• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০, ৯ জিলহজ ১৪৪১, ৩১ জুলাই ২০২০

গ্রাম-গ্রামান্তর

হাতাহাতি যুদ্ধ ১৯৭১

রুকুনউদ্দৌলাহ

| ঢাকা , রোববার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯

(শেষাংশ)

গরিবপুর রণাঙ্গনের আর এক যোদ্ধা আবদুল বাতেন। তার বাড়ি চৌগাছা উপজেলার বড় নিয়ামতপুর গ্রামে। টগবগে তরুণ। ১৯৭১ সালের ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যখন আন্দোলনে উত্তাল তখন তিনি রিক্রুট হিসেবে ট্রেনিংয়ে ছিলেন। এমনিতেই সেনাবাহিনী বাইরের কিছু জানা বোঝার সুযোগ খুব কম পায়। তার ওপর রিক্রুট। ৩ মাস চট্টগাম সেনানিবাসে ট্রেনিংয়ে থাকা অবস্থায় আসে ২৫ মার্চ। ওই দিন কালো রাতে গোলাগুলির আওয়াজ শুনে তাদের বুঝতে বাকি থাকে না দেশে কী হচ্ছে। তারা সেনানিবাস থেকে পালানোর পথ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু বেরুনো কোন রকমেই সহজ ছিল না। নানা ধরনের চিন্তা-ভাবনা ভয়ভীতি মাথায় এসে ভর করতে থাকে তাদের। পালাতে গিয়ে যদি ধরা পড়ে তাহলে জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু স্বাধীনতার চেতনা যে রক্তে একবার জাগ্রত হয়েছে তা কি আর মৃত্যু ভয়ে থেমে থাকতে পারে। বরিশালের আবদুল মান্নান ও শামসুল আলমসহ আরও ৫-৭ জন জীবন বাজী রেখে জোট করেন। পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হতেই হবে। আর তাই তারা অজানা গন্তব্যের পথে পা বাড়ালেন। পালালেন ট্রেনিং সেন্টার থেকে। চট্টগ্রামের পাহাড়-পর্বত বন-বাদারের দুর্গম পথে কখনো হেঁটে, কখনও গড়িয়ে, খেয়ে না খেয়ে ধারণার বাইরে বহু দূর অতিক্রম করে সমতলভূমির সড়ক পান। কিন্তু তার পরেও পথ চলা নিরাপদ ছিল না। এ অবস্থায় কিছু পথ গাড়িতে চড়ে আবার বিপদ মনে করলে কিছু পথ হেঁটে ১১ রাত ১১ দিন পর বাড়িতে পৌঁছান।

তিনি বলেন, চারিদিকে মুক্তিযুদ্ধের দামামা চলছে। তার পরিবার ছিল স্বাধীনতাকামী। ৬৯ এর গণআন্দোলন, ৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ৭১ এর স্বাধীনতা আন্দোলনে গ্রামের এই সাধারণ মানুষটির সক্রিয় ভূমিকা ছিল। চারিদিকের উত্তাল বিক্ষুব্ধ দিনে তিনি স্থির থাকতে পারছিলেন না। তিনি ছেলেকে অনুপ্রেরণা দেন, সেনাবাহিনীর ট্রেনিং যখন পেয়েছ তখন দেশ স্বাধীনের কাজে তা ব্যয় করো। বাবার প্রেরণায় যুদ্ধ জয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, প্রথমে ভারতের বাগদার টালিখোলা ট্রেনিং ক্যাম্পে ভর্তি হই। ৫-৭ দিন সেখানে থাকি। সেখানে নেতৃত্ব দিতেন চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন মল্লিক। তিনি আমাদের একটি কার্ড দেন। সেখান থেকে আমরা চলে যাই বনগাঁয়। পরে আমাদের পাঠানো হয় বিহারের চাকুলীয় (বীরভূম) ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে প্রথম ব্যাচে ভর্তি হই। ট্রেনিং করানো হয় ছয় সপ্তাহ। ট্রেনিং শেষে দত্তবিলা হয়ে বয়রা এসে ৮নং সেক্টরের অধীন বয়রা ৪ উইং, ডি-কোম্পানি, তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্পে যোগদান করি। তখন বয়রা ক্যাম্পে মেজর কেএন হুদাসহ সেনা ও বিমানবাহিনীর সাতজনকে ইপিআরে কো-অপ্ট করে নেয়া হয়। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা সদস্য হিসেবে আমাকেও ওই গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রথমেই আমাদেরকে রেকি করার দায়িত্ব দেয়া হয়। বয়রা থেকে রেকি করতে এসে আমরা ধুলিয়ানী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে অবস্থান করতাম। ওই এলাকার ছুটিপুর-বর্ণি-গুলবাগপুরে পাকিস্তানি সেনাদের আনাগোনা ছিল বেশি। আমরা তাদের গতিবিধি রেকি করতাম ও বিভিন্ন ভাবে তাদের বাধা সৃষ্টি করতাম। আমাদের কমান্ডার ছিলেন মেজর কেএন (খন্দকার নাজমুল) হুদা। সহ-কমান্ডার ছিলেন লে. অলোক কুমার গুপ্তা, কোয়ার্টার মাস্টার তপন কুমার ব্যানার্জী, হাবিলদার মেজর ছিলেন গিয়াস উদ্দিন, নায়েক সুবেদার ছিলেন আলাউদ্দিন।

পরবর্তীতে আমাকেসহ বিভিন্ন বাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ৭ জনকে ধুলিয়ানী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের অধীনে দেয়া হয়। আমার সঙ্গে ছিলেন শাহাবুদ্দিন (বিমানবাহিনী), সলুয়ার শাহাজাহান আলী (সেনাবাহিনীর ৭ম বেঙ্গলের সদস্য), ফরিদপুরের আবদুর রহমান (আর্মি মেডিকেল কোর) ও নোয়াখালীর শফিউদ্দিন (সেনাবাহিনী)। একদিন আমরা ধুলিয়ানী ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সলুয়া ব্রিজ (চৌগাছা-যশোর সড়কে অবস্থিত) উড়িয়ে দেয়ার জন্য রওনা দিই। দুপুরের খাবার ও গোসল করার জন্য গরিবপুর মাঠে অবস্থানকালে স্থানীয় রাজাকাররা পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে সংবাদ দেয়। সংবাদ পেয়ে পাকহানাদার বাহিনী দুপুর দেড়টা-২টার দিকে আমাদের ওপর আক্রমণ করে। সেখানে আমরা কেউ খাচ্ছিলাম, কেউ গোসল করছিলাম। একটা বাচ্চা ছেলে এসে আমাদের সংবাদ দেয় পাঞ্জাবিরা আসছে। তখন আমরা সটকে পড়ি। হানাদার বাহিনী উড়ো ফায়ার দিতে দিতে আমাদের দিকে আসতে থাকে। আমরা পাশের মাঠের গলা পানিতে নেমে পড়ি। পানির মধ্যে নেমে আমিসহ আমার সহকর্মীরা ফায়ার করতে থাকি। পরে ওই পানি সাতরে গিয়ে বাড়িয়ালি গ্রামে উঠি।

বাড়িয়ালি থেকে ফিরে ধুলিয়ানী ক্যাম্পে আসি। সেখানে ৫-৭ দিন থাকার পর আমাকে বয়রা ক্যাম্পে নেয়া হয়। সেখানে হুদা সাহেব পরিকল্পনা করেন বর্ণি ইপিআর ক্যাম্প আক্রমণ করার। মেজর হুদার নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন আর্মি-ইপিআর-মুক্তিযোদ্ধাসহ বর্ণি ইপিআর ক্যাম্প আক্রমণ করে সেলিং করতে থাকি। হানাদার ইপিআর সদস্যরাও আমাদের ওপর মর্টার মারতে থাকে।

তুমুল লড়াইয়ের এক পর্যায়ে দু’পক্ষেরই গোলা বারুদ শেষ হয়ে যায়। ওই রণক্ষেত্রে তখন শুরু হয় মল্লযুদ্ধ। এই যুদ্ধের মধ্যে জগন্নাথপুরের যুদ্ধ ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। দেশের আর কোথাও এ যুদ্ধ হয়নি। এ দিন প্রচ- যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। জগন্নাথপুর আমবাগান রণাঙ্গন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এখানকার যুদ্ধের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ে দেশের সামরিক একাডেমিতে পাঠ করানো হয়। এখানে যে যুদ্ধ হয় তার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন হলেন চৌগাছার জগন্নাথপুরের রেজাউল হক। তিনি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক কাম অফিস সহকারীর চাকরি করতেন। তার বর্ণনামতে ওই দিন ছিল সম্ভবত ২০ নভেম্বর, ঈদুল আজহার দিন। মানুষের চোখে মুখে আতংক কখন কী হয় এ ভেবে কেউ ঈদের আনন্দ করতে পারেনি। গ্রামজুড়ে যেন কবরের নিস্তব্ধতা। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে গরিবপুর, জামতলা, জগন্নাথপুর এসে অবস্থান নিল শত শত পাকিস্তানি সৈন্য। পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে বিধ্বংসী ট্যাংক। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি চৌগাছা দখল নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করা। মেজর এম এ মঞ্জুরের অধীন ৮ নম্বর সেক্টরের বয়রা সাবসেক্টর কমান্ডার তখন ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা। যিনি ‘ক্যাপ্টেন হুদা’ নামেই বেশি পরিচিত।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মিত্র হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে অনেকটাই সম্মত তখন। জগন্নাথপুর সীমান্ত এলাকা। তাই মিত্রবাহিনীর ঢুকে পড়াটাও ছিল সহজ। মাসের পর মাস বিহারে ট্রেনিং করা গেরিলা যোদ্ধাদের নিয়ে প্রস্তুত ছিল মিত্র বাহিনীও। সন্ধ্যার পর পাকিস্তানি সেনারা সিংহঝুলি মাঠ ও জগন্নাথপুর গ্রামের উত্তর পাড়ায় ট্যাংকসহ পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান নেয়। মিত্র বাহিনীও আসে। তারা জগন্নাথপুরের দক্ষিণ মাঠ ও গরিবপুর মাঠের চাড়ালের বাঁশবাগানে আনাগোনা শুরু করে। ওই সময় রেজাউল হক, গ্রামের হারুনুর রশিদ ও আবদুল আজিজসহ অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করছিলেন। ওই সময় মিত্র বাহিনী রেজাউল হককে ডেকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে শত্রু বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করে। পাকিস্তানি বাহিনীর তেঁতুলতলা অবস্থান ও সেখানে যাবার পথের একটি নিখুঁত চিত্র মিত্র বাহিনীকে তিনি দেন। পরের দিন ভোরে মিত্র বাহিনী আবার আসে। তাদের ঘাঁটি ছিল শাহজাদপুরে। কাবিলপুরে কপোতাক্ষ নদ পার হয়ে তারা রণক্ষেত্রে আসতেন। তিনি তাদেরকে পথ দেখিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর তেঁতুলতলা অবস্থানে নিয়ে যান। তিনি দূর থেকে লক্ষ্য করেন শত্রু সেনারা অ্যাম্বুস করে আছে। মিত্র বাহিনীও তা দেখে রেজাউল হককে দ্রুত সেখান থেকে সরে যেতে বলেন। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে নিরাপদ স্থানে সরে যান। এর পরপরই শুরু হয় দু’পক্ষের গুলি বিনিময়। হানাদার বাহিনী প্রথমে গুলি বর্ষণ করে। পরপরই পাল্টা গুলি বর্ষণ করে মিত্র বাহিনী। প্রচণ্ড গোলাগুলিতে এলাকা কাঁপতে থাকে যেন। এলাকাবাসী বাঁচার জন্য দিকবিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। সেখানে প্রায় ২ ঘণ্টা যুদ্ধ হয়। শত্রুরা ট্যাংক নামানো ছাড়াও বিমান হামলাও শুরু করে। মিত্র বাহিনীর বিমানও ছিল আকাশে।

জগন্নাথপুরের আশেপাশের অধিকাংশ গ্রাম আগেই জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানিরা। প্রায় মানুষশূন্য গ্রামে তখন যে ক’টি ঘরে লোকজন ছিল, তাদের না মেরে সরে যেতে বলে খান সেনারা। এ বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে এলাকার মানুষ বিষ্মিত হয়। কারণ হায়েনার চরিত্র এমন হতে পারে তা ভাববার বিষয় বটে। তবে তারা হয়তো এও ভাবতে পারে যুদ্ধে তাদের পরাজয় অনিবার্য। জীবনটা নিয়ে ফিরতে পারবে কি না সে ভরসাও নেই। জীবনের শেষ বেলায় এসে হয়তো বা এই ভাবনাটা ওদের এসেছিল যে আর সাধারণ মানুষ মেরে লাভ নেই। অথবা অন্য কিছুও ভাবতে পারে। যাহোক গ্রামের মানুষ সরিয়ে দিয়ে তারা গরিবপুর ও জগন্নাথপুরের পুকুরপাড়, বিল ও আমবাগানে অ্যাম্বুশ নেয়। অর্থাৎ যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত তারা। যে কোন মুহূর্তে শুরু হবে যুদ্ধ।

রেজাউল হক স্মৃতি চারণ করে বলেন, যুদ্ধ করে যুদ্ধ দেখা আর দুপক্ষের যুদ্ধ দাঁড়িয়ে দেখা এক নয়। যতটুকু সম্ভব নিরাপদে থেকে সেই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিলেন রেজাউল হক। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বয়রা থেকে কাবিলপুর দিয়ে পশ্চিম-দক্ষিণ কোণ থেকে গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক নিয়ে হাজির হয় মিত্রবাহিনী। দুটি শিখ লাইট আর্টিলারি রেজিমেন্ট, কাশ্মীর রেজিমেন্ট ও একটি শক্তিশালী ট্যাংক রেজিমেন্ট ছিল বহরে।

জগন্নাথপুরের যে আম বাগানে মূল যুদ্ধ হয়, সেটি এখন মুক্তিনগর শহীদ সরণি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। যুদ্ধের সময় ছিল বড় বড় আমগাছ। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা একজোট হয়ে আসে ঈদের দিন দুপুর নাগাদ। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। কপোতাক্ষ নদ ও ঢেঁকিপোতা বাঁওড় পেরিয়ে আসা মিত্র বাহিনীর ট্যাংকের মুখোমুখি হয় গরিবপুর থেকে আসা পাকিস্তানি ট্যাংক। চলে অনবরত গোলাগুলি। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল হাজারের বেশি। পাকিস্তানিদের সঠিক সংখ্যা না জানা গেলেও এর চেয়ে বেশি ছিল বলেই ধারণা।

মাঠ পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকের ধানক্ষেতে বিধ্বস্ত হয় পাকিস্তানিদের দুটি ট্যাংক। একটি মুক্তিবাহিনীর পোঁতা মাইনে, অন্যটি মিত্র বাহিনীর আর্টিলারি শেলে। শেলে চেইন কেটে যাওয়া ট্যাংকটি পড়েছিল কয়েক দিন। পচা লাশের গন্ধে ভরে ছিল সেই জায়গা এখন ধানের গন্ধে মাতোয়ারা। সড়কটিও হয়েছে মাটি থেকে পিচঢালাই।

এদিন শেলের টুকরো পড়ে নিহত হন মুক্তিনগরের এক বয়স্ক মহিলা। সেদিন এতো মানুষ মারা গিয়েছিল যে, কাউকেই কবর দেয়া যায়নি। সেসময় কুকুর আর শিয়ালের পেটে যায় সব লাশ।

প্রথমে ট্যাংক থেকে ট্যাংকে গুলি, মর্টার শেল নিক্ষেপ শুরু হলেও একসময় ট্যাংকগুলো এতো কাছাকাছি এসে যায় যে, আর সামনে এগিয়ে গুলি ছোড়া সম্ভব ছিল না। দু’পক্ষের সৈন্যরা একসময় কাছাকাছি চলে এলে গুলি ছোড়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ তাতে নিজেদের লোক চিহ্নিত করে শত্রুপক্ষকে গুলি করা কঠিন হয়ে ওঠে। একসময় বেয়নেট দিয়ে চলতে থাকে যুদ্ধ। সবশেষ যখন আরও মুখোমুখি হলো তখন বেয়নেট ফেলে হাতাহাতি, চুলোচুলি পর্যন্ত হয়। এমন যুদ্ধের নজির দেশে বা বিশ্বে আর নেই।

যুদ্ধের একসময় মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করতে বললে তারা অস্বীকৃতি জানায়। এভাবে তারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যায়। টানা যুদ্ধের পর শেষ দিকে বিমান হামলায়ও যখন রক্ষা না হয়, তখন পিছু হটে ক্যান্টনমেন্টে না ঢুকে বারোবাজার হয়ে খুলনার শিরোমণিতে পালিয়ে যায় পাকিস্তানিরা। ২২ নভেম্বর জগন্নাথপুরে ওঠে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য।

এই যুদ্ধে শত্রু পক্ষের ৯৬ জন সৈনিক মারা যায়। তাদের আটটি ট্যাংক ধ্বংস হয়। এ মল্লযুদ্ধ শেষ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে মিত্র বাহিনীকে পরাস্ত করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী বিমান হামলা শুরু করে। তাদের বিমানের গর্জনে জগন্নাথপুরসহ চৌগাছার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে। ব্যাপক গোলা বর্ষণের মাধ্যমে মিত্র বাহিনীকে হঠানোর চেষ্টা করলেও তা প-শ্রমে পরিণত হয়। ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাল্টা হামলায় শত্রু বিমান পরাস্থ হয়ে জগন্নাথপুরের আকাশে উড্ডয়ন করার মনোবল হারিয়ে ফেলে। এক পর্যায়ে মিত্র বাহিনী শত্রুদের দু’টি বিমান ভূপাতিত করে দুই পাইলটকে আটক করে। তারা বিধ্বস্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয়। এ সময় জয় বাংলা স্লোগানে মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকার মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে।

অপরপক্ষে গ্রামের সাধারণ মানুষসহ ৫৭ জন শহীদ হন। তাদের মধ্যে ১৯ জনের নাম সংগ্রহ করা গেছে। তাদের নাম জগন্নাথপুর স্কুলের মাঠে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে লিপিবদ্ধ আছে। তারা হলেন,

১. মুক্তিযোদ্ধা সুজাউদ্দৌলা, পিতা-আবদুর রহমান বিশ্বাস।

২. আসাদুজ্জামান মধু, পিতা-আবদুর রহমান বিশ্বাস।

৩. আবদুর রাজ্জাক, পিতা- আবদুল গফুর বিশ্বাস।

৪. আবুল হোসেন, পিতা-ইব্রাহিম বিশ্বাস।

৫. রেজাউল ইসলাম, পিতা-মুন্সী মঈনুদ্দিন বিশ্বাস।

৬. করিমন নেছা, স্বামী-বাবর আলী।

৭. মহিউদ্দিন, পিতা- আহাদাব আলী।

৮. রহিমা খাতুন, পিতা-পরশউল্লাহ।

৯. ভানু বিবি, পিতা-মাওলা বকস মণ্ডল।

১০. ছইরন নেছা, স্বামী-লোকমান হোসেন।

১১. দেওয়ান মুন্সী, পিতা-সোনা মুন্সী।

১২. কফিল উদ্দিন, পিতা-ভোলাই মণ্ডল।

১৩. বিশু মণ্ডল, পিতা- ভোলাই মণ্ডল।

১৪. খোকা বারিক, পিতা- জুড়োন মণ্ডল।

১৫. আলতাফ হোসেন, পিতা- রজব আলী শিকদার।

১৬. জহির উদ্দিন, পিতা- মান্দার মণ্ডল।

১৭. হাসান আলী, পিতা- আবদুস সামাদ।

১৮. আয়শা আক্তার, পিতা-বিশু মণ্ডল।

১৯. তাহের আলী, পিতা-তফেল মণ্ডল।

হাতাহাতি যুদ্ধ অবস্থায় সেলিং অব্যাহত থাকে। শত্রু বাহিনীর বিমান হামলা চলতে থাকে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কৌশলগত কারণে মিত্র বাহিনী কিছুটা পিছু সরে গিয়ে ২২ নভেম্বর রাতে প্রবল আক্রমণ করে। এ আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে শত্রু বাহিনী ১৭ খানা ট্যাংক ফেলে পালিয়ে যায়। এই ট্যাংকগুলোর মধ্যে মুক্তিনগরে ছিল ৭ খানা ও দক্ষিণসাগরে ছিল ১০ খানা। এ দিন এই এলাকা স্থায়ীভাবে মুক্ত হয়ে যায়।

জগন্নাথপুরের তবিবর রহমান ভোলাও ওই মল্লযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী। এখন তার বয়স ৭০ বছর। তিনি জানান, পিয়াজ রোপণের জন্য মাঠে গিয়ে মিত্র ও শত্রু বাহিনীর হাতাহাতি যুদ্ধ দেখে বাড়ি চলে আসেন। তারা যুদ্ধক্লান্ত মিত্র বাহিনীকে নারিকেল ও গুড় খেতে দেন।

মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ইজারুল ইসলাম জানান, এই যুদ্ধটি ছিল ভয়াবহ। উভয় পক্ষের গোলাবারুদ শেষ হলে হাতাহাতি (মল্লযুদ্ধ) যুদ্ধ শুরু হয়। তার জানামতে মল্লযুদ্ধ দেশের আর কোথাও হয়নি। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন জানান, জগন্নাথপুর সংলগ্ন এলাকায় তুমুল যুদ্ধ হয়। মিত্র বাহিনী এবং শত্রু বাহিনীর গোলাবারুদ ও যুদ্ধের রসদ শেষ হলে উভয় পক্ষ মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল বিশাল আম বাগান। বিরাটকায় আম গাছে ছিল ওই বাগান ভরা। এই পুরো আমবাগান মল্লযুদ্ধে রক্তাক্ত হয়ে যায়।

মল্লযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে জগন্নাথপুর গ্রামের নাম পরিবর্তন করে মুক্তিনগর করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক শিল্প মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম জানান, জগন্নাথপুর যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পাকসেনারা সিংহঝুলী, মশিয়ুরনগর মাঠ ও জগন্নাথপুরে সাজোয়া ট্যাংকসহ সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান করতে থাকে। মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেয় জগন্নাথপুর ও গরিবপুর মাঠসংলগ্ন চাড়ালের বাঁশ বাগানে ও তেঁতুলতলায়।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ডা. নূর হোসেন বলেন, জগন্নাথপুর-গরিবপুর সংলগ্ন এলাকায় যুদ্ধটি স্মরণযোগ্য। মিত্রবাহিনী ও পাকবাহিনীর গোলাবারুদ ও যুদ্ধের রসদ শেষ হলে উভয় মল্লযুদ্ধে (হাতাহাতি) লিপ্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ছিল আম্রকানন। আম গাছে মাঠটি ভরা ছিল। এই আম্রকাননে কিল ঘুষি, লাথি এমনকি বেয়নেট দিয়ে তারা যুদ্ধ করে। পুরো আম্রকানন রক্তাক্ত হয়ে যায়।