• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৯, ৬ মাঘ ১৪২৫, ১২ জমাউল আওয়াল ১৪৪০

শিশুর বিকাশে মুক্তিযুদ্ধের বই

শায়লা রহমান তিথি

| ঢাকা , শনিবার, ১২ জানুয়ারী ২০১৯

আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। অনেক বড় ছিল সে যুদ্ধ। আমাদের সেই মহান যুদ্ধ জয়ের পেছনে ছিলেন একজন নেতা, যার নেতৃত্ব না হলে আমরা হয়ত আরও হাজার বছর পরাধীনই থাকতাম। যুদ্ধে জয়লাভ করে যে দেশটি আমরা পেয়েছি, তার বিনিময়ে রয়েছে বহু মানুষের ত্যাগ আর রক্ত।

ইতিহাসের বই ছাড়াও আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার জন্য শিশুসাহিত্য হতে পারে অন্যতম প্রধান মাধ্যম। জাতীয় চেতনার সঙ্গে শিশুদের মানসিকভাবে সংযুক্ত করার জন্য এর বিকল্প নেই। বহু মানুষের রক্ত আর দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের এই লাল-সবুজ পতাকা। এই পতাকা যতদিন থাকবে, এই দেশ যতদিন থাকবে ততদিন আমাদের চেতনায় লালিত হবে মুক্তিযুদ্ধ। নতুন প্রজন্মকে দেশের প্রতি অনুগত আর সমৃদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে, তাদের হাতে তুলে দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত বই।

বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে লেখা আমাদের মহান ত্যাগের ইতিহাস শিশু-কিশোরদের অবশ্যই জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্যও আমাদের বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া দরকার। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই ত্যাগের ইতিহাস আর আবেগ প্রকাশিত হয় বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে। ইতিহাসকে যখন সাহিত্যে তুলে আনা হয়, তা হয় অনেক হৃদয়গ্রাহী ও আবেগমিশ্রিত। শিশু-কিশোররা ইতিহাসের নিরস লেখার চেয়ে সাহিত্যের আবেগঘন লেখাতে বেশি মনোনিবেশ করবে এটাই স্বাভাবিক।

স্বাধীনতার পর থেকে রচিত হওয়া সাহিত্যের সকল শাখায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য মহিমায় স্থান করে নিয়েছে। বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য অংশ হিসেবে তাই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুসাহিত্যের আলোচনা প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। আজকে যারা শিশু আগামী দিনে তারাই দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যত প্রতিনিধি, তাই তাদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করতে তাদের ইতিহাস সচেতন করতে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বঞ্চনা, অত্যাচারের কথা জানাতে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুসাহিত্যের।

শিশুসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ উঠে এসেছে নানাভাবে। শিশুসাহিত্যের পরিসর সমৃদ্ধ হয়েছে একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধে। ছড়া আমাদের শিশুসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশেষ করে ছড়ার মধ্য দিয়েই মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিশুসাহিত্যে উঠে এসেছে অনেক বেশি। শিশুকিশোররা যে কোন বিষয়কে ছড়া-কবিতার মাধ্যমে ছন্দে ছন্দে বেশ উপভোগ করে পড়তে পছন্দ করে। আর এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের যারা স্বনামধন্য ছড়াকার আছেন, তারাও তাদের ভূমিকাটি সঠিকভাবে পালন করেছেন। তারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচনা করেছেন কালজয়ী সব ছড়া।

ছড়াসাহিত্যের ক্ষেত্রে অগ্রণী ছড়াকারদের মধ্যে রয়েছেন সুকুমার বড়ুয়া, আখতার হুসেন, লুৎফুর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেনÑ এখলাস উদ্দিন আহমদ, আসাদ চৌধুরী, খালেক বিন জয়েন উদ্দীন, মাহমুদ উল্লাহ, আবু কায়সার, আবু সালেহ, ফারুক নওয়াজ, লুৎফর রহমান রিটন, সুজন বড়ুয়া, আমীরুল ইসলাম, আসলাম সানী, রাশেদ রউফ, ধ্রুব এষ, সারওয়ার-উল-ইসলাম, ওবায়দুল গনি চন্দন, আনজির লিটন, প্রমুখ। কিশোর গল্পেও পড়েছে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিশোর গল্প-উপন্যাস লিখেছেন আলী ইমাম, কাইজার চৌধুরী, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, আবু সাঈদ জুবেরী, আমীরুল ইসলাম, ইমদাদুল হক মিলন, আশরাফুল আলম পিন্টু, রফিকুর রশীদ প্রমুখ। ছড়া-কবিতা এবং কিশোর কবিতায়ও মুক্তিযুদ্ধকে তুলে এনেছেন সুজন বড়ুয়া, রাশেদ রউফ, রহীম শাহ, আহসান মালেক, পাশা মোস্তফা কামাল প্রমুখ। বর্তমানে তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল অনেক ছড়ালেখক তাদের রচনায় মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনছেন। আমাদের শিশুকিশোরদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করার জন্য এ ধারাটি অবশ্যই অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে যেসব সাড়া জাগানো উপন্যাস লেখা হয়েছে, তার সবগুলো হয়ত শিশুদের উপযোগী নয় এর আঙ্গিক ও পরিসরের কারণে। কিন্তু একটা শিশু যখন তার কৈশোর পেরিয়ে কলেজ জীবনে বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদার্পণ করবে, তখন সে সঙ্গত কারণেই খুঁজে নেবে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যগাঁথা উপন্যাস। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে নানা যৌক্তিক কারণে বদলেছে আমাদের উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, পটভূমি। সেইসঙ্গে বদলেছে চরিত্রের চিত্রায়ণের দৃশ্যপট। বলা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমাদের ঔপন্যাসিকরা সন্ধান করেছেন এক নতুন শিল্পরীতির। যে রীতিতে তারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পাশাপাশি জনমানুষের আকক্সক্ষার চিত্র তুলে ধরেছেন তাদের লেখায়। মানুষের নতুনভাবে জেগে ওঠার বীজমন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থার বাস্তব চিত্রের সার্থক প্রতিফলনও দেখা যায় এসব উপন্যাসে। আমাদের উপন্যাসে এ ধারার উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘তিমি’, হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘ঘেরাও’ ও ‘কালো ঘোড়া’ আনিসুল হকের ‘মা’, আমজাদ হোসেনের ‘অবেলায় অসময়’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ শামসুর রাহমানের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’, রিজিয়া রহমানের ‘একটি ফুলের জন্য’, শওকত আলীর ‘অবশেষে প্রপাত’ ও ‘যাত্রা’, রাহাত খানের ‘ছায়া দম্পতি’, শওকত ওসমানের ‘দুই সৈনিক’, ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ ও ‘নেকড়ে অরণ্য’, রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারি সূর্য’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলে কোঠার সেপাই’, রশীদ হায়দারের ‘অন্ধকথা মালা’, আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’, ইত্যাদি। কিশোর উপন্যাস ‘আমার বন্ধু রাশেদ’-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ কিভাবে দিন যাপন করেছেন, তা তুলে ধরেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এ রকম অনেক গুণী লেখক তাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখনির মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যজগতকে সমৃদ্ধ করেছেন।

একটি জাতির আত্মপরিচয় হচ্ছে তার শেকড়ের সন্ধান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শেকড়, আমাদের ঐতিহ্য। একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে কোন জাতির ভবিষ্যত নাগরিকরা গড়ে উঠলে সেই জাতি একটি শেকড়হীন বৃক্ষে পরিণত হবে। তাই আমাদের শিশুদের জানাতে হবে, বোঝাতে হবে, শেখাতে হবে আমরা কত ত্যাগের বিনিময়ে এই দেশটি পেয়েছি। এক্ষেত্রে লেখকদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে লেখার, অভিভাবকদের দায়িত্ব রয়েছে তার শিশুর হাতে সঠিক বইটি তুলে দেবার।

আমাদের শিশুকিশোরদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের বই তুলে দেবার জন্য বর্তমান সরকার বিগত দশ বছরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও সরকারি গণগ্রন্থাগারের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ বই ক্রয় করেছে। সরকারি গণগ্রন্থাগারের ৭০টি শাখার জন্য সরকার প্রতিবছর বই ক্রয় করে থাকে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে সরকার বিগত দশ বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার বই ক্রয় করে বিতরণ করেছে। প্রতিবছরই মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের ইতহিাস ঐতিহ্য সংবলিত বই ক্রয় করে বিতরণের ব্যবস্থা করেছে সরকার। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার জন্য এ প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিকশিত হোক আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। দেশের জন্য তা ভালোবাসায় ভরে থাক আমাদের শিশু কিশোরদের মন, মনন আর সমগ্র সত্ত্বা

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ)

  • জনপ্রতিনিধির ওপর নজর রাখুন

    মোহাম্মদ আবু নোমান

    একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চোখ-ধাঁধানো, অভাবনীয় মহাবিজয় ও ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতা অর্জনের পর

  • সময়ের কথা রাখুন

    হিমাংশু দেব বর্মণ

    সত্যি, মাঝে মধ্যে অকারণেই হাসতে ইচ্ছে করে। সেই অকারণের হাসিটা কেমন হলে