• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৭ ফল্গুন ১৪২৬, ২৫ জমাদিউল সানি ১৪৪১

মুজিব শতবর্ষ

মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

| ঢাকা , শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০

image

১৩ ফেব্রুয়ারি

এবার একুশে নতুন তাৎপর্য নিয়ে

এসেছে -তাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতিকে একচেটিয়া পুঁজিবাদি, ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ আর স্বৈরাচারের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার পথ দেখিয়েছে। তাই স্বাধীনতা-উত্তর এই ২১ ফেব্রুয়ারি সারা জাতির কাছে এক নতুন অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে আসছে। এবারে ২১ ফেব্রুয়ারি-শহীদ দিবস জাতীয় শহীদ দিবস। রোববার প্রদত্ত এক বিবৃতিতে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলার প্রতিটি নাগরিককে যথাযথ মর্যাদার সাথে জাতীয় শহীদ দিবস হিসেবে এবারের শহীদ দিবস পালন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এই বিবৃতিতে তিনি দেশবাসীর নিকট নিন্মোক্ত বক্তব্য রেখেছেন। লাখো শহীদের পবিত্র বক্ষের রক্তের ফলগুধারায় সিক্ত জননী বাংলার বুকে স্বাধীনতার বিজয় পতাকাবাহী একচেটিয়া পুঁজিপতি ও স্বৈরাচারী শাসন আর শোষণের শৃঙ্খলমুক্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে আবার সোনায় রূপান্তরিত করার মহান শপথে বলীয়ান। প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা আমার : বর্ষ পরম্পরায় আবার আসছে মহান ২১ ফেব্রুয়ারি। বাঙালি জাতির জীবনে একটি অমর দিন। আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে এমনি একটি দিনে মাকে মা বলে ডাকার ও মায়ের ভাষায় মনের ভাব প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার মানসে পাঞ্জাবি বেনিয়াদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। দুর্জয় শপথে বলীয়ান সারাবাংলার প্রত্যন্ত প্রান্তরে বিক্ষোভে ফেটে পড়া জনতার মিছিলে পশুরদল চালিয়েছিল নির্বিচারে বুলেট। তরুণ বক্ষের রক্তে রাজপথকে রঞ্জিত করে দিয়ে মায়ের মর্যাদা সেদিন রক্ষা করেছিল বরকত, সালাম, শফিউর, আওয়াল, রফিক আর জব্বার। আর একই সঙ্গে সে রক্তস্রোতের প্রতিটি বিন্দু থেকে ওরা জন্ম দিয়ে গেল লক্ষ কোটি সালাম, বরকতকে। বাংলার মানুষের মনে জাগিয়ে দিয়ে গেল জাতীয়তাবাদের নতুন চেতনা। যার ফলশ্রুতিরূপ ১৯৫৪ নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলিম লীগের হলো ভরাডুবি। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই প্রাসাদচক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বাঙালি জাতি পুনর্বার শৃঙ্খলিত হলো। তাদের বুকের ওপর চেপে বসল সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর। তারপর শুরু হয় একনাগাড়ে সামরিকবাহিনীর নির্মম অত্যাচার আর আমাদের রক্তদানের পালা। সালাম-বরকতের উত্তরসুরি বাংলার তরুণ সম্প্রদায় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রচনা করলো আত্মত্যাগের এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। অবশেষে ১৯৬৬ শেষভাগে আফ্রো এশিয়ার লৌহমানব, রাজনৈতিক বিশ্বের উজ্জলতম নক্ষত্র, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পূজারি, বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহান বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধু ও তার আওয়ামী লীগের প্রতি জানালো পূর্ণ আস্থা। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে নজীরবিহীন সে গণরায়কে বানচাল করার উদ্দেশ্যে পাঞ্জাবি হায়েনার দল সারা দেশব্যাপী বর্বরতায় লিপ্ত হলো।

বাংলাদেশের সাহায্যে পাশ্চাত্যের শর্তে পাকিস্তানের ঋণ বাংলাদেশকে দিতে হবে

লন্ডন। পাশ্চাত্যের কতিপয় দেশ পাকিস্তানে প্রদত্ত বিপুল পরিমাণ ঋণ যা বাস্তবপক্ষে উসুলযোগ্য নয় তার অংশবিশেষ বাংলাদেশের স্কন্ধে চাপানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সাহায্যদানের শর্ত হিসেবে বাংলাদেশকে বকেয়া ঋণের অংশীদার করার চেষ্টা চলছে। সাহায্যদানকারী দেশসমূহ ও বিশ্বব্যাংক এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনার পরামর্শ দান করছেন বলে খবরে প্রকাশ। বাংলাদেশ অনুরূপ পরামর্শ উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করবেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন না। উক্ত মহল উল্লেখ করেন যে, পাশ্চাত্যের প্রস্তাবটি পদ্ধতিগতভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পক্ষে গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নিলে এবং তা কার্যকরী হলে ফলাফল দাঁড়ায় এই যে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রায় পঙ্গু পাকিস্তানের বিদেশি ঋণ একটি নয়া রাষ্ট্রের স্কন্দে চাপিয়ে দেওয়া। বিগত বছরগুলিতে পাকিস্তান বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ গ্রহণ করেছে, যা পরিশোধের ক্ষমতা পাকিস্তানের নেই। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান এককভাবে দায় পরিশোধ বন্ধ ঘোষণা করেছে। যে বাংলাদেশ থেকে আহরিত সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যবহৃত হতো, সেই বাংলাদেশ হাতছাড়া হওয়ায় পাকিস্তানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সাংঘাতিক হ্রাস পেয়েছে। ইতোপূর্বে চীন পাকিস্তানের যে ঋণদান করেছিল, তা সরাসরি সাহায্য বা গ্রান্ট বলে চীনের পক্ষ হতে সম্প্রতি ঘোষণা করা হয়েছে। বিগত বছরগুলিতে বিশ্বব্যাংক ও পাশ্চাত্যের সাহায্য দানকারী দেশসমূহের জ্ঞাতসারেই পাকিস্তানি শাসকরা বৈদেশিক সহয্যের অধিকাংশই পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করেছে। পশ্চিমাঞ্চলের পুঁজিপতিরা পূর্ব পাকিস্তান প্রকৃত পক্ষে উপনিবেশিক শোষণ চালিয়ে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের দ্রুত বিপুল পরিমাণ সাহায্যের প্রয়োজন কিন্তু পাকিস্তানের বকেয়া ঋণ এই সাহায্য দ্রুত প্রাপ্তির পক্ষে বাধাস্বরূপ বলে উক্ত মহল উল্লেখ করেন। তারা মনে করেন যে, কনসোর্টিয়ামভুক্ত দেশসমূহকে অতিদ্রুত বাংলাদেশকে গ্রাণ্ট ও সুদমুক্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দান করা বাস্তবমুখী হবে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, গত মাসে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ডেভিড ফ্রষ্টের সঙ্গে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে গৃহীত ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব পাকিস্তানের। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ঋণের সামান্য অর্থমাত্র বাংলাদেশে ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ দুর্গতির মধ্য দিয়ে চলছে। তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হবে এর কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি দায় পরিশোধে সমর্থ হবে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানে ঋণদানকারী দেশগুলি আশা করে যে, পাকিস্তানে প্রদত্ত ঋণের অংশবিশেষ বাংলাদেশের স্কন্ধে অর্পিত হলে অদূর ভবিষ্যতে তা উসুল করা সম্ভব হবে। ফলে তাদের লোকসানের পরিমাণ কম হবে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পদ বণ্টন হলে বকেয়া ঋণের অংশ ব্যতিত বাংলাদেশের পাওয়ার কিছুই নেই। তবে, অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলে সদস্যপদ লাভ করলেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণে সমর্থন হবে।

বাংলাদেশ নয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান ও নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কমরেড এস এ ডাঙ্গে শনিবার বলেছেন যে, বাংলাদেশের জনগণ এখানে এক নয়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, এটা সারাবিশ্বের মেহনতি মানুষের জন্য নতুন আশার সূচনা করেছে। বাংলাদেশের ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র আয়োজিত দুদিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে মি. ডাঙ্গে এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশে বিপ্লবে সাফল্য শুধু এখানকার মানুষের আশা-আকাঙ্খাকে উজ্জীবিত করে নাই বরং তা প্রতিবেশী ভারতবর্ষের ৫০ কোটি সংগ্রামী মানুষের তথা বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দিয়েছে।

ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে পরিচালনা করেছে বলে পাশ্চাত্যের সংবাদপত্রগুলো যে। ধারণা পোষণ করেছে মি. ডাঙ্গে তার সমালোচনা করেন এবং বলেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিপাগল মানুষের ঐক্যবদ্ধতাই ভারতকে তাদের বিপ্লবকে সাহায্য করতে প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিবাহিনীর সাহায্যে ভারতীয় সেনাদল মিত্রবাহিনী হিসেবে এগিয়ে এসেছে এবং তারা যৌথভাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বাহিনীর কবলমুক্ত করেছে। তিনি জানান যে, বাংলাদেশে ২৩ মার্চের আগে এই দেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র সম্প্রদায় ও বুদ্ধিজীবীরা একসঙ্গে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। বাংলাদেশ থেকে দখলদার পাকিস্তানবাহিনীকে বিতাড়ন খুব সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষের একাত্মতার জন্যই তাদের এখান থেকে সহজে বিতাড়ন সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এখানকার সমাজব্যবস্থা সমাজতন্ত্রের দিকেই পরিচালিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে ২২ জন একচেটিয়া পুঁজিপতি চক্র বাংলাদেশে তাদের শোষণের ভূতকে চাপিয়ে রেখেছিল। সশস্ত্র বিপ্লবের পরে এখন সে ভূত বিতাড়িত। কাজেই পুনরায় যাতে বাংলাদেশে একচেটিয়া পুঁজিপতিচক্র চেপে বসতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য তিনি সংগ্রামী জনতার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের মতো ভারতেরও ৭৫ জন একচেটিয়া পুঁজিপতি রয়েছে। বর্তমানে তারা বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটানোর জন্য সচেষ্ট আছেন এবং এই ধরনেরই যে কোনো চক্রান্তকে বানচাল করার জন্য তিনি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মেহনতি মানুষ এখানে যে কোনো ধরনের চক্রান্তকে নসাৎ করে দেবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

তিনি বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীর অধিকারকে নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও হাঙ্গেরির শ্রমিক নেতৃবৃন্দ যোগদান করে। সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সার্জেই ত্রুব নিকভ, কমরেড মনি সিং, বেগম মতিয়া চৌধুরী, জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মি. উইলি জানকে, ভারতের মি. রনেণ সেন ও শ্রমিক নেত্রী মিস দেশপান্ডে। স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এটাই প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন। বিশ্ব ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও ফ্রান্সের ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থা সি-জি-টি এ সম্মেলনে বাণী পাঠিয়েছেন।

সূত্র : দিনলিপি, বঙ্গবন্ধুর শাসন সময়, ১৯৭২