• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, ২০ জিলকদ ১৪৪১

শুভ রহমান : মানবিক মূল্যবোধের অনন্য ব্যক্তিত্ব

দিল মনোয়ারা মনু

| ঢাকা , সোমবার, ১৩ মে ২০১৯

image

দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক শুভ রহমানের আজ (১৩ মে) প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী শ্রদ্ধা ভালোবাসায় জড়ানো। অনন্য সাধারণ এক প্রদিবাদী মানুষ যাকে পেয়েছি দীর্ঘদিন সুখে, দুঃখে, সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে একজন খুব কাছের মানুষ হিসেবে। মধুর ব্যবহার এবং সুরুচি সম্পন্ন উদার এ মানুষটি প্রয়োজনে কতখানি কঠোর হতে পারেন, সেই চিত্রও আমার জানা। সাংবাদিকতা শুধু নয়, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও ছিলেন তিনি অক্ষয় প্রাচীরের মতো। প্রথম দেখা তার সঙ্গে আমার বিয়ের পর। সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে শিক্ষাবিদ ভাবীসহ তিনি আমাদের যে মধুর সম্ভাষণে আন্তরিক আপ্যায়ন করেছিলেন, তা আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সাধারণ পোশাকের সপ্রতিভ ভয়শূন্য এ মানুষটিকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল। তারপর দেখেছি বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে নেতৃত্ব দিতে। কি কঠোর কি আপসহীন। আমি নিজে সাংবাদিকতায় থাকায় এবং তাদের সঙ্গে বিদ্যমান পারিবারিক এক মধুর বন্ধনের কারণে এ দেখা এবং জানাটা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে দিনে দিনে, শ্রদ্ধা বেড়েছে, বেড়েছে ঘনিষ্ঠতা। সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছেন। সাংবাদিকতা যদি তার পেশা হয় তবে রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা জীবনাদর্শ হিসেবে নেয়া, এবং পাশাপাশি সাহিত্য সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার কাজ ছিল তার নেশা। বীরদর্পে তিনি এ কাজটি নিরলসভাবে করেছেন, অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। দেশের প্রথম শ্রেণীর দৈনিক সংবাদ, দৈনিক বাংলা, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় উচ্চ পদে আসীন হয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। ক্ষুরধার লেখনী, সত্য উদ্ঘাটনে স্পষ্ট বক্তব্য সম্পন্ন বলিষ্ঠ কলাম, ঘটনা বিশ্লেষণে তথ্য-নির্ভর এ সবই ছিল তার বৈশিষ্ট্যের অঙ্গ। তার রাজনৈতিক অভিঘাত সুদূরপ্রসারি হওয়ায় সাহসের সঙ্গে সব পরিস্থিতি অতিক্রমের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাই তাকে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা ও আদর্শ- সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শুধু সোচ্চার নয় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিতে। তিনি ষাটের দশকে প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার বন্ধুদের নিয়ে ‘সৃজনী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী’ গঠন করেছেন। ঠিক একই লক্ষ্যে ষাটের দশকেই শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘরের সাংগঠনিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। দৈনিক সংবাদ কার্যালয়ে শহীদুল্লাহ কায়সার ও তোয়াব খানের নেতৃত্বে গঠিত কার্যকরী পরিষদ গঠিত হলে তিনি এর কার্যকরী সংসদের সদস্য হন।

এ পরিষদের সভাপতি ছিলেন গোলাম রহমান, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নিয়ামত হোসেন, অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন শুভ রহমান। শুরু হয় সেই থেকে সংগঠনের কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার নানা তৎপরতা। তাতেও তিনি অংশ নিয়েছেন। এদেশের সাংস্কৃতিক চর্চাকে আন্দোলনে রূপ দিতে তার চেষ্টার অন্ত ছিল না। সাংবাদিকতা, সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পাশাপাশি এ দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনও বহুমুখী হোক সেই কাজে তিনি সারা জীবন ব্যাপৃত ছিলেন। যুগে যুগে সংস্কৃতি আমাদের সাহস যুগিয়েছে, লড়তে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এক যোগে রুখে দাঁড়াতে। তার সাংবাদিকতা তার সংস্কৃতি চর্চা পুরোটাই ছিল নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার ও সমাজ রূপান্তরের লক্ষ্যে নিবেদিত। শুভ রহমান কমিটেড সাংবাদিক হিসেবে সমাজ বদলের আদর্শে অবিচল থেকে সংগ্রাম করে গেছেন। আশির দশকে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমমনাদের নিয়ে গঠন করেছিরেন ‘গণশিল্পী সংস্থা’। এর নেতৃত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক কামাল লোহানী, সঙ্গে ছিরেন মোজাম্মেল হোসেন মন্টু ও শামসুল হুদা এবং আরও অনেকে। ভোগবাদিতার সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করতেন না শুভ রহমান। যারা বিনোদনের জন্য সংস্কৃতি বিক্রী করে তাদের তিনি প্রকৃত সংস্কৃতিসেবী মনে করতেন না। শুভ রহমান শুধু সাংবাদিকই নন, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের একনিষ্ঠ সৈনিক ছিলেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য ছিলেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। এছাড়া তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, জাতীয় নবান্ন উৎসব ও সোমেন চন্দ স্মৃতি পরিষদের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন উদ্যোগী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে।

সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তিনি একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। এ ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন কবি। তার প্রগতিশীল জীবনবাদী বিজ্ঞানমনস্ক কবিতার জন্য তার প্রিয় পাঠকদের মনে তিনি স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। বিভিন্ন দৈনিকের কলাম গুলোই শুধু নয়, তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘নির্বাচিত চালচিত্র’, ‘গণ-সংগ্রামের রক্ত ফসল’, ‘যাহারা তোমার বিষইছে বায়ু’, ‘মাও সেতুং’, কাব্য গ্রন্থ ‘জীবন জীবনব্যাপী’ এবং সেরা কবিদের কবিতা নিয়ে তার সম্পাদিত বই ‘কাব্যসমগ্র’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ছিলেন। এ মানুষটি দেশভাগের পর হুগলী জেলার চুচুড়া থেকে বাবা, মা পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। তারপর বহু চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে একজন পরিপূর্ণ সংগ্রামী মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।

সাধারণের মধ্যে অসাধারণ এ মানুষটি এ দেশের সাংবাদিকদের সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক নানা কর্মকা-ের বাঁক বদলে ভূমিকা রেখে আলোচনায় এসেছেন। এর ধারাবাহিক পর্যালোচনাকালে একটি সত্য উপলব্ধি করা যায়, সমাজ পরিবর্তনে তিনি কতখানি অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন আর কী নিষ্ঠার সঙ্গে নিরলস ভূমিকা রেখে গেছেন। অনুসরণীয় এ মানুষটির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু তিনি থাকবেন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সংগ্রামী মানুষের চেতনার মধ্যে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবী এবং সাংবাদিকদের ভালোবাসার মধ্যে।

[লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক]