• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৯, ৬ মাঘ ১৪২৫, ১২ জমাউল আওয়াল ১৪৪০

সাংবিধানিক আদর্শের আলোকে ইশতেহার বাস্তবায়ন

মাহবুবর রহমান চৌধুরী

| ঢাকা , শুক্রবার, ১১ জানুয়ারী ২০১৯

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস, বিষয়বস্তু ও আনুষঙ্গিক তথ্যপঞ্জী বিশ্লেষণে কতিপয় অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত ফসল। আমাদের স্বাধীনতা যেমন বহু দামে রক্তমূল্যে কেনা তেমনি আমাদের সংবিধানও ‘রক্তের আঁখরে’ লেখা- রাষ্ট্র পরিচালনার দিশারী, দিকনির্দেশক এক দলিল। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানের অংশ। ঘোষণাপত্রে- জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার অপরিহার্যতার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল ‘জয় বাংলা’, আমরা রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও বাংলাদেশের আপামর জনমানুষের সার্বিক বিকাশ ও বিজয়ের পথরেখা নির্ধারণ করে দিয়েছি। এখানে রয়েছে আমাদের স্বাধীনতার মর্মবাণী। কবি নজরুলের ভাষায় বলতে হয়Ñ ‘জয় নিপীড়িত জনগণের জয়, জয় নবউত্থান জয়’।

সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর (পাকিস্তানের গণপরিষদ নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্য) নির্বাচিত মোট ৩৪ জন গণপরিষদ সদস্য সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করে দেন। ১০ জুন ১৯৭২ সালে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি কর্তৃক খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করে বঙ্গবন্ধুকে হস্তান্তর করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় খসড়া সংবিধান রচনাকালে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়ে সংবিধানের বিষয়ে সাধারণ জনগণের, বিশিষ্টজনদের এবং বুদ্ধিজীবীদের নিকট হতে পরামর্শ আহ্বান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- ‘তখন দেশবাসীর কাছে আবেদন করেছিলাম যে, দলমত নির্বিশেষে আপনাদের যে কোন পরামর্শ, যে কোন মতামত থাকলে মেহেরবানি করে কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেবেন। যদিও দু-একটি কেউ কেউ দিয়েছেন, কিন্তু যারা খবরের কাগজে বক্তৃতা করেন, তারা একখানাও দেন নাই। তাদের কাছ থেকে যা পেয়েছি, অন্য কর্মীদের কাছ থেকে, অন্য মানুষের কাছ থেকে, প্রফেসরদের কাছ থেকে আরও অনেক পেয়েছি। তাতে অনেক সাহায্য হয়েছে। কিন্তু শাসনতন্ত্র যারা মানেন না, যারা গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল তারা মেহেরবানি করে এক কলমও লিখে পাঠাননি।’ সংবিধান প্রণয়নকালে কমিটির বাইরে জনমত আহ্বান এবং এ প্রেক্ষিতে কতিপয় বিশিষ্ট মানুষের সহযোগিতা ও কতিপয়ের অস্বীকৃতির বিষয়ে বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করেন আইনবিদ ড. কামাল হোসেনের ওপর। এ কমিটিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং আওয়ামী লীগ দলের বাইরে ন্যাপের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায় সংবিধান রচনার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু গণসম্পৃক্ততার ও জনমতের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, সংবিধানকে মহিমান্বিত করার জন্য।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদ (৭০ সালের নির্বাচিত সদস্য) কর্তৃক চূড়ান্তভাবে সংবিধান অনুমোদিত হয়। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখ হতে প্রণীত সংবিধান চালু বা কার্যকর হয়। সংবিধান বিল গৃহীত হওয়ার প্রাক্কালে (৪ নভেম্বর ১৯৭২) বঙ্গবন্ধু তার প্রদত্ত ভাষণে বলেন- ‘মাননীয় স্পিকার সাহেব আজ এ পরিষদে শাসনতন্ত্র পাস হয়ে যাবে। কবে হতে এ শাসনতন্ত্র বলবৎ হবে, তা আমাদের ঠিক করতে হবে। আমি মনে করি সে দিন, যে দিন জল্লাদ-বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনীও আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল, সেই তারিখ। সেই ঐতিহাসিক ১৬ ডিসেম্বর থেকে আমাদের শাসনতন্ত্র কার্যকর করা হবে। সেই দিনের কথা রক্তের অক্ষরে লেখা আছে। স্পিকার সাহেব সেই ইতিহাস আমরা রাখতে চাই।’ বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে প্রণীত সংবিধান, সংবিধান প্রণেতা ও সব গণপরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে যে বক্তব্য রাখেন আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাও অবিস্মরণীয়।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার মেয়াদ ছিল ৫ বছর অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত। নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য সংবিধান প্রণয়ন। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী (৩০০ আসনে ১৬৭ আসনে বিজয়ী) দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ৯ মাস ধরে বাংলাদেশে পাশবিক গণহত্যা চালানো, ৩০ লাখ বাঙালি হত্যা, লাখো নারীর সম্ভ্রমহানি প্রভৃতির প্রতিক্রিয়ায় সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধ যার ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ’৭০-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যরাই প্রণয়ন করেন একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার অনন্য সাধারণ সংবিধান।

সংবিধান বিলের ওপর বঙ্গবন্ধু তার প্রদত্ত ভাষণে বলেন-‘এ শাসনতন্ত্রের জন্য কত সংগ্রাম হয়েছে এই দেশে। আজকে আমার দল যে ওয়াদা করেছিল তার এক অংশ পালিত হলো। এটা জনতার শাসনতন্ত্র।... ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে আমার জীবন সার্থক হবে, শহীদের রক্তদান সার্থক হবে।’ সংবিধান বিল গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু গৃহীত সংবিধানের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নতুনভাবে গণম্যান্ডেট গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন- ‘জনাব স্পিকার আজকে বিদায় নেয়া হচ্ছে। সদস্যরা সংবিধানে স্বাক্ষর করতে আসবেন। তারপর যারা পাঁচ বছরের জন্য এসেছিলেন তারা সেই পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ না হতেই চলে যাবেন। এভাবে তারা যে ত্যাগের প্রমাণ দিলেন, উদারতা দেখালেন, সেটা পার্লামেন্টের ইতিহাসে বিরল। এর জন্য সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি।’ ক্ষমতা ভোগের অধিকারী হয়েও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিজয় মহিমা সমুন্নত ও স্মরণীয় রাখার জন্য ক্ষমতার এ ত্যাগ একটি বিরল দৃষ্টান্ত।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে পরিচালনার জন্য রচিত সংবিধান সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন-‘ভারত স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে। শাসনতন্ত্র দিতে লাগলো ১৯৫০ সাল। ২৫ বছরে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার শাসনতন্ত্র দিতে পারে নাই। দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা যায় না, ১০ মাসের মধ্যে কোন দেশ শাসনতন্ত্র দিতে পেরেছে।... শাসনতন্ত্রে জনগণের অধিকার থাকবে, কর্তব্যও থাকবে।’ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার জন্য গঠিত ড্রাফটিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ড. ভিমরাও রামজি আম্বেদকর। তিনি আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন ও শাসনতন্ত্র বিষয়ে পিএইচডি করা বিশেষ প্রাজ্ঞজন। তার নেতৃত্বে ১৯৫০ সালে ভারতে শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়। পাকিস্তানের গোটা শাসনকালের প্রায় পুরোটাই ছিল অসাংবিধানিক শাসন। ৫৬ সালের গৃহীত শাসনতন্ত্র পরবর্তী সামরিক সরকারপ্রধান আইয়ুব খান বাতিল করে দেন। সে হিসাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু হয় একটি সুলিখিত সংবিধানের মাধ্যমে। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এই সংবিধানের আলোকে। এ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯১ আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে দেশ শাসনের অধিকার লাভ করে। জনগণের ম্যান্ডেটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভিযাত্রার সূচনা হয়।

রাষ্ট্রীয় আদর্শ চতুষ্ঠয় সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর উক্তি-‘আমাদের আদর্শ পরিষ্কার হয়ে রয়েছে। এই পরিষ্কার আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং সে আদর্শের ভিত্তিতে এ দেশ চলবে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ-বাঙালি জাতীয়তাবাদ- এই বাঙালি জাতীয়তা চলবে বাংলাদেশে। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার আকাশ-বাতাস, বাঙালির রক্ত দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদ।

আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনসাধারণের ভোটের অধিকারকে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে যেখানে শোষণহীন সমাজ থাকবে। শোষক-শ্রেণী আর কোনদিন দেশের মানুষকে শোষণ করতে পারবে না। এবং সমাজতন্ত্র না হলে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ ৫৪ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে বাঁচতে পারবে না। সে জন্য অর্থনীতি হবে সমাজতান্ত্রিক। আর হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। হিন্দু তার ধর্ম, মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ- যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে বাংলার বুকে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে ঘোষিত আদর্শের রূপায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য যারা শপথ নিয়েছিলেন তাদের কতিপয় ক্ষমতালোভী তা বঙ্গ করেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বিপথগামী সামরিক বাহিনীর নরঘাতক কিছু সদস্য। ১৫ আগস্ট তারা জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে। এই ঘাতকচক্র পবিত্র সংবিধানকেও রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত করে। একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম তার লিখিত প্রবন্ধে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেন-‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর নরঘাতকরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখল করে। খোন্দকার মোশতাকের অবৈধ সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর যে এজেন্ডা বাস্তবায়িত করেছিল তারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রাণপণ প্রয়াস চলেছিল জিয়াউর হমানের ৫ বছর ৭ মাস ২৩ দিনের অবৈধ শাসনামলে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ওই রক্তলোলুপ সামরিক অভ্যুত্থান স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় গৌরবগাথা ও অর্জনকে পরিত্যাগ করে এদেশে আবার ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে পরাজিত মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামী ইসলামীকে এদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের পূর্ণসুযোগ সৃষ্টি করেছিল এবং স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিল। (সূত্র : প্রবন্ধ দৈনিক আজাদী, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮) এর ফলশ্রুতিতে দেশব্যাপী ক্যু, পাল্টা ক্যু, বোমা, গ্রেনেড, অগ্নিসন্ত্রাস, মানুষ হত্যার নরমেধযজ্ঞ মানুষ প্রত্যক্ষ করে। সংখ্যালঘু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ড দিয়ে তারা তাদের জিঘাংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার প্রয়াস পায়। ইসলামের নামে ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার অপচেষ্টা চলে। সংকীর্ণ রাজনীতির স্বার্থে, ক্ষমতার স্বার্থে পবিত্র ধর্ম ইসলামকে ব্যবহার করে মতলববাজ ইসলাম ব্যবসায়ীরা। এ সব অপকর্ম দ্বারা তারা ধর্মকে অপমানিত ও ধর্মবাণীকে লাঞ্ছিত করে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ এই নামে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮ প্রকাশ করে। জনগণকে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও সার্বিক বিকাশে কাজ করার জন্য ভোট প্রদানের আহ্বান জানানো হয়। নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীকে লক্ষ্য করে পূর্বে প্রণীত নির্বাচনী ইশতেহার রূপকল্প ২০২১ এর কথা স্মরণ করে বলা হয়Ñ সেই রূপকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে এবং ২০১৮ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের ১টি বাংলাদেশ, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫১ ডলারে উন্নীত, দারিদ্র্যের হার ক্রমহ্রাসমান বর্তমানে তা ২১.৮ শতাংশ বাজেটের আকার ক্রম-স্ফীত হয়ে বর্তমানে ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এসব দৃশ্যমান ইতিবাচক দিক ছাড়া অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, সুবর্ণচরে শরণার্থী রোহিঙ্গা সমস্যার মোকাবিলা, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, যুবশক্তিকে উৎপাদনমুখী করার সৃষ্টিশীল প্রয়াস সর্বোপরি অতীত ভুল-ভ্রান্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমার আহ্বানে মানুষ ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়। এরই ফলশ্রুতিতে ২৮৮ আসনে মহাজোটের বিরাট বিজয়। নির্বাচনে সংঘটিত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তা নিয়ে ব্যাপক কোন জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়নি। তাছাড়া জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া, ভারত পাকিস্তানসহ সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশ এ বিজয়কে অভিনন্দিত করে। চতুর্থবার সরকার গঠন করে বিশ্বের বিস্ময়রূপে আবির্ভূত হন জননেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং তার বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। (১) আমার গ্রাম আমার শহর (২) তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশের সমৃদ্ধি। এ দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়ার মধ্যে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমস্যা সমাধানের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। গ্রামের সব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে শহরের সুযোগ-সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারণ করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি, গ্রামীণ শিল্প, কুটির শিল্পে প্রণোদনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রাণপ্রবাহ গ্রামে সঞ্চালিত করার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তারুণ্যের শক্তিকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে গতিশীল করার প্রয়াস নিতে হবে। জমিদারি কাজে পূর্ববঙ্গে (শিলাইদহ, শাজাদপুর, পাতিসর) আবাসকালীন সময়ে (১৮৯৯-১৯০১) কবি রবীন্দ্রনাথ গ্রাম বাংলার গ্রামীণ নিসর্গ ও গ্রামের কৃষিজীবী শ্রমজীবী মানুষের একান্ত সান্নিধ্যে এসে তাদের সৃষ্টিশীল প্রতিভা দেখে অভির্ভূত হন। তার ভাষ্যে এ গ্রামগুলো ‘ভুতলের স্বর্গখন্ড’। তিনি নোবেল প্রাইজের টাকা দিয়ে এখানে সমবায় ব্যাংক, আধুনিক কৃষিব্যবস্থা চালু করেন। তার উচ্ছ্বসিত উক্তি-‘আমি ভালোবাসি দেব, এই বাংলার দিগন্ত প্রসার ক্ষেত্র/যে শান্তি উদার বিরাজ করিছে নিত্য’। গ্রামীণ বিকাশ ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যান্য যে অঙ্গীকারগুলো ব্যক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে (১) গণতন্ত্র, নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ (২) আইনের শাসন মানবাধিকার সুরক্ষা (৩) জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দক্ষ সেবামুখী প্রশাসন (৪) সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মাদক নির্মূল (৫) অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন (৬) বৃহৎ প্রকল্প (পদ্মা সেতু, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, দোহাজারী কক্সবাজার রেলপথ বাস্তবায়ন (৭) নারীর ক্ষমতায়ন (৮) দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য হ্রাস (৯) খাদ্য নিরাপত্তা (১০) বিদ্যুৎ জ্বালানী সক্ষমতা (১১) শিল্প উন্নয়ন (১২) শিক্ষার বিস্তার (১৩) স্থাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবা (১৪) যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নীতকরণ (১৫) ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া (১৬) সমুদ্র বিজয়-ব্লুইকোনমির দিগন্ত উন্মোচন (১৭) জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা (১৮) শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ কল্যাণ (১৯) মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন (২০) ধর্ম ও সংস্কৃতি (২১) ক্রীড়া (২২) ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর কল্যাণ (২৩) গণমাধ্যমের স্বাধীনতা (২৪) নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা সুরক্ষা (২৫) পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়ন (২৬) ডেল্টা পরিকল্পনা ২১০০ উল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য বিজয়ী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে তার সফলতার মধ্যেই রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর ইচ্ছা বাস্তবায়নের পূর্ণতা। এই সফলতার কামনা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণেরও। নবগঠিত সরকার প্রদত্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সফল হবে এটিই কাম্য।