• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৯ রমজান ১৪৩৯

সংবাদের আলোয় আলোকিত

সালাম জুবায়ের

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৭ মে ২০১৮

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের যে আধুনিক ধারা এখন বহমান তা প্রথম দৈনিক সংবাদের মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে বা গড়ে উঠেছে। যেভাবেই বলি, এটা পরম সত্য যে, সংবাদের দেখানো পথ বেয়েই বাংলাদেশে একদিকে সাংবাদিকতা, অন্যদিকে সংবাদপত্রের নিজস্ব ধারা অর্জন সম্ভব হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের সংবাদপত্র মানেই ছিল কলকাতার দৈনিক এবং সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশন ধারার অনুসরণ। সে ধারা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছিল সংবাদই। এ নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু মোদ্দা কথা হচ্ছে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রথম যুগে দৈনিক সংবাদ আধুনিক সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে পথ দেখিয়েছে। অন্য কথা, দৈনিক সংবাদের আলোয় আলোকিত হয়েছে বাংলাদেশের আধুনিক সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা। আর সংবাদের সে দ্বীপ্তি যে প্রখরতা এবং দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিল তার প্রমাণ এখনকার সংবাদ। সংবাদের অনেক কিছুই আগের মতো নেই। যুগের সঙ্গে, সময়ের নানা ঘটনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বা আধুনিকতাকে ধরে রাখতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু যে ধারা সংবাদের মাধ্যমে অংকুরিত হয়েছিল তার আলো এখনও ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের পাতায় পাতায়। এর পাশাপাশি আরেকটি তথ্য সংযোজন করা অত্যাবশ্যক, তা হচ্ছে দৈনিক সংবাদ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি কথা প্রথমেই বলতে হয় বা শুনতে হয়, তা হলো দৈনিক সংবাদ তার দীর্ঘ চলার পথে সব সময়ই সবচেয়ে মর্যাদাকর ঘটনা এবং প্রতিভাদীপ্ত মানুষের সঙ্গে থেকেছে। পেশাগত আলো ছড়ানোর পেছনে এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা এবং মেধা সম্পন্ন মানুষের কর্মকা- প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, পরবর্তী যুগে যদিও অন্য অনেক পত্রিকা এবং অনলাইন শুরু হওয়ার পর এ জগতের অনেক কিছুই নতুন ভাব ও অভিধা পেয়েছে।

সংবাদের জন্ম ১৯৫১ সালে। তখন বাংলাদেশে সংবাদপত্র বলতে ছিল দৈনিক আজাদ। কলকাতা থেকে আনন্দবাজার এবং অন্য দু’একটি পত্রিকা ডাকযোগে আসতো। আর ছিল কিছু ম্যাগাজিন ধরনের সাপ্তাহিক পত্রিকা। এরমধ্যে বিনোদন পত্রিকাই ছিল বেশি। এর মধ্যদিয়েই সংবাদপত্র পাঠকদের তৃষ্ণা মিটতো। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয় দৈনিক সংবাদ প্রকাশের পর। সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল মূলত এদেশীয় একটি সংবাদপত্র প্রচলনের প্রত্যাশা নিয়েই। প্রগতিশীল একজন ব্যবসায়ীর হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আনুষঙ্গিক নানা কারণে তার পক্ষে সংবাদপত্র চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। তখন সংবাদ চলে যায় রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের হাতে। এরপরই সংবাদের পথ রাজনৈতিক দিকে চলে যায়। এর কারণ ছিল আরও রাজনৈতিক। তখন বাংলাদেশে, অন্য অর্থে, পূর্ববঙ্গে ছিল মুসলিম লীগের শাসন। মুসলিম লীগ ছিল মূলত একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় থাকার জন্য যেটুকু সংবাদ সম্পর্কিত কর্মকান্ড করা প্রয়োজন সে টুকু করার তাগিদ ছাড়া অন্যদিকে মনযোগ দেয়ার ইচ্ছা তাদের প্রথম দিকে ছিল না, প্রয়োজনও ছিল না অবশ্য। কিন্তু মুসলিম লীগের সংবাদপত্র চালানোর মতো ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় নির্বাচনে তাদের ভরাডুবির পর। তখন সংবাদপত্র নিয়ে তাদের আর কিছু করার মতো অবস্থাও ছিল না। এ সময় সংবাদের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন নরসিংদীর ঘোড়াশালের জমিদার পরিবারের সন্তান আহমদুল কবির। তিনি তখন অত্যন্ত শিক্ষিত এবং রাজনৈতিকভাবে মেধাবী এবং আদর্শবাদী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারায় তিনি দীক্ষিত। তিনি সংবাদ কিনে নেন। সংবাদ জন্ম নেয়ার সময় এর সম্পাদক হিসেবে ছিলেন তখনকার সময়ের নানাভাবে উজ্জল ব্যক্তিত্ব খায়রুল কবির। তিনি ছিলেন আহমদুল কবিরের বড় ভাই। খায়রুল কবির পরবর্তীতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং জগতের অন্যতম দিকপাল হয়ে উঠেছিলেন।

আহমদুল কবির সংবাদের মালিকানা কিনে নেয়ার পর এর খোলনলচে পাল্টে ফেলেন। এই পাল্টে ফেলার পেছনে তার রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শন কাজ করেছে। আগেই বলেছি আহমদুল কবির মূলত: ছিলেন বাম ঘরানার প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে দীক্ষিত এবং একজন আধুনিক মানুষ। এই অর্জন তার ছিল উচ্চমার্গের পড়াশোনা এবং সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের মানসিকতা থেকে উদ্ভূত। তিনি যে কতটা মেধাবী ও আধুনিক মানসিকতাসম্পন্ন ছিলেন তা অনুধাবন করা যায় সেই সময়ে তার রাজনৈতিক অর্জন বিশ্লেষণ করলে। তিনি তার মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনযাপনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রথম সহ-সভাপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলন। এটা তার জীবনের একটি বিরল অধ্যায়। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, তা হলো, আহমদুল কবির একটি জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তার মধ্যে বাম প্রগতিশীল এবং সমাজের অবহেলিত মেহনতি মানুষের ভালো জীবনযাপন প্রাপ্তির চিন্তা স্থান করে নিয়েছিল। তার এই আদর্শ দেশের নানা উত্থান-পতনের পরও অব্যাহত ছিল মৃত্যু পর্যন্ত। বিলাসী জীবন ত্যাগ করে তিনি সাধারণ জীবনযাপন করে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। এটা যেমন তার জীবনযাপন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, তেমনি দৈনিক সংবাদ পরিচালনার ক্ষেত্রে বলা যায়। সবখানেই ছিল তার ভিন্নধর্মী আদর্শবাদিতা। আর এভাবে নির্লোভ ও আদর্শবাদী জীবনের দিকে নিজেকে ধাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই তিনি বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের দিকপাল হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের সংবাদপত্রকে একটি নতুন রূপ দিতে পেরেছিলেন, যে ধারা এখনও অব্যাহত আছে তার উত্তর প্রজন্মের হাত ধরে।

আহমদুল কবির তার রাজনৈতিক আদর্শের কারণেই হাতে নিয়েই নতুন জীবন দিলেন সংবাদকে। মৃত্যুপথ যাত্রী একটি সংবাদপত্রকে তিনি নতুন দিকে নিয়ে গেলেন। সেই নতুন দিকটি হলো, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের সংবাদপত্র পড়ার সংস্কৃতিকে তিনি আরও বিস্তৃত করে সাধারণ মানুষের সংগ্রামশীল জীবন ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার মুখপত্র হিসেবে তুলে ধরলেন। এই অসাধারণ কাজটি করে তিনি এক্ষেত্রে হয়ে উঠলেন পথ প্রদর্শক। তার এই ভিন্নধর্মী চিন্তার আরও ব্যাপক প্রসার ঘটে পরবর্তীকালে অন্য সংবাদপত্রগুলো একই ধরনের পথে চলা শুরু করার মধ্যদিয়ে। আগেই বলেছি তখন সংবাদপত্র পাঠ ছিল উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের বিষয়। তা থেকে বের করে আহমদুল কবির সংবাদপত্রকে ছড়িয়ে দিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে, শিক্ষক, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক থেকে শুরু করে উচ্চমার্গে পেশাজীবীদের পাশাপাশি একজন সাধারণ শ্রমিককেও তিনি সংবাদপত্র পাঠের গন্ডিতে নিয়ে আসেন। এই আনাটা ছিল সংবাদপত্রকে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের পাঠযোগ্য করার মধ্যদিয়ে। একজন রাজনৈতিক কর্মী, একজন উচ্চশিক্ষিত শিক্ষাবিদ যেমন তার পাঠযোগ্য বিষয় পাচ্ছে সংবাদপত্রে তেমনি পাটকল, সুতাকলের একজন সাধারণ শ্রমিকও তার পাঠযোগ্য বিষয় পাচ্ছেন দৈনিক সংবাদে। সাধারণ মানুষ তার রাজনৈতিক অধিকারের জন্য আন্দোলন সংগ্রামের খবর পাচ্ছিলেন সংবাদ পড়ে। একজন প্রান্তিক কৃষক, চাষিও দৈনিক সংবাদকে তার পাশে পাচ্ছিলেন। কোন মাসে কোন ধান রোপন করতে হবে সে খবরটিও সংবাদ খুব যত্নের সঙ্গে বিভিন্ন পাতায় তুলে ধরেছে। যেমন তুলে ধরেছে শিশুদের কথা, নারীদের কথা, ব্যবসায়ীদের কথাও। সেই সময় শিশুদের জন্য আলাদা পাতা, নারীদের জন্য, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য, কৃষকদের জন্য- সবার, সব পেশার মানুষের কথা বলার জন্য, সুখ-দুঃখ প্রকাশের জন্য সংবাদ পৃথক পৃথক বিভাগ শুরু করেছিল। এটা একটি অসাধারণ ঘটনা বিশেষ করে সংবাদপত্রের সেই প্রাথমিক যুগে। এখন এই সময়ে বসে এখনকার প্রজন্মের পক্ষে ৫০-৬০ বছর আগের সংবাদপত্রের রূপ অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বুঝতে হলে অনেক গবেষণা করে তথ্য বের করতে হবে। তখনই সংবাদকে চেনা যাবে।

সংবাদে গ্রামীণ জনপদ, কৃষক- এসব বিষয় এত জোরালোভাবে উঠে আসতো যে, শহরের আড়ম্বরপূর্ণ সমাজের পাশাপাশি গ্রামের নিরাভরণ পরিবেশেও সংবাদপত্র পাঠের আকাংক্ষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল দৈনিক সংবাদ। দৈনিক সংবাদের পাতায় কৃষক ও গ্রাম জনপদের কথা তুলে ধরে সংবাদের রিপোর্টার মোনাজাত উদ্দিন বাংলাদেশের সংবাদ জগতে একটি ভিন্ন ধারাই সংযোজন করে ফেললেন। তা হলো ‘গ্রামীণ সাংবাদিকতা’ এবং ‘চারণ সাংবাদিকতা’। এই অসাধারণ কাজ হয়েছে দৈনিক সংবাদের মাধ্যমেই। আর এসবই ছিল সংবাদপত্র শিল্পে যেমন তেমনি সাংবাদিকতায়ও মাইলফলক। অন্য অর্থে সংবাদের আলোয় আলোকিত হওয়া। সংবাদপত্রের এই বিষয়ভিত্তিক বিবর্তন নিয়ে যদি গবেষণা হয় তবে তার সিংহভাগজুড়েই থাকবে দৈনিক সংবাদ, দৈনিক সংবাদের বিভিন্ন বিষয়। কারণ সংবাদপত্রের যা কিছু অভিনব, নতুন এবং আধুনিক সংযোগ তার সব না হলেও সিংহভাগই হয়েছে দৈনিক সংবাদের হাত ধরে।

সংবাদপত্রের ভাষার ব্যবহার নিয়েও দৈনিক সংবাদেও নিজস্ব অবস্থান ছিল ভিন্ন রকম। তখন যে গুটি কয়েক সংবাদপত্র ছিল তার সবই সাধুভাষা ব্যবহার করতো। কিন্তু সংবাদ সেই গন্ডি ছাড়িয়ে চলতি ভাষার প্রয়োগ শুরু করে। এটা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। বলিতেছি, করিতেছি-এর স্থানে বলছি, করছি’র ব্যবহার তখনকার সময়ের চাহিদায় সংবাদ সংযোজন করেছিল। তাতে ভাষার যে আধুনিকতা তা পরিস্ফুট হয়েছিল। এর ফল হিসেবে আধুনিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সংবাদকে নিজেদের পত্রিকা বলে মনে করতে পেরেছিল। যা পরে অন্য পত্রিকার ভাগ্যেই জুটেছিল।

দৈনিক সংবাদ এই যে নানাভাবে নানা সময়ে সংবাদপত্র শিল্পকে সংগঠিত, সমৃদ্ধ, সংযোজিত এবং সুশোভিত করেছে তার পেছনে কাজ করেছে সেই সময়ের দেশের সবচাইতে দক্ষ, মেধাবী, অভিজ্ঞ এবং সৃজনশীল একদল মানুষ। সেই গুণী মানুষেরাই বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মানদ- নির্ধারণ করতে সবচেয়ে বেশি এবং সৃজনশীল অবদান রেখেছেন। তারাই তাদের মেধা ও মননের ধারাবাহিকতায় সাংবাদিকতার পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টি এবং সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের মেধা-গুণে তৈরি হওয়া সাংবাদিকরাই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশা ও সংবাদপত্র শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, এখনও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এখনও তাদের হাতে তৈরি মেধাবী সাংবাদিকরা, এক অর্থে উজ্জল নক্ষত্র হিসেবে বিচরণ করছেন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করছেন। এভাবে বলতে গিয়ে যেসব গুণী সাংবাদিক ব্যক্তিত্বের নাম আমাদের সামনে চলে আসে, সময়ে অসময়ে সাংবাদিকতা সম্পর্কিত আলোচনা সমালোচনা বা কারও গুণকীর্তনের সময় যাদের কথা মনে পড়ে, এই মুহূর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন, খায়রুল কবির, সত্যেন সেন, রনেশ দাশ গুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সার, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, সৈয়দ নূরুদ্দিন, তোহা খান, কেজি মুস্তাফা, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান, আউয়াল খান, তোয়াব খান, গোলাম সারোয়ার প্রমুখ। এই গুণীদের সবাই এক সময় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দৈনিক সংবাদে অবদান রেখেছেন।

এইসব প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের বাইরে অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী দৈনিক সংবাদে নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তাদের কলাম লেখার শুরুও হয়েছিল দৈনিক সংবাদে। সংবাদপত্রে কলাম লেখার যে ধারা এখন খুবই সমৃদ্ধ, এক সময়, সেই ষাট ও সত্তরের দশকে, এ কলাম লেখার প্রচলন হয়েছিল দৈনিক সংবাদেই। সংবাদে কলাম লিখে একাধিক সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী প্রায় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। এটাও হয়েছিল দৈনিক সংবাদ তখন সব শ্রেণী পেশার মানুষের প্রায় অবশ্য পাঠ্য তালিকায় ছিল বলে এবং তখনকার সংবাদপত্র পাঠক সেই সব কলামে ব্যক্ত মতামতকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন বলেই তারা প্রায় সব পাঠকের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে পরিগণিত হতে পেরেছিলেন। সংবাদপত্রে কলাম লেখার সেই ধারা পরবর্তীতে আরও বিকশিত এবং সমৃদ্ধ হয়েছে এবং এখন কলাম লেখার সংবাদপত্রের পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধিতে অনেক অবদান রাখছে। আমরা যারা সংবাদে তৈরি এবং বর্ধিত এবং বিকশিত তাদের জন্য আনন্দের যে, এই কলাম লেখার ধারা সংবাদই প্রথম শুরু করেছিল। এক্ষেত্রে সেই সব গুণী ব্যক্তিদের নাম সবার সামনে এসে আমাদের, এই প্রজন্মের সংবাদকর্মীদর সম্মানীত করছে প্রতিনিয়ত।

আরেকটি ক্ষেত্রে দৈনিক সংবাদের অবদান ছিল প্রায় কিংবদন্তির মতো। তা হলো দৈনিক পত্রিকার পাতায় সাহিত্য চর্চার নতুন এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত করা। এ কাজটি দৈনিক সংবাদ এতটাই সফলভাবে করতে সক্ষম হয়েছে যে, এক পর্যায়ে অনেক লেখক দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে লেখা ছাপা হওয়ার কারণে গৌরবের অধিকারী হতেন, অন্য অর্থে বলা যায় ‘জাতে ওঠা লেখক’ হয়ে উঠতেন। এটা সংবাদের কৃতিত্বের একটি বড় অধ্যায় হয়ে আছে। অনেক লেখক ‘লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন কিনা তার কিছুটা নির্ভর করতো তার লেখা দৈনিক সংবাদে ছাপা হয়েছে কিনা তার ওপর। এই অবস্থা দীর্ঘদিন, প্রায় দশকের পর দশক ধরে অব্যাহত ছিল। এ ধারা পরবর্তীতে অন্য দৈনিক পত্রিকা অনুসরণ করে আরও বেশি সমৃদ্ধ অবস্থা সৃষ্টি করেছে হয়তো, কিন্তু সংবাদের সে ধারাকে পেছনে ফেলতে পারেনি। ভবিষ্যতেও দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সময় দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীর নাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। এটা এখন এক ধরনের কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে।

সংবাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংবাদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক সমৃদ্ধ প্রসঙ্গ চারপাশে ভিড় করবে। সেটা কি সংবাদ লেখা, সংবাদ পরিবেশন এবং বিভিন্ন বিভাগ সৃষ্টি - যে ক্ষেত্রেই হোকনা কেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এবং সংবাদপত্র ব্যবস্থাপনা- সবকিছুই শুরুর দিকে সংবাদের আলোয় আলোকিত হয়েছে। সে আলোর ঔজ্জল্য আরও অনেক দিন আমাদের, বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতকে আলোকিত করে যাবে - সন্দেহ নেই।