• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ২৩ জিলহজ ১৪৪১, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

মুজিব শতবর্ষ

মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

| ঢাকা , শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২০

image

১৩ মার্চ

ভারতের নির্বাচন-ইন্দিরার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক শক্তির জয়

নয়াদিল্লি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিধান সভার নির্বাচনে ভারতবাসীর অবিসংবাদী নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে কংগ্রেস দল কতকগুলো রাজ্যের দুর্ভেদ্য বিরোধীতা ভুলুণ্ঠিত করে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ভারতের সর্বাপেক্ষা আশন্ত রাজ্য পশ্চিম বাংলার প্রবল প্রতাপশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সি পি আই (এস) এবং তার দিকপাল নেতাদের শশাচনীয়ভাবে পরাজিত করে কংগ্রেস অপ্রতিহত গতিতে বিজয়ের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে চলেছে।

ভারতের বর্তমান সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস আজ পর্যাপ্ত ভোট গণনার ফলাফল অনুসারে ৯টি রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিজয়মুকুট অর্জন করেছে। এছাড়াও পশ্চিম বাংলা, বিহার ও জম্মুকাশ্মীর রাজ্যে কংগ্রেস নিশ্চিত বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে।

কংগ্রেস এ পর্যন্ত যেসব রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে সেগুলি হচ্ছে, হারিয়ানা, রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, হিমাচল প্রদেশ, মহীশুর, আসাম, অন্ত প্রদেশ ও পাঞ্জাব। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের প্রদেশ প্রধানও নির্বাচিত হয়েছে। বিহারের মোট ৩১৮টি আসনের মধ্যে ১৭১টি আসনের ভোট গণনার ফল ঘোষণা করা হয়েছে। তন্মধ্যে কংগ্রেস ৮৯টি, সিপিআই ২৭টি, আদি কংগ্রেস ১৬টি, সোস্যালিষ্ট পার্টি ১৪টি, এবং জনসংঘ ১৩টি আসন পেয়েছে। জনু ও কাশ্মীরে ৩৬টি আসনের ভোট গণনার ফল জানা গেছে। তার মধ্যে কংগ্রেস ২৫টি, জামাত ইসলামী ৪ ও জনসংঘ ১টি আসন পেয়েছে।

গোয়ারাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মি. বিডি বান্দোদকরের মহারাষ্ট্র বাদী গোমস্তাক পার্টি তার বিরোধী দলের দখল থেকে এবার আরও দুটি আসন কব্জা করেছে। মনিপুর রাজ্যের ৬০টি আসনের মধ্যে ৪৫টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কংগ্রেস ১৪টি, মনিপুর পিপলস পার্টি ১০, ইউএনআইসি ৩, নির্দলীয় ১৩, সোস্যালিষ্ট পার্টি ১, আদি কংগ্রেস ১ এবং সিপিআই ১টি আসন লাভ করেছে।

ঢাকায় আন্তর্জাতিক এজেন্টদের ঘৃণ্য তৎপরতা

কোনো এক সরকারি মহল থেকে বলা হয় যে, কিছু সংখ্যক আন্তর্জাতিক মুদ্রা পাচারকারী তাদের বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করে দিচ্ছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। উক্ত মহল থেকে সাংবাদিককে জানানো হয় যে, গত সপ্তাহে একমাত্র ঢাকা বিমানবন্দর দিয়েই পাঁচ হাজার স্টার্লিং পাউন্ডেরও অধিক মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করা হয়েছে। সরকারি মহল থেকে বলা হয় যে, বিভিন্ন ছদ্মবেশে এইসব এজেন্টরা বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের কাছে হাজির হয়ে সরকারি মূল্যাপেক্ষা অধিক মূল্য দেবে বলে প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে তাদের সঙ্গে স্টার্লিং পাউন্ড কিংবা মার্কিন ডলার সম্বন্ধে শুল্ক কর্মচারীদের কাছে কোনো তথ্য প্রকাশ না করার পরামর্শ দেয়। গত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ ভাড়া করা বিমানে বাংলাদেশে আগমনকারী এইসব যাত্রীদের অধিকাংশই হচ্ছে লন্ডন অধিবাসীও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের লোক।

এই মহল থেকে আরও প্রকাশ করা হয় যে, কোনো কোনো বিদেশি যাত্রী এই আন্তর্জাতিক মুদ্রা পাচারকারীদলের কাছ থেকে নিয়ে এসে, সরকারি মূল্যাপেক্ষা বহুল উচ্চমূল্যে বাংলাদেশে সংগ্রহ করে থাকে। প্রাক্তন পি আই এ এর পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মচারীরা দেশের এই অংশে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি দেখাবার জন্যে বাংলাদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করার উদ্দেশ্যে এই পথ ধরে বলে উক্ত মহল থেকে প্রকাশ করা হয়।

সরকারি পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে সুবিধার জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বিমানবন্দরে বিদেশিদের মুদ্রা বিনিময়ের জন্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের একটা বৈদেশিক মুদ্রা। কাউন্টার খোলা হয়েছে বলে সরকারি মহল থেকে প্রকাশ করা হয়।

তারা জানান যে, এমতাবস্থায় যাত্রীদের কাছ থেকে বিশেষ কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সোমবার বিমানবন্দরে পুলিশ একটা লোককে হাতে নাতে ধরে ফেললে এই চোরাচালানের তথ্য বেরিয়ে পড়ে। লোকটা সিলেটের একজন যাত্রীকে সরকারি মূল্যাপেক্ষা অধিক মূল্যে তার স্টার্লিং পাউন্ড বিক্রির জন্যে প্রলুব্ধ করছিল। তেজগাঁও পুলিশ চোরাচালানীকে গ্রেফতার করে এবং পরে জামিনে মুক্তি দেয়। ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত করা হচ্ছে বলে পুলিশ থেকে জানানো হয়েছে।

প্রমোদকর ৫০ ভাগ হ্রাসের দাবি

ঢাকায় চলচ্চিত্র প্রদর্শকরা সরকারের নিকট প্রমোদর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ হ্রাস করার দাবি জানান। আর্থিক ক্ষতি থেকে রেহাই পাবার জন্য তারা এ দাবি জানান। তারা ইতিপূর্বে আমদানিকৃত ৫৪টি ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি দানের জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

পরশু স্থানীয় একটি সিনেমা হলে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তারা উপরোক্ত বক্তব্য পেশ করেন। চলচ্চিত্র প্রদর্শক গ্রুপের চেয়ারম্যান জনাব এম এ আওয়াল সাংবাদিকদের বলেন যে, ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই চলচ্চিত্র প্রদর্শকরা আর্থিক সমস্যার মোকাবিলা করে আসছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রদর্শনী বন্ধ থাকলেও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়েছে, তাছাড়া দখলদারবাহিনী কয়েকটি হলের ক্ষতিসাধন করে।

চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন যে, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অর্থনৈতিক অক্ষমতার দরুন নয়া চলচ্চিত্র নির্মাণ অনিশ্চিত। তিনি বলেন, স্থানীয় চিত্রশিল্পের স্বার্থে নয়া চলচ্চিত্র আমদানি করা সঠিক হবে না। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে আমদানিকৃত ৫৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়ের। শতকরা ২০ ভাগ প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য তহবিলে দেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে

বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নিয়মিতভাবে দ্রুত পাট চালান দেবার জন্য অবিলম্বে জাহাজের ব্যবস্থা করা গেলে বাংলাদেশ কিছু অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে বলে ওয়াকেফহাল মহলসূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে চালান পাঠাতে বিলম্ব হলে বিদেশি ক্রেতারা কৃত্রিম তন্তু আর থাইল্যান্ডের পাটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে করে শুধু যে বৈদেশিক মুদ্রা খাতে ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, বাজারটাও চলে যেতে পারে। জানা গেছে যে, বিদেশি ক্রেতারা পাটের আশু চালানের নিশ্চয়তা পেলে এমনিক রপ্তানি মূল্য নিয়ন্ত্রণের ওপরে কয়েক পাউন্ড হারে বেশি দামে দিতেও রাজি আছেন। এতে দেখা যাচ্ছে যে, চালানের গ্যারান্টি থাকলে বাংলাদেশ স্বাভাবিক হারের চাইতে কিছু বেশি টাকা পেতে পারতো।

আজ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন আমাদের খুব বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত বাজার আর জাহাজ না পেলে এর কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে এই পরিবহন অসুবিধার জন্য বাংলাদেশের পাট বিদেশে পাঠানো মুস্কিল হয়ে পড়েছে। পাট রপ্তানিকারীরা যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্বাসনের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন। এই সঙ্গে বন্দরগুলোর আশে পাশে সাম্প্রতিক সংগ্রামের দিন গুলিতে নিমজ্জিত জাহাজগুলি তুলে চ্যানেল পরিষ্কার করার ওপরও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ এর জন্য সেখানে বড় জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটছে। তাদের মত হচ্ছে, সরকার অবিলম্বে কিছু বার্জ ও জাহাজ বাকিতে খরিদ করুক। মাত্রাধিক ভাড়া দেওয়ার চাইতে এটা অনেক সুবিধাজনক।

গত বছর মার্চের পর থেকে বিদেশি চটকলগুলি বাংলাদেশের পাট না পেয়ে খুব ক্ষস্তি হয়েছে। এই সময়ে থাইল্যান্ডের পাট এসে কিঞ্চিৎ চাহিদা মিটিয়ে গেছে। পাটও কৃত্রিম বস্তু পর্যলোচনা সাময়িকীর গত জানুয়ারি সংখ্যায় বিষয়টা আরও পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সময়ের প্রাইসেস কারেন্ট’ পত্রিকায় বলা হয়ছে, ডাভির মিলগুলো এ সময় সাময়িক চাহিদা মিটাবার জন্য ভারত থেকে ৫০ হাজার বেল পাট খরিদ হবে। কথা অবশ্য সত্যি যে, বাংলাদেশ থেকে পাট আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে শুরু করেছে। কিন্তু চালানের পরিমাণ আরও বেশি হওয়া উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।”

দুষ্কৃতিকারীদের খুঁজে বের করো- বঙ্গবন্ধু

ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ বলেন যে, এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা বাংলাদেশ অথবা তাকে (বঙ্গবন্ধুকে) ভালোবাসে না। তারা নিজেদের সরকার গঠন করতে চেয়েছিল। তারা এখনও পর্যন্ত অস্ত্র জমা দেয়নি। এসব দুষ্কৃতিকারী এখন গ্রামাঞ্চলে ও অন্যান্য কোনো কোনো এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছে। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, বাংলাদেশে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে জনগণ তাকে ভালোবাসে না। সুতরাং জনগণ এই দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করবে এবং শাস্তি দেবে। বঙ্গবন্ধু জনগণের সহায়তায় দেশের প্রত্যেক প্রান্ত থেকে দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করার জন্য আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেন যে, তিনি এইসব ব্যক্তিকে শাস্তি দানের জন্য সরকারি ক্ষমতা অথবা পুলিশ বাহিনী ব্যবহার করতে চান না।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী ময়দানে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন যে, এক শ্রেণির লোক জনগণের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে শেখ মুজিব বলেন যে, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও জোট নিরপেক্ষতা জাতির এ সুস্পষ্ট ৪টি আদর্শ সম্পূর্ণরূপে কোনো রকম প্রশ্নের ঊর্ধ্বে।

বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, আমরা সশস্ত্র প্রস্তুতি ব্যতিরেকেই যদি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে উৎখাত করে থাকতে পারি তবে এসব ব্যক্তিকে মোকাবিলা করা মোটেই কঠিন হবে না। তিনি এসব শক্তিকে মোকাবিলা করার ব্যাপারে তাঁর প্রতি জনগণের সমর্থনের ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করেন।

সূত্র : দিনলিপি, বঙ্গবন্ধুর শাসন সময়, ১৯৭২