• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, ৭ রবিউল সানি ১৪৪০

সুবিধাপ্রাপ্তদের সুবিধা বৃদ্ধি

মোহাম্মদ আবু নোমান

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮

গ্রামগঞ্জে একটি কথা আলোচনায় থাকেÑ ‘যারা খেয়েছ তারা আবার খাও, আর যারা না খেয়েছ তারা না খেয়ে থাক।’ অন্যভাবেও বলা হয়Ñ ‘যে খাইছ সে আরও খাও, আর যে না খাইছ সে চলে যাও।’ একজনের নাকে-মুখে দিয়ে খাবার দেয়া হচ্ছেÑ আর অন্যদিকে শতজন না খেয়ে ধুঁকছে। সেদিকে কারও কোন খবর নেই। বড়রা বলতেনÑ ‘তেলা মাথায় ঢালো তেল, ন্যাড়া মাথায় ভাঙ্গ বেল।’

একের পর এক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন ও পাচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা। নির্বাচন সামনে রেখে সম্প্রতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশ সরল সুদে গৃহনির্মাণ ঋণ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তা জানিয়েছে। ২০১৫ সালে বেতন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধির পর কখনও শূন্যপদ ছাড়াই পদোন্নতি, বিনা সুদে গাড়ি কেনার ব্যবস্থা, স্বল্প সুদে ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি করার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে সরকার। জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেফতারের আগে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার বিধান রেখে ‘সরকারি চাকরি আইন-২০১৮’ করা হয়েছে। অথচ একই অপরাধে অভিযুক্ত হলে সাধারণ নাগরিক থেকে জনপ্রতিনিধি, সবাইকে অনুমতি ছাড়াই গ্রেফতার করা যাবে। আর অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হলে গ্রেফতারে নমনীয়তাসহ সরকারের অনুমোদন লাগবে। আইনের ওই ধারাটিকে বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী বলে উল্লেখ করছেন বোদ্ধামহল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, এ রকম গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন স্বল্পমেয়াদি সংসদের শেষ অধিবেশনে তড়িঘড়ি করে অনুমোদিত হওয়ায় তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা সাময়িক সুবিধার জন্য কি না, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এছাড়াও সরকারের শেষ সময়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদেরও মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতার সুবিধা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত ১৫ নভেম্বর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সরকারি চাকরিদের প্রতি কোন বিরাগ বা বিদ্বেষ থেকে নয়, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা তো সবার জন্য সমভাবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত। সরকার যে উদ্দেশ্যেই বেতন বাড়াক তা নিয়ে প্রশ্ন নয়। কিন্তু কেউ বলতে পারবে কিÑ এত সুবিধার পরও বাংলাদেশে সরকারি এমন কোন প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে জনগণ ঘুষ, অনিয়ম বা হয়রানি ছাড়া সেবা পাচ্ছে? বেসরকারি চাকুরেরা যদি স্বল্প বেতনে ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া চলতে পারেন, তাহলে সরকারি চাকরিজীবীরা কেন পারছেন না? বেতন, সুবিধা বৃদ্ধির পর দেশের সর্বসাধারণ যদি দুর্নীতিমুক্ত সরকারি প্রশাসন পেত তাও গর্ব করার মতো হতো।

বর্তমানে দেশের গার্মেন্ট খাতে ন্যূনতম বেতন কাঠামো থাকলেও দেশের অন্যান্য বেসরকারি খাতে বেতন কাঠামো নিয়ে কোন দিক নির্দেশনা নেই। একজন মাস্টার্স পাস ছেলেমেয়ে যদিও অতি কষ্টে একটা চাকরি পায়, তাদের বেতন ধরা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ হাজারের মধ্যে। অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের লাফিয়ে লাফিয়ে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বাড়িয়ে একটা অসম সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। এ বেতন বৃদ্ধির বোঝা সর্বসাধারণের ঘাড়েই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। যেখানে মুষ্টিমেয় সরকারি চাকরিজীবীদের অস্বাভাবিক বেতনের কারণে বাজার মূল্য ও মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে প্রায় ৯০ শতাংশ বেসরকারি চাকরিজীবীসহ অন্যান্য সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।

বেতন বৃদ্ধির কারণে সরকারি কর্মচারীরা খুশিই ছিলেন। তার ওপর শেষ সময়ে এসে তাদের আরও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। নির্বাচনের আগে বিশেষত প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগকে বারতি ‘নিমক’ দানের কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা সেটাই প্রশ্ন?

এছাড়াও আগে শুধু যুগ্ম সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তারা গাড়ির সুবিধা পেতেন। এখন উপসচিবেরাও গাড়ির জন্য সরকার থেকে সুদমুক্ত ৩০ লাখ টাকা করে ঋণ পাচ্ছেন। জানা গেছে, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপসচিবদের ৫০ হাজার টাকা দেয়া হবে। বর্তমানে ব্যাংকের জিএমদের এ বাবদ ৪০ হাজার টাকা দেয়া হয়। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের জিএম পর্যায়ে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪৫ হাজার টাকা দেয়ার প্রস্তাব করা হবে।

সম্প্রতি সরকার বাড়ি তৈরি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণসুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করছে। গত সেপ্টেম্বরে এর সঙ্গে আরেকটি সুবিধা যুক্ত করা হয়। চাকরিরত অবস্থায় কোন সরকারি কর্মচারী মারা গেলে ওই কর্মচারীর উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে সরকার আর ঋণের টাকার আসল, সুদ ও দ-সুদ কিছুই ফেরত নেবে না। কোন কর্মচারী পঙ্গু হয়ে অবসরে গেলেও একই সুবিধা পাবেন। আবার যারা পেনশনের পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন, অবসরের তারিখ থেকে ১৫ বছর পার হলে তাদেরও মাসিক ভিত্তিতে আবার পেনশন দেবে সরকার। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্টও (বার্ষিক বৃদ্ধি) পাবেন তারা। প্রবীণ নাগরিকদের এ সুবিধাটিকে অবশ্য ইতিবাচক এত কারও কোন সংশয় নেই।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করায় কারও অখুশি বা নিরানন্দের কারণ নেই। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্বপালনে কতটা নীতি ও নৈতিকতার পরিচয় দিতে পারবেন, তা প্রশাসনের স্বচ্ছতা, শুদ্ধতাই বলে দেবে। একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান সরকারি চাকরিজীবী অর্থনৈতিক দিকটার নির্ভরতার পর যদি সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়নীতির সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে দেশের সব পর্যায়ে ব্যাপক উন্নয়নসহ সুজলা-সুফলা এ দেশ সোনার দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব। অল্প সময়েই পাল্টে যেতে পারে দেশের চেহারা। কিন্তু এত কিছু সুবিধার পরও বেশিরভাগ সরকারি চাকরিজীবীরা দুর্নীতিপরায়ণ; এটি ভাবতেই খারাপ লাগে। তারা যদি জনসেবার পরিবর্তে নিজেদের অর্থবিত্ত গড়ায় ব্যস্ত থাকেন, তারা যদি ভুলে যান যে জনগণের টাকায় তাদের বেতন-ভাতা ও সুবিধাদি প্রদান করা হয়। তাহলে দেশের জন্য দুর্ভাগ্যের ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নয়।

ইতিপূর্বে ঘুষের পাঁচ লাখ টাকাসহ নৌপরিবহন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী ড. এসএম নাজমুল হককে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর আগে এই নাজমুল হকের আরেক পূর্বসূরি নৌপরিবহন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার একেএম ফখরুল ইসলামও ধুষ খাওয়ার অপরাধে ধরা পড়েছিল। ইতিপূর্বে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বন্দর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার এছহাক আলীর প্রকাশ্যে ঘুষ নেয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। এছাড়াও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত সংস্থা প্রধান আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিসিআইই), ঢাকার নিয়ন্ত্রক ও ১৯৮৫ সালের বিসিএস (বাণিজ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. শহিদুল হকের ঘুষ গ্রহণের ঘটনা ভিডিও চিত্রে ধরা পড়েছিল।

এভাবে দেশের এমন একটা অফিস আছে কী যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হয়? ঘুষবাণিজ্য প্রতিটা অফিসের স্বাভাবিক চিত্র। এভাবে কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার প্রধান কর্তাব্যক্তি যদি ঘুষ আর দুর্নীতিতে জড়িয়ে পরে তখন সে প্রতিষ্ঠান চলছে কি করে? উর্ধ্বতন কর্মকর্তা যখন ঘুষ বাণিজ্যে ব্যস্ত, তখন নিচের কর্মচারীদের তো আনন্দের সীমা থাকার কথা নয়। আর কোন প্রতিষ্ঠানের নিচের কর্মচারীরা যখন ঘুষ খান তখন তার উপরের যারা হর্তাকর্তা আছেন, তাদেরকেও তো নিশ্চয় ভাগ দিয়েই চলতে হয়। নাকি কেউ টেরই পায় না কিছু? একথা ঠিক যে সবাই দুর্নীতিবাজ না। এটাও ঠিক যে, ঘুষখোরদের কর্মকা- তাদের উপরের অফিসারদের প্রশ্রয় ছাড়া সম্ভব না, অন্তত এটা কারোরই বুঝতে কষ্ট হয় না।

সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে দেশের অন্যান্য সেক্টরের কর্মজীবীদের বেতন না বাড়ায় তারা চরম অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সরকারের কার্যক্রমে মনে হচ্ছে দেশ স্বাধীন হয়েছে মুষ্টিমেয় সরকারি কর্মজীবীর জন্য। বেসরকারি চাকরিজীবীদের কথা ভাবার কেউ আছে কী? কার্যত এখন দেশকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, এক ভাগ সরকারি আরেক ভাগ হচ্ছে সাধারণ জনগণ! বেসরকারি মিল, ফ্যাক্টরি, শিল্প-কারখানা, গার্মেন্টস, কোম্পানির শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তাদের বিরামহীন হাড়ভাঙা খাটুনি, পরিশ্রম ও ঘামঝরা শ্রমের বিনিময় সরকারের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার সিংহভাগ আসে যেসব খাত থেকে, তাদের জন্য দেশের সংবিধানে কোন আইন ও বাজেট আছে কী? এক শ্রেণীর একচেটিয়া, বেপরোয়া, অবিবেকি, অবিবেচনাপূর্ণ ও অসমীচীন সুযোগ সুবিধা দেয়ার ফলে দ্রব্যমূল্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে, সাধারণের আজ নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। কর্মক্ষেত্রে বেতন-ভাতায় এমন আকাশ-পাতাল বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের সচেষ্ট হওয়ার সঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত সরকারকেই করতে হবে।

এছাড়াও মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সব সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মচারীদের বাসায় আগে বাবুর্চি ও নিরাপত্তা প্রহরী থাকলেও গত বছর সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, বাবুর্চি ও নিরাপত্তা প্রহরীর বদলে সচিবেরা এখন ১৬ হাজার করে প্রতি মাসে মোট ৩২ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। গত জুনে সচিবদের জন্য ৭৫ হাজার টাকা করে মোবাইল ফোন কেনা এবং ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ হিসাবে মাসে ৩ হাজার ৮০০ টাকা করে বিল দেয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। আগস্ট থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য মাসিক ঝুঁকি ভাতা এবং একই মাসে পুলিশ পরিদর্শকদের জন্য ‘বিশেষ ভাতা’ চালু করা হয়।

সরকার এদের দিতেই থাকুক, আরও দিলেও বলা হবে আরও লাগবে! অথচ কোটি কোটি বেকার বসে আছে। সরকারকে বুঝতে হবেÑ যারা ন্যূনতম বেতন হলেও ভালো সার্ভিস দিতে ইচ্ছুক। এসব শিক্ষিত যুবকদের ব্যাপারে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে। সার্বিক বিশ্লেষণে প্রাপ্তির দিক থেকে যে সব সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার সিংহভাগই প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের উপরের দিকের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এর বাইরে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, কনস্টেবল ও ইন্সপেক্টর পর্যন্ত যারা আছেন, তারা দিন-রাত যে পরিশ্রম করেন, সে তুলনায় অন্য সরকারি কর্মচারীরা সিকি পরিমাণও শ্রম দেন না। সিভিল কর্মচারীরা ৯টা-৫টা পর্যন্ত আফিস ও সপ্তাহে ২ দিন ছুটি ভোগ করে থাকেন। এজন্য সরকারকে সবার জন্য সমান সুযোগ বাস্তবায়ন জরুরি।

abunoman1972@gmail.com