• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪১

রিপোর্টারের সাতকাহন

সাধারণ মানুষের এসপি হারুন অর রশিদ

সালাম জুবায়ের

| ঢাকা , রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯

image

সংবাদপত্রে পুলিশের দুর্নাম নিয়ে লিখতে লিখতে সাংবাদিকরা অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বললে ভুল বলা হবে না। প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বুলালে এ কথার সত্যতা অনুধাবন করা যায়। কিন্তু পুলিশকে নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও কোন কোন পুলিশের ভালো কাজের জন্য সেই পুলিশ সদস্যোর যেমন তেমনি সামগ্রিকভাবে পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তিও অনেক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এমন অনেক উদাহরণও সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই ছাপা হয়। তেমনি একজন ভালো পুলিশ কর্মকর্তার কথা বলতেই আজ এ নিবন্ধের অবতারণা। এ ভালো পুলিশ কর্মকর্তার নাম হারুন অর রশিদ। তিনি এখন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভালো কাজের জন্য তিনি এখন ‘সাধারণ মানুষের এসপি’ হিসেবে পুরো নারায়ণগঞ্জবাসীর সুনাম কুড়িয়েছেন। হারুন উর রশিদের জনবান্ধব কর্মকাণ্ডের জন্য এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসায়ী, এমন কি বিভিন্ন পাড়ার ছিচকে চোরও আতঙ্কের মধ্যে থাকে-কখন অপকর্মের জন্য এসপির আইনের থাবা এসে তার ওপর পড়বে। তিনি নারায়ণগঞ্জের সব থানায়, গ্রামে, পাড়ায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ছিচকে চোরের কাছেও একটি বার্তা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। তা হলো- আপনি যত শক্তিশালী হোন, যে দলের লোকই হোন বা অনেক টাকার মালিক হোন, আইন ভেঙে কোন ধরনের অপকর্ম করে পার পাবেন না। এর পাশাপাশি তিনি আরেকটি বার্তা, যা শুধু নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছেই, সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তা হলো- তিনি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এ খবর পৌঁছে দিতে পেরেছেন যে, কোন সন্ত্রাসীকে, তিনি যে দলেরই হোক, যত বড় সন্ত্রাসীই হোক, ভয় পাবেন না, রুখে দাঁড়ান, মনে রাখবেন পুলিশ আপনার পাশে আছে, কোন পুলিশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, আপনার পাশে না দাঁড়ালে আমাকে জানাবেন। প্রতিদিন তিনি সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনতে তার কার্যালয়ে আসা অসংখ্য মানুষকে সাক্ষাৎ দেন, অভিযোগ শুনে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এই যে তিনি এভাবে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পেরেছেন, পারছেন- এটা একজন এসপির জন্য সত্যিকার অর্থেই একটি সাফল্য। আর এই সাফল্যের কারণেই তিনি নারায়ণগঞ্জের সহজ-সরল সাধারণ মানুষের বাহবা পেতে পারেন, পাচ্ছেনও।

নারায়ণগঞ্জে এসপি হিসেবে যোগদান করে হারুন অর রশিদ তার কর্মকা-কে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিন্যাস করেন। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সেবা দেয়া এবং পুলিশ প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব ঘোচানোর লক্ষ্যে বেশ কিছু সৃজনশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। এর আগে কোন এসপি এতটা গুছিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যেতে এতটা সক্রিয় হননি, যতটা এসপি হারুন হয়েছেন। অনেকের মতে, এসপি হারুন অর রশিদের অন্যতম প্রশংসনীয় কর্মসূচি হচ্ছে প্রকাশ্য রাস্তায় সংবাদ সম্মেলন করা। শুনতে কিছুটা অবাক হওয়ার মতো হলেও সত্যি, এসপি হারুন সাংবাদিকদের জন্য যত সংবাদ সম্মেলন করেছেন তার বেশিরভাগই করেছেন নারায়ণগঞ্জে প্রকাশ্য রাস্তায় নয় তো কোন অপারেশন স্পটে। নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য সাংবাদিকদের ডেকে তার কার্যালয়ের চার দেয়ালের মধ্যে বসিয়ে না রেখে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই যে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন সেই স্থানে গিয়েই সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন, কথা বলেছেন, প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যনজট এবং অবৈধ ফুটপাত দখল নিয়ে প্রায় সব সংবাদ সম্মেলনই করেছেন যে সড়কের ফুটপাত দখলমুক্ত করেছেন সেই ফুটপাতে দাঁড়িয়েই। এর ফলে সাংবাদিকরা নিজেরা পুলিশের কর্মকা- প্রত্যক্ষ করতে এবং সে বিষয়ে বাস্তবধর্মী প্রশ্ন করতে পারেন। সে সংবাদ সম্মেলন শুধু সাংবাদিকরাই নয়, শত শত সাধারণ মানুষও দেখতে পারছেন, পরের দিনের পত্রিকায় নয়, প্রকাশ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এসপির বক্তৃতা শুনতে পাচ্ছেন। একটি শহরের সাধারণ মানুষের জন্য এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে? এসপি হারুন অর রশিদ এভাবেই তার কাজের প্রতি সাংবাদিকদের যেমন তেমনি সাধারণ মানুষের মনযোগ আকর্ষণ করেছেন। এর ফলশ্রুতি হচ্ছে তার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা, আগের যে কোন এসপির তুলনায়, অনেক বেড়েছে। তার প্রতি এ আস্থা জাগাতে পারাও তার একটি বড় মাপের সাফল্য। আর তার প্রতি প্রগাঢ় আস্থার কারণে তিনি ভালো যা করেন তার প্রতি নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ যেমন তেমনি সাধারণ মানুষও সমর্থন জানায়। এটাও এসপি হারুন অর রশিদের অন্য রকম মর্যাদা লাভ।

এসপি হারুন অর রশিদ নারায়ণগঞ্জে যোগদান করেই নারায়ণগঞ্জের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে, এমন কি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিরোধী দলের নেতা থেকে শুরু করে শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, পাড়াভিত্তিক মাস্তান-সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজি, পরিবহন মালিকÑ সবাইকে একটি হুশিয়ারি সুকৌশলে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এখন থেকে কোন ধরনের অপকর্ম করে কেউ পার পাবে না। আর, অনেকটা প্রথম রাতেই বিড়াল মারার মতো, রাজনৈতিক মাস্তান ও সন্ত্রাসীদের আস্তানায় হানা দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে ‘দেশব্যাপী খ্যাতিমান’ একজন রাজনৈতিক গডফাদার আছেন, সব মহল সেই গডফাদারের হুঙ্কারে সব সময় কম্পমান থাকেন। এসপি হারুন সেই গডফাদারের কোন বেআইনি নির্দেশ একটিবারের জন্যও আমলে নেননি। তিনি এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে বলেছেন, কোন গডফাদার-সন্ত্রাসীর নির্দেশ শুনতে নারায়ণগঞ্জে আসিনি, এসেছি এখানকার সাধারণ মানুষকে সরকারের আইন অনুযায়ী সেবা দিতে। সে পথ থেকে কেউ ফিরিয়ে রাখতে পারবে না, তিনি যত ক্ষমতাধর বা শক্তিশালীই হোন। এ মনোভাব থেকে এসপি হারুন কখনোই বিচ্যুত হননি। ফলে এসপি হারুনকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। পেছন ফিরে যে তাকাতে হয়নি তার অনেক উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দেখা যায়। বিগত কোন এসপিই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক গডফাদার, রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের গায়ে হাত দিতে সাহস পাননি। প্রায় সব এসপিই রাজনৈতিক গডফাদার-সন্ত্রাসীদের সমীহ করে চলেছেন, তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে নিজ পদ ও সম্মান বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু ব্যতিক্রম এসপি হারুন অর রশিদ। তিনি গডফাদারের কোন কথাই কানে তোলেননি। বরং নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-এমপির নিকটাত্মীয় ও অপকর্মের সহযোগীদের শুধু গ্রেফতারই করেননি, জেলের ভাতও খাইয়েছেন। গডফাদারের আত্মীয়ের জুয়ার আড্ডা, মদের ব্যবসা, ফ্ল্যাট দখল, টর্চার সেল- সব জায়গায় অভিযান চালিয়েছেন। শুধু অভিযান চালিয়েই থেমে থাকেননি, দায়ী প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় এনেছেন। এভাবে প্রভাবশালীদের জেলে ঢোকানো আগে কেউ ভাবতেই পারেনি। শুধু তাই নয়, একজন প্রভাবশালী এমপি’র বিভিন্ন অপকর্ম তুলে ধরে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। এমন বুকের পাটা আর কোন পুলিশ কর্মকর্তার ছিলনা।

এসপি হারুন অর রশিদ আরেকটি ভালো কাজ করে দেখিয়েছে ফুটপাত দখলমুক্ত রেখে। তিনি প্রথমেই ঘোষণা করেছিলেন, ফুটপাতে শহরবাসী হাঁটবে, সেখানে অবৈধ দোকান বসতে দেয়া হবে না। তিনি কথা রেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক গডফাদাররা ফুটপাত ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা কামিয়েছেন। সিটি মেয়র অনেক চেষ্টা করেও শুধু পুলিশের অসহযোগিতার কারণে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে শতভাগ সফল হতে পারেননি। এসপি হারুন যখন একই ধরনের ঘোষণা দিলেন তখনই ফুটপাতের চেহারা পাল্টে গেল। ফুটপাতে কোন অবৈধ দোকান বসেছে কি না- তা তদারকি করতে এসপি নিজেই সড়কে নেমে যান। একাধিক দিন নারায়ণগঞ্জের মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন এসপি তার সহকর্মী পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে মিছিল করে যাচ্ছেন, থেমে থেমে সাধারণ পথচারীর সঙ্গে কথা বলছেন, জানতে চাইছেন রাস্তায় চলতে গিয়ে তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা। একজন পুলিশ সুপার, ৪/৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ এবং বিভিন্ন থানার ওসিদের নিয়ে যখন সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নিতে রাজপথে নেমে যান তখন হাজার হাজার মানুষ তার পেছনে মিছিল করে এগিয়ে যান। সড়কের পাশের দোকানপাট, বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে লোকজন অবাক হয়ে যান এভাবে পুলিশ বাহিনীকে তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখে। তখন সবাই ভেবে নেন- এ এসপিতো আমাদের এসপি, জনগণের এসপি। একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে।

নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ এসপি হারুন অর রশিদকে কতটা ভালোবাসেন, পছন্দ করেন বিভিন্ন সময় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিছুদিন আগে শহরের চাষাঢ়া মোড়ে খাজা মার্কেটের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় হারুন অর রশিদকে ‘বাংলার সিংহাম’ উপাধি দিয়ে একটি ব্যানার টাঙানো হয়। ব্যানারে লেখা ‘বাংলার সিংহাম’- প্রচারে নারায়ণগঞ্জবাসী। বোম্বের সুপাহিট একটি ছবির নাম ‘সিংহাম’। সে ছবির নায়ক একজন সৎ, সাহসী ও পরোপকারী পুলিশ অফিসার। সে পুলিশ অফিসারের বীরত্বের কাছে কোন সন্ত্রাসী তো দূরের কথা, কোন রাজনৈতিক গডফাদারও টিকে থাকতে পারেননি। অমিত সাহসের সঙ্গে সেই পুলিশ অফিসার সমাজ থেকে সব নির্যাতন-অনাচার-অনিয়ম-সন্ত্রাস দূর করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ এসপি হারুন অর রশিদকে ঠিক তেমনি একজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন বলেই তাকে ‘বাংলার সিংহাম’ উপাধি দিয়ে ব্যানার টাঙিয়েছিলেন।

এসপি হারুন তার সমাজ হিতকর কর্মকা- দিয়ে তার কর্মস্থলেও সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পর ভালো ভালো কাজ করে পাঁচবার ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ এসপি হিসেবে পুরস্কার লাভ করেছেন। নারায়ণগঞ্জের আর কোন এসপি এতবার শ্রেষ্ঠ এসপির মর্যাদা লাভ করতে পারেননি।

হারুন অর রশিদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে যখন কথা বলেন, তখন তার কথার মধ্যে এক ধরনের সাহস ও দৃঢ়তা থাকে। সংবাদপত্রের পাতা থেকে তার কিছু বক্তব্য তুলে ধরলে তাকে বুঝতে সুবিধা হবে। তিনি বলেন ‘এই নারায়ণগঞ্জ একটি সুন্দর শহর হবে। এখানে আর কোন সাত খুন হবে না, আর কোন ত্বকী হত্যা হবে না। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’ ‘আমরা এখানে রাজনীতি করার জন্য আসি নাই, দল করার জন্য আসি নাই। যে সব সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুকে ধরা হচ্ছে তারা হয়তো কারও ভাইবোন হতে পারে কিংবা কারও লোক হতে পারে। এতে কারও মন খারাপ হতে পারে, কিন্তু আমাদের অভিযান চলবেই।’ ‘আমরা সেবার মানসিকতা নিয়েই কাজ করছি। আমরা কোন গ্রুপিং কিংবা কোন দলবাজি করছি না। আমরা সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে চাই।’ ‘আজ আমরা ফ্ল্যাট উদ্ধার করে দিচ্ছি, ভূমি উদ্ধার করে দিচ্ছি, কারখানা উদ্ধার করে দিচ্ছি। আমরা শুধু সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জনের জন্য কাজ করছি।’