• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪ মহররম ১৪৪২, ০৫ আশ্বিন ১৪২৭

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা : তাকে যেমন দেখেছি

পঙ্কজ ভট্টাচার্য

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

আমার দুর্লভ সৌভাগ্য এই যে, আমি মানবেন্দ্র লারমার মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছি, আমরা উভয়ে ‘ক্লাসমেট’ যেমন ছিলাম তেমনি ছিলাম ‘জেলমেটও’, আর একই সালে উভয়ে এ ভূখ-ে জন্মলাভ করি, বৃহত্তর চট্টগ্রামে আমাদের বাল্য ও যৌবনের বড় একটা সময়কাল কাটে।

১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে সতীর্থ হিসেবে এমএন লারমাকে পেয়েছি। সহপাঠীদের মধ্যে মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত এ তরুণ ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। শাণিত যুক্তি সহযোগে তিনি বক্তব্য রাখতেন, মূল্যবোধ ও নীতির প্রতি ছিল তার অবিচল নিষ্ঠা। জীবনযাপনে ছিলেন অত্যন্ত সহজ ও অনাড়ম্বর। আমরা উভয়ে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলাম, রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল সাধারণভাবে অভিন্ন।

সেই দিনগুলোতে পাহাড়ি জনগণসহ মেহনতি ও গরিব জনগণের শোষণমুক্তির স্বপ্নে তিনি অধীর থাকতেন। বিশ্বজুড়ে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের সাফল্য, প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ ইউরোপ ও এশিয়ায় উত্তাল হয়ে ওঠা, সমাজণান্ত্রিক শিবিরের ক্রমবর্ধিত বিশাল অগ্রগতি ও প্রভাব তার চিন্তা ও ধ্যানধারণায় গভীরভাবে রেখাপাত করে। স্বদেশ চিন্তায় ছিল ‘দ্বিজাতি’ তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের প্রতি ঘোর অনাস্থা ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল সমাজ রূপান্তরের রূপকল্প ছিল তার স্বপ্ন। তিনি আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হতেন সামন্ত শোষণ-নির্যাতনের জোয়ালে আবদ্ধ পাহাড়ি জনগণের জিম্মিদশা দেখে। পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলোর অনুন্নয়ন, পিছিয়ে পড়া, অশিক্ষা, জাতিগুলোর পরস্পরের মধ্যে সমঝোতা ও সদ্ভাবের অভাব তাকে পীড়িত করত। উপরন্তু পাহাড়ি জুম্ম জাতিগুলোর ওপর চেপে বসা পাকিস্তানি উগ্র সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠীর মতাদর্শ ও শোষণ ব্যবস্থা এবং বাঙালি জাত্যাভিমানী ধারা এবং উগ্র ইসলামী আগ্রাসী কার্যক্রমের আঘাতে জুম্ম জাতির দুর্ভাগ্য বরণের পথে অবধারিতভাবে ধাবিত হওয়ার বহুমুখী চক্রান্ত সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন, সোচ্চার, সজাগ ও সতর্ক।

সেই সময়ে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক গণবিরোধী সরকার কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি জুম্ম জাতিসত্তা নিশ্চিহ্নকরণের প্রক্রিয়া শুরু করে। ১৯৬০ সালে এ মরণফাঁদ প্রকল্প চালু হয়। এ ঘটনাটি মারাত্মকভাবে নাড়া দেয় এমএন লারমার জীবনকে, এটি হয়ে উঠে তার জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। এ সময়ে শয়নে-স্বপনে-জাগরণে তাকে তাড়া করে ফিরতে থাকে এক মহাবিপদের দুঃশ্চিন্তা, জুম্ম জনগোষ্ঠীর শিকড় ছিন্ন এবং অস্তিত্ব বিপন্ন করা এবং জুম্ম সংস্কৃতি ও অর্থনীতি বিলুপ্ত করার এক ‘রাষ্ট্রীয়’ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে পাহাড়ি জনগণসহ দেশের আপামর জনগণকে সচেতন, সক্রিয় ও সংগঠিত করার কঠিন কর্মপন্থা তিনি গ্রহণ করেন। আইয়ুবের সামরিক শাসনের নির্যাতনের মুখে নাগরিক অধিকারহীন ওই দিনগুলোতে এমএন লারমা অনেকটা একক প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। তার এ অসম সাহসী ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামন্ত নেতৃত্বের বিরোধিতা তিনি পেয়েছেন পদে পদে।

অকুতোভয় লারমা তৎকালীন পূর্ববঙ্গের দুটি প্রধান পত্রিকা ইত্তেফাক ও সংবাদের চিঠিপত্র কলামে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার এ প্রকল্প বন্ধে যুক্তিপূর্ণ আবেদন তুলে ধরেন এবং ওই দুটি পত্রিকায় এমএন লারমা স্বনামে প্রতিবাদী প্রবন্ধ লেখেন। আমার যতদূর মনে পড়ে কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায়ও এ মর্মে তার লেখা ছাপানো হয়। তখন ভারতের পত্রিকাটি এ অঞ্চলে ব্যাপক প্রচারিত পত্রিকা ছিল। তার যুক্তিপূর্ণ এবং বিপন্ন মানবতা বাঁচানোর আবেগদীপ্ত এ আহ্বানে পাহাড়ি অঞ্চলসহ প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং শাসকগোষ্ঠীর উন্নয়নের মুখোশ খসে পড়ে। এ বাঁধের কারণে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সমুল এবং চাষযোগ্য ৫৪ হাজার একর জমি, লারমার জন্মভিটা মহাপুরম গ্রাম, বৌদ্ধ বিহার, স্কুল, রাস্তাঘাট সবকিছু চিরদিনের জন্য অতলে ডুবিয়ে দিল। আশ্রয়হীন ও উদ্বাস্তুতে পরিণত হলো এক লাখ পাহাড়ি মানুষ।

এমএন লারমা এ ঘটনাকে পাহাড়িদের অস্তিত্ব বিলোপের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, জুম্ম জনগোষ্ঠীর নিঃস্বকরণের ‘প্রকল্প’ এবং পাহাড়ের ‘চিরন্তন কান্না’ বলে চিহ্নিত করেন। অপর পক্ষে সামন্ত নেতারা এহেন প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া দূরের কথা, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দাবি উচ্চারণের সাহস পর্যন্ত দেখালেন না, উপরন্তু তারা বললেন ‘কাপ্তাই বাঁধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীদের প্রতি পাকিস্তান সরকার প্রশংসনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে’।

একদিকে পাক শাসকগোষ্ঠী এবং অন্যদিকে সামন্তপ্রভুদের পাহাড়ি জাতি বিনাশী এ সব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে অভিন্ন জুম্ম জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার কাজে, জুম্ম যুব শক্তিকে জাতীয় অগ্রণী বাহিনী হিসেবে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব রক্ষায় অগ্রসর করার কাজে, সব শোষণ-নির্যাতন, অশিক্ষা, কুসংস্কার থেকে মুক্তির সামাজিক আন্দোলন গড়তে ‘গ্রামে চলো’ স্লোগান নিয়ে গ্রামাঞ্চলে ‘জাতীয় শিক্ষার’ স্বদেশী আন্দোলন গড়ে তোলা এবং যুব বাহিনীকে সর্ব পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং শিক্ষা বিস্তার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এমএন লারমা।

এমএন লারমা ১৯৫৭ সালে পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলন, ’৫৮ সালে ছাত্র ইউনিয়নে অংশগ্রহণ এবং ’৬২ সালে পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনে নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে এবং কাপ্তাই বাঁধ নিয়ে তার লেখালেখি এবং প্রচারপত্রের মাধ্যমে পাহাড়ি যুব মানসে তিনি প্রচ- আলোড়ন সৃষ্টি করেন। শাসকগোষ্ঠী এমএন লারমার ভূমিকায় বিপদ আঁচ করে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। দুই বছরের অধিক লারমা কারারুদ্ধ থাকেন।

১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে আমি চট্টগ্রামের কারারুদ্ধ হই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন উৎসব বর্জন আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে। চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে তখন পুর্ণেন্দ্র দস্তিদার, সুখেন্দু দস্তিদার, সাইফউদ্দীন খান প্রমুখের সঙ্গে কয়েক মাস আটক থাকি। সে সময় এমএন লারমাকে কারাগারের সাথী হিসেবে পাই। তখন দেখেছি কারাগারের কষ্টের জীবনকে পোড়-খাওয়া বিপ্লবীর জীবনে রূপান্তরিত করতে তিনি সাধনা করছেন, চরম কৃচ্ছসাধনার পথ ধরেছেন। আমি রাজবন্দী হওয়ার সুবাদে যে কয়েক প্রস্ত পোশাক পেতাম তার একাংশ তাকে দিতে চাইলে তিনি নিতে অস্বীকার করেন এ যুক্তিতে যে, ‘আমি সরকারের মামলায় আসামি, সরকারের অতিথি, সরকার কিছু দিলে আমি নিতে পারি, আপনার প্রাপ্য জিনিস আমি কেন নেব?‘ জুম্ম জাতির মুক্তি ও শোষিত জনগণের স্বার্থে সমাজ বদলের সংগ্রামের জন্যে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ তিনি চট্টগ্রাম কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে শিক্ষকতা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের কাজে সর্বশক্তি নিয়োজিণ করেন। তার আদর্শে ছাত্র-যুব-নারী উদ্বুদ্ধ হয়ে জুম্ম জনগণের মধ্যে গণজাগরণের প্রস্তুতি চালাতে থাকে।

১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রচ- জোয়ারের মধ্যেও এমএন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এমএন লারমা জুম্ম যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উৎসাহিত করেন। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সিভিল প্রশাসনের অসহযোগিতা ও বিরোধিতার কারণে এ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সমস্ত পার্বত্য অঞ্চলে মুষ্টিমেয় রাজাকার ব্যতীত পাহাড়ি-বাঙালি ব্যাপকতম অংশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেন। পরিস্থিতি এমন হয় যে, দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তার অনুচরদের হামলা-হুমকির কারণে এমএন লারমা ও তার ছোট ভাই সন্তু লারমাসহ অন্য নেতারা প্রায় সময় পালিয়ে বেড়াতেন। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের পর মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ মুজিব বাহিনীর অত্যাচারে লারমা ভ্রাতৃদ্বয় ও অন্যান্য জুম্ম নেতাদের প্রায়ই পালিয়ে থাকতে হতো।

এমএন লারমা আশা করেছিলেন বাঙালির জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রক্তমূল্যে অর্জিত স্বাধীনতা অর্জনের পর জুম্ম জনগণের অধিকারের আকাক্সক্ষা ও শত বছরের তাদের বেদনার কথা বিজয়ী বাঙালি শাসকগোষ্ঠী বুঝবেন। এক্ষেত্রে তার প্রত্যাশা ও স্বপ্ন ছিল সঙ্গত কারণেই। স্বপ্নভঙ্গের দুঃখ বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে সারাজীবন।

সংবিধান রচনাকালে এমএন লারমা তার উচ্চ প্রত্যাশার কথা বারবার তুলে ধরেছেন। তিনি বলতেন, দেশের সংবিধান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আপামর জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সব প্রকারের জাতিগত ও শ্রেণীগত বঞ্চনার অবসান ঘটবে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে এ অঞ্চলের এবং আদিবাসী পাহাড়ি জনগণের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। সদ্য স্বাধীন দেশের সরকার বাঙালি উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রভাবে লারমার জুম্ম জাতীয়তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি অগ্রাহ্য করেন, স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাব নাকচ করেন। কিন্তু লারমা দৃঢ়তার সঙ্গে পাহাড়ি ১১টি জাতিগোষ্ঠীসহ সারা দেশের ৪৫টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য এবং জাতিসত্তার অস্তিত্ব সংরক্ষণ এবং অবহেলিত জুম্ম জনগণের উন্নয়নের দাবি একদিনের জন্যেও ত্যাগ করেননি।

১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এমএন লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতি গঠনের মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক হাতিয়ার গড়ে উঠে, গড়ে তোলা হয় ছাত্র, যুব, নারীসহ জুম্ম প্রগতিশীল অংশের সহযোগী সংগঠনগুলো । ১৯৭৩ সালে সাধারণ নির্বাচনে জনসংহতি সমিতির সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পার্বত্য উত্তরাঞ্চলে এমএন লারমা এবং দক্ষিণাঞ্চলে চাথোয়াই রোয়াজা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন।

জাতীয় সংসদেও এমএন লারমা পাহাড়ি জনগণের সংস্কৃতি-অর্থনীতিক অধিকার ও উচ্চতর স্থানীয় স্বশাসন এবং আদিবাসীসহ আপামর গরিব মেহনতি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ধারাবাহিক বক্তব্য, প্রস্তাব ও দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।

১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব তার দলের ব্যর্থতা ও জনবিচ্ছিন্নতা কাটাতে বাকশাল নামে একমাত্র পার্টি গঠনের জন্য যখন মরিয়া হয়ে উঠেন তখন তিনি আতাউর রহমান, মো. তোয়াহা এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বাকশালে যোগ দিতে পৃথক পৃথকভাবে কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এমএন লারমার এ বৈঠক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমার ক্ষুদ্র উদ্যোগ কিছুটা ছিল। এ বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এমএন লারমার দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক ও কার্যকর আলোচনা হয়। আলোচনায় বঙ্গবন্ধু পাহাড়ি জনগণের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ভাষা-ঐতিহ্য রক্ষার্থে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার হিসেবে অনেকাংশে স্বশাসন প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন এ শর্তে যে, এমএন লারমাকে বাকশালে যোগ দিতে হবে, অবশেষে লারমা বঙ্গবন্ধুর এ শর্ত মেনে নেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এমএন লারমার সেই রাতের দীর্ঘ আলোচনা ও সমঝোতা হওয়ার তারিখটি আজ মনে নেই। কিন্তু মনে আছে এমএন লারমা সে রাতটি আমার সঙ্গে কাটান। বর্তমান প্রেসক্লাবের বিপরীতে ন্যাপ কার্যালয় উশ্রী ভবনে ২১ তোপখানা রোডে দোতলার কোণার ছোট ঘরে আমি থাকতাম, মাটিতে ছিল ঢালাও পাতা বিছানা। সে ঘরে একজনের ভাত দুজনে ভাগ করে খেয়ে বিছানায় বসে শুয়ে ভোররাত পর্যন্ত পাহাড়ি জনগণ, দেশের মেহনতি মানুষের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের আশঙ্কা সব কিছু নিয়ে আমরা আলোচনার ঝড় তুলি। সে রাতের স্মৃতি ভোলার নয়।

অতঃপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক পটপরিবর্তনের পর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হলে জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনা করেন। সশস্ত্র এই দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্যে ১৯৭৭ ও ’৮২ সালে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সম্মেলনে তিনি সভাপতি পদে নির্বাচিত হন।

১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর পানছড়ির গভীর অরণ্য আস্তানায় চিহ্নিত বিভেদপন্থি বিশ্বাসঘাতক চক্রের হাতে নৃশংসভাবে নিহন হন জুম্ম জাতির স্থপতি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাসহ তার ৮ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

এমএন লারমা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন সামন্ত শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শিক্ষা। তার ঠাকুরদা চানমনি চাকমা এবং পিতা চিত্ত কিশোর চাকমাসহ পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পাওয়া সামন্ত বিরোধী সংগ্রামের ঐতিহ্য লারমার চেতনাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে।

দেশের সংবিধানের অধীনে জুম্ম জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় সরকারে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার এই সশস্ত্র যুদ্ধ এমএন লারমার নির্দেশিত পথে তার মৃত্যুর পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সম্পাদনের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটে। এ ক্ষেত্রে এমএন লারমার আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে বর্তমানে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। নানা চড়াই-উতরাই মোকাবিলা করে চরম ধৈর্য ও রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা নিয়ে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন সন্তু লারমা। চেঙ্গী-মাইনী-কাচালং-সাঙ্গু-মাতামুহুরী-কর্ণফুলীর অববাহিকা জুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের অধিকার, জুম্ম পরিচয়, শান্তি ও উন্নয়ন ২২ বছর পূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তির পরেও অর্জিত হয়নি। এখনও রক্ত ঝরে পাহাড়ে, অশান্তি-অবিচার উৎখাত-উচ্ছেদ-নির্যাতন ও অধিকারহীনতার মধ্যে পাহাড়ে কান্নার ধ্বনি উঠে। মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণের জীবন দর্শন ও নীতি অনুসরণ করেই পাহাড়ে অধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার করতে হবে।

এমএন লারমার পথ নির্দেশ আজও প্রাসঙ্গিক- ‘গ্রামে ছড়িয়ে পড়’, ‘শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো’, ‘নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করো’, ‘সকল জাতির অধিকার সমান’, ‘যারা মরতে জানে তারা অজেয়’ মহান নেতার এসব বাণী আজ সময় ও যুগের দাবি হয়ে আমাদের পথ দেখাবে।