• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪১

সড়কগুলোতে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে প্রতিকারের উপায় কি হবে না!

আজম জহিরুল ইসলাম

| ঢাকা , শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঘর থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে ফিরতে পারব কিনা তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি আমরা কেউ-ই দিতে পারছি না। এমনকি যার গ্যারান্টি দেয়ার কথা, সেই সরকারও আজ ব্যর্থ। কেনো এই ব্যর্থতা সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

প্রত্যেক মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। যেহেতু জন্ম নিলে মরতে হবে, তাই সকল মানুষ প্রত্যাশা করে তার মৃত্যুটা যেনো ঘটে স্বাভাবিক নিয়মেই। কিন্তু কতজনের ভাগ্যে জুটছে স্বাভাবিক মৃত্যু? মানুষ রোগ-ব্যাধিতে মারা গেলে সেটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু যদি অন্যের ভুলের কারণে, অন্যের ইচ্ছায় বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারো মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সেটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির আত্মাহুতির সংবাদ গণমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসে। কিছুদিন আগে ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাঝামাঝি স্থানে মালবোঝাই একটি ট্রাকের ধাক্কায় একটি প্রাইভেট কার দুমড়ে-মুচড়ে যায়। প্রাইভেট কারে থাকা একই পরিবারের পাঁচ ব্যক্তি, বিশেষ করে স্বামী, স্ত্রী ও তিন সন্তানের করুণ মৃত্যু হয়। বেশ কিছুদিন আগে কুমিল্লায় বরযাত্রীসমেত একটি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় পতিত হলে বর-কনেসহ গাড়িতে থাকা সবাই প্রাণ হারান। নাটোরের বড়াইগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সাতজন মারা গেছেন। এমনিভাবে সম্ভাবনাময় কত তরুণ-তরুণী সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারিয়ে পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তার সংবাদ আমরা ক’জন রাখি?

আমাদের দেশে প্রতিদিনই অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে, যার সঠিক হিসাব বের করা খুবই কঠিন। প্রতিদিনই দেশের গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে অনেক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংবাদ আছে, যেগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় না। ফলে ওই সব দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংবাদগুলো আড়ালেই থেকে যায়।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই দুই বাসের চাপাচাপিতে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে অপেক্ষারত শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায় জাবালে নূর নামের একটি বাস। শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম প্রাণ হারায়। আহত হয় আরও ১৩ জন। এ মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। এ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয় এবং সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের বহ্নিশিখা। তারপর প্রধানমন্ত্রী দোষীদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে যায়।

এ সময় সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির বিধান রেখে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে কঠোর ট্রাফিক আইন দ্রুত পাস করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এছাড়া গত বছরই সংসদে সড়ক আইন-২০১৮ পাস হয়। সে আইন পাস হওয়ার পরপরই তৎকালীন মন্ত্রিসভার এক প্রভাশালী মন্ত্রীর সংগঠনের নেতারা এর বিরোধিতা করে ধর্মঘট ডেকে সারা দেশ অচল করে দেয়।

এ ব্যাপারে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এসএম সালেহ উদ্দিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছেন সেগুলো বাস্তবায়ন হলে সড়কের বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমে যেত। নির্দেশনাগুলো বাস্তবসম্মত। কিন্তু দুর্ভাগ্য এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরেও নিরাপদ সড়ক গড়ে উঠেনি এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যাও কমেনি। তাদের দাবি পূরণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সড়কে ফিরে আসেনি শৃঙ্খলা। চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালনা, সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ির অবাধ চলাচল বন্ধ হয়নি। লাইসেন্সবিহীন চালকদের দৌরাত্ম্য, নগর পরিবহন ও দূরপাল্লার গাড়িগুলোর প্রতিযোগিতা পূর্বের মতোই রয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে কিছু দাবি বাস্তবায়ন হলেও বাকিগুলোর কোনো খবর নেই।

বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা এমন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে, যা দেখলে গা শিউরে উঠে। সম্প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের সংগঠন শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৮৩টি দুর্ঘটনায় ৫৩ জন নারী, ৭১ জন শিশুসহ ৪১১ জন নিহত ও ৭২৫ জন আহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ৪০১টি দুর্ঘটনায় ৪১৫ জন নিহত এবং ৮৮৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতের তালিকায় ৫৮ জন নারী ও ৬২ জন শিশু রয়েছে। মার্চে ৩৮৪টি দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নারী, ৮২ জন শিশুসহ ৩৮৬ জন নিহত এবং ৮২০ জন আহত হয়েছেন। এপ্রিলে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩২৭টি। এতে ৩৪০ জন নিহত ও ৬১০ জন আহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে ৩৮ জন নারী ও ৫৩ জন শিশু রয়েছে। মে মাসে ৩৯৭টি দুর্ঘটনার মধ্যে ৪৭ জন নারী, ৪৪ জন শিশুসহ ৩৩৮ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৫০৪ জন। জুনে ৩৬৭টি দুর্ঘটনায় ৪৯ জন নারী, ৬৯ জন শিশুসহ ৪৩৯ জন নিহত এবং ৮১৮ জন আহত হন। জুলাইয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩১১টি। এতে নিহত ও আহত হয়েছেন যথাক্রমে ৩৪৮ জন ও ৫১৩ জন। নিহতের মধ্যে ৪৬ জন নারী ও ৪০ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া আগস্টে ৩৩৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণহাণি ঘটেছে ৩৯৮ জনের, যার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা যথাক্রমে ৪৭ জন ও ৫৭ জন। এসব দুর্ঘটনায় ৮২৩ জন আহত হয়েছেন।

এসসিআরএফ তাদের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার ১০টি কারণ উল্লেখ করে বলেছে, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, অদক্ষ চালকের কাছে দৈনিক চুক্তিভিত্তিক গাড়ি ভাড়া, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ, বিধি ভঙ্গ করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং, সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার যানবাহন বৃদ্ধি, ব্যস্ত সড়কে স্থানীয়ভাবে তৈরি ইঞ্জিনচালিত ক্ষুদ্রযানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, বিরতি ছাড়াই দীর্ঘসময় ধরে গাড়ি চালানো, পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, জনবহুল এলাকাসহ দূরপাল্লার সড়কে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ এবং বিভিন্ন স্থানে সড়কের বেহাল দশা অন্যতম।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসের সড়ক দুর্ঘটনার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। আমাদের দেশে রোগ-ব্যাধিতে যত লোক মারা যায়, তার চেয়েও বহুগুণ লোক মারা যায় মনুষ্যসৃষ্ট সড়ক দুর্ঘটনায়। এসব দুর্ঘটনায় কত সম্ভাবনাময় তরুণ, যুবক ও শিশুরা আত্মাহুতি দিচ্ছে তার কোনো শেষ নেই। পরিবারের কোনো একজন সক্ষম ব্যক্তি যদি মারা যায় তাহলে সেই পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্নার মাতম উঠে পরিবার ও স্বজনদের মাঝে। পরিবারের ওপর নির্ভরশীল কোনো কর্তাব্যক্তি যদি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় সেই পরিবারে ওপর চেপে বসে অভাব নামের নিষ্ঠুর দানব। বিশেষ করে দারিদ্র্যের সঙ্গে যাদের নিত্য বসবাস তাদের দুঃখকষ্টের সীমা থাকে না। পরিবারের চাহিদা পূরণের জন্য ওইসব পরিবারের কাউকে না কাউকে তখন রাস্তায় নামতে হয়, মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে দিতে হয় শূন্য হাত। এভাবে কোনো অসহায়, দুর্দশা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দিন তো চলতে পারে না।

দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে দরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা। এ ব্যাপারে সরকারসহ পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে ট্রাফিক নজরদারি বৃদ্ধি করা। বেপরোয়া যান চলাচল বন্ধসহ লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি যাতে সড়কে নামতে না পারে তা নিশ্চিত করা। সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। কোনো প্রভাবশালী বা অশুভ শক্তির কাছে মাথা নত না করে একটু কঠোর হতে পারলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আমরা জানি, সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় আনা সম্ভব হবে না; তবে সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারলে মানুষের মাঝে আস্থা ও স্বস্তি দুটোই ফিরে আসবে।

[লেখক : সাংবাদিক, লেখক, ছড়াকার, নাট্যকার]