• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বস্ত বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী

মোহাম্মদ শাহজাহান

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯

ডিসেম্বর বাঙালি জাতির বিজয়ের মাস, গৌরবের মাস, আনন্দের মাস। ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর এ মাসেই বাংলার মানুষ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। আজ ৩ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এইদিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন- ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১ এর ৩ ডিসেম্বর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বিশ্বস্ততম বন্ধু ভারতরত্ন ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার গড়ের মাঠে উপস্থিত বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষকে উদ্দেশ করে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘তুম লোক নিশ্চিত থাকো তোমাদের আমরা তোমাদের মুক্ত স্বাধীন দেশে পাঠাব, নিরাপদ দেশে পাঠাব- যাতে তোমরা নিরাপদে থাকতে পারো। তোমরা নিরাপদে দেশে ফিরে যাও, ভালো থাকো, দেশকে গড়ে তুলবে। আমরা দেখব তোমরা একটি সুখী জাতি, একটি সুখী ও শান্তির দেশ গড়ে তুলেছ। তোমাদের আর কেউ হামলা করতে পারবে না। আমরা তাদের আজই জবাব দেব। আমরা তোমাদের পাশে থাকব। তোমাদের সঙ্গে, তোমাদের দেশে গিয়ে আমি দেখা করব। তোমাদের নেতা মুজিবকে আমরা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। তোমাদের সঙ্গে ফের মিলেঙ্গে মেরে ভাই আওর বহিনো।’ জনসভায় বক্তৃতার শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জনতাকে উদ্দেশ করে তিনি নিজেই বললেন, আমার সঙ্গে তোমরা আওয়াজ দাও- ভারত-বাংলাদেশ ভাই ভাই, হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই, স্বৈরাচারী যুদ্ধবাজ ধ্বংস হোক, যুদ্ধ না শান্তি- শান্তি শান্তি, জয় বাংলা। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গর্জে উঠেছিল গড়ের মাঠ। স্লোগানে স্লোগানে ঐতিহাসিক দিনে গড়ের মাঠের জনসমুদ্রে যেন ঝড় ওঠে। নেচে গেয়ে জনতা স্লোগান দেয়- ইন্দিরা কি জয়, ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ- হিন্দি-বাংলায় মিশ্র স্লোগানে বার বার কেঁপে ওঠে গড়ের মাঠ। জনসভায় উপস্থিত এপার বাংলার বাঙালিদের স্লোগান ছিল-বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় ইন্দিরা গান্ধী ইত্যাদি। মহান সৃষ্টিকর্তাই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। কলকাতার লাখ লাখ মানুষের জনসভায় মিসেস গান্ধীর এই বক্তৃতার পর শুধু বাংলা বা ভারতের জনগণ নয়, বিশ্ববাসী বুঝে যায়, সহসাই বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দু’দশকের মুক্তিসংগ্রামের ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তীতুমীর, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, বাদল, দীনেশ, বিনয় থেকে শুরু করে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকসহ আরও অনেকেই হয়তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। মহান নেতা মুজিবের রাজনীতি পর্যালোচনা করে ঐতিহাসিকরা নিশ্চিতভাবেই একমত হবেন যে, তার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৬৬ সালে তিনি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি ৬ দফা জাতির সামনে পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু নিশ্চিতভাবেই জানতেন, পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ৬ দফা মানবে না এবং ৬ দফা একদিন এক-দফাতে পরিণত হবে। ৬ দফা দেয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানের তৎকালীন মুখপাত্র পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানও বলেন, মুজিবের ৬ দফা হচ্ছে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করা। বঙ্গবন্ধু পারতপক্ষে পূর্ব পাকিস্তান শব্দটি উচ্চারণ করতেন না। তিনি পাকিস্তান সংসদেও বক্তৃতাকালে পূর্ব পাকিস্তান বোঝাতে পূর্ব বাংলা বলে উল্লেখ করতেন। বাংলাদেশের নামকরণও করেন শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর অনেক কৃতিত্বের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে স্বাধীনতার দাবিতে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একজন মানুষের অঙ্গুলি হেলনে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন উদাহরণ সম্ভবত খুব কম।

শত্রু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি দেড় হাজার মাইল দূরে লায়ালপুর কারাগার থেকে মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বন্দি নেতা মুজিবই ছিলেন যুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের রাষ্ট্রপতি। তার নামেই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। ৯ মাস যুদ্ধের সময়ে সাড়ে সাত কোটি নারী-পুরুষ সবাই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। সে সময় এদেশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের মনে করতেন দেবদূত। মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে হাসতে হাসতে জীবন দিয়েছেন। ইতিহাসে শেখ মুজিবের অমর কীর্তি হয়ে থাকবে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। এর একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করা যায় না। ‘মুজিব বাংলার- বাংলা মুজিবের। ’

এতকিছু সত্ত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও সেদেশের জনগণের সহযোগিতা, সমর্থন ও সাহায্য ছাড়া মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করতে পারতো না বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের বিশ্বাস। তৎকালীন সমসাময়িক বিশ্বে ইন্দিরার মতো রাষ্ট্রনায়কের সংখ্যা হাতে গোনা। নিজ দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতাদের রাজনৈতিকভাবে একরকম ধরাশায়ী করে তিনি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। দোর্দ- প্রতাপে একাধারে ১১ বছর দেশ শাসনের পর কনিষ্ঠ পুত্রের বাড়াবাড়ির জন্য ’৭৭ এর নির্বাচনে পরাজিত হন। তিন বছর পর বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি আবারো নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৮১ সালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে একেবারে শুরু থেকেই সমর্থন, সহযোগিতা ও সাহায্যের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলার নিরীহ-নিরপরাধ ছাত্র-জনতাকে হত্যা করতে শুরু করে। মধ্যরাতের পর দেড়টার দিকে গ্রেফতার হওয়ার আগে সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে সত্তরের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দলের নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা সম্বলিত বার্তা ওই রাতেই দেশ-বিদেশে প্রচারিত হয়ে যায়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ওই রাতে ঢাকাসহ সারা দেশে লাখো মানুষকে হত্যা করে।

বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা তখন বন্ধ। বেতার-টিভি পাকিস্তান সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। বিদেশি সাংবাদিকদের দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরকে আসতেও দেয়া হচ্ছিল না। ভারত সরকার এবং সেদেশের গণমাধ্যম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গণহত্যার কথা বিশ্ববাসীকে জানায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং সেদেশের শক্তিধর নিরাপত্তা উপদেষ্টা (পরবর্তীকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ড. হেনরি কিসিঞ্জার। মিসেস গান্ধীর প্রতি নিক্সন এতটাই ক্ষুব্ধ হন যে, ‘হতচ্ছাড়া মেয়েলোক’ বলে গালি দিয়েছিলেন। আরও বিভিন্নভাবে মিসেস গান্ধীকে অপমান করেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন।

একাত্তরের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ওই সফরে কি কি কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে তিনি এর যথার্থতা ব্যাখ্যা করেন। নভেম্বরের ৪ ও ৫ তারিখ হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে বৈঠক করেন ইন্দিরা। ইন্দিরার সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে যদি তার গণহত্যার পথ থেকে বিরত না করা যায়, তাহলে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অনিবার্য।’ প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে নিক্সন কোনো কথা না বলে ভারতের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করে লিখিত বিবৃতি দেন। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী হিন্দিতে আগে থেকে লেখা বিবৃতি পাঠের বদলে ইংরেজিতে ভাষণ দিলেন। এক কোটি বাঙালি উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নেয়ায় ভারত কী বিশাল সমস্যার সম্মুখীন সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্ষুব্ধ ইন্দিরা বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি, আমাদের সমস্যা সমাধানে আপনাদের কাছ থেকে আরও গভীর উপলব্ধির আশায়, কিছু প্রাজ্ঞ বোধের সন্ধানে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্রুদ্ধ জবাবের পর কারো বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, তিনি নিক্সনকে কড়া ভাষায় একরকম বকেই দিলেন। নিক্সনও তা বুঝতে পারেন। পরের দিন বৈঠকের আগে নিক্সন এই অপমানের প্রতিশোধ নেন। বৈঠকের সময় নির্ধারিত থাকলেও ইন্দিরাকে অতিথিকক্ষে ৪৫ মিনিট বসিয়ে রাখলেন। এমনকি ড. কিসিঞ্জারও বৈঠকের নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছাননি। অনেক পরে একজন পদস্থ কর্মকর্তা এসে ইন্দিরাকে ওপরের তলায় রুজভেল্ট কক্ষে নিয়ে বসালেন। বৈঠক খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে এ বৈঠকের কথা স্মরণ করে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘বৈঠকে নিক্সন বলতে গেলে কোনো কথাই বলেননি। অধিকাংশ কথা কিসিঞ্জারই বলছিলেন। নিক্সন হয়তো মিনিট কয়েক কিছু একটা বললেন, এরপর কিসিঞ্জারের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী, তুমি তো একথাই বলবে হেনরি, ঠিক কি-না। ’ সফর শেষে স্বদেশে ফিরে অবশেষে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশকে প্রথম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারত। এতে স্বাভাবিকভাবেই নিক্সন ক্রুদ্ধ হন। ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের এক মাস পর ৬ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট নিক্সন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইন্দিরার আক্রমণ-বাসনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি এখন ভাবছি, এখানে (অর্থাৎ হোয়াইট হাউসে তার বৈঠকের সময়) ওই হতচ্ছারা মেয়ে লোকটাকে (ইন্দিরা গান্ধী) (The goddamned woman) খুব সহজে ছেড়ে দিয়েছি কি-না। ... ও (ইন্দিরা) আমাদের একেবারে বোকা বানিয়ে গেছে। কিন্তু শুনে রাখো, এর জন্য তাকে (ইন্দিরাকে) মূল্য দিতে হবে। হ্যাঁ, মূল্য দিতে হবে।’ ইন্দিরাকে ‘দেখে ছাড়বেন’ বলার একদিন পর, ৭ ডিসেম্বর নিক্সন ভারতে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধের নির্দেশ দেন। কংগ্রেসের ভেতরে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ওঠে। কিন্তু নিক্সন বলেন, ‘যে যা-ই বলুক, আমি সে সিদ্ধান্ত বদলাবো না।’ কিসিঞ্জার জানতে চান, ‘কোনো অবস্থায় না?’ নিক্সন জবাবে বলেন, ‘না, মহাশয় (কোন অবস্থায়) তা করবো না। এসব হারামিরা (These bastards) যেমন কাজ করছে, এখন তার সমুচিত জবাব পাবে।’ ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতকে পর্যুদস্ত করার জন্য ১০ ডিসেম্বর কিসিঞ্জারকে নিক্সন বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানকে (সরাসরি) অস্ত্র পাঠানোর ব্যাপারে কংগ্রেসকে রাজী করানো যাবে না। এ জন্য পাকিস্তানকে বিস্তর অর্থনৈতিক সাহায্য দেবো। নিক্সন-কিসিঞ্জারের চক্রান্ত ও চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি ইন্দিরা গান্ধী। শেষ পর্যন্ত লড়ে যান নেহেরু কন্যা প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা। আখেরে তিনিই বিজয়ী হন। পাকিস্তানিদের অত্যাচার, হত্যা, নির্যাতনের শিকার বাংলার এক কোটি মানুষকে ইন্দিরার ভারত আশ্রয়, বাসস্থান ও খাবার দিয়েছে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকার ভারতের মাটিতে থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। ভারতের মাটিতেই মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের শুধু ট্রেনিং ও আশ্রয় নয়, অস্ত্রশস্ত্রও দিয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার। ভারত আশ্রয় না দিলে যুদ্ধকালীন সরকার যেমন গঠিত হতো না বা গঠিত হলেও কাজ করতে পারতো না, তেমনি এদেশে মুক্তিবাহিনীও সৃষ্টি হতো না। ভারতে আশ্রয় না পেলে পাকি দস্যুরা বাংলার সকল যুবকদের হত্যা করে ফেলত। এক কথায় ভারত সরকার ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আশ্রয়, প্রশ্রয়, সাহায্য, সমর্থন ও সহযোগিতা না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কি পরিণত হতো তা ভাবতেও গা শিউরে উঠে।

একাত্তরের ২ আগস্ট নরাধম ইয়াহিয়া ঘোষণা করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে মুজিবের বিচার করা হবে। গোপন বিচারে বাঙালি জাতির জনককে ফাঁসিতে হত্যা করাই ছিল ওই তথাকথিত বিচারের মূল লক্ষ্য। ৮ আগস্ট ইন্দিরা গান্ধী ভারত সরকারের পক্ষে প্রেরিত এক বার্তায় শেখ মুজিবের জীবন রক্ষায় ও তার মুক্তির দাবিতে ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিশ্বের সব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের প্রতি অনুরোধ জানান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য মিসেস গান্ধী বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর করেন। অবশেষে ৩ ডিসেম্বর ভারত আক্রমণ করে পাকিস্তান। এই পরিস্থিতিতে ভারত পাল্টা আক্রমণে বাধ্য হয়। এ সময় বাংলাদেশ ও ভারতের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে যৌথবাহিনী গঠন করা হয়। যৌথবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী বীরবিক্রমে মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেসামাল হানাদার বাহিনী একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ।

পৃথিবীর সব দেশের আগে ৬ ডিসেম্বর ভারত সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ৩ মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্যদের ইন্দিরা গান্ধী স্বদেশে ফেরত নিয়ে যান। বিশ্বে এ ধরনের দ্বিতীয় নজির নেই। ১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেন। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে মিসেস গান্ধীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে ভারতের জনগণের উদ্দেশে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বাধীনতার এবং তিনি তা দিয়েছেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, বাংলাদেশের শরণার্থীদের সসম্মানে দেশে ফেরত পাঠাবো, মুক্তিযোদ্ধাদের সবরকম সাহায্য করবো এবং বাংলাদেশের অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনব। আমিও আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি।’ উল্লেখ্য, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ১৪ হাজার সেনা সদস্য জীবন দান করেছেন। বিলম্বে হলেও ২০১১ সালের ২৫ জুলাই সোমবার মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের কন্যা শেখ হাসিনার সরকার ভারতরত্ন ইন্দিরা গান্ধীকে মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা সম্মাননা’ প্রদান করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সরকার, সে দেশের জনগণ এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাহায্য, সমর্থ ও সহযোগিতার কথা এত স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বস্ত এবং দুর্দিনের বন্ধু নেহেরুকন্যা ভারতরত্ন মহিয়সী ইন্দিরা গান্ধীকে চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। জয় বাংলা।

১ ডিসেম্বর ২০১৯

[লেখক : মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক; সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা]

bandhu.ch77@yahoo.com