• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫, ১২ রজব ১৪৪০

সময়ের কথা রাখুন

হিমাংশু দেব বর্মণ

| ঢাকা , শনিবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৯

সত্যি, মাঝে মধ্যে অকারণেই হাসতে ইচ্ছে করে। সেই অকারণের হাসিটা কেমন হলে কারণ পর্যন্ত গড়ায়, এ বিষয়টা মাথায় রেখে হাসলে বোধ হয় হাসির কারণে আর মাথা ব্যথা হয় না। কেবল আমারই নয়। এমন অনেক হাস্য-রসিকই আছেন, যারা একটু হেসেই নিজের মনকে নিজে প্রবোধ দিয়ে রাখেন। আর যারা এ হাসির খোরাক জুগিয়ে যান তাদের না পারা যায় তাদের নিজস্ব অবস্থানে রাখতে, আবার তাদের না বলা যায় জোকার। এমনভাবে হাসতে হাসতে এক সময় হাসির শব্দ আর থাকে না, বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু মুখ বন্ধ হয় না। অর্থাৎ নিঃশব্দে হা করে থাকা। তখন হাসির আবেগটাও থাকে না, কখনও কখনও চোখের কোণে জল জমে ওঠে বা অতি বিস্ময়ে বিস্মিত হয়ে উঠতে হয়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে শুরু করে নির্বাচনপরবর্তী সময়েও যে গুঞ্জন চলছে আমাদের রাজনৈতিক কুশীলবদের নিয়ে, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন ও বাংলার বাঘ কাদের সিদ্দিকী। তবে আলোচনা যাই হোক, যেভাবেই হোক, এই দুই নেতৃত্ব যে এ নির্বাচনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে দিয়েছেন, তা বলা যায় নিঃসন্দেহে। প্রথমত, ড. কামাল হোসেন হাত মেলানোর আগমুহূর্ত পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছিল না বিএনপি-জামায়াত জোটের কোন কর্মকান্ড আছে কিনা দেশে। তারা নিজেরাই ছিল অঘোষিত গৃহবন্দী। রাজপথ তো দূরের কথা, ঘরে বা অফিসে বসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দু’চার কথা বলা, তাও কিন্তু শোনা যায়নি। তাদের এই নীরবতা দেখে যদি কেউ মনে করত যে, বিএনপি নেতাকর্মীরা সব রাজনীতি থেকে অবসর নিল কিনা, এটাও বোধ হয় ভুল কিছু হতো না। ঠিক এমনই মুহূর্তে ড. কামাল হোসেন এসে হাত মেলালেন বিএনপির সঙ্গে। তাতেই দলটি যেন হালে পানি পেল। বেশ নড়েচড়ে বসল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনেও এলো তারা। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই ড. কামাল হোসেন জাতিকে আশ্বাস বাণীও শোনালেন ‘বাঙালি জেগে ওঠো, কান্ডারি প্রস্তুত।’ বস্তুত কান্ডারি কোথায় ছিলেন, কিভাবে ছিলেন, কার জন্য প্রস্তুত ছিলেন- সে খবর এখন পর্যন্ত জাতির অজানা রয়ে গেছে। কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন- ‘ধানের শীষ এবার শুধু বিএনপির মার্কা নয়, এটা এবার জনগণের মার্কা।’ কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় বলতে হয় যে, কোথায় ছিলেন এই কান্ডারিগণ! জনগণের ধানের শীষই বা কোথায় ছিল? তারা ধানের শীষ নিয়ে জনগণের সামনে এলেন না কেন? হুঙ্কার শুনে তো ভালোই লেগেছিল। এটাই হাসির একটা দারুণ খোরাক বহন করে যে, গুহার ভেতর থেকে গর্জন করে যায় বাঘ। সে গর্জন কারও কান পর্যন্ত পৌঁছাল না।

আসলে কান্ডারি হতে হলে সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে আশা দিতে হয়, ভরসা দিতে হয়। তার আগে মাল্লাগণকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হয়। কারণ দুর্ঘটনার দায়ভার কখনও মাল্লাদের ওপর বর্তায় না। সে দায় কান্ডারির ওপরই গড়ায়। আর এ দায় এড়াতেই ড. কামাল হোসেন উপায় একটা খাঁড়া করলেন। তিনি নির্বাচনের খুব কাছাকাছি সময়ে বললেন, জামায়াত নেতারা প্রার্থী হবে আগে জানলে উনি নাকি বিএনপির সঙ্গে জোট করতেন না। সত্যিই কি উনি জানতেন না? জোট করার আগে কি তিনি বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছিলেন, তারা কি কথা দিয়েছিলেন তারা জামায়াত নেতাদের প্রার্থী করবেন না? বিএনপি কি শর্ত দিয়ে শর্ত ভঙ্গ করেছে, না এটা আলোচনা করে নিতে উনার নিজেরই ভুল হয়েছিল, তা উনি বলেননি।

আমার মনে হয় উনি আগে থেকে এসব আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু তার জন্য এটাই ছিল প্রধান এবং প্রথম কাজ। যে কারণে তিনি প্রথমত, আওয়ামী লীগ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা দল করল গণফোরাম। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে গিয়ে সেই জোট থেকেও বেরিয়ে গেল। কারণটা ছিল আওয়ামী লীগ ’৭২ সালের সংবিধান অখন্ডিত রেখে কার্যকর করেনি। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের কিছু দাবি মেনে নিয়ে তা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে। তার তো দরকার ছিল ওই সংবিধানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। আসলে বিএনপি কি তার ওই সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে বলে রাজি হয়েছিল, নাকি এ আলোচনা করতেও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন? না কি উনি সংবিধানের আশা পুরোপুরি ত্যাগ করে দিয়েছেন? এমন হতে পারে গোল্লায় যাক সংবিধান, শেষ জীবনে একটু ক্ষমতার স্বাদটুকু অন্তত পাই। কিন্তু বুর্জোয়া কিছু নেতার মতো উনিও কি ভেবেছিলেন বাংলার মানুষ নির্বোধ? উনি যা বলবেন, যেখানে যেতে বলবেন, সবাই অন্ধের মতো তা শুনবেন এবং তাঁর পিছু পিছু হাঁটবেন! সত্যিই বাঙালি আবার প্রমাণ করে দিল এরা আসলে কাউকেই অন্ধের মতো বিশ্বাস করে না। তাদের আশা ভরসা দিয়ে জাগিয়ে তোলার মতো আর কেউ নেই।

সত্যি কথা বলতে কী, ’৮৯ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জনগণ গণতন্ত্র পাওয়ার আশায় তিন জোটের নেতাদের ডাকে পথে নেমেছিল, রক্ত দিয়েছিল, জীবন দিয়েছিল। জনগণের রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে তারা (নেতারা) ক্ষমতা পেয়েছে, কিন্তু জনগণ আজও গণতন্ত্রের দেখা পায়নি। সেদিনের সেই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন যারা তার মধ্যে আজকের এই কুশীলবরাও ছিলেন। তারা ক্ষমতায়ও বসেছেন। দলীয় সরকার তাদের আদর্শ থেকে দূরে থাকার কারণে তারা দল ত্যাগ করলেন, পরবর্তীতে জোট করে তাও ত্যাগ করলেন। সেদিন তাদের ভূমিকাটা সত্যিই তাদের মহান করেছিল। মানুষ তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছিল। কিন্তু আজ তারা কী করলেন!

বাম আদর্শে বিশ্বাসী এই মহান নেতারা যদি বাম দলগুলোর সঙ্গে জোট করে অন্তত বাম দলগুলোকেও জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন অবশ্যই তারা তাদের মর্যাদার জায়গাটা ধরে রাখতে পারতেন। জাতি ঠিক আগের মতোই তাদের মাথার মণি করে রাখত। আগামীতে আবার তাদের ভরসা করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতেন অতি নিকটবর্তী সময়েই। দেশের মানুষ বিকল্প চায় এতে কোন সন্দেহ নেই। তারা সেই বিকল্প শক্তির কান্ডারি হতে পারতেন। ’৭২-এর সংবিধান অখ-ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে অবশ্যই দক্ষ ও বলিষ্ঠ কান্ডারি প্রয়োজন। তবে এই কান্ডারিকে অবশ্যই দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হলে চলবে না। দূরদর্শিতা সম্পন্ন একনিষ্ঠ জনকল্যাণ মূলক চেতনা লালনকারী একজন দক্ষ নেতার দ্বারাই সম্ভব এ কান্ডারি হওয়া। আর তাকে শুধু ভোটের সময় এলে দেখা যাবে, সারা বছর খবর থাকবে না এমন নেতার কোন দরকার পড়বে না বাঙালির। সুসময় দুঃসময় সব সময়ই জনগণের পাশে থাকবে- এমন নেতা অবশ্যই পাশে চায় আজকের বাঙালি জাতি।

দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের দাম অতিমাত্রায় কম, বেকারত্বের হার বৃদ্ধিসহ দুর্বিষহ জনজীবনের পাশে কখনও দেখা যায়নি আজকের এই কান্ডারিদের। তারপরও নির্বাচনে নেমেও জনগণের কল্যাণমুখী কোন ইশতেহার তেমন জোরেশোরে শোনা যায়নি তাদের মুখে। কেবল তারা তাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি আর তারেক জিয়ার দেশে ফেরার নির্বাচন বলে নির্বাচনী প্রচারে শোনা গেছে। জনগণের মুক্তির কোন কথা ছিল না সেখানে। জনগণ তাদের সেই ডাকে একদম সাড়া দেয়নি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা ছিল তাদের প্রচার প্রোপাগান্ডায়। তবে তাদের গণতন্ত্র তো ইতিপূর্বে দেখে নিয়েছে বাংলার মানুষ। আজকের আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের সঙ্গে তাদের গণতন্ত্রের কোন ফারাক খুঁজে পায়নি জনগণ। বরং অপেক্ষাকৃত এটাকে কিছুটা উন্নত বলে মেনে নিয়েছে। আর তাই তাদের সে ডাকে সাড়া দেয়নি এ দেশের জনগণ।

আবার কান্ডারিরা বলছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। আমিও এ কথায় একমত পোষণ করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। কিন্তু আপনারাই বা তালগাছের কাছে বেল পাওয়ার আশা করেন কিভাবে? যেখানে ম্যাকিয়াভেলিবাদে স্পষ্ট বলা হয়েছে- ‘শঠতা কপটতাই হচ্ছে বুর্জোয়া রাজনীতির মূল কৌশল।’ তাদের দ্বারা এটা অতি সহজে এবং নির্দ্বিধায় সম্ভব। তাছাড়া তারা কিন্তু বহির্বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে পেরেছে যে নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হয়েছে। আর আজকের কান্ডারিরা, আপনারা যে তরণীর কান্ডারি হয়েছেন, এই অপকৌশলটা তারাই শিখিয়ে গেছে আজকের কুশীলবদের। অতএব, যে কারখানায় মাল উৎপাদন হলো সেই কারখানার পরিচালক থাকবেন নিজেরা, আর সেই মালটা যারা ব্যবহার করছে তাদের বিপক্ষে যেতে বলবেন জনগণকে, এটা কেমন কথা! কারখানা বন্ধ করতে না পারেন, অন্তত সে কারখানা চলতে সাহায্য করাটা তো আপনাদের কাজ না।

যা হয়েছে, তা ভালো হোক আর মন্দ হোক, অবশ্যই তা থেকে শিক্ষা নেয়ার কিছু আছে। অবশ্যই আমাদের সুশিক্ষাটা চাওয়া উচিৎ। আজ দেশের বিজ্ঞ নেতা তথা বোদ্ধা ব্যক্তিরা যদি গণমানুষের হাসির খোরাকের জোগানদার হয়ে ওঠেন এটা জাতির জন্য অতি লজ্জাকর এবং দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতের দিকেই এগিয়ে যাবে। অগ্রসরমান নতুন প্রজন্মের চেতনা গোঁড়ামি আর ভন্ডামির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাহলে এ লজ্জার হাসি কে হাসতে চায় বলুন! আর এ লজ্জা থেকে দূরে থাকতে হলে অবশ্যই সমস্ত ভন্ডামির বাইরে নিজেদের স্বকীয় অবস্থানটা ধরে রেখে গণমানুষকে সঙ্গে নেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখাই হবে সবচেয়ে উত্তম কাজ। কোন ভাঙা গাড়ির নষ্ট গিয়ারে কার্বন না ঘঁষে বরং নতুন গাড়ি রাস্তায় নামানোটাই আজ জরুরি। সময় এখন নতুন গাড়ি চায়। সময়ের এ দাবি মেনে নিয়ে নতুন গাড়িটি রাস্তায় নামিয়ে সেই স্টিয়ারিংটা শক্ত হাতে ধরুন। তাহলে অবশ্যই বাঙালি জেগে উঠবে।

[লেখক : কলামিস্ট]

hd.bormon@gmail.com