• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ৭ ফল্গুন ১৪২৬, ২৫ জমাদিউল সানি ১৪৪১

মুজিব শাসন আমল : ১৯৭২

| ঢাকা , শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১২ ফেব্রুয়ারি

সরকারি কর্মচারীদের হাজিরায় দেরি সহ্য করা হবে না- বঙ্গবন্ধু

ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি কর্মচারীদের অফিসে দেরি করার সিদ্ধান্তে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, সরকারি কর্মচারীদের কাজে গাফিলতি জাতীয় উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করবে এবং সরকার তা কোনো মতেই বরদাস্ত করবে না। আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েটের কয়েকটি অফিস পরিদর্শনে গিয়ে কর্মচারীদের হাজিরা দেরি দেখে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। বঙ্গবন্ধু অফিস পরিদর্শনে গিয়ে এমনকি সকাল ৯টার পরেও কোনো কোনো কর্মচারীকে অনুপস্থিত দেখে বলেন যে, তার সরকার অফিসে হাজিরার ব্যাপারে কোনো প্রকার দেরি বরদাস্ত করবে না এবং দেরি করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। শেখ মুজিব আরো বলেন যে, দেশের লাখ লাখ লোকের রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। জাতীয় উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের গাফিলতি চলবে না। প্রধানমন্ত্রী এটাই প্রথম আকস্মিক পরিদর্শন বলে সংশ্লিষ্ট অফিসার ও অনুপস্থিত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তিনি এবারের মতো কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

ফ্রান্স ও ইটালি স্বীকৃতি দিয়েছে

ঢাকা। ফ্রান্স আজ বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে চুক্তিপত্র বিনিময় করা হয়। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র অফিসে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে দু’দেশের মধ্যে এই চুক্তিপত্র বিনিময় হয়। ফরাসি মিশন প্রধান মি. পিয়াবে বার্থেলট তার দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে পত্র পেশ করলে বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুস সামাদ আজাদ তা গ্রহণ করেন। আজ ইটালিও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছেন বলে রয়েটারের এক খবরে প্রকাশ। প্যারিস থেকে আনীত নোট হস্তান্তরের পর ফরাসি মিশন প্রধান বলেন যে, তিনি ফরাসি সরকার এবং ফরাসি জনগণের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য শুভেচ্ছাবাণী বহন করে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদের সকলের সৌভাগ্য কামনা করি। তিনি এ মর্মে আশ্বাস দেন যে, ফ্রান্স বাংলাদেশের সাথে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক কামনা করে। একই অনুভূতির প্রতিধ্বনি করে জনাব আব্দুস সামাদ আজাদ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সব রকমের সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য ফ্রান্স সরকার এবং ফরাসি জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। পূর্বাহ্নে বাংলাদেশের পরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় ফরাসি মিশন প্রধান বলেন, ‘আমি আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরে আনন্দিত।” তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের জন্য আমার কাছে একটি সুখবর আছে। আমি আমার দেশের সাথে আপনার দেশের একটি স্বীকৃতি পত্র নিয়ে এসেছি।

কমিউনিস্ট পার্টি সরকারের সাথে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে

ফেনী। বাংলাদেশের প্রবীণতম কমিউনিস্ট নেতা মনি সিং বলেন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি সরকারের সাথে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করবে। বৃহস্পতিবার ফেনী মহকুমা কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে স্থানীয় ডাকবাংলোতে আয়োজিত এক জনসভায় তিনি বক্তৃতা দান করছিলেন। শ্রী সিং বলেন, আমাদের সরকার দরিদ্র। এমতবস্থায় সরকারের পক্ষে অবিলম্বে উদ্বাস্তু ও গৃহহীন লোকদের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানো অসম্ভব। বক্তৃতা প্রসঙ্গে তিনি দেশের সেবায় সর্বোতভাবে আত্মনিয়োগের জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সকল শ্রেণির লোক ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে গেলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। যে সকল দল গুরুতররূপে সরকারের বিরোধিতা করেছে তিনি তাদের হুঁশিয়ারি করে দেন। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জনাব আবদুস সালাম, মিসেস অনিমা সিং, জনাব আব্দুল হাই এবং মির আব্দুল হাইও এসভায় বক্তৃতা করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য শ্রী মনি সিং ঐদিন কমিউনিস্ট পার্টির মহুকুমা অফিস উদ্বোধন করেন।

১৩ ফেব্রুয়ারি

ব্যাংক, বীমা ও বড় শিল্প শিগগিরই রাষ্ট্রায়ত্ত হবে

বাংলাদেশের ব্যাংক ও বীমা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে অচিরেই রাষ্ট্রায়ত্ত করা হবে। বাংলাদেশের পূর্তমন্ত্রী জনাব মতিউর রহমান রোববার তারই সম্মানার্থে আয়োজিত এক সম্বর্ধনা সভায় এই তথ্য জানান। এমনকি বলেন, এদেশে শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েম করার জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বক্তৃতায় তিনি মার্কিন সাহায্যকে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিকে শোষণের হাতিয়ার বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন যে, অতীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ২০টি একচেটিয়া পুঁজিপতি পরিবার এদেশের মানুষকে নিদারুণভাবে শোষণ করে গেছে। তিনি জানান, বাংলাদেশে আর কখনোই ২০ পরিবারের মতো একচেটিয়া কোটিপতি সৃষ্টি হতে দেয়া হবে না। কেননা পুনরায় এদেশের অর্থনীতি মাত্র কতিপয় লোকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে বাঙালির কপালে অতীতের মতোই দুঃখ নেমে আসবে।

সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে : মন্ত্রী বলেন যে, বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে রাতারাতি আইন করে সমাজতন্ত্র কায়েম করা যায় না। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার এবং সরকারের আন্তরিকতার ওপরই তা অধিক নির্ভরশীল। তিনি বলেন যে, আজকাল সবাই মুখে সমাজতন্ত্রের খুব তুবড়ি ছুটাচ্ছে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, অতীতে ২৪ বছর ধরে ইসলামের নামে এদেশের মানুষকে শোষণ করা হয়েছে। তেমনিভাবে সমাজতন্ত্রের আড়ালেও জনগণকে শোষণ করার চেষ্টা চালানো হতে পারে। সে সম্পর্কে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, সমাজতন্ত্রের নামে যেন এদেশের মানুষকে আরেকবার শোষণ করা না হয়। জনাব মতিউর রহমান বলেন যে, বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে তার ভিত্তি স্থাপন করা প্রয়োজন। এবং সেজন্যই গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বাংলার সম্পদ : মন্ত্রী বলেন যে, তিনি বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অত্যন্ত আশাবাদী। কেননা বাংলাদেশে তিনটি অতুলনীয় সম্পদের সমন্বয় ঘটেছে। এই সম্পদ হচ্ছে, বাংলার অল্পে তুষ্ট পরিশ্রমী ও দেশপ্রেমিক মানুষ, বাংলার অফুরন্ত সম্পদ ও উর্বর মাটি এবং বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের আগুনে পোড় খাওয়া অন্যান্য ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল নেতৃত্ব।

মার্কিন সাহায্যের সমালোচনা : মন্ত্রী মার্কিন সাহায্যের তীব্র সমালোচনা করে তথাকথিত মার্কিন সাহায্যকে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক শোষণের হাতিয়ার বলে অভিহিত করেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন যে, অতীতে বাংলাদেশের বহুব্যবসায়ী সাহায্য নিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে যাতে পুনরায় আমরা নিঃস্ব হয়ে না পড়ি, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা সাহায্যকে অভিনন্দন জানানো হবে। এ ব্যাপারে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও জার্মানি এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের শোষণমুক্ত অর্থনীতির বিকাশের জন্য তিনি সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সোনার বাংলাকে সোনায় রূপান্তরিত করে এখানে কৃষক শ্রমিককে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি : দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন যে, দেশের কোনো কোনো স্থানে কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতকারী লুটপাটের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং অনেককেই ভয় দেখাচ্ছে। মন্ত্রী বলেন যে, দুষ্কৃতকারীরা এসব অপকর্ম চালিয়ে যেতে পারবে বলে যদি মনে করে থাকে তবে তারা ভুল করবে এবং শীঘ্রই তাদের দমন করা হবে। তিনি এসব দুষ্কৃতকারীকে বর্বর ইয়াহিয়ার দোসর এবং জনগণের শত্রু বলে আখ্যা দেন।

দালালরা নগণ্য : মন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশের বাইরে চলে যাওয়া এক কোটি এবং দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী সাড়ে ৬ কোটি লোকের মিলিত সংগ্রামেই এতো তাড়াতাড়ি বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করা সম্ভবপর হয়েছে। তিনি বলেন যে, দালালের সংখ্যা এতো নগণ্য যে তারা শতকরা কোনো হারের আওতাভুক্ত নয়। ঢাকা শিল্প ও বণিক সংঘের পক্ষ থেকে জনাব মতিউর রহমানকে দেওয়া এই সম্বর্ধনা সভায় কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ ছাড়া বহু বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, জনাব মতিউর রহমান ২৫ মার্চের আগে ঢাকা শিল্প ও বণিক সংঘের সভাপতি ছিলেন এবং এর পরবর্তীকালে মুজিবনগরে তিনি বাংলাদেশের শিল্প ও বণিক সংঘ গঠন করে তার সভাপতি হন।

শুধু প্রশংসাই নয়, সরকারের ভুলভ্রান্তি তুলে ধরুন

বাংলাদেশ সরকারের আইন ও শাসনতন্ত্র বিষয়ক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন সংবাদপত্রের মাধ্যমে সরকারের ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটিগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান, যার ফলে সরকার তার দোষত্রুটি সংশোধন করতে পারবে। বিকেলে বেইলি রোড শহীদমিনার ও বরকত মেমোরিয়াল প্রাইমারি স্কুল উদ্বোধনকালে আইনমন্ত্রী উক্ত আহ্বান জানান। উল্লেখযোগ্য যে, ড. কামাল হোসেন ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে এ শহীদ মিনার ও স্কুলটি উদ্বোধন করেছিলেন। কিন্তু ২৫ মার্চের পর পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এ দুটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেয়। সংবাদের বর্তমান ধরন সম্পর্কে মন্ত্রী মহোদয় বলেন যে, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে শুধু সরকারের প্রশংসার দ্বারাই সাংবাদিকরা সরকারকে সাহায্য করতে পারে না। সাংবাদিকরা কেবলমাত্রই সৎ ও নিরপেক্ষভাবে সরকারের দোষত্রুটি খুঁজে বের করে সরকারকে সাহায্য করতে পারে। এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে ‘ডাকসুর সহ-সভাপতি জনাব আ স ম আব্দুর রব কালবিলম্ব না করে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা চালু করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সভাপতির ভাষণে জনাব খালেদ মোহাম্মদ আলী এম সি এ সরকারি কর্মচারীদের আমলাতান্ত্রিক মনােভাব পরিত্যাগ করে জনগণের বন্ধু হবার আহ্বান জানান।

সূত্র : দিনলিপি, বঙ্গবন্ধুর শাসন সময়, ১৯৭২