• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১

শ্রম আইনে ‘শ্রমিক’-এর সংজ্ঞায় গৃহকর্মীদের অন্তর্ভুক্তি

| ঢাকা , শুক্রবার, ০২ আগস্ট ২০১৯

আর্থিক অনটনের বঞ্চনা থেকে মুক্ত হবার আশায় প্রতিদিনই অগণিত মানুষ শহরমুখী হয়ে থাকেন। কর্মসন্ধানী এমন মানুষের একটি বড় অংশই কাজ করে থাকেন গৃহকর্মী হিসেবে। গৃহকর্মী হিসেবে মূলত কাজের সুযোগ পান নারী ও শিশুরা।

২০১০ সালের ৩ মে, আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ছিল এরকম যে, ফুলদানি ভেঙে যাবার অপরাধে গৃহকর্ত্রী তার ১০ বছর বয়সি গৃহকর্মীর হাত-পা বেঁধে মেঝেতে ফেলে নির্যাতন করেন এবং গরম খুন্তি তার পশ্চাৎদেশে প্রবেশ করান। গুরুতর আহত অবস্থাতেও গৃহকর্মী শিশুটিকে হাসপাতালে না নিয়ে ঘরেই বেঁধে রাখা হয়। কয়েক দিন পর উপায় না দেখে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে গৃহকর্ত্রীকে কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।

বিএনডব্লিউএলএ (Bangladesh National Women Lawyers Association)-এর আইনজীবীরা উক্ত প্রতিবেদনটি উচ্চ আদালতের নজরে এনে শ্রম আইনের সংজ্ঞায়নে গৃহস্থালির কাজকর্মকে স্বীকৃতি এবং ‘শ্রমিক’ শব্দের সংজ্ঞায় গৃহকর্মীদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তাদের সহায়তার জন্য আইনি কাঠামো উপযুক্ত করে তুলতে জনস্বার্থ মামলার পিটিশন ফাইল করেন। একই সঙ্গে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় তুলে ধরেন একই ধরনের অন্য প্রতিবেদনসমূহ। তেমনই কয়েকটি প্রতিবেদন নি¤œরূপ : গৃহস্থালির ব্যবহার্য কোনো সামগ্রী ভেঙে ফেলায় ১১ বছর বয়সি গৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং ইস্তিরি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান পুড়িয়ে দেয়া হয়। ২. গৃহকর্মীকে এমনভাবে প্রহার করা হয় যে তার মৃত্যু ঘটে। ৩. গৃহকর্মীর গায়ে অ্যাসিড ঢেলে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।

সে সময়কার প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে বিএনডব্লিউএলএর আইনজীবীরা উচ্চ আদালতের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেনÑ গৃহকর্মীরা গৃহের কর্তাব্যক্তিদের সামনে কতখানি দুর্বল এবং অসহায় হয়। আর্থিক দৈন্য তাদেরকে নিয়োগকারী গৃহপরিচালকের কাছে জিম্মি করে ফেলে। অভাবের কারণে অনেকেই কাজ ছেড়ে চলে যেতে পারেন না। আর যারা শিশু গৃহকর্মী এবং তৃতীয় কোনো পক্ষের প্ররোচনায় গ্রামের বাড়ি থেকে শহরে এসেছেন, অনেক ক্ষেত্রে তাদের ফিরে যাবার কোনো পথই জানা থাকে না; থাকে না আইন-অধিকার নিয়ে কোনো ধারণাও। এমনকি তাদের বাবা-মাও ঠিকমতো সন্তানের খোঁজখবর পান না। এবং উপরিউক্ত প্রতিবেদনগুলোই প্রমাণ করে যে, এই স্পষ্ট দুর্বলতা এবং অসহায়ত্ব দেখে ক্ষেত্রবিশেষে কতটা নির্দয় হয়ে ওঠেন নিয়োগকারীরা। উপরিউক্ত ঘটনাগুলো ছাড়াও যৌন হয়রানি এবং সেই ঘটনা লুকিয়ে রাখতে হত্যা এবং গুমের ঘটনাও অসংখ্য বলে উল্লেখ করা হয় মামলাটির রায়ে। গুরুতর অপরাধগুলো সব ক্ষেত্রে না হলেও যথাযথ বেতন-ভাতা, কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা, পর্যাপ্ত ছুটি বা অবকাশের সুযোগ ইত্যাদি অধিকার ক্ষুণœ হয় প্রতিনিয়তই। যে ঘটনাগুলো ভয়াবহ না হওয়ায় পত্রপত্রিকার উপরিউক্ত প্রতিবেদনগুলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে না, কিন্তু গৃহকর্মীর জীবনযাপনে এই ন্যূনতম অধিকারগুলোও খুব জরুরি। বিজ্ঞ আদালত রায়ে আরো অভিমত প্রদান করেন যে, শিশু গৃহকর্মী যারা দুর্ব্যবহার এবং শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে, তাদের দৈহিক বৃদ্ধি এবং মানসিক সুস্থতায় বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকেও গুছিয়ে নিতে অক্ষম করে দেয়।

আইনজীবীরা গৃহকর্মীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির এমন চিত্র তুলে ধরে বিজ্ঞ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, আইনের কাঠামোগত দুর্বলতাই গৃহকর্মীদের এমন দুরবস্থার সুযোগ করে দিয়েছে। তারা যুক্তি উপস্থাপন করে বলেনÑ শ্রম আইনের কাঠামোগত পরিবর্তন করা হলে অসহায় গৃহকর্মীদের আইনি ক্ষমতায়ন সম্ভব, যা হলে কাঠামোটি কোনো নিয়োগকারীকে নির্যাতন করার মতো পরিস্থিতির সুযোগ দেবে না। আইনি কাঠামোতে গৃহকর্মীদের উপযুক্ত অন্তর্ভুক্তি তাদের সামাজিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গৃহস্থালির কাজকে শ্রম আইনের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলে তা সরকারের ‘শিশু শ্রম নিরসন নীতি, ২০১০’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা’ প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

‘শ্রম আইন, ২০০৬’ ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে; ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি ব্যক্তিকে সংজ্ঞায়িত করে কিশোর হিসেবে। আইনটির ৩৪ ধারা কোনো শিশুকে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একজন কিশোরকে এই শর্তে নিয়োগ করা যাবে, যদি রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দ্বারা এমনটি সত্যায়িত হয় যে, উক্ত নিয়োগে তার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু আইনটির ২(৬৫) ধারা অনুযায়ী, ‘শ্রমিক’ অর্থ কোনো ব্যক্তি যিনি কোনো প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে কোনো দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক কাজ করার জন্য নিযুক্ত হন। উক্ত সংজ্ঞা গৃহকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে না। ধারা ২(৩৫) অনুযায়ী ‘প্রতিষ্ঠান’ অর্থ কোনো দোকান, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান অথবা বাড়িঘর বা আঙিনা, যেখানে কোনো ‘শিল্প’ পরিচালনার জন্য শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। যেহেতু শিল্প পরিচালনার জন্য শ্রমিক নিয়োগ করাই প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য, সেহেতু গৃহস্থালির কাজ শ্রম আইনের অধীনে বিবেচ্য হবে না। অথচ গৃহকর্মীদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। তারা সারা দিন কাজ করেও ‘শ্রমিক’ হিসেবে আইনে স্বীকৃতি পায় না। ফলে তাদের অধিকারসমূহ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। রায়ে আইনের ৪৪ ধারা নির্দেশ করে উচ্চ আদালত মন্তব্য করেন যে, শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করলেও আইনটি শিশু শ্রমের বিষয়ে শক্ত অবস্থান না নিয়ে বরং নরম (Relaxed) হয়ে যায়।

উচ্চ আদালত মামলাটির রায়ে ১০টি নির্দেশনা প্রদান করেন। আদালতের নির্দেশনাসমূহের সারাংশ নি¤œরূপ :

‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা’র নীতি অর্থবহ করে তুলতে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত সব ধরনের শিশু শ্রম তা গৃহস্থালির কাজকর্মই হোক না কেন, বন্ধ করতে সব রকম ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

১৩ বছরের ঊর্ধ্বে গৃহকর্মে নিযুক্ত কিশোর-কিশোরীরা যেন কাজের পাশাপাশি লেখাপড়া বা অন্যান্য কাজের প্রশিক্ষণ নেবার সুযোগ পায় সেই নিমিত্তে, নিয়োগকারীরা যেন তাদেরকে পর্যাপ্ত সময় প্রদান করে।

‘শিশু শ্রম নিরসন নীতি, ২০১০’-এর বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করতে উচ্চ আদালত সরকারকে তাগিদ দেন। বিশেষ করে কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশু শ্রম ইউনিট এবং জাতীয় শিশু শ্রম কল্যাণ কাউন্সিল গঠনের সুপারিশ করা হয়।

‘গৃহকর্মী’দের ‘শ্রম আইন, ২০০৬’-এর ‘শ্রমিক’ সংজ্ঞায়নে অক্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো সার্বক্ষণিক তদারকি এবং এই সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে সরকারকে তৎপর হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই নিমিত্তে বিচারিক প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়।

গ্রাম থেকে শহরে গৃহস্থালির কাজকর্মে নিয়োগের তথ্যাদি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট নথিভুক্ত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সরকারকে নির্দেশনা দেয়া হয়, যেন সকল গৃহকর্মীর তথ্য মফস্বল এলাকায় পৌরসভা এবং শহর এলাকাতে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে সংরক্ষণ করা হয়।

আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার গৃহকর্মীদের স্বাস্থ্য চেকআপ নিশ্চিতকরণ নিয়োগকারীর ওপর বাধ্যতামূলক করতে সরকারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

আইনি কাঠামো গৃহকর্মীদের জন্য পোক্ত করে তুলতে বলা হয়, যাতে তাদের বেতন-ভাতা, কাজের সময়সীমা, অবকাশ, ছুটি ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।

আইন দ্বারা অবশ্যই ক্ষতিপূরণ এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে কাজ করার সময় আঘাতপ্রাপ্ত হলে গৃহকর্মীরা সহজে পুনর্বাসিত হতে পারেন।

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)