ধন করা হয়েছে। কিন্তু হলে কি হবে। যারা জোগায় ক্ষুধার অন্ন জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তান কৃষকরা আজ দিশেহারা। চোখে অন্ধকার দেখছেন। ওরা পারেন না রাজপথ-রেলপথ অবরোধ করতে। পারেন না হরতাল ধর্মঘট করতে। সবাই তার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য নিজেই নির্ধারণ করে। কিন্তু কৃষকের পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা অন্যের হাতে। সেলুকাস, কি বিচিত্র এ দেশ! কিন্তু কৃষকের এ দুঃখের সারি কে শুনবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ঘরের টাকা পরের দিয়ে উৎপাদিত ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষক। তারা ধার-দেনা করে ধান ফলান। যাদের কাছ থেকে ধার নেন বা যে দোকান থেকে বাকিতে সার কীটনাশক নেন তাদের সঙ্গে এ শর্ত আবদ্ধ হতে হয় যে, ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে টাকা পরিশোধ করতে হবে। আর তাই কৃষক ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ছোটেন বিক্রি করার জন্য। সুযোগ বুঝে ক্রেতারা দাম কমিয়ে দিয়ে ফায়দা লোটে।

ইতোমধ্যে যশোর, ঝিনাইদহ, বাগেরহাটসহ সারা দেশ থেকে কৃষকদের হতাশার খবর প্রতিনিয়ত আসছে। ওই সব জায়গায় ধানের দাম পড়ে গেছে। ধানের এ দর পতনে চলতি মৌসুমে বোরোর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধান বিক্রি করতে আসা কৃষকরা হতাশ। ‘ধানের লাভজনক মূল্য দাও, কৃষক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ এই দাবিতে কৃষকবন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ধান উৎপাদনে এবার কৃষকের বিঘাপ্রতি ১৪ হাজার ৬৩০ টাকা থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে যারা নিজেদের জমিতে চাষ করেছেন তাদের খরচ হয়েছে ১৪ হাজার ৬৩০ টাকা। আর যারা বর্গা চাষ করেছেন তাদের খরচ আরও পাঁচ হাজার টাকা বেশি হয়েছে। খরচের মধ্যে রয়েছে টিএসপি ৭৫০ টাকা, ইউরিয়া ৮০০ টাকা, পটাশ ২৫০ টাকা, দস্তা ১৮০ টাকা, জিপসাম ১৫০, থিওভিট ২০০ টাকা। কীটনাশক এক হাজার টাকা, বীজ ৮০০ টাকা, জমি চাষ এক হাজার, মই ২০০ টাকা, ধান লাগানো দুই হাজার টাকা, নিড়ানো এক হাজার ২০০ টাকা, পানি সেচ দুই হাজার টাকা, ধান কাটা দুই হাজার টাকা, ধান বাড়িতে আনা ৭০০ টাকা, ধান ঝাড়া এক হাজার ৪০০ টাকা। যারা বর্গা চাষি এ খরচের সঙ্গে বিঘাপ্রতি ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে জমির মালিকদের।

বোরো মৌসুমে এক বিঘা জমিতে গড়ে বিঘা প্রতি ২০ মণ ধান পান কৃষক। বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা মণ। এতে এক বিঘায় উৎপাদিত ধান বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ১৪ হাজার টাকা। এ হিসেবে জমির মালিক-কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৬০০ টাকা। এই লোকসানই শুধু লোকসান নয়। প্রায় চার মাস ধরে একজন কৃষক ওই জমির পেছনে যে সময় ব্যয় করেছেন তার কোন বিনিময় তিনি পাচ্ছেন না। তার ওই সময়ের মূল্য টাকার অঙ্কে করা সম্ভব নয়।

যশোরের কেশবপুরের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, এ বছর ধান চাষ করে অধিকাংশ কৃষক দেনায় জড়িয়ে পড়েছেন। ধান বিক্রি করে দায়দেনা শোধ করছেন। কৃষক আবদুল আলিম বলেন, ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে পাওনাদারদের পদাচরণ বেড়ে যায়। ধান মাড়াই শেষ হতেই তারা টাকার জন্য চাপ দেয়। ফলে উঠান থেকেই ধান বিক্রি করতে হয়। আর দোকানদারদের হালখাতা আর মহাজনের দেনা শোধ করতেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। অনেকের ঈদ হবে না বলে যোগ করলেন শাহপুর গ্রামের আরেক কৃষক আবদুল গণি।

জমির মালিক প্রফেসর ইকবাল হোসেন বাবুল বলেন, আগে চাষাবাদ করতাম। কিন্তু এ কাজে এখন আর লাভ হচ্ছে না। সব কাজ শ্রমিক দিয়ে করাতে গিয়ে প্রতি বছর লোকসান হতো। নিজের সব জমি লিজ দিয়েছেন। কোন খরচ ও ঝুঁকি ছাড়াই পাঁচ বিঘা জমি থেকে ২৫ হাজার টাকা পেয়েছেন এ বোরো মৌসুমে। তা দিয়ে ধান কিনেছি ৩৬ মণ।

সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা দরে এক মণ ধান ১ হাজার ৪০ টাকায় ক্রয়-বিক্রয় হবার কথা থাকলেও যশোরের দোগাছিয়া, চুড়ামনকাটি, পুলেরহাট, রূপদিয়া, রাজগঞ্জ ধানের মোকাম খ্যাত বাজারে প্রতি মণ ধান রকম ভেদে ৬২০ টাকা থেকে ৭০০ পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে সরকারের এ দামের ব্যাপারে কিছুই জানেন না কৃষক।

দোগাছিয়ার কৃষক মোশারফ হোসেন, মহিউদ্দিন, আকলাকুর রহমান ও আরাফাত হোসেন বলেন, আমাদের দোগাছিয়া, চুড়ামনকাটি বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে কেউ ধান কিনছে না। সরকারের ধান ক্রয়ের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানিনে।

কৃষকরা বলেন, সরকার যদি সরাসরি ধান ক্রয় করত তাহলে একজন কৃষক এক হাজার ৪০ টাকা মণ দরে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারত। এ নিয়মে একজন কৃষক ধান বিক্রি করতে পারলে তিনি বাজারদর (বাজারে ৭০০ টাকা ধানের মন) ছাড়া আরও ৩৪০ টাকা মণ প্রতি বেশি পেতেন। এতে কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হতো। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কৃষকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এ দাম পাচ্ছে না। সরকারি ধান কে বা কারা গুদামে সরবরাহ করেন তা সাধারণ কৃষকরা জানেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে সরকারের কাছে ধান বিক্রির বাজার চলে গেছে।

কেশবপুরের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ধানের তেমন চাহিদা নেই। গত বছর ধান মজুদ করে লোকসান হয়েছে। মোকামে প্রচুর মজুদ থাকায় আগ্রহ নিয়ে কোন মহাজন ধান ক্রয় করছে না।

সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা দরে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪০ টাকায় ক্রয়-বিক্রয় হবার কথা বলে জেলা খাদ্য অফিস বলেছে। চিঠি আশার পরপরই ধান ক্রয় শুরু হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে যে দামেই বেচা-কেনা হোক না কেন এতে আমাদের কিছু করার নেই। যশোরে জেলার একজন খাদ্য কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশে এক সঙ্গে চাল, ধান আর গম ক্রয় শুরু হয়েছে। ধান সাধারণত একটু দেরিতে ক্রয় করা হয়ে থাকে। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, গুদামে জায়গা সংকট, দীর্ঘ সময় গুদামে রেখে দিতে হয় আর সহজে স্থানান্তর করা যায় না। তিনি বলেন, ধানের চেয়ে চাল ক্রয়ের দিকে আগ্রহ বেশি।

এদিকে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে যশোরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

ধানসহ সব কৃষিপণ্যের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত, সব ইউনিয়নে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধানসহ ফসল ক্রয় করার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়াও পাশাপাশি ধান ক্রয়ে খাদ্য অফিসের অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধেরও দাবি জানান।

এ বছর ধান কাটার সময় প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে মাঠ থেকে ধান আনা ও মাড়াই করতে দ্বিগুণ খরচ হয়েছে। আবহাওয়ার কারণে কৃষি শ্রমিকেরা মজুরি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়ায় খরচ অনেক বেড়ে গেছে। একেক জন শ্রমিককে দিনপ্রতি মজুরি ৮০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।

এমন একটা সময় ছিল যখন কৃষকের খবর কেউ রাখত না। শুধু বইয়ের পাতায় আর মুখের স্লোগান ছিল কৃষক জাতির মেরুদন্ড। কিন্তু বইয়ের এ বাণী ও স্লোগানের কোন মূল্যায়ন ছিল না। কৃষককে চাষাভুষা বলে ঘৃণা করত সবাই। সেই অবস্থা এখন নেই। এখন কৃষির উন্নয়নে শহুরে উচ্চ শিক্ষিত চাকরেরা ছোটেন কাদা-পানিতে পূর্ণ ক্ষেতের আল পর্যন্ত। উৎপাদন বাড়াতে তারা কৃষকের সঙ্গে পারলে গতরে খাটেন। কৃষিকে মান্ধাতার আমল থেকে টেনে তুলে আধুনিক রূপ দেয়া হয়েছে। সে আমলে এক বিঘা জমিতে যেখানে ৪-৫ মণ ধান ফলিয়ে কৃষক খুশি হতো। এখন সেই জমিতে সাধারণত ২০ মণ ধান হচ্ছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থা এখনও সেই পুরোনো আমলের থেকে গেছে। এখনও ফসল উঠলে দাম পড়ে যায়। কৃষকের হা-হুতাশে দিন কাটে।

চাষিরা বলছেন, আমাদের কোন সংগঠন নেই। তবে আমাদের নাম ভাঙিয়ে এ দেশে আছে কৃষকলীগ, কৃষক দল, কৃষক সমিতি প্রভৃতি। কৃষকদের নাম ব্যবহার করে ওই সব সংগঠন করা হলেও সেখানে কৃষকের কেউ নেই। সব ধান্ধাবাজি কারবার আর কি। সব সরকার দুর্নীতিবাজদের পুরস্কৃত করে। যেমন কালো টাকার মালিক, ব্যাংক লুটেরা, শেয়ার বাজার লুটেরা, হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিদের বিভিন্ন সময় তাদের নানা ছুতায় সুবিধা দিয়ে আসছে। অথচ কৃষকের দুঃখের কথা সরকার জানে না। কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার দাবি করা হলে সরকার যা বলছে তা কৃষকের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়া মতো।

চলতি মৌসুমে সার, বীজ, কীটনাশক বা ডিজেল পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ভালো। তাছাড়া মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে পরিমাণ মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় ধানের ভালো ফলন হয়েছে। সরকারিভাবে ধানের যে ক্রয়মূল্য সেটা পর্যাপ্ত হলেও চাষিদের কাছ থেকে তো সরকারিভাবে ধান ক্রয় করা হয় না। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। বাজারে এক হাজার থেকে ১১০০ টাকা মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারলে তাদের পরিশ্রম সার্থক হতো। তবে ঘূর্ণিঝড় ফণী কৃষকদের মধ্যে প্রবল শঙ্কা জাগালেও তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ায় এদিক থেকে তারা স্বস্তি বোধ করছেন।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংগ্রাম পরিষদ যশোর জেলা শাখা। মানববন্ধন চলাকালে সংগঠনের আহ্বায়ক আফরোজা সুলতানা মৌ বলেন, এদেশের কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও তার ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ মধ্যস্বত্বভোগীরা বিনা পরিশ্রমে এ কৃষকদের ফসলের মূল্য শোষণ করে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে। তাই দেশের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে দ্রত উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য কৃষি উপকরণের দাম কমাতে হবে।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস করতে হবে। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে এবং প্রকৃত কৃষকদের মাঝে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

  • রক্তঝরা কষ্টের ধান!

    মোহাম্মদ আবু নোমান

    সন্তানের মমতায় লালন, কঠোর পরিশ্রম ও শরীরের রক্ত পানি করে ফলানো ফসল