• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১১ ফল্গুন ১৪২৬, ২৯ জমাদিউল সানি ১৪৪১

মদ্যপান ও বিপণন বিধিমালা সংশোধন হচ্ছে

মো. মাহবুবুল হক

| ঢাকা , শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৯

‘মদপান ও কেনাবেচায় নিয়ম স্পষ্ট হচ্ছে’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত। হয়েছে (প্রথম আলো, ১৯.০২.২০১৯ তারিখ)। একটি অংশ তুলে ধরা হলো: ‘এ পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, মুসলিম প্রহিবিশন রুল ১৯৫০ ও এক্সাইজ ম্যানুয়াল (ভল্যুম-২) ও প্রয়োজন। অনুযায়ী নির্বাহী আদেশে অ্যালকোহল বা মদ্যপান ও কেনাবেচার বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয়। অস্পষ্টতা থাকায় অ্যালকোহল বা মদ্যপান কেনাবেচা, আমদানি-রফতানি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। সে কারণে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী অ্যালকোহল জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা হচ্ছে। তবে আগের মতোই এ দেশের মুসলিম নাগরিকদের জন্য মদ অবৈধই থাকছে। কোনো মুসলমান চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া মদ বা মদ জাতীয় পানীয় পান করতে পারবেন না। চিকিৎসকের সনদ নির্ধারিত ফরমে যুক্ত করে তাকে আবেদন করতে হবে। অমুসলিম নাগরিকেরা কোনো নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন না। তাছাড়া মুচি, মেথর, ডোম, ঝাড়ুদার ও চা-বাগানের শ্রমিক পারমিট নিয়ে দেশি মদ কিনতে পারবেন। ২১ বছরের নিচে কোন ব্যক্তির কাছে মদ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকছে।

প্রায় ৭০ বছর পুরাতন আইনটির প্রাসঙ্গিকতা সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হয়। তা বোঝা যায় প্রকাশিত আরেকটি খবর থেকে (যুগান্তর, ২৮.০৫.২০১৮ তারিখ)। শিরোনাম মদ বিক্রির লাইসেন্স দেয়া হোক। জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর অংশ নিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী উক্তিটি করেছেন। তার মতে দেশে বহু অনুমোদিত মদ বিক্রেতা অবৈধ কেনাবেচা করে চলেছে কিন্তু লাইসেন্স না থাকার কারণে ট্যাক্স না পরিশোধ করার সুযোগ নিতে পারছে এরা। সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। আর পানীয় শুল্ক হার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি বলে পণ্যটির খুচরা মূল্য বেশি পড়ছে। বিদেশি পর্যটক বা কাজের সূত্রে যারা আসেন তারা দাম বেশি বলে আগ্রহ দেখান না। বেচাবিক্রি নেই বললে চলে। ফলে হোটেল রেস্তোরাঁয় নাইট-লাইফ বলে কিছু গড়ে ওঠনি। যা বিদেশিদের আকর্ষণের পরিবর্তে বিকর্ষণ করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাদের চোখে বাংলাদেশ একটি শুষ্ক দেশ। অননুমোদিত বিক্রেতাদের ট্যাক্স নেটওয়ার্কের। আওতায়ায় আনা গেলে এ জাতীয় পানীয় ব্যবসা থেকে রাজস্ব আয় আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ও হবে। মাননীয় মন্ত্রীর লক্ষ্য দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য এই খাতটির প্রতি ন্যায্য গুরুত্ব দেয়া। তার কথার রেশ ধরে এ খাতটি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসকরা দর্শনায় কেরু নামের একটি ডিসটিলারি স্থাপন করেছিল যা এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বেশকিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বাজারে এসেছে। বলে শুনেছি। মুন্সীগঞ্জের বিখ্যাত আলু সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরের অভাবে অনেক সময়ে শত শত টন আলু নদীতে ফেলে দিতে হয় বলে কাগজে দেখা যায়। উপযুক্ত কাঁচামাল ব্যবহার করে বিশ্বমানের মদ, বিয়ার প্রস্তুত করার সক্ষমতা আমাদের আছে বলে মনে করি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হতে পারে। উদ্যোগ সফল হলে বিদেশে রফতানিও বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমনটি ভারতে হয়েছে।

ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় মদ্যপানে সরকারি পর্যায়ে বৈষম্যের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে দেখা যায়নি। এ অভ্যাস আজও অটুট। কবি মির্জা গালীবের একটি উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। ‘তেরি দুয়াওমে আসর হো, তো মাসজিদকো হিলাকে দিখা / নাহি দো ঘুত পি, মাসজিদকো হিলতে দেখ’। বাংলা অনুবাদ - (তোমার প্রার্থনাতে যদি বিশ্বাস থাকে তাহলে মসজিদ নাড়িয়ে দেখাও, নয়তো দুই ঢোক গিলে মসজিদ নড়ছে তা দেখো)। তার জন্ম ১৭৯৭ সালে। আগ্রায়। পুরো নাম মির্জা আসাদুল্লাহ গালীব। গালীব তার ছদ্মনাম। এ অঞ্চলে মুসলিম দেশ হিসেবে খ্যাত পাকিস্তানেও মদ্যপানে বাধা ছিল না। ভুট্টো তনয়া বেনজীর এতে ছেদ ঘটায় যা এখনও বলবৎ রয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী হতে চলেছে কিন্তু এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন সাড়া-শব্দ শোনা যায়নি। এ কী অবহেলা না কী সেই বস্তাপচা ঔপনিবেশিকতার জের? তবে মদ্যপান বন্ধ নয়। শর্ত সাপেক্ষে পান ও কেনাবেচা করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত স্পষ্টিকরণে আগের মতো মুসলিমদের মদ্যপান অবৈধ মর্মে নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। তবে চিকিৎসক থেকে এমন মর্মে সনদ পাওয়া গেলে রোগী এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে। মদ্যপানে শরীরে কি প্রভাব পড়ে তা রিডার্স ডাইজেস্ট সাময়িকির প্রকাশিত ফ্যামিলি হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো: মদ বা অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় পাকস্থলিতে প্রবেশ করা মাত্র তা রক্ত-প্রবাহের সঙ্গে মিশে যায়। রক্তের মাধ্যমে যকৃতে, তারপর হৃৎপি-ে, ফুসফুস হয়ে পৌঁছে মস্তিষ্কে যেখানে এর। ক্রিয়া প্রকাশ পায়। এটি এক প্রকার বিষণœতাকারী যা মস্তিষ্কে অবস্থিত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াকর্মের গতি হ্রাস ও বাধা সৃষ্টি করে। ফলে মদ্যপায়ী নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে থাকে, নিজেকে হালকা ভাবতে শুরু করে। দেহ অবশাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। চলাফেরা সমন্বয়হীন হয়ে যায়। সেবনের মাত্রা যত বাড়ানো হবে যকৃতের ক্যানসারসহ পরিপাকতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঙ্গগুলোর বৈকল্য ও মৃত্যুঝুঁকির মাত্রাও সেই হারে বৃদ্ধি পাবে। এমনটি বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন। আজকের বিশ্বে চিকিৎসা শাস্ত্রে প্রভূত উৎকর্ষতা লাভের কারণে যেনতেন উপায়ে রোগ নির্ণয় করা হয় না, বানোয়াট পথ্যও চিকিৎসক দেন না। যথা নিয়মবহির্ভূত রোগ নির্ণয় ও ক্ষতিকর বা না জেনে পথ্য পরামর্শ করার ফলে রোগীর মৃত্যু বা অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসককে ছেড়ে দেয়া হয় না। তাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয়। এমন দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রে অ্যালকোহল মদ রোগমুক্তির ওষুধ হিসেবে বিবেচিত নয়। অতএব, এ বিধানটি বিলোপ করা যেতে পারে।

দুটি অংশ তুলে ধরছি। ১. অ্যালকোহল জাতীয় মাদকদ্রব্য কোথায় কেনাবেচা হবে, মদ্যপায়ীরা কোথায় বসে মদ পান করবেন, পরিবহন করতে পারবেন কি না- সেসব বিষয়ে স্পষ্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অচিরে বিধিমালাটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। ২. মদ পাওয়া যাবে দুই থেকে পাঁচ বা তার চেয়ে বেশি তারকাযুক্ত হোটেল, পর্যটন বা কূটনৈতিক এলাকা, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব ও ডিউটি ফ্রি শপে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এক থেকে সাতটি বা প্রয়োজন হলে যৌক্তিকতা দেখিয়ে তার বেশি লাইসেন্স পেতে পারে। বিধিমালায় বার বলতে বোঝানো হয়েছে অনুমোদিত জায়গা বা স্থাপনা, যেখানে বিদেশি মদ বৈধভাবে বিক্রির জন্য সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও সেবন করা যাবে। বারের মধ্যে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার, ক্লাব বার রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।’

ওপরে বর্ণনার আলোকে অ্যালকোহল বা মদ জাতীয় পানীয় দেশের প্রত্যন্ত লোকালয়ে সরবরাহ ও সেবন সুবিধা সৃষ্টি করা হচেছ বলে ধরে নেয়া যায়। শক্লাব ও ডিউটি ফ্রি শপে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এক থেকে সাতটি বা প্রয়োজন হাওরাঞ্চলে তো অঢেল পাওয়ার সুযোগ থাকবে সে কথা না-ই বা বললাম। তবে দেশব্যাপী হাতের কাছে এমন পানীয় ভোগের সুবিধা কী শুধু পর্যটক, বিদেশি যাদের কর্মসূত্রে আসতে হয়, দেশের অমুসলিম নাগরিকদের জন্য? যদি তা হয় তবে অল্প বিস্তর নাইট-লাইফের সূচনা সৃষ্টি হতে পারে। দেশের অমুসলিম নাগরিকেরা এ সুযোগ। গ্রহণ করবেন। তারা এখনও করেন। দেশের মুসলিম নাগরিকের বড় একটি অংশ মনে-প্রাণে এমন পানীয় গ্রহণ করবেন না বলে মনে করছি। অবশিষ্টদের ইচ্ছা ভিন্ন হতে পারে। তারা কী করবেন? হতাশ হয়ে শুধু হাপিত্যেশ করে যাবেন? নাকি একটা কিছু করবেন। এত বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে তাদের অবস্থাটা কী ইসপের সেই ‘আঙ্গুর ফল টক’ গল্পে শিয়ালের মতো মনে হতে পারে? শিয়াল সব শক্তি একত্র করে লাফের পর লাফ দিয়ে লোভনীয় আঙ্গুর ফল ছুঁতে ব্যর্থ হয়ে বলেছিল, আঙ্গুর ফল টক। অবশিষ্ট মুসলিম নাগরিকগণ হয়তো বলবেন, মদ্যপানে অস্থিরতা আনে। এদের মধ্যে যারা প্রয়োজনে সোজা পথে হাঁটেন না, তারা হয়তো হাল ছাড়বেন না। চিকিৎসকের খোঁজে বেরিয়ে পড়বেন। কোনো মতে যদি একখানা সনদ জোগাড় করা যায় তবে তো কেল্লা ফতেহ।

হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া কোন দেশে অ্যালকোহল বা মদ জাতীয় পানীয় নিষিদ্ধ নয়। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে বিধিমালা দেখে কেউ যেন বলতে পারে পুরনো মদ নতুন বোতলে।

[লেখক : পরিচালক, প্রকৌশল (সাবেক) বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন]