• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪১

গ্রাম-গ্রামান্তরে

ঘরে ঘরে চাকরির স্লোগান
ওদের সঙ্গে নির্মম রসিকতা

রুকুনউদ্দৌলাহ্

| ঢাকা , বুধবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঘরে ঘরে চাকরির স্লোগান কারও কারও কাছে নির্মম রসিকতা বলে মনে হচ্ছে। চাকরি হওয়া তো দূরের কথা অনেকের হওয়া চাকরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাও দুঃখ ছিল না, কিন্তু সম শ্রেণীর অন্য সবার চাকরি থাকলেও কিছু মানুষের কপাল পুড়েছে। এ বিষয়ে আবেদন নিবেদনে কোন মহলের মন গলছে না। যারা বিষয়টা দেখবেন তাদের ভাবখানা এমন যে কোথায় কার কী হলো তার সব খবর কী রেখে পারা যায়।

এমনি ধরনের কপাল পোড়া একদল শিক্ষক-কর্মচারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সেদিন। বিশেষ একটি প্রয়োজনে যশোর শিক্ষা বোর্ডে গিয়েছিলাম। ওই সময় তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। বোর্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের আশেপাশে তারা অসহায়ের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। রাজ্যের যত হতাশা এসে তাদের ঘিরে রেখেছে। তারা একে একে যে সব কথা শোনালেন তা বড়ই বেদনাদায়ক। তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণও বটে। যশোর শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ জাতীয়করণ হওয়ায় চুক্তিভিত্তিক ২০ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কপাল পুড়েছে। তারা ১২ জন শিক্ষক ও আট জন কর্মচারী প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের আগে থেকে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে স্থায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের মতো নির্ধারিত প্যাটার্নভুক্ত শূন্য পদের বিপরীতে দীর্ঘদিন যাবৎ চুক্তিভিত্তিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে (স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭১.১৮.০০২.১৭(অংশ-৩)-৮৬২) যশোর শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ একই সঙ্গে দেশের ১১টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারীদের ঘাটতি বেতন ভাতা যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রদান করে আসছিল। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরি স্থায়ী করতে পারেনি। জাতীয়করণ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্বে শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্মীকরণের লক্ষ্যে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক কর্মচারী ৫৭ জনের নামের তালিকা ও প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

তারা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সব প্যাটার্নভুক্ত শূন্যপদ এবং পদসমূহের বিপরীতে নিয়োগপ্রাপ্ত চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-কর্মচারীদের নামের তালিকা বাদ দিয়ে শুধু স্থায়ী ৩৭ জন শিক্ষক-কর্মচারীর নাম প্রস্তাব করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদ সৃজনের জন্য পাঠিয়েছে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চুক্তিভিত্তিক ওই সব শিক্ষক-কর্মচারীরা সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিকভাবে কষ্টের মধ্যে পড়েছেন। তারা আজ চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন।

একজন বললেন, আমার মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। কিন্তু কপাল পোড়ায় আর মেয়ের বিয়ের কথা ভাবতে পারছিনে। যে যুগ তাতে খালি হাতে বিয়ের কাজে নামা যাবে না। এখন একে বেকার, তার ওপর অন্য কোথাও ঢুকবো সে সুযোগও নেই।

ইতোমধ্যে তার মতো তাদের প্রায় সবার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের নির্ধারিত বয়স সীমা শেষ হয়ে গেছে। যখন ঘরে ঘরে চাকরির স্লোগানে বেকাররা উদ্বেলিত, সোনালী স্বপ্নে সবাই বিভোর ঠিক তখন একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে ২০ জনের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে অভিশপ্ত বেকারত্ব। এতে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন।

তারা পৃথক পৃথকভাবে যে বিবরণ দিলেন তাতে অধিকাংশেরই এ চাকরিটাই একমাত্র সম্বল। তাদের কারো ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। কেউ টাকার অভাবে নিজে অথবা বউ-ছেলেমেয়ে সুচিকিৎসা করাতে পারছে না। টাকার অভাবে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে দেবেন, শিক্ষা প্রতিষ্টানে চাকরি করে এসে সে রকম সিদ্ধান্ত নেয়াও শোভন নয়।

তারা বললেন, ঘরে ঘরে চাকরি গীতির গায়করা ভালোই তামাশা দেখছেন। আসলে আমাদের এই ছোট্ট দেশটির মানুষ একেবারে তৃণমূল থেকে উঠে এসেও গোড়ার কথা ভুলে যান। নতুবা ২০ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে কোন আক্কেলে তারা বেকার করলেন। তারা কি জানেন না যে তারা চাকরিহারা হলে আর কোথাও চাকরি পাবে না। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে জীবনের বাকি দিনগুলো তারা কি অবলম্বন করে টিকে থাকবে।

শিক্ষক-কর্মচারীরা জানান, একই সঙ্গে দেশের আরও ১০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে। কিন্তু ওই সব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-কর্মচারীদের বাদ দেয়া হয়নি। চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-কর্মচারীদের যদি চাকরিতে নেয়া না যায় তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয়করণের কি এমন দরকার ছিল। কারও পেটে লাথি মেরে জাতীয়করণের নামে এমন উন্নয়ন অমানবিক। জাতীয়করণ না করলে কি ওই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যেত? দেশের আর সব প্রতিষ্ঠান যদি বেসরকারি থেকেও ভালো অবস্থানে থাকতে পারে তাহলে যশোর শিক্ষা বোর্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজও চলতো। আর যারা ওই প্রতিষ্ঠানটিতে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে ছিলেন তারা কী জোর করে ঢুকেছেন? প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে পরে স্থায়ী করা হবে এই শর্তে তাদের চাকরিতে নেয়া হয়। তাদের চাকরি থেকে বাদ দেয়ার কোনো নৈতিক অধিকার কারো নেই। আর যদি বাদ দিতে হয় তাহলে তাদের এই প্রতিষ্ঠানে যে ক’বছর নষ্ট করেছেন তা ফিরিয়ে দিতে হবে যাতে তারা অন্য কোথাও চাকরি খুঁজে নিতে পারে। সরকার দেশের সব মানুষের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা বলতে কিছুই নেই। বড় বিচিত্র এ দেশ।

সরকারের পক্ষ থেকে যখন বলা হচ্ছে ঘরে ঘরে চাকরি তখন সরকারের এ কথার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি সিদ্ধান্ত যারা নিল তারা কি সরকারের প্রতিশ্রুতি বা ঘোষাণাকে অসার প্রমাণের অপচেষ্টা করছে। যারা কলকাটি নাড়ছে তারা কোনো মতেই সরকারের হিতাকাক্সক্ষী হতে পারে না। খেলছে অন্যরা আর দুর্নামের ভাগটা পড়ছে সরকারের ওপর। দেশের আর ১০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-কর্মচারীরা যখন জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়েননি তখন নীতিগত কারণে যশোরের শিক্ষক-কর্মচারীরাও বাদ পড়বেন না। মাঝে কিছু সময়ের জন্য মতলববাজরা পানি ঘোলা করছে এই যা। তারা নগদ নারায়নে পকেট ভর্তির সুযোগ তৈরির জন্য একটা ফাঁদ পাততে পারে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াবে এমন কথা ইতোমধ্যে বঞ্চিতদের মাথায় ঢুকেছে। মন্ত্রণালয়ের মতলববাজরা তাদের এমন পথে হাটতে বাধ্য করছে। ন্যায্য পাওনা থেকে যদি কেউ কাউকে বঞ্চিত করে তবে অসহায় ওই মানুষকে আইনের কাছে সাহায্য চাওয়া ছাড়া আর তো পথ থাকে না।

তাদের বঞ্চনার কথা যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতির কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারীরা হলেন, গণিত প্রভাষক সিরাজুল ইসলাম, বাংলা প্রভাষক হোমায়রা আখতার, ফিন্যান্স ব্যাংকিং ও বীমা প্রভাষক মতিউর রহমান, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন প্রভাষক মতিয়ার রহমান, হিসাব বিজ্ঞান প্রভাষক সামছুন নাহার, ইংরেজি সহকারী শিক্ষক মাকসুদা খাতুন, চারু ও কারুকলা সহকারী শিক্ষক উৎপল কুমার বিশ্বাস, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা সহকারী শিক্ষক মাহবুবুল্লাহ, ইংরেজি সহকারী শিক্ষক মাহফুজা রহমান, গণিত ও বিজ্ঞান সহকারী শিক্ষক বেলাল হোসেন, সহকারী লাইব্রেরিয়ান নন্দিতা নন্দী, সংগীত শিক্ষক সন্ধ্যা অধিকারী, তবলা বাদক কিশোর বিশ্বাস, অফিস সহায়ক (আয়া) মুনমুন খাতুন, নৈশ প্রহরী বদিউজ্জামান শান্ত, এমএলএসএস (পরিচ্ছন্নতা কর্মী) শিল্পী খাতুন, অফিস সহায়ক (পরিচ্ছন্নতা কর্মী) আল আমিন ও অফিস সহায়ক (পরিচ্ছন্নতা কর্মী) নূরজাহান।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের পক্ষে। আর এ জন্য তাদের চাকরিতে বহাল রাখার আবেদনপত্রে তারা সুপারিশ করেছেন।

একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চাকরি হারানোর ব্যাপারে ওই ২০ জনের কপালের দোষ না কি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খামখেয়ালি এর জন্য দায়ী। একই দেশে একই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন আর ১০ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-কর্মচারীরা হচ্ছেন না। সে ক্ষেত্রে যশোরের শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরিহারা হবেন কেন? এটাকে স্রেফ বেআইনি বললে বেশি করে বলা হবে বলে আমার মনে হয় না। দেশ জুড়ে যখন টাকার খেলা চলছে তখন যশোরের ভাগ্য বঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারীরা এমন একটা বিষয়ের শিকারও হতে পারে। ‘গ্রাম্য কথায় আছে ‘চাচীর তরকারীর এমন গুণ, জাগায় ঝাল জাগায় নুন’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও হয়েছে সে রকমটা।

তিনি বলেন, আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে সজ্জন মানুষ বলে জানি। বিষয়টা তার কানে অথবা প্রধানমন্ত্রীর কানে তুলতে পারলে এর একটা ন্যায়সঙ্গত সমাধান হতো বলে আমার বিশ্বাস।